📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 উৎপাদনের নিয়ামকসমূহ

📄 উৎপাদনের নিয়ামকসমূহ


পশ্চিমা অর্থনৈতিক তত্ত্বে উৎপাদনের চারটি নিয়ামক হলো-ভূমি, শ্রম, পুঁজি ও সংগঠন। পক্ষান্তরে, ইসলামি অর্থনীতিতে এর সংখ্যা ছয়: ১. পরিবেশ, ২. প্রাকৃতিক সম্পদ, ৩. শ্রম ও ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে গঠিত মানব-নিয়মক, ৪. পুঁজি, ৫. সমাজ এবং ৬. আসমানি পথনির্দেশনা ও নিয়ামত। পশ্চিমা অর্থনীতি এই গবেষণার পরিসরের ভেতর পড়ে না বলে সেটার নিয়ামকগুলো বিবেচনায় আনা নিষ্প্রয়োজন। আর তা ছাড়া এগুলো এমনিতেও সুপরিচিত। তবে ইসলামি অর্থনীতির আলোচনায় এদের কোনো কোনোটির পুনরাবৃত্তি হতে পারে।

উৎপাদন নিয়ন্ত্রণের প্রথম নিয়ামক পরিবেশ। কারণ আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে পরিবেশের ব্যবহার ও সংরক্ষণ করতে মানুষ আদিষ্ট। পরিবেশ আল্লাহর সকল সৃষ্টির বাসস্থান। সকলের বসবাস এবং বেড়ে ওঠার জন্য একে উপযোগী করে সৃষ্টি করেছেন তিনি। পরিবেশের কাঠামোর মধ্যেই তিনি দিয়ে রেখেছেন অন্তর্নিহিত এক কলাকৌশল, যার মাধ্যমে এটি ভারসাম্যপূর্ণ থাকে। মানুষ উৎপাদন প্রক্রিয়ায় এই পরিবেশকে ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু এই ভারসাম্যকে বিনষ্ট করা চলবে না। যেমন- উৎপাদনকালে বিষাক্ত গ্যাসের ব্যবহার। যেহেতু এটি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্থ করতে পারে এবং জীবনযাত্রার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে, তাই এটি বৈধ হতে পারে না।

উৎপাদনের দ্বিতীয় নিয়ামক প্রাকৃতিক সম্পদ। অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় আল্লাহ-প্রদত্ত প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করতে মানুষ শুধু অনুমতিপ্রাপ্তই নয়, বরং আদিষ্টও বটে। এ কারণেই আল্লাহ এগুলোকে সহজলভ্য করে দিয়েছেন। পরিবেশ ও প্রাকৃতিক উপাদান এই দুই নিয়ামকের মাঝে পার্থক্যকারী রেখাটি খুব সূক্ষ্ম মনে হতে পারে। কিন্তু এ দুটোর মাঝে পার্থক্য আছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতিক সম্পদকে হিসেব করা হয়েছে ব্যবহৃত হওয়ার জন্যই। পক্ষান্তরে, পরিবেশের ব্যবহার ঘটাতে হবে বটে, কিন্তু একে সকলের জন্য উপযোগী উপায়ে সংরক্ষণও করতে হবে। অন্যভাবে বললে, প্রাকৃতিক সম্পদকে যদি এমনসব কার্যক্রমে বিনিয়োগ করা যায় যেগুলোর ফলাফল আরও টেকসই হবে, তাহলে সেই সম্পদকে শুধু শুধুই বাঁচিয়ে রাখার দরকার নেই। কিছু প্রাকৃতিক সম্পদ এমনিতে টেকসই বটে। যেমন মাটি, পানি, প্রাণিসম্পদ। খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ব্যতিক্রম।

তৃতীয় হলো মানব-নিয়ামক। এই নিয়ামকটির ব্যাপারে কুরআন ও সুন্নাহয় জোর দেওয়া হয়েছে। ওপরেও এ নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হওয়ায় এর আর পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন নেই। একটি বিষয় যোগ করা যায় অবশ্য। তা হলো মানব-নিয়মকের মধ্যে শ্রম ছাড়াও ব্যবস্থাপনা বা সংগঠন এবং উদ্যোগও অন্তর্ভুক্ত, যেমনটা পশ্চিমা তত্ত্বের ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হলো।

