📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 ঋন রিবা

📄 ঋন রিবা


ইসলামি রচনাবলিতে ঋণ রিবাকে বিভিন্ন পরিভাষায় আখ্যায়িত করা হয়েছে, যেগুলোর অর্থ একই:
➡ রিবাল জাহিলিয়্যা: এখানে জাহিলিয়াত হলো প্রাক-ইসলামি অজ্ঞতার যুগ,
➡ রিবাদ দুয়ুন বা রিবাল কুরুদ: দুয়ুন এবং কুরুদ অর্থ ঋণ,
➡ রিবান নাসিআ: পরিশোধের মেয়াদের সাথে সম্পর্কিত রিবা,
➡ রিবাল কুরআন: কুরআনে উল্লেখিত রিবা।

এই সবগুলো পরিভাষা দিয়ে একই ধরনের রিবাকে বোঝায়। কুরআনে এর উল্লেখ রয়েছে, যা আগেই আলোচনা করা হয়েছে। পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন নেই। তাহলে ইসলামে একমাত্র যে ধরনের ঋণ বৈধ, তা হলো সুদমুক্ত ঋণ বা কারদুল হাসান (কর্জে হাসানা)-উত্তম ঋণ (আরবিতে কারদ অর্থ ঋণ, এবং আলোচ্য প্রেক্ষিতে আল-হাসান অর্থ উদার বা উত্তম)।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 বিক্রয় রিবা বা রিবাল বুয়ু

📄 বিক্রয় রিবা বা রিবাল বুয়ু


এটির কথা সুন্নাহয় উল্লেখিত হয়েছে, কুরআনে নয়। এর উদ্ভব ঘটতে পারে পণ্য বিনিময়ের ফলে, যেখানে বিলম্বিত মেয়াদের সংশ্লিষ্টতা থাকতেও পারে, না-ও থাকতে পারে। এই ধরনের রিবা আবার দুই প্রকার:
➡ ক) পরিমাণে অতিরিক্ত পাবার আশায় কোনো জিনিস বা পণ্যকে একই ধরনের অন্য কোনো জিনিস বা পণ্যের সাথে তাৎক্ষণিক বিনিময় করার ফলে যে রিবা হয়। এ ধরনের রিবাকে বলে রিবাল ফাদল। অর্থাৎ, তাৎক্ষণিক সরবরাহের লেনদেনের ফলে একই জিনিসের পরিমাণ বৃদ্ধি করার ফলে যে রিবা সংঘটিত হয়। যেমন, স্বর্ণের বদলে (অতিরিক্ত) স্বর্ণ অথবা গমের বদলে (অতিরিক্ত) গম বিনিময়। এই বিনিময়টি বৃদ্ধি সহকারে হওয়া বৈধ নয়। নিচে আরও উদাহরণ দেখবেন।
➡ খ) কোনো জিনিস বা পণ্যের সাথে একই বা ভিন্ন ধরনের জিনিস বা পণ্যের বিলম্বিত সরবরাহ বা ভবিষ্যৎ সরবরাহের ফলে যে ধরনের রিবা হয়। এ ধরনের রিবাকে বিলে রিবান নাসিআ। অর্থাৎ, বিলম্বিত ও ভবিষ্যৎ সরবরাহের লেনদেনের ফলে একই বা ভিন্ন জিনিস বা পণ্যের পরিমাণে বৃদ্ধির ফলে যে রিবা সংঘটিত হয়। যেমন, ভবিষ্যৎ সরবরাহের জন্য স্বর্ণের বদলে (অতিরিক্ত) স্বর্ণ অথবা গমের বদলে (অতিরিক্ত) গম বিনিময় করা। এই বিনিময়ের ক্ষেত্রে বিলম্বিত সরবরাহ এবং কোনো বৃদ্ধি সহকারে হওয়া দুটিই অবৈধ নয়। আরও উদাহরণ নিম্নে উল্লেখ করা হবে।

বিক্রয় রিবার নিষেধাজ্ঞা উল্লেখ করে নবি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, বিনিময়ের ক্ষেত্রে কোন শর্তগুলো পূরণ করলে এ ধরনের রিবা পরিহার করা যাবে। তিনি বলেন, "স্বর্ণের বদলে স্বর্ণ, রুপার বদলে রুপা, গমের বদলে গম, যবের বদলে যব, খেজুরের বদলে খেজুর, লবণের বদলে লবণ—সমপরিমাণ, সমানে সমান (হতে হবে)। আর এ দ্রব্যগুলো যদি একটি অপরটির ব্যতিক্রম হয় তাহলে যেভাবে ইচ্ছা বিক্রয় করতে পারো, যদি তা হাতে হাতে (নগদ নগদ) হয়।” (সহীহ মুসলিম: ১৫৮৭)।

