📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 ভাষাগত অর্থ

📄 ভাষাগত অর্থ


আরবিতে 'রিবা' শব্দের ভাবার্থ 'বৃদ্ধি'। এর ক্রিয়াপদ 'ইয়ারবু', যার অর্থ 'এটি বৃদ্ধি পায়'। এটা হলো শব্দটির সাধারণ ভাষাগত অর্থ, যা শুধুই সুদের ভিত্তিতে টাকা ধার দেওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। কিন্তু কুরআনে এই শব্দটি উল্লেখিত হয়েছে নির্ধারিত বৃদ্ধিতে টাকা দেওয়ার প্রসঙ্গে। এর ওপর আরও জোরদান করা হয়েছে নির্দিষ্ট পদাশ্রিত নির্দেশক 'আল' যুক্ত করার মাধ্যমে। অতএব, ক্রিয়াপদ 'ইউরবি' দিয়ে বোঝানো হয়েছে নির্ধারিত বৃদ্ধিতে টাকা প্রদানের কাজটিকে। আর বিশেষ্য 'মুরবি' দিয়ে বুঝিয়েছে সেই ব্যক্তিকে যে এই কাজ করে। কুরআনে এই শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়েছে বিশেষভাবে এই নির্দিষ্ট দ্যোতনা বোঝাতে। রিবা ছাড়াও এমন আরও অনেক শব্দ রয়েছে, যেগুলো কুরআনের নির্দিষ্ট পারিভাষিক শব্দে পরিণত হয়েছে। অন্য যে-কোনো শাস্ত্রের মতো অর্থনীতিতেও যে-কোনো শব্দের একাধিক অর্থ গড়ে উঠতে পারে। একটি ভাষাগত, আরেকটি পারিভাষিক। শরীয়তও এর ব্যতিক্রম নয়। কোনো একটি শব্দের ভাষাগত ও শাস্ত্রীয় অর্থের মাঝে পার্থক্য নিয়ে আলিমগণকে প্রায়ই আলোচনা করতে দেখা যায়। রিবা শব্দটির পারিভাষিক বা শাস্ত্রীয় অর্থ কী, তা আরও ভালো করে বোঝা যায় কুরআন ও সুন্নাহয় এর নিম্নলিখিত উল্লেখগুলো থেকে।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 কুরআনে উল্লেখ

📄 কুরআনে উল্লেখ


এটি দেখা যায় দুটি প্রধান ক্ষেত্রে:
➡ ক. সূরা বাকারার ২৭৫-২৭৯ নং আয়াত, যেখানে এর বিধান তথা সংজ্ঞা একদম খোলাখুলি-"...যদি তাওবা করো, তাহলে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই থাকবে।” এ থেকে বোঝা যায় যে, ঋণদাতা একমাত্র যে জিনিসটি ফিরে পাওয়ার অধিকার রাখে, তা হলো মূলধন। এখান থেকে স্পষ্টতই রিবার সংজ্ঞা বোঝা যায়। রিবা হলো যতটুকু (অতিরিক্ত) ফেরত দেওয়ার কথা, তার থেকে ঋণের পরিমাণ তথা মূলধনের বিয়োগফল। আর এটাকেই বর্তমানে সুদ নামে আখ্যায়িত করা হয়।
➡ খ. ব্যবসা ও রিবার মাঝে কুরআনের পার্থক্য করা। এ দুটি জিনিসই মূলধনে এক ধরনের বৃদ্ধি ঘটায়। অথচ প্রথমটি বৈধ, দ্বিতীয়টি নিষিদ্ধ। "আল্লাহ ব্যবসাকে করেছেন হালাল, আর রিবাকে করেছেন হারাম” (সূরা বাকারা, ২: ২৭৫)। দুটোই বৃদ্ধি আনয়ন করা সত্ত্বেও একটি অনুমোদিত এবং অপরটি নিষিদ্ধ হয়ে। তাহলে বোঝা যায়, তাদের প্রকৃতি কখনো এক হতে পারে না। দুটির মধ্যে একটি পার্থক্য হলো ঝুঁকি গ্রহণ। আরেকটি হলো সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মাঝে ঝুঁকি ও লাভের মধ্যকার অনুমোদিত ভারসাম্য। ব্যবসার অংশীদাররা ঝুঁকি ও লাভ উভয়টিই সমানভাবে ভাগাভাগি করে। অপরদিকে রিবা কার্যক্রমে ঝুঁকি শুধুই ঋণগ্রহীতার। এভাবে রিবাকে যে ব্যবসায় কার্যক্রমের লভ্যাংশের থেকে আলাদা করে দেখানো হলো, সেটিকেই বর্তমানে আমরা সুদ নামে চিনি। সেটির পরিমাণ চড়া হোক বা না হোক, কথা একই।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 সুন্নাহতে উল্লেখ

📄 সুন্নাহতে উল্লেখ


এখানেও স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, আসল ধারকৃত পরিমাণের ওপর ঋণগ্রহীতার দেওয়া যে-কোনো পরিমাণ অতিরিক্ত সম্পদই রিবা। নবি বলেছেন, "জাহিলি যুগের সমস্ত সুদ বাতিল করা হলো। তোমরা তোমাদের মূলধন সংগ্রহ করবে। তোমরা অত্যাচার করবে না, অত্যাচারিতও হবে না।” (সুনানু আবি দাউদ: ৩৩০১)।

ওপরের আলোচনা থেকে উপসংহারে আসা যায়, রিবা বর্তমান যুগের প্রচলিত সুদেরই নাম। আশা করি এতে করে এই ব্যাপারটিকে ঘিরে থাকা ধোঁয়াশা কেটে যাবে।

এই বিতর্কের কারণ হিসেবে কয়েকটি বিষয়কে উল্লেখ করা যায়:
➡ ১. নিষিদ্ধকরণের তৃতীয় পর্যায়ে কুরআনের ব্যবহৃত "বহুগুণ বৃদ্ধি" কথাটি। কিন্তু চতুর্থ ও চূড়ান্ত পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে সেটিকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া ঋণের কুরআনি সংজ্ঞা হলো 'মূলধন', যার অতিরিক্ত যে-কোনো পরিমাণ সম্পদই রিবায় পরিণত হয়। তা ছাড়া "বহুগুণ বৃদ্ধি" কথাটির আরেকটি ব্যাখ্যা আছে। রিবা তথা সুদের হার যা-ই হোক না কেন, বছরের পর বছর পরিক্রমায় এতে মূলধনের ওপর বৃদ্ধির পরিমাণ 'চড়া' আকারের-ই হয়ে ওঠে। দীর্ঘমেয়াদে এমনটাই হয় সুদের ফল।
➡ ২. খ্রিস্টান লেখকদের প্রভাব, বিশেষত ক্যালভিনের। তিনি চক্রবৃদ্ধি ও সরল সুদের মাঝে পার্থক্য করেছেন এবং সরল সুদকে হালাল বলতে চেয়েছেন। এভাবে যে, প্রথমটি বৈধ নয়, কারণ এতে সুদের হার "চড়া” হয়ে থাকে; কিন্তু দ্বিতীয়টির হার "যৌক্তিক" হওয়ার কারণে তা বৈধ (Tawney, 1980)। তার এই মতবাদের কারণে পরবর্তী লেখকদের চিন্তাপদ্ধতি প্রভাবিত হয়ে থাকতে পারে।
➡ ৩. মুসলিম লেখকদের পারিপার্শ্বিক রাজনৈতিক আবহাওয়ার প্রভাব। রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ হয়তো কিছু অনৈসলামিক আর্থিক নীতিমালা সমর্থন করে। প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে কিছু লেখকের মাঝে সেগুলোর পক্ষে সাফাই গাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। মধ্যযুগ থেকে মুসলিম সরকারগুলো যখন থেকে অবক্ষয়ের শিকার হতে থাকে, সে সময়ে এটি দেখা দেয়। এরপর বর্তমান সময়ে এসে আধুনিকায়নের নামে অর্থনীতির পশ্চিমাকরণের সরকারি পদক্ষেপের ফলে ব্যাপারটি আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
➡ ৪. ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মে সুদের নিষিদ্ধতার ভিন্নতর ব্যাখ্যা। এই ব্যাপারে ইহুদিবাদ ও খ্রিষ্টবাদের শিক্ষা ইসলামি শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বটে। কিন্তু ইসলামি শরীয়তের কথা হচ্ছে, সুদ শুধু 'দুজন ইসরাঈলি'র মধ্যেই নিষিদ্ধ নয়। বরং ইসরাঈলি ও অ-ইসরাঈলির মাঝেও নিষিদ্ধ (সূরা বাকারা, ২: ২৭৫- ২৭৯)। নিউ টেস্টামেন্টে সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও খ্রিষ্টানধর্মে সুদ নিষিদ্ধ ছিল। প্রাথমিক যুগের খ্রিষ্টান আইনবিদগণ এর বিরুদ্ধে ছিলেন। তাদের মত ছিল, যে ব্যক্তি গোঁয়ার্তুমি করে সুদকে পাপ নয় বলে দাবি করবে, তাকে ধর্মদ্রোহী হিসেবে শাস্তি দিতে হবে (উদাহরণস্বরূপ দ্রষ্টব্য: Tawney, 1980)। মার্টিন লুথারও অনবরত সুদের নিন্দা করে গেছেন। ক্যালভিন হলেন প্রথম খ্রিষ্টান লেখক, যিনি সুদকে বৈধ হিসেবে গ্রহণ করেন। ক্যালভিনের মতে, নির্ধারিত একটি পরিমাণ ছাড়িয়ে না গেলে, সুদ আইনসিদ্ধ। আর দরিদ্রদের ক্ষেত্রে কোনো সুদই নেওয়া যাবে না। মুসলিমদের মতে, ক্যালভিনের এই শিক্ষাকে নাকচ করে দিয়েছে প্রাথমিক যুগের খ্রিষ্টান আইনবিদদের শিক্ষা। উল্লেখ্য যে, মুসলিমরা (অবিকৃত) ইহুদিবাদ ও খ্রিষ্টবাদকে আল্লাহর নাযিলকৃত ধর্ম হিসেবে বিশ্বাস করে, যা ইসলাম আগমনের সাথে সাথে রহিত হয়ে গেছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00