📄 মা‘ইন
দক্ষিণ আরবের দ্বিতীয় রাজ্য ছিল মা'ইন (বাইবেলীয় মাওন, মেউন এবং মেইন)। এর অর্থ ঝরনার পানি। মা'ইনীয় যুগের অস্তিত্ব খ্রিষ্টপূর্ব ৭০০ থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ৭০ সাল পর্যন্ত (প্রাগুক্ত)। রাজ্যটি লোবান এবং অন্যান্য সুগন্ধি পণ্য উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত ছিল। মন্দিরের আচার-অনুষ্ঠানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল এসব দ্রব্য। বিশেষত মিশরীয়রা মমি বানাতেও এগুলো ব্যবহার করত। সাবার মতো এই রাজ্যটিও ঈশ্বরতন্ত্র হিসেবে শুরু হয়ে পরবর্তীকালে ধর্মনিরপেক্ষ হয়। মা'ইনীয় সাম্রাজ্যও বাণিজ্যপথের ওপর গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অধিকার করে ছিল।
📄 কাতাবান এবং হাদরামাত
বাকি দুটো রাজ্য কাতাবান এবং হাদরামাউত। প্রথমটির অস্তিত্ব ছিল খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ থেকে ৫০ সাল পর্যন্ত এবং দ্বিতীয়টি খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৪৫০ থেকে প্রথম খ্রিষ্টীয় শতক পর্যন্ত (প্রাগুক্ত)। অবশ্য এই রাজ্যদ্বয় সাবা ও মা'ইনের ছায়ায় ঢাকা পড়ে যায়। এখানকার বাণিজ্যে মশলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সাম্রাজ্য চারটি খ্রিষ্টপূর্ব ১১৫ সাল থেকে নতুন এক শক্তির অধীনে চলে যায়। আর সেটা হলো পশ্চিম আরব থেকে উদ্ভূত হিম্ইয়ার গোত্র। প্রথম হিম্ইয়ারীয় রাজ্য প্রায় ৩০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত টিকে থাকে। সাবীয়-মা'ইনীয় বাণিজ্যের উত্তরাধিকারী হিম্ইয়ারিরা সাবাবাসীদের মতো একই সংস্কৃতি ও ভাষার অধিকারী ছিল। সাবীয়- হিম্ইয়ারীয় জনপদের আর্থ-সামাজিক কাঠামো ছিল গোত্রীয় ব্যবস্থা, সামাজিক শ্রেণিবিভাগ এবং সামন্তবাদী অভিজাততন্ত্র ও রাজতন্ত্রের একটি সংমিশ্রণ (Hitti, 1963)। প্রায় ৩০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে শুরু হয় দ্বিতীয় হিম্ইয়ারীয় রাজ্য। তখন হিম্ইয়ারিরা হাদরামাউত ও কাতাবান দখল করে নেয় এবং দক্ষিণ আরবকে শাসন করে চলে ষষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত। মাঝখানে ৩৪০ থেকে ৩৭৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত আবিসিনীয় দখলদারিত্বের ফলে ছোট একটি বিরতি পড়ে (প্রাগুক্ত)। কিন্তু এই সময়কালটি ছিল ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে হাওয়া বদলের এক যুগ।
📄 বিশ্বাস ও ভাগ্যের পরিবর্তন
দক্ষিণ আরব ততদিনে আল-ইয়েমেন নামে পরিচিতি লাভ করেছে। মধ্য-চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ খ্রিষ্টীয় শতাব্দীর এই পুরো সময়টায় অঞ্চলটির ভাগ্য নির্ধারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে ধর্মীয় বিষয়াদি। শুরুর দিকে এই অঞ্চলের ধর্মবিশ্বাস ছিল গ্রহভিত্তিক একটি জ্যোতিষ-ব্যবস্থা, যেখানে সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের অধিকারী চন্দ্র- দেবতাকে একেক গোত্রে একেক নামে ডাকা হতো। যেমন: প্রেম, প্রেমিক, পিতা, সুস্বাস্থ্যদাতা ঈশ্বর এবং চাচা।