নবি এর এই হাদীস ও অন্যান্য হাদীস থেকে নিম্নলিখিত সাধারণ নিয়মগুলো পাওয়া যায়, যেগুলো পণ্য রিবার ক্ষেত্রে মেনে চলতে হবে (Al-Qusi, 1982)।
➡ ১. ধাতুর বদলে ধাতু অথবা খাদ্যের বদলে খাদ্য (যেমন, স্বর্ণের বদলে স্বর্ণ অথবা গমের বদলে গম) বিনিময় করতে চাইলে দুটি শর্ত অবশ্যই পূরণ করতে হবে: (ক) উভয় জিনিসের পরিমাণগত সমতা এবং (খ) ত্বরিৎ সরবরাহ।
➡ ২. দুটি ভিন্ন ধরনের ধাতু অথবা ভিন্ন ধরনের খাদ্য (রুপার বদলে স্বর্ণ অথবা যবের বদলে গম) বিনিময় করতে চাইলে একটি শর্ত পূরণ করতে হবে: সরবরাহের দ্রুততা (সমতা এখানে প্রয়োজনীয় শর্ত নয়)।
➡ ৩. ধাতুর বদলে খাদ্য (গম বা যবের বদলে রুপা বা স্বর্ণ) কোনো শর্তই প্রয়োজন নেই। লেনদেন সম্পন্ন হবে মুক্ত বাণিজ্যের মাধ্যমে।

উপর্যুক্ত বিধিনিষেধগুলোর পেছনে যৌক্তিকতা সম্ভবত মুদ্রাভিত্তিক লেনদেনকে উৎসাহিত করে পণ্য বিনিময়কে নিরুৎসাহিত করা। নবি একবার তাঁর সাহাবি বিলাল ইবনু রাবাহ-কে দুই একক নিম্নমানের খেজুরের বিনিময়ে এক একক উচ্চমানের খেজুর কিনতে দেখেন। দেখে বলেন, “এটা নিশ্চিত রিবা। এ কাজ কখনই করবে না। তবে এরকম (উচ্চমানের) খেজুর কিনতে চাইলে নিজেরগুলো টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে তারপর সে টাকা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত খেজুর কিনতে পারো” (সহীহ বুখারি: ২৩১২, সহীহ মুসলিম: ১৫৯৪)। পণ্য বিনিময়ের বাজারপদ্ধতির চেয়ে মুদ্রাব্যবস্থা বেশি সুবিধাজনক। তা ছাড়া পণ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে দুই পণ্যের মাঝে ‘সাম্য’ খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে যে অনিশ্চয়তা কাজ করে, মুদ্রাব্যবস্থায় সে অনিশ্চয়তা নেই।

রিবার কার্যকারণ নিয়ে যে সংশয়, তা কুরআনি রিবা নিয়ে নয়; মূলত এই বিক্রয় রিবাকে ঘিরে। অধিকাংশ ফকিহদের বিপরীতে কেউ কেউ বিশ্বাস করে যে, সুন্নাহয় উল্লেখিত এই ছয়টি জিনিসের মধ্যেই পণ্য রিবা সীমাবদ্ধ। তাই বিক্রয় রিবার নিয়ম শুধু এগুলোর ওপরই প্রযোজ্য হবে। অধিকাংশের মতে এই ছয়টি পণ্য উদাহরণ। সুন্নাহতে সরাসরি উল্লেখিত না থাকলেও অন্য কিছু পণ্যের ওপর এটি প্রযোজ্য হবে, আর সেগুলো কী কী এটি নিয়ে ফকিহগণ বিভিন্ন মত পোষণ করেন।

ইসলামে সুদ নিষিদ্ধকরণের দুটি উদ্দেশ্য রয়েছে—নৈতিক ও অর্থনৈতিক। নৈতিক উদ্দেশ্য হলো ঋণকৃত টাকার ওপর অতিরিক্ত পরিমাণ আদায় করার মাধ্যমে দরিদ্র ও অভাবীদেরকে নিপীড়ন না করা। অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য উদ্ভূত হয়েছে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো থেকে:
➡ ১. ন্যায়বিচারের নীতিমালা। ব্যবসায়িক চুক্তিতে সংশ্লিষ্ট উভয় পক্ষের মাঝে লাভ ও ক্ষতি উভয়টিই ভাগ করে দেওয়াকে যথার্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এখানে।
➡ ২. পুঁজির মালিকদেরকে কঠোর পরিশ্রম ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক অবদান রাখতে উৎসাহিত করা, এবং
➡ ৩. মুষ্টিমেয় জনগোষ্ঠীর হাতে সম্পদ পুঞ্জীভূত করার প্রবণতা বিলোপ করা। ইসলাম ধনী হওয়ার বিরুদ্ধে নয়। কিন্তু সুদের ভিত্তিতে টাকা ধার দেওয়ার মতো অলস ও স্বার্থকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তা অর্জন করা যাবে না।

টিকাঃ
[১] এটি লেখকের ব্যক্তিগত ধারণা। শরয়ী নুসুস, সুন্নাহ বা আহকামের বাস্তবতা থেকে এটা প্রমাণিত হয় না যে, বিক্রয় রিবা নিষিদ্ধের পেছনে উদ্দেশ্য ছিল পণ্য বিনিময় প্রথাকে নিরুৎসাহিত করা। - সম্পাদক

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00