📄 খিলাফাত বা প্রতিনিধিত্ব
খিলাফাত বা প্রতিনিধিত্বের ধারণাটি থেকে বোঝা যায়, মানবজাতি বিশ্বজগতের কেন্দ্র এবং পৃথিবীতে আল্লাহর অধীনস্থ সহকারী। এটি ইসলামি মতাদর্শের মূল নির্যাস, যাকে কেন্দ্র করে ইসলামি অর্থনৈতিক চিন্তা আবর্তিত হয়। মানুষ যে বিশ্বজগতের কেন্দ্র, সে ব্যাপারে কুরআন বলে, 'তিনি পৃথিবীর সবকিছু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন' (সূরা বাকারা, ২: ২৯) আরও বলে, 'তোমরা কি দেখো না, আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন এবং তোমাদের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করেছেন?' (সূরা লুকমান, ৩১: ২০; আরও দ্রষ্টব্য: সূরা নাহল, ১৬: ১২-১৪, সূরা ইসরা, ১৭: ৭০, সূরা হাজ্জ, ২২: ৬৫ এবং সূরা জাসিয়া, ৪৫: ১২-১৩)। পৃথিবীতে মানুষের প্রতিনিধিত্বের কথা ঘোষণা করে কুরআন বলে, 'যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদের বললেন, আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি সৃষ্টি করছি', 'তিনিই তোমাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছেন', এবং 'তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনো এবং আল্লাহ তোমাদেরকে যা কিছুর উত্তরাধীকারী করেছেন তা থেকে ব্যয় করো', (যথাক্রমে সূরা বাকারা ২: ৩০, সূরা ফাতির, ৩৫: ৩৯ এবং সূরা হাদীদ, ৫৭: ৭)।
অধীনস্থ সহকারীর দায়িত্ব হলো তার ঊর্ধ্বতনের আদেশ অনুযায়ী তার দায়িত্ব পালন করা। নিয়োগকারী উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তথা আল্লাহ যেভাবে অর্থনৈতিক সম্পদকে ব্যবহৃত হতে দিতে চান, সে-সংক্রান্ত নিয়মকানুন অবতীর্ণ করেছেন তিনি। আরেকভাবে বললে, পৃথিবীতে মানুষের কাছে থাকা সকল অর্থনৈতিক সম্পদ আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত। উল্লেখিত নিয়মকানুনের যে-কোনো ব্যত্যয়ের ফলে মানবজাতি তার আমানতের ভুল ব্যবহার ও অপব্যবহারের দায়ে দণ্ডিত হবে। তাই মানুষ আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার অধীন। আমানতদারির নিয়ম অনুযায়ী, এসকল নিয়মকানুনের অন্যথা করলে মানুষ আল্লাহর শাস্তির যোগ্য হয়ে যাবে। আল্লাহই যেহেতু এই সম্পদগুলোর স্রষ্টা এবং চূড়ান্ত মালিক, তাই শাস্তির পরিমাণ বা এমনকি অনুশোচনাকারীর প্রাপ্ত ক্ষমার পরিমাণ তিনিই নির্ধারণ করবেন। এই ধারণা ও এর থেকে আহরিত মূলনীতিগুলো পৃথিবীর সকল অর্থনৈতিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেমন: অর্থনৈতিক সম্পদ ভোগ করা, সম্পদের উৎসের উন্নয়ন, এবং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ-বিনিয়োগকারীদের মাঝে সংযোজিত মুনাফার বণ্টন ইত্যাদিতে। নিচে তা দেখানো হবে।
📄 আমানাহ বা স্বাধীন ইচ্ছা ও দায়িত্বভার
ক. স্বাধীন ইচ্ছা
এটি হলো মানুষের কোনোকিছু গ্রহণ, নির্বাচন বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার সক্ষমতা। কুরআনে স্পষ্টভাবে তা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সেইসাথে কুরআনে তাকদীরের কথাও উল্লেখও রয়েছে। এতে একটি ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে এবং হয়েছেও। দুটি ধারণাকে পাশাপাশি দেখলে প্রশ্ন আসে যে, মানুষের কাজকর্ম কি আসমানি শক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত? নাকি তার নিজের ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে? প্রথমটি হলে মানুষকে তার নিজের কাজকর্মের জন্য দায়ী হওয়ার কথা না। কিন্তু পরেরটি হলে তার দায়ী হওয়াই উচিত।
এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা যদিও আমরা এখানে করব না, কিন্তু এ বিষয়ে সারকথা হলো, মানুষকে ভালো ও মন্দ বেছে নেওয়ার স্বাধীন ইচ্ছে দেওয়া হয়েছে। নিজের সৃষ্টি করা মানুষের চরিত্র সম্পর্কে জ্ঞান ও পরম প্রজ্ঞা থাকার কারণে আল্লাহ তার তাকদির জানেন। তাই মানুষ আল্লাহ-প্রদত্ত বিধান মেনে সরল পথে থাকবে, না তা থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবে-তা বেছে নেওয়ার ক্ষমতা তার আছে। আল্লাহও ব্যাপারটি আগে থেকেই জানেন। কুরআনের একাধিক স্থানে মানুষের এই স্বাধীন ইচ্ছের ব্যাপারটিতে জোরারোপ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী বক্তব্যটি সম্ভবত সেই আয়াত, যেখানে বলা হয়েছে অন্য কোনো সৃষ্টি দুঃসাহস না দেখালেও মানুষ আল্লাহর দেওয়া আমানতের ভার গ্রহণ করতে রাজি হয়েছে। কঠিন ভাষায় কুরআনের আয়াত বলে, 'আমি তো আসমান, জমিন ও পর্বতমালার নিকট এই আমানত পেশ করেছিলাম, তারা তা বহন করতে অস্বীকার করল এবং তাতে শঙ্কিত হলো, কিন্তু মানুষ তা বহন করল, মানুষ তো অত্যন্ত জালিম, অতিশয় অজ্ঞ' (সূরা আহযাব, ৩৩: ৭২)।
মানুষকে দুটি পথ দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে-ভালো ও মন্দ। কোনটি অনুসরণ করবে, তা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে তার নিজের ওপর। আল্লাহ বলেন, 'আমি কি তার জন্য সৃষ্টি করিনি দুটি চোখ? আর জিহ্বা ও দুটি ঠোঁট? আর আমি তাকে দেখিয়েছি দুটি পথ', (সূরা বালাদ, ৯০: ৮-১০)। আল্লাহ ও মানুষের মাঝে আমানতদারির সম্পর্ক হিসেবে আল্লাহ যে মানুষকে প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব প্রদান করেছেন, এই স্বাধীন ইচ্ছা সেটারই প্রতিফলন।
খ. দায়িত্বভার
স্বাধীন ইচ্ছা থেকে উদ্ভূত কর্তৃত্বের ক্ষমতা আল্লাহ ও মানুষের মধ্যকার প্রতিনিধিত্ব সম্পর্কের একটি দিক মাত্র। এ সম্পর্কের অপর দিকটি হলো দায়িত্বভার। এটি মানুষের ইচ্ছের স্বাধীনতার ওপর একটি সীমারেখা আরোপ করে এবং তাকে তার কাজকর্মের জন্য জবাবদিহিতার অধীন করে দেয়। 'আমানতসূত্রে মালিকানা' হিসেবে মানুষ যেহেতু অর্থনৈতিক সম্পদের মালিক হয়, তাই আমানত চুক্তির শর্তানুযায়ী সেগুলোর ব্যবস্থাপনা করাও তার দায়িত্বের আওতায় পড়ে। এসব শর্তের কোনো ব্যত্যয় ঘটলে সম্পদের চূড়ান্ত মালিক আল্লাহ তাআলার কাছে মানুষ জবাবদিহি করতে বাধ্য। মানুষের স্বাধীনতাকে তাই বলা চলে শর্তাধীন স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা চূড়ান্ত নয়, বরং সীমাবদ্ধ ও নির্ধারিত। পৃথিবীর অর্থনৈতিক সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষের ওপর আরোপিত এই সীমারেখার দুটি দিক আছে: ➡ উৎপাদনের ক্ষেত্রে মানুষের দায়িত্ব হলো কর্মদক্ষতা নিশ্চিত করা; ➡ আর বণ্টনের ক্ষেত্রে দায়িত্ব হলো সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে আবারও ব্যাখ্যা করা হবে।