📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 গণ-মালিকানা

📄 গণ-মালিকানা


কুরআন ও সুন্নাহতে ব্যক্তিগত মালিকানা যেমন স্বীকৃত, গণ-মালিকানাও তা-ই। নবি গণ-মালিকানার পরিসর হিসেবে বলেছেন পানি, চারণভূমি ও আগুনের মালিকানার কথা। তিনি বলেন, “তিনটি জিনিসের ওপর মুসলিমগণের সামষ্টিক মালিকানা রয়েছে—পানি, চারণভূমি এবং আগুন” (মুসনাদু আহমাদ: ২৩১৩২)। এগুলো প্রাথমিক পরিবেশে জীবনের জন্য আবশ্যক প্রাকৃতিক সম্পদ (Qutb, 1979)। মানবসমাজ সামগ্রিকভাবে এই তিন ধরনের অর্থনৈতিক সম্পদের সাধারণ ব্যবহারের অধিকার রাখে। জীবনের প্রয়োজন পূরণে এগুলো কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার ওপর এই অধিকার নির্ভরশীল। এসব সম্পদের মালিকানা গোটা সমাজের কাছে অর্পণ করার কারণটা সম্ভবত একেবারেই স্পষ্ট। এগুলো সেসব মৌলিক পণ্য, যেগুলো মানুষের খুবই প্রয়োজনীয়। এগুলো ছাড়া জীবনধারণ দুরূহ হয়ে পড়ত। তাই এসব মৌলিক সম্পদকে ব্যক্তিগত মালিকানা থেকে বাইরে ধরা হয়েছে। অবশ্য স্থান-কাল ও সমাজভেদে এসব সম্পদের আপেক্ষিক প্রয়োজনীয়তার মাত্রা বিভিন্নরকম। কিন্তু মূল বিধান হলো কোনো একটি সংগঠিত সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্র সেই সমাজের জন্য অত্যাবশকীয় এসব সম্পদের মালিক। "জনস্বার্থ” সংক্রান্ত ফিকহি মূলনীতি ব্যবহার করে নির্ধারণ করা হবে যে, কোনো একটি প্রাকৃতিক সম্পদ গণ- মালিকানাধীন বলে বিবেচিত হবে কি না।

উল্লেখ্য যে, প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে সমাজ বা রাষ্ট্র এগুলোর মালিকানা লাভ করে বটে। কিন্তু কোনো ব্যক্তি আবার তার নিজস্ব পানির উৎস (যেমন কুয়া), নিজেদের মালিকানাধীন চারণভূমি বা আগুনের মালিক হতে পারে। অর্থনৈতিক সম্পদটি গণ-মালিকানাধীন হবে কি না, তা নির্ভর করে সেটির প্রাকৃতিক হওয়া বা না-হওয়ার ওপর। প্রাথমিক ইসলামি ইতিহাসের গ্রন্থাদি থেকে জানা যায় যে, মুসলিমরা ব্যক্তিগতভাবে নিজস্ব কৃয়ার মালিক ছিল। কেউ কেউ আবার স্বেচ্ছায় সমাজের কল্যাণার্থে তা দান করে দিয়েছিলেন।

ফলে সংজ্ঞা নির্ধারণে একটি প্রধান সমস্যার উদ্ভব হয়: একটি অর্থনৈতিক সম্পদ কোন ক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে সমাজের মৌলিক চাহিদা পূরণ করছে বলে বিবেচিত হবে এবং কোন ক্ষেত্রে একে প্রাকৃতিক সম্পদ বলে ধরা হবে? একটি সরল যাযাবর সমাজে এ প্রশ্নের উত্তর কঠিন কিছু নয়, যেমনটা আদি ইসলামি রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু বর্তমান মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর মতো জটিলতর কাঠামোতে এর সংজ্ঞায়ন কঠিন। এসব জায়গায় ফিকহের প্রয়োজনীয়তা প্রতিভাত হয়। ফকিহগণ নতুন প্রয়োজনের তাগিদে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে বিধিবিধান আহরণ করেন। যেমন, তুলনামূলক বিশাল মাত্রায় খনিজ পদার্থ আবিষ্কৃত হলে সেটার মালিক কে হবে, এ ব্যাপারে কিছু ফকিহ বলেছেন তার মালিক হবে সমাজ তথা রাষ্ট্র। ওই ভূমিটি যে ব্যক্তির, সে না। ইমাম মালিক এরকম মত দিয়েছেন। (Al-Zarqani, 1990)1

ভূমির মালিকানা এবং সেই মালিকানা কিভাবে মালিকের হাতে পৌঁছেছে, তার ভিত্তিতে শরীয়ত বিভিন্নরকমের বিধান দিয়েছে। এখান থেকেই বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়। এগুলোর সারমর্ম হলো, কোনো জমি খুঁড়ে যা কিছু আবিষ্কৃত হবে, তা ওই জমির মালিকের মালিকানায় থাকবে। সেখানে রাষ্ট্রের প্রাপ্য হবে ওই আবিষ্কৃত গুপ্তধনের যাকাত (Al-Kalby, 1989)। আর খনির ব্যাপারে যে বিধান, তেলের উৎসের ক্ষেত্রেও তা-ই প্রযোজ্য হতে পারে।

