📄 ফিকহ
ইসলামি রাষ্ট্রের সম্প্রসারণ ঘটার সাথে সাথে মুসলিমরা এমন সব নতুন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়, যেগুলো নবিজির জীবদ্দশায় উদ্ভূত হয়নি। এগুলোর জন্য এমন উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, যেগুলো কুরআন ও সুন্নাহতে সরাসরি বর্ণিত হয়নি। প্রাথমিক যুগের মুসলিম আলিমদের তাই নতুন পরিস্থিতির সমাধান গ্রহণের জন্য কুরআন ও হাদীসের পাঠ্য থেকে বিধান ও নীতিমালা আহরণ করার প্রয়োজন পড়ে। এক্ষেত্রে 'রায়' নামক একটি শব্দ ব্যবহৃত হয়। যার অর্থ কুরআন সুন্নাহর আলোকে কারও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রচেষ্টা (Khallaf, 1942)। এর ধর্মীয় বৈধতা পাওয়া যায় নবি ﷺ এর জীবদ্দশার একটি ঘটনা থেকে। নবিজি মুআয ইবনু জাবালকে ইয়েমেনে বিচারক হিসেবে পাঠাচ্ছিলেন। তাকে দিকনির্দেশনা দেওয়ার সময় নবি ﷺ সেসব ক্ষেত্রে বিচার-বিবেচনাশক্তি প্রয়োগ করার অনুমোদন দেন, যেসব ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহতে স্পষ্ট বিধান উল্লেখ করা নেই (প্রাগুক্ত)।
অতএব, ফিকহ নানারকম উৎসের ওপর নির্ভর করে এবং প্রয়োজনীয় বিধান আহরণের জন্য কিছু মূলনীতি অনুসরণ করে। এসব উৎসের প্রথমটি হলো কুরআন ও সুন্নাহ। কুরআন ও সুন্নাহতে যেসব স্পষ্ট বিধান রয়েছে, সেখানে আর নিজের মতামতের কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু যেখানে স্পষ্ট বিধান অনুপস্থিত, সেখানে ফকিহ প্রয়োজনীয় বিধান বের করবেন। সেক্ষেত্রে তাদের অনুসরণ করতে হবে কুরআনের সংশ্লিষ্ট আয়াতের সার্বিক অর্থ ও উদ্দেশ্য, হাদীসের ব্যাখ্যা ও উদ্দেশ্য, এবং আইনশাস্ত্রের সাধারণ নীতিমালা ও তাৎপর্য। শরীয়তের মৌলিক বৈশিষ্ট্য লঙ্ঘন করা যাবে না। সুতরাং, ফিকহের মূল নির্যাস কুরআন ও সুন্নাহ। এই ব্যাপারটি উপলব্ধি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইসলামি অর্থনৈতিক চিন্তার বহু আর্থ-সামাজিক ব্যাপার উদ্ভূত হয়েছে ফিকহ থেকে। অন্যান্য যেসব ভিত্তির ওপর ইসলামি ফিকহ প্রতিষ্ঠিত, সেগুলো হলো: ইজমা বা ঐক্যমত্য, কিয়াস বা সাদৃশ্যের ভিত্তিতে আইনগত সিদ্ধান্ত, সূক্ষ্মতর কিয়াস, জনস্বার্থ এবং রীতিনীতি।
ইজমা হলো মুজতাহিদ আলিমগণের কোনো বিষয়ে সাধারণভাবে একমত হওয়া। দুটি বিষয় লক্ষণীয়:
➡ ক. সাধারণ ঐক্যমত্য মানে সকল বা অধিকাংশ মুসলিমের একমত হওয়া নয়। বরং শুধু প্রাজ্ঞ আইনবিদ (ফুকাহা) এবং ধর্মীয় বিশেষজ্ঞগণ (উলামা) এর অন্তর্ভুক্ত।
➡ খ. ইজমা প্রয়োগ হয় শুধুমাত্র সেসব বিষয়ে যেখানে ফকিহগণের মতামত দেওয়ার প্রয়োজন আছে। ইবাদতের আচার-অনুষ্ঠানের নিয়ম যেগুলো যথেষ্ট স্পষ্টভাবে কুরআন ও সুন্নাহয় বর্ণিত আছে, সেখানে ব্যক্তিগত মতামতের কোনো প্রয়োজন নেই (Al-Zuhail, 1989)1
শরীয়তের উৎস হিসেবে ইজমার ভূমিকা দুর্বল হয়ে আসে খিলাফতে রাশিদার সমাপ্তির পর এবং উমাইয়্যা যুগের শুরুর দিকে। মুসলিমরা এসময় রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং প্রধান আলিমগণের মাঝে সাধারণ ঐক্যমত্য খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে। তবে খিলাফতে রাশিদার আমলে ইজমার মাধ্যমে আহরিত বিধানগুলো পরবর্তী ফকিহগণের নিজস্ব মতামত তৈরির ক্ষেত্রে ভিত্তি হিসেবে কাজ করে (Al-Qattan, 1986)1
কিয়াস হলো পূর্ববর্তী উৎসগুলোতে স্পষ্টভাবে উল্লেখিত বিধান থেকে বর্তমান পরিস্থিতির জন্য সবচেয়ে সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন নিয়ম আহরণ করার পদ্ধতি। শরীয়তের সম্ভাব্য কোনো শূন্যস্থান পূরণে এই পদ্ধতিটি সহায়ক। ইস্তিহসান অর্থ কিয়াস থেকে প্রাপ্ত কোনো সিদ্ধান্ত ছেড়ে দিয়ে আরও প্রাসঙ্গিক কোনো সাদৃশ্যের আলোকে নতুন বিধান আহরণ করা। জনস্বার্থ বা ইস্তিসলাহ হলো নতুন কোনো বিষয়ে এমন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো, যা জনগণের জন্য কল্যাণকর কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহতে স্পষ্টভাবে উল্লেখিত নয় (Zuhaili, 1989)। রীতিনীতি বা উরফ হলো কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রদানের ক্ষেত্রে ওই সমাজের প্রচলিত প্রথার ওপর নির্ভর করা—সেসব ক্ষেত্রে যেখানে কুরআন, সুন্নাহ বা ইজমাতে স্পষ্ট কিছু উল্লেখ নেই। ফিকহের উপর্যুক্ত মূলনীতিগুলো যদিও শরীয়তের মূল উৎস কুরআন ও সুন্নাহর তুলনায় দুর্বল, কিন্তু আর্থ-সামাজিক বিষয়াদিতে মুসলিম ফকিহগণের কাছে এগুলো ভালো রকমের গুরুত্ব বহন করে। কুরআন-সুন্নাহর সীমারেখার মাঝে থেকে তারা জাগতিক বিষয়ে এমন বেশ কিছু নীতিমালা প্রণয়ন করেছেন, যেগুলো ইসলামি অর্থনৈতিক চিন্তার ভিত্তি। বিকাশে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। যথাসময়ে তা আলোচিত হবে।