চতুর্থ নিয়ামক মূলধন। সম্পদকে যখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের উদ্দেশ্যে সংস্থাপন করা হয়, সেটাই তখন হয়ে যায় মূলধন। এই সম্পদের ব্যাপারে কুরআন ও সুন্নাহয় কতটা জোরারোপ করা হয়েছে, তা ওপরে দেখানো হয়েছে। তাই পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। মূলধনের মূল্যও আলোচিত হয়েছে আগেই। পশ্চিমা ও ইসলামি উভয় অর্থনীতিতে মূলধনের গুরুত্ব আবারও উল্লেখযোগ্য। ঋণ মূলধন হওয়ার ব্যাপারে এই দুই অর্থনীতি যদিও ঘোরতরভাবে দ্বিমত, কিন্তু সাম্যের ভিত্তিতে ব্যবসার ব্যাপারে এদের অবস্থান আবার একই। উভয় ঘরানায় ব্যবসার পুঁজির মূল্য হলো সাম্যের ভিত্তিতে ফেরতপ্রাপ্ত হার। এটি আসে মূলত লভ্যাংশের বণ্টন থেকে। পশ্চিমা তত্ত্বে ঋণ-পজির মূল্য হলো সুদ। আর ইসলামি তত্ত্বে এর কোনো স্থান নেই। কারণ অন্য সকল ঋণের মতো ঋণকৃত পুঁজিকেও হয় সাম্যভিত্তিক ব্যবসার পুঁজিতে পরিণত করতে হবে, আর নয়তো বিনামূল্যে দিতে হবে।

➡ উৎপাদনের পঞ্চম নিয়امক সমাজ। সমাজকে উৎপাদনের নিয়امক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কারণ দুটি। প্রথমত, উৎপাদন পরিকল্পনা তৈরির ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপক ও উদ্যোক্তার ওপর সমাজের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। কারণ এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়, যাতে তা জনসমাজের জন্য সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগে। ঘুরেফিরে এটার কারণেই আবার ব্যবস্থাপক তাদের ব্যবসার উপকারিতার সর্বাধিককরণ করতে পারে। দ্বিতীয়ত, উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ, যা সমাজ থেকেই লাভ করা যায়। সমাজকে উৎপাদনের নিয়امক হিসেবে গণ্য করলে ব্যবসায়িক কারবার এবং তার পারিপার্শ্বিক জনসমাজের মধ্যে জোরদার হয় পারস্পরিক সম্পর্ক। ফলে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সমাজের প্রতি প্রয়োজনবোধ এবং দায়িত্বশীলতা সৃষ্টি হয়। উৎপাদন খাত যে সমাজের ওপর নির্ভরশীল, এ ব্যাপারটা তুলে না ধরলে ব্যবসায়িক কারবার ও জনসমাজের মাঝে আন্তঃসম্পর্ক অবহেলিত রয়ে যাবে।

উপর্যুক্ত বিষয়টি অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যসমূহের সাথে সম্পর্কযুক্ত। ইসলামের মতে, উৎপাদনের মূল্য বা মুনাফার সর্বাধিককরণ মোটাদাগে উন্নয়নের লক্ষ্য নয়। এখানে বরং সর্বাধিককরণ পরিভাষাটিই বাদ দিতে হয়। বলা চলে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন থেকে ব্যক্তি ও সমাজের জন্য কল্যাণকর উপকারিতা বৃদ্ধি করাটাই এখানে লক্ষ্য। পশ্চিমা ক্লাসিক্যাল অর্থনীতির চাইতে বরং পশ্চিমা পরার্থবাদী (Altruist) ও সামাজিক অর্থনীতিই এ ব্যাপারে ইসলামি অর্থনীতির অধিক নিকটবর্তী। এখানে উৎপাদনকর্ম বা অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে সোজাসাপ্টাভাবে নৈতিক বিষয়াদি এবং মূল্যবোধ রক্ষা করার ওপর জোর দেওয়া হয়।

➡ ষষ্ঠ নিয়امক হলো আসমানি পথনির্দেশনা এবং নিয়ামত। মুসলিমরা জীবনে যা কিছুই করবে, তাতেই তাদের কর্তব্য হলো আল্লাহকে মেনে চলা এবং নবি -কে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা। অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যেও তারা আল্লাহর কাছ থেকে দিকনির্দেশনা চায় এবং তাঁর নিষিদ্ধকৃত জিনিস থেকে বিরত থাকে। জীবনে উপভোগ করার জন্য তিনি যত কল্যাণ পূর্বনির্ধারিত করে রেখেছেন, সেগুলো অনুসন্ধান করার ক্ষেত্রে মুসলিমরা আল্লাহর অনুগ্রহ কামনা করে। মুসলিমদের বিশ্বাসমতে, একজন ব্যক্তি যত ভালোভাবেই প্রস্তুতি নিক, উৎপাদনের সব নিয়امক যত ভালোভাবেই গুছিয়ে রাখুক, পরিকল্পনা যত নিখুঁতই হোক—আল্লাহর সাহায্য, প্রজ্ঞা, পথনির্দেশনা ও অনুগ্রহের প্রতি নির্ভরতা না থাকলে কোনো সাফল্যই আসবে না। চূড়ান্ত সাফল্যকে দেখা হয় আল্লাহ-প্রদত্ত জিনিস হিসেবে। আত-তাওয়াক্কুল আলাল্লাহ তথা আল্লাহর প্রতি ভরসা মুসলিমদের চিন্তাপদ্ধতির একটি মৌলিক উপাদান। উৎপাদন, ভোগ ও অন্য সকল মানবীয় কর্মকাণ্ডে এ ব্যাপারটি প্রযোজ্য।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00