কোনটা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীনে এনে গণ-মালিকানাধীন করা হবে এবং কোনটা ব্যক্তির কাছে ছেড়ে দিয়ে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন করা হবে, এই প্রশ্নটি বিভিন্ন মাযহাবের বহু ফকিহ ও আলিমের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। ইসলামি অর্থনৈতিক ইতিহাস জুড়ে মালিকানার আকৃতি ও ধরনের ওপর ভিত্তি করে গণ-মালিকানা নানাভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। পরে বিস্তারিত আলোচিত হবে এ বিষয়টি। যেমন, পরের অধ্যায়ে আমরা দেখব রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব • কিভাবে ভূমির ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করেছেন, যাতে এর আরও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। তা ছাড়া নতুন বিজিত ভূমি সাধারণ মুসলিম জনগণের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া হয়নি। এটি পূর্ব থেকে প্রচলিত রীতির বিপরীত। এই ভূমিগুলো সমাজের সকল সদস্যের ব্যবহারের জন্য রাষ্ট্রের মালিকানাধীন রাখা হয়।

তা ছাড়া আমরা আরও দেখব যে, ভূমির মালিকানা সমাজ নয়, বরং রাষ্ট্র গ্রহণ করেছে। এগুলো সাওয়াফি ভূমি বা শাহী এস্টেট (Crown Estate) হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এখানেই শেষ না। রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য সহকারে এসব ভূমিকে ব্যবহার করবে, এরকম যোগ্য মানুষের কাছে সেই ভূমি অর্পণ করার অধিকার খলিফা রাখেন। কালক্রমে এসব এস্টেটের মালিকানা হস্তান্তরিত হয় বিশেষ কিছু ব্যক্তি হাতে। কারণ তাদের অবদানের ফলে মুসলিমরা এমনভাবে উপকৃত হয়েছে, যা ইতিহাসে স্থান করে নেয়। উমাইয়্যা ও আব্বাসি খিলাফতের আমলে এর স্পষ্ট নিদর্শনের দেখা মেলে।

কিন্তু আমাদের প্রাথমিক আলোচনার এই পর্যায়ে নিচের বিষয়গুলোর প্রতি জোরারোপ করা প্রয়োজন:
➡ (ক) অর্থনৈতিক সম্পদের মালিকানার ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান হলো ব্যক্তি ও রাষ্ট্র উভয়কেই মালিকানা থেকে উপকৃত হতে দেওয়া। এদের একটিকে অপরটির ওপর কোনো প্রাধান্য দেওয়া হয়নি।
➡ (খ) কোনো অর্থনৈতিক সম্পদকে এমনভাবে জাতীয়করণ করে ফেলা, যার ফলে ব্যক্তি সেখানে অংশগ্রহণ করে অর্থনৈতিক সম্পদের উন্নয়ন ও উদ্বৃত্ত সম্পদ সৃষ্টির কোনো সুযোগই পায় না, এই নীতি ইসলামি আদর্শে একেবারেই অনুপস্থিত।
➡ (গ) অর্থনৈতিক সম্পদে কাউকে ব্যক্তিগত মালিকানা প্রদান করা মানে এই না যে, সে ওই সম্পদ অপব্যবহারের সুযোগ পেয়ে গেল।
➡ (ঘ) ব্যক্তির হাতে অর্থনৈতিক সম্পদের অনিচ্ছাকৃত অপব্যবহার সংঘটিত হলে রাষ্ট্র ক্ষেত্রবিশেষে হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি সংশোধন করার বৈধতা পেতে পারে। অবশ্য তার আগে সেই ব্যক্তিকে এ উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় সাহায্য- সহযোগিতা প্রদান করতে হবে।
➡ (ঙ) অর্থনৈতিক সম্পদের ইচ্ছাকৃত অপব্যবহারের ফলে ব্যক্তি অপরাধী হিসেবে গণ্য হয়। এর ফলে রাষ্ট্র এখানে হস্তক্ষেপ করে সম্পদটি নিজ জিম্মায় নিয়ে নিতে পারে।
➡ (চ) উপযুক্ত অর্থনৈতিক সম্পদ পুনর্বণ্টনের ফলে মূল মালিককে তার মালিকানা থেকে বঞ্চিত করা হবে না। বরং এই পুনর্বণ্টন হবে মালিকানার অধিকারে কোনো বাধা সৃষ্টি না করেই সেই অর্থনৈতিক সম্পদ ব্যবহারের অধিকার হস্তান্তর করা।
➡ (ছ) ব্যবহারের অধিকার পুনর্বণ্টিত করার ক্ষেত্রে সেই পুনর্বণ্টিত অর্থনৈতিক সম্পদ থেকে উৎপন্ন আয়ের ন্যায্য অংশ মূল মালিককে প্রদান করা হবে,
➡ (জ) নিয়ন্ত্রণাধীন অর্থনৈতিক সম্পদ কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে যাদের সাহায্য প্রয়োজন, তাদের সহযোগিতা প্রদান করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। এখানে রাষ্ট্র পালন করবে সহযোগিতাকারী এবং পাহারাদারের ভূমিকা। একদিকে তার লক্ষ্য হবে সহযোগিতা ও শিক্ষা প্রদান করা, অপরদিকে অপচয় ও অপব্যবহার প্রতিরোধ করা।
➡ (ঝ) অন্যের ওপর ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া না ফেলা সাপেক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বীদের মাঝে মুক্ত প্রতিযোগিতা বৈধ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00