📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 শ্রম

📄 শ্রম


কুরআন ও সুন্নাহয় শ্রমের ওপর অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কর্মের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে অনেকবার কথা বলেছে কুরআন। সুন্নাহয় কাজের মর্যাদা অনেক বেশি। নবি এও বলেছেন যে, কিছু পাপ আছে, যেগুলো জীবিকা উপার্জনের জন্য পরিশ্রম করা ছাড়া মাফ হয় না (সহীহ বুখারি)।সা। সব ধরনের বৈধ পরিশ্রমকে উৎসাহিত করা হয়েছে, এমনকি তা পশু-পাখির উপকারে এলেও। হাদীসে আছে, 'কোনো মুসলিম যদি কোনো চারা রোপণ করে বা শস্য চাষ করে এবং সেখান থেকে কোনো পাখি, মানুষ বা প্রাণী আহার করে, তবে এটি তার জন্য সদাকা হবে' (সহীহ বুখারি: ২৩২০)। নবিজি ও তাঁর সাহাবিগণ বাজারে কাজ করে নিজেদের জীবিকা অর্জন করে নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে।

তা ছাড়া কুরআন ও সুন্নাহয় শ্রমের ধারণার ব্যাপারে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো চিহ্নিত করা যায়:
➡ ১. শ্রম মানে শুধুই ভাড়া করা শ্রম নয়। বরং পুঁজি ও জমি-সহ সকল ধরনের শ্রম এর অন্তর্ভুক্ত। তাই ইসলামি প্রেক্ষাপটে উদ্যোগও শ্রমের ভেতরে পড়ে।
➡ ২. কাজ করাকে প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়, এমনকি সে ধনী হলেও। অলস বড়লোকের কোনো জায়গা এখানে নেই।
➡ ৩. ইবাদতে পূর্ণ মনোযোগ কখনোই কাজ পরিত্যাগ করার গ্রহণযোগ্য ওজর নয়। ইসলামে কোনো বৈরাগ্যবাদ নেই। নবি এক লোককে দেখলেন, যে সারা দিন মসজিদে ইবাদত-বন্দেগি করে কাটায়। তিনি জানতে চাইলেন এই লোকের ভরণপোষণ কে দেয়। তাঁকে জানানো হলো, অমুক-তমুক ব্যক্তি। নবিজি বলেন যে, তারা এই ইবাদতগুজার ব্যক্তির চেয়ে উত্তম।
➡ ৪. চাকরিদাতারা তাদের চাকরিজীবীদের প্রতি 'ন্যায়পরায়ণ' হতে হবে। সময়মতো মজুরি প্রদান, কাজের যথাযথ পরিবেশ নিশ্চিতকরণ, যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের বণ্টন এবং সকলের সাথে সমান আচরণ করতে হবে। নবি বলেছেন, 'তোমাদের দাসেরা তোমাদেরই ভাই। আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধীনস্থ করেছেন; কাজেই কারও ভাই যদি তার অধীনে থাকে, তবে সে যা খায়, তা-ই যেন তাকে খেতে দেয় এবং সে যা পরে, তা-ই যেন তাকে পরায়। তোমরা তাদের সাধ্যাতীত কোনো কাজ তাদের ওপর চাপিয়ে দিও না। আর যদি তাদের শক্তির ঊর্ধ্বে কোনো কাজ দাও, তবে তাদের সহযোগিতা করো' (সহীহ বুখারি: ৩০)

ওপরের বিষয়গুলোর আলোকে বলা যায় যে, কিছু নিয়মকানুন ইসলামি শিক্ষার চেতনার সাথে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ। যেমন, সর্বনিম্ন মজুরির পরিমাণ এমনভাবে নির্ধারিত করা, যার ফলে কর্মীরা কর্মদাতার অনুরূপ খাবার ও পোশাক ধারণ করতে পারে। সর্বোচ্চ কর্মঘণ্টার ব্যাপারে নীতিমালা ঠিক করে দেওয়া। যথাযথ কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করা। কর্মস্থলের বিপদ-আপদের ব্যাপারে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং কাজের চাপ হ্রাস করার উদ্দেশ্যে প্রযুক্তি এস্তেমাল করা (Chapra, 1980)।