ধর্মীয় পরিবর্তনের প্রথম ইঙ্গিত পাওয়া যায় ৩৫৬ সালে সম্রাট কন্সট্যান্টিয়াস কর্তৃক প্রথম আনুষ্ঠানিক খ্রিষ্টান মিশনারি দল প্রেরণের মাধ্যমে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকাটি দখলের জন্য রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের মাঝে দ্বন্দ্ব বিরাজ করত। তাই মিশনারি প্রেরণের এই উদ্যোগটির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল বলেও বিদিত আছে (Hitti, 1963)। মিশনারিগণ ও নিম্নতর পদাধিকারীরা এই অঞ্চলে খ্রিষ্টান ধর্মের প্রচার-প্রসার এবং বিভিন্ন স্থানে গির্জা নির্মাণে সফল হন। ইহুদি ধর্মও প্রসারিত হয় এই অঞ্চলে। সর্বশেষ হিময়ারীয় রাজা যু-নাওয়াস ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। শুরু হয় বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের মাঝে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ইহুদি রাজা যু-নাওয়াস ৫২৩ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবরে নাজরানের ২০,০০০ খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীকে আগুনের একটি পরিখায় নিক্ষেপ করে গণহত্যা করেন (আত-তাবারি)। কুরআনে এই গণহত্যার উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে, 'কক্ষপথ বিশিষ্ট আসমানের কসম! প্রতিশ্রুত দিবসের কসম! শপথ সাক্ষ্যদাতার ও যার ব্যাপারে সাক্ষ্য দেওয়া হয়! ধ্বংস হয়েছে গর্তের অধিকারীরা। ইন্ধনপূর্ণ যে গর্তে ছিল আগুন, যখন তারা তার কিনারায় বসে ছিল। আর তারা বিশ্বাসীদের সাথে যা করছিল তা নিরীক্ষণ করছিল। তারা তাদেরকে নির্যাতন করেছিল শুধু এ কারণে যে, তারা পরাক্রান্ত ও প্রশংসিত আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছিল। যার রয়েছে নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সর্বময় কর্তৃত্ব, আর আল্লাহ সবকিছু দেখেন।' (সূরা বুরুজ, ৮৫: ১-৯)।
এই নাটকীয় ঘটনা সে যুগের প্রধানতম রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ খুলে দেয়। খ্রিষ্টধর্মের প্রতিরক্ষাকারী হিসেবে রোমান সম্রাট প্রথম জাস্টিন আবিসিনিয়ার নাজ্জাশিকে হস্তক্ষেপ করার অনুরোধ জানান। নাজ্জাশি ছিলেন সেই অঞ্চলের নিকটতম খ্রিষ্টান শক্তি। আবিসিনীয় সেনাবাহিনী লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে এসে রাজ্যটিকে জয় করে নেয়। তারা ৫২৫ থেকে ৫৭৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ভূমিটি দখলে রেখেছিল (Hitti, 1963)। ওদিকে উত্তরদিকে অবস্থিত কাবা নিজস্ব ধর্মীয় প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিল। দক্ষিণের গির্জার বিপরীতে কাবার প্রভাব খর্ব করার জন্য আবিসিনীয় সেনাপতি আবরাহা মক্কায় একটি সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। এর লক্ষ্য ছিল কাবা ধ্বংস করে দেওয়া। অভিযানটি সফল হয়নি। গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে ধ্বংস হয়ে যায় বাহিনীটি। বলা হয়ে থাকে যে, ঘটনাটি ৫৭০ বা ৫৭১ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত। সে বছরেই জন্ম নিয়েছিলেন ইসলামের নবি।
৫৭৫ খ্রিষ্টাব্দ দক্ষিণ আরবে এক নতুন রাজনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে পারস্যের উত্থানের সাক্ষী হয়। এক পক্ষে খ্রিষ্টান আরব এবং অপর পক্ষে ইহুদি ও পৌত্তলিক আরবদের মাঝে দ্বন্দ্ব চলতেই থাকে। প্রথম দলটি তো খ্রিষ্টান বাইজেন্টাইনের প্রতিনিধি আবিসিনীয়দের সহায়তা পায়। পরের দলটি সাহায্য চায় তার প্রতিদ্বন্দ্বী সাম্রাজ্য পারস্যের কাছে। দক্ষিণ আরবের ওপর আবিসিনীয় ও বাইজেন্টাইন আধিপত্য নির্মূল করার এই মোক্ষম সুযোগটি পারস্য লুফে নেয়। পারস্য সেনাবাহিনীর ছয়টি যুদ্ধজাহাজ পারস্য উপসাগর থেকে ইয