📄 মূলধনের দর
ইসলামে মূলধনের দর সুদের হার নয়, বরং মূলধনের ওপর আসা লাভ, যা মূলত লভ্যাংশ থেকে আসে। কুরআন ও সুন্নাহয় সুদ তথা রিবাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর বদলে বৈধ করা হয়েছে ব্যবসা: "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং রিবাকে করেছেন হারাম” (সূরা বাকারা, ২: ২৭৫)। নবিজি নিজেই ব্যবসা করেছেন। অতএব, ঋণদাতা ও গ্রহীতার মাঝে সম্পর্কের দুটি দিক:
➡ ক) ঋণ যদি ভোগের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়, তাহলে বিনামূল্যে দিতে হবে।
➡ খ) আর যদি ব্যবসার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়, তাহলে সেটা দিতে হবে অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে আর নয়তো কোনো উপার্জনের উদ্দেশ্য ছাড়া।
উপার্জনের উদ্দেশ্যে দিলে সেটা হবে ব্যবসার ক্ষতির দায় বহনের বিপরীতে ব্যবসার লভ্যাংশ লাভ করা। আর উপার্জন করার উদ্দেশ্য না থাকলে এমন একটি সময় নির্ধারিত থাকবে, যখন ঋণের পুরো টাকা ফেরত দিতে হবে। বিনামূল্যে ঋণ পুনঃপরিশোধের ওপর ব্যবসায়িক ফলাফলের কোনো প্রভাব পড়বে না। সুদের ব্যাপারটা যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, তার প্রেক্ষিতে সুদ হারাম করার বিধানটি বিস্তারিত আলোচিত হওয়ার দাবি রাখে।
রিবার সংজ্ঞা হলো সুদের ভিত্তিতে টাকা ধার দেওয়া। কুরআনের চার জায়গায় এটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর শাস্তিও অবতীর্ণ হয়েছে চার ধাপে।
➡ প্রথম উল্লেখটি তত কঠোর নয়, যদিও নিরুৎসাহিতকরণ বেশ স্পষ্ট। এখানে বলা হয়েছে যে, সুদের বিনিয়োগ বাহ্যিকভাবে বৃদ্ধি পেলেও আল্লাহর দৃষ্টিতে বৃদ্ধি পায় না: "মানুষের সম্পদে বৃদ্ধি পাবে বলে তোমরা যে রিবা দিয়ে থাকো, আল্লাহর দৃষ্টিতে তা ধন-সম্পদ বৃদ্ধি করে না” (সূরা রূম ৩০: ৩৯)।
➡ দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও এগিয়ে গিয়ে বলা হয়েছে যে, সুদ গ্রহণ নিষিদ্ধ এবং এর জন্য নিশ্চিতভাবেই শাস্তি পেতে হবে। অন্যান্য জাতির ওপরও তা হারাম ছিল এবং এর জন্য তারা শাস্তি পেয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “সুতরাং ইহুদিদের জুলুমের কারণে আমি তাদের ওপর উত্তম খাবারগুলো হারাম করে দিয়েছিলাম, যা তাদের জন্য হালাল করা হয়েছিল। যেহেতু তারা অনেককে আল্লাহর পথ হতে প্রতিরোধ করত, নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও রিবা গ্রহণ করত এবং অন্যায়ভাবে লোকদের ধন-সম্পদ গ্রাস করত। আর আমি তাদের মধ্যকার অবিশ্বাসীদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি” (সূরা নিসা, ৪: ১৬০-১৬১)। এই আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে সুদী কারবারে লিপ্ত ইহুদি জাতির কথা। কাজটিকে আল্লাহর অবাধ্যতার নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করার মাধ্যমে মুসলিমদের ওপরও বিধিবদ্ধ হয়ে যায় যে, তারা এ কাজ থেকে দূরে থাকবে। সুদী কারবারে লিপ্ত হবে না। তারপরও নিষিদ্ধকরণের ব্যাপারটা সরাসরি উল্লেখ না করে করা হয়েছে উদাহরণের মাধ্যমে।
➡ সুদ-সংক্রান্ত তৃতীয় আয়াতে ঈমানদারদেরকে সরাসরি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেন তারা দ্বিগুণ ও বহুগুণ করে সুদ 'ভক্ষণ' না করে। স্পষ্টত বলে দেওয়া হয় যে, তাদের উচিত জাহান্নামের আগুনের শাস্তিকে ভয় করা: “হে মুমিনগণ, তোমরা রিবা খেয়ো না বহুগুণ বৃদ্ধি করে এবং আল্লাহকে ভয় করো যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো। আর তোমরা সেই আগুনকে ভয় করো যা কাফিরদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে” (সূরা আলি ইমরান, ৩: ১৩০-১৩১)। এই পর্যায়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সরাসরি এবং অবাধ্যতার শাস্তি সুস্পষ্ট। কিন্তু তারপরও অস্পষ্টতা থেকে যেতে পারে যে, এই নিষেধাজ্ঞা তো শুধু চক্রবৃদ্ধি হারে সুদের ক্ষেত্রে। চতুর্থ ও চূড়ান্ত আয়াতে আরও খোলাসা করে সকল অস্পষ্টতা দূর করা হয়েছে।