শ্রমিকদের কাছেও প্রত্যাশিত হলো যে, তারা কাজ সম্পন্ন করার জন্য নিজের সর্বোচ্চটা প্রদান করবে। তাদেরকে হতে হবে সৎ, পরিশ্রমী ও কর্মদক্ষ। নবি বলেছেন, 'যে গোলাম তার প্রতিপালকের উত্তমরূপে ইবাদত করে এবং মনিবের হক আদায় করে, তার কল্যাণ কামনা করে আর তার আনুগত্য করে, সে দ্বিগুণ সওয়াব লাভ করবে।' (সহীহ বুখারি: ২৫৫১)

টিকাঃ
[১] এই শব্দে সহীহ বুখারি বা অন্য কোনো হাদীসগ্রন্থে কোনো হাদীস পাওয়া যায়নি। তবে তাবারানি ও দাইলামি ভিন্ন একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন যা অত্যন্ত দুর্বল। এই হাদীসে পাপ ক্ষমা হওয়ার কথা বলা হয়নি। এ ছাড়াও ইমাম যাহাবী এ-এর মতে হাদীসটি জাল। (দেখুন, লিসানুল মীযান, ইবনু হাজার: ৫/১৮৩)। তবে সহীহ হাদীস থেকে এটি প্রমাণিত হয় যে যেকোনো মেহনতের বিনিময়ে মুমিনের গুনাহ মাফ হতে পারে। এ ছাড়াও হাদীস থেকে প্রমাণিত হয়, উপার্জন করে পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়া সওয়াবের কাজ। (দেখুন, সহীহ বুখারি: ৫৬৪১, ৬৩৭৩।) সম্পাদক
[২] এই বর্ণনাটি হাদীসগ্রন্থসমূহে পাওয়া যায়নি। কোনো কোনো হাদীসে অবস্থাসাপেক্ষে ভিন্ন কথাও আছে। ইমাম তিরমিযি ৯ (২৩৪৫) একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। আনাস এ বলেন, নবি -এর যুগে দুই ভাই ছিলেন। তাদের মধ্যে একজন নবি -এর মজলিসে আসতেন, অপরজন কোনো কাজ করে উপার্জন করত। উপার্জনশীল ভাইটি নবি ৯-এর কাছে তার (শিক্ষার্থী) ভাইয়ের (কাজ না-করার) অভিযোগ করলেন। নবি ও বললেন, 'হয়তো তোমাকে তার ওসিলায় রিযিক দেওয়া হচ্ছে।' তবে নিজের হাতের কামাই সর্বশ্রেষ্ঠ কামাই। সহীহ বুখারিতে (২০৭২) বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ বলেন, 'নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো কেউ খায় না। আল্লাহর নবি দাউদ এই নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন।' - সম্পাদক
[১] এই হাদীস ও পূর্বোক্ত হাদীসে সরাসরি ক্রীতদাসের কথা বলা হয়েছে। সাধারণ কর্মী বা অধীনস্থ কর্মচারীর কথা বলা হয়নি। লেখক একে সরাসরি কর্মচারী অর্থে ব্যবহার করেছিলেন, যা সংশোধন করা হয়েছে। তবে বডিগার্ড, ড্রাইভার ইত্যাদি ব্যক্তিগত কর্মচারীর ব্যাপারে হাদীসগুলো অনেকক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। কিন্তু যেসব কর্মী ব্যক্তিগত মজুর নন, যেমন দর্জি, পিয়ন বা যাদেরকে কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে চাকরি দেওয়া হয়েছে তাদের প্রায় বিষয় (যেমন খাওয়া-পরায় সমতা) ক্রীতদাসের চেয়ে ভিন্নতর। মোটকথা কর্মী বা চাকরিজীবীদের ব্যাপারে শরীয়তে আলাদা দিকনির্দেশনা আছে, ক্রীতদাসের হাদীসগুলো এসবক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য নয়। সম্পাদক

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 মূলধন

📄 মূলধন


মূলধনকে বলা হয় পণ্যের মাঝে সঞ্চিত শ্রম, যা অন্যান্য পণ্য উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয় (Abu Saud, 1965)। অর্থনৈতিক শ্রমকে মূলধনসৃষ্টির ভিত্তি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে এ সংজ্ঞায়। কিন্তু পুঁজি মানে শুধুই শ্রম না। বরং এই শ্রমের সাথে প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক মেলবন্ধন ঘটতে হবে, যা দিয়ে সঞ্চিত মূলধনটি তৈরি হয়েছে। ফলে সংজ্ঞাটিকে প্রশস্ত করতে হবে, যাতে শ্রম ও প্রাকৃতিক সম্পদ উভয়ের সমন্বয়কে বোঝায়। অবশ্য মূলধন সৃষ্টির একেক পর্যায়ে একেকটি উপাদান একেকভাবে কার্যকর হয়। এরকম সংজ্ঞাই ইসলামি দৃষ্টিকোণের সাথে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, যেখানে শুরুতেই প্রাকৃতিক সম্পদকে দেখা হয় আল্লাহ-প্রদত্ত অনুগ্রহ হিসেবে। ঐশী প্রজ্ঞার বলে তিনি এগুলো প্রদান করেছেন পৃথিবীকে বাসযোগ্য করার জন্য। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি শ্রমের সাথে একত্র হয়ে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করে। এই প্রক্রিয়ার অনেক লক্ষ্যের মাঝে একটি হলো ঐশীবলে প্রদত্ত প্রাকৃতিক সম্পদের উপযোগ বৃদ্ধি করা। অর্থনৈতিক শ্রমের সংজ্ঞায় এই ব্যাপারটির ওপর আরও জোর দেওয়া হয়েছে। এটি হলো প্রকৃতির ওপর প্রযুক্ত সেই শ্রম, যার মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে ভোক্তার জন্য উপযোগ তৈরি অথবা উৎপাদন সুযোগ বৃদ্ধি করা হয় (Baqir-al-Sadr, 1968)1

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 মূলধনের দর

📄 মূলধনের দর


ইসলামে মূলধনের দর সুদের হার নয়, বরং মূলধনের ওপর আসা লাভ, যা মূলত লভ্যাংশ থেকে আসে। কুরআন ও সুন্নাহয় সুদ তথা রিবাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর বদলে বৈধ করা হয়েছে ব্যবসা: "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং রিবাকে করেছেন হারাম” (সূরা বাকারা, ২: ২৭৫)। নবিজি নিজেই ব্যবসা করেছেন। অতএব, ঋণদাতা ও গ্রহীতার মাঝে সম্পর্কের দুটি দিক:
➡ ক) ঋণ যদি ভোগের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়, তাহলে বিনামূল্যে দিতে হবে।
➡ খ) আর যদি ব্যবসার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়, তাহলে সেটা দিতে হবে অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে আর নয়তো কোনো উপার্জনের উদ্দেশ্য ছাড়া।

উপার্জনের উদ্দেশ্যে দিলে সেটা হবে ব্যবসার ক্ষতির দায় বহনের বিপরীতে ব্যবসার লভ্যাংশ লাভ করা। আর উপার্জন করার উদ্দেশ্য না থাকলে এমন একটি সময় নির্ধারিত থাকবে, যখন ঋণের পুরো টাকা ফেরত দিতে হবে। বিনামূল্যে ঋণ পুনঃপরিশোধের ওপর ব্যবসায়িক ফলাফলের কোনো প্রভাব পড়বে না। সুদের ব্যাপারটা যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, তার প্রেক্ষিতে সুদ হারাম করার বিধানটি বিস্তারিত আলোচিত হওয়ার দাবি রাখে।