➡ চতুর্থ পর্যায়টি স্পষ্টতম, সবচেয়ে সোজাসাপ্টা এবং চরম শাস্তিমূলক। এটি (ক) খোলাখুলিভাবে সুদকে নিষিদ্ধ করে, (খ) রিবার ভিত্তিতে ঋণ প্রদানকারীদের আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বলে অভিযুক্ত করে, (গ) মুমিনদের এ থেকে তাওবা করে তা পরিত্যাগ করতে বলে, (ঘ) উল্লেখ করে যে, তাওবা করে নিলে তারা নির্ধারিত সময়ে মূলধন ফেরত নিতে পারবে, এবং (ঙ) যা ফেরত নেওয়া যাবে, সেটাকে মূলধন (রুউসু আমওয়ালিকুম) হিসেবে সংজ্ঞায়িত ও সীমাবদ্ধ করে দেয়। খোলাখুলি স্পষ্টতা সহকারে আয়াতটি বলে: “যারা রিবা গ্রহণ করে, তারা সেই ব্যক্তির মতো দাঁড়াবে যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল করে। এটি এজন্য যে তারা বলে, 'ক্রয়-বিক্রয় তো রিবার মতোই।' অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন আর রিবাকে করেছেন হারাম। যার কাছে তার প্রভুর পক্ষ থেকে উপদেশ এসেছে এবং সে বিরত হয়েছে, তবে অতীতে যা হয়েছে তা তারই থাকবে, আর তার ব্যাপারটি আল্লাহর ইখতিয়ারে। আর যারা পুনরায় আরম্ভ করবে তারাই আগুনের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আল্লাহ রিবাকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং সদাকাকে বৃদ্ধি করেন। আল্লাহ কোনো অকৃতজ্ঞ পাপীকে পছন্দ করেন না। যারা ঈমান আনে, সৎকর্ম করে, নামাজ কায়েম করে এবং যাকাত দেয়, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট পুরস্কার আছে। তাদের কোনো ভয় নেই, আর তারা দুঃখিতও হবে না। হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, রিবার সব বকেয়া পরিত্যাগ করো—যদি তোমরা মুমিন হও। যদি তোমরা পরিত্যাগ না করো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও। কিন্তু যদি তাওবা করো, তাহলে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই থাকবে। এতে তোমরা অত্যাচার করবে না এবং অত্যাচারিতও হবে না।” (সূরা বাকারা, ২: ২৭৫-২৭৯)।
এভাবে ধাপে ধাপে বিধান প্রবর্তন করার ব্যাপারটি ইসলামি শিক্ষায় বিরল নয়। কুরআনে এমন অনেক ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে নিয়ম দেওয়া হয়েছে কোনো দুষ্কৃতির চর্চাকে ধমকি ও সীমাবদ্ধ করার জন্য। পরে নতুন বিধান এসে আগের নির্দেশটি রহিত করে দেয় এবং সেই দুষ্কৃতিকে পুরোদমে নিষিদ্ধ করা হয়। মদপানের নিষেধাজ্ঞা এর একটি উদাহরণ। এটি দুই ধাপে বর্ণিত হয়েছে কুরআনে। প্রথম ধাপে মুসলিমদের আদেশ দেওয়া হয়েছে মাতাল অবস্থায় নামাজে না আসতে। দ্বিতীয় ধাপে আগের বিধানকে রহিত করে দিয়ে বলা হয়েছে যে, মদপান সম্পূর্ণ হারাম। কার্যত, প্রথম বিধানটি এখনো মদপানঘটিত অসামাজিক আচরণ সীমাবদ্ধকরণে প্রয়োজনীয়। নামাজ যেহেতু ভোর থেকে নিয়ে রাত পর্যন্ত দিনে পাঁচবার ফরজ, তাই সারাদিনে একবার মাতাল হওয়াও মুমিনদের জন্য একপ্রকার অসম্ভব। মদপানের জন্য বাকি থাকল তাই রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগের সময়টুকু। কিন্তু দ্বিতীয় পর্যায়ের বিধানটি আরও সোজাসাপটা। কুরআনে সুদের পর্যায়ক্রমিক নিষেধাজ্ঞা পরিপূর্ণ হয়েছে সূরা বাকারার ২: ২৭৫-২৭৯ আয়াতগুলোর মাধ্যমে। এ প্রসঙ্গে এগুলোই সবচেয়ে বিশদ আয়াত। আয়াতগুলোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপসংহার এবং একটি বিতর্কের উত্তর উঠে এসেছে। উপসংহারটি এই যে, সুদ এখন আল্লাহর কাছে স্রেফ অপছন্দনীয় নয়, বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে কঠিন ভাষায় যুদ্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া সুদের অর্থ-সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত প্রশ্নেরও জবাব দেওয়া হয়েছে এখানে। নিচে এটি আলোচিত হবে।