রিবার সংজ্ঞা হলো সুদের ভিত্তিতে টাকা ধার দেওয়া। কুরআনের চার জায়গায় এটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর শাস্তিও অবতীর্ণ হয়েছে চার ধাপে।
➡ প্রথম উল্লেখটি তত কঠোর নয়, যদিও নিরুৎসাহিতকরণ বেশ স্পষ্ট। এখানে বলা হয়েছে যে, সুদের বিনিয়োগ বাহ্যিকভাবে বৃদ্ধি পেলেও আল্লাহর দৃষ্টিতে বৃদ্ধি পায় না: "মানুষের সম্পদে বৃদ্ধি পাবে বলে তোমরা যে রিবা দিয়ে থাকো, আল্লাহর দৃষ্টিতে তা ধন-সম্পদ বৃদ্ধি করে না” (সূরা রূম ৩০: ৩৯)।
➡ দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও এগিয়ে গিয়ে বলা হয়েছে যে, সুদ গ্রহণ নিষিদ্ধ এবং এর জন্য নিশ্চিতভাবেই শাস্তি পেতে হবে। অন্যান্য জাতির ওপরও তা হারাম ছিল এবং এর জন্য তারা শাস্তি পেয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “সুতরাং ইহুদিদের জুলুমের কারণে আমি তাদের ওপর উত্তম খাবারগুলো হারাম করে দিয়েছিলাম, যা তাদের জন্য হালাল করা হয়েছিল। যেহেতু তারা অনেককে আল্লাহর পথ হতে প্রতিরোধ করত, নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও রিবা গ্রহণ করত এবং অন্যায়ভাবে লোকদের ধন-সম্পদ গ্রাস করত। আর আমি তাদের মধ্যকার অবিশ্বাসীদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি” (সূরা নিসা, ৪: ১৬০-১৬১)। এই আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে সুদী কারবারে লিপ্ত ইহুদি জাতির কথা। কাজটিকে আল্লাহর অবাধ্যতার নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করার মাধ্যমে মুসলিমদের ওপরও বিধিবদ্ধ হয়ে যায় যে, তারা এ কাজ থেকে দূরে থাকবে। সুদী কারবারে লিপ্ত হবে না। তারপরও নিষিদ্ধকরণের ব্যাপারটা সরাসরি উল্লেখ না করে করা হয়েছে উদাহরণের মাধ্যমে।
➡ সুদ-সংক্রান্ত তৃতীয় আয়াতে ঈমানদারদেরকে সরাসরি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেন তারা দ্বিগুণ ও বহুগুণ করে সুদ 'ভক্ষণ' না করে। স্পষ্টত বলে দেওয়া হয় যে, তাদের উচিত জাহান্নামের আগুনের শাস্তিকে ভয় করা: “হে মুমিনগণ, তোমরা রিবা খেয়ো না বহুগুণ বৃদ্ধি করে এবং আল্লাহকে ভয় করো যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো। আর তোমরা সেই আগুনকে ভয় করো যা কাফিরদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে” (সূরা আলি ইমরান, ৩: ১৩০-১৩১)। এই পর্যায়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সরাসরি এবং অবাধ্যতার শাস্তি সুস্পষ্ট। কিন্তু তারপরও অস্পষ্টতা থেকে যেতে পারে যে, এই নিষেধাজ্ঞা তো শুধু চক্রবৃদ্ধি হারে সুদের ক্ষেত্রে। চতুর্থ ও চূড়ান্ত আয়াতে আরও খোলাসা করে সকল অস্পষ্টতা দূর করা হয়েছে।
➡ চতুর্থ পর্যায়টি স্পষ্টতম, সবচেয়ে সোজাসাপ্টা এবং চরম শাস্তিমূলক। এটি (ক) খোলাখুলিভাবে সুদকে নিষিদ্ধ করে, (খ) রিবার ভিত্তিতে ঋণ প্রদানকারীদের আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বলে অভিযুক্ত করে, (গ) মুমিনদের এ থেকে তাওবা করে তা পরিত্যাগ করতে বলে, (ঘ) উল্লেখ করে যে, তাওবা করে নিলে তারা নির্ধারিত সময়ে মূলধন ফেরত নিতে পারবে, এবং (ঙ) যা ফেরত নেওয়া যাবে, সেটাকে মূলধন (রুউসু আমওয়ালিকুম) হিসেবে সংজ্ঞায়িত ও সীমাবদ্ধ করে দেয়। খোলাখুলি স্পষ্টতা সহকারে আয়াতটি বলে: “যারা রিবা গ্রহণ করে, তারা সেই ব্যক্তির মতো দাঁড়াবে যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল করে। এটি এজন্য যে তারা বলে, 'ক্রয়-বিক্রয় তো রিবার মতোই।' অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন আর রিবাকে করেছেন হারাম। যার কাছে তার প্রভুর পক্ষ থেকে উপদেশ এসেছে এবং সে বিরত হয়েছে, তবে অতীতে যা হয়েছে তা তারই থাকবে, আর তার ব্যাপারটি আল্লাহর ইখতিয়ারে। আর যারা পুনরায় আরম্ভ করবে তারাই আগুনের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আল্লাহ রিবাকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং সদাকাকে বৃদ্ধি করেন। আল্লাহ কোনো অকৃতজ্ঞ পাপীকে পছন্দ করেন না। যারা ঈমান আনে, সৎকর্ম করে, নামাজ কায়েম করে এবং যাকাত দেয়, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট পুরস্কার আছে। তাদের কোনো ভয় নেই, আর তারা দুঃখিতও হবে না। হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, রিবার সব বকেয়া পরিত্যাগ করো—যদি তোমরা মুমিন হও। যদি তোমরা পরিত্যাগ না করো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও। কিন্তু যদি তাওবা করো, তাহলে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই থাকবে। এতে তোমরা অত্যাচার করবে না এবং অত্যাচারিতও হবে না।” (সূরা বাকারা, ২: ২৭৫-২৭৯)।

এভাবে ধাপে ধাপে বিধান প্রবর্তন করার ব্যাপারটি ইসলামি শিক্ষায় বিরল নয়। কুরআনে এমন অনেক ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে নিয়ম দেওয়া হয়েছে কোনো দুষ্কৃতির চর্চাকে ধমকি ও সীমাবদ্ধ করার জন্য। পরে নতুন বিধান এসে আগের নির্দেশটি রহিত করে দেয় এবং সেই দুষ্কৃতিকে পুরোদমে নিষিদ্ধ করা হয়। মদপানের নিষেধাজ্ঞা এর একটি উদাহরণ। এটি দুই ধাপে বর্ণিত হয়েছে কুরআনে। প্রথম ধাপে মুসলিমদের আদেশ দেওয়া হয়েছে মাতাল অবস্থায় নামাজে না আসতে। দ্বিতীয় ধাপে আগের বিধানকে রহিত করে দিয়ে বলা হয়েছে যে, মদপান সম্পূর্ণ হারাম। কার্যত, প্রথম বিধানটি এখনো মদপানঘটিত অসামাজিক আচরণ সীমাবদ্ধকরণে প্রয়োজনীয়। নামাজ যেহেতু ভোর থেকে নিয়ে রাত পর্যন্ত দিনে পাঁচবার ফরজ, তাই সারাদিনে একবার মাতাল হওয়াও মুমিনদের জন্য একপ্রকার অসম্ভব। মদপানের জন্য বাকি থাকল তাই রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগের সময়টুকু। কিন্তু দ্বিতীয় পর্যায়ের বিধানটি আরও সোজাসাপটা। কুরআনে সুদের পর্যায়ক্রমিক নিষেধাজ্ঞা পরিপূর্ণ হয়েছে সূরা বাকারার ২: ২৭৫-২৭৯ আয়াতগুলোর মাধ্যমে। এ প্রসঙ্গে এগুলোই সবচেয়ে বিশদ আয়াত। আয়াতগুলোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপসংহার এবং একটি বিতর্কের উত্তর উঠে এসেছে। উপসংহারটি এই যে, সুদ এখন আল্লাহর কাছে স্রেফ অপছন্দনীয় নয়, বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে কঠিন ভাষায় যুদ্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া সুদের অর্থ-সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত প্রশ্নেরও জবাব দেওয়া হয়েছে এখানে। নিচে এটি আলোচিত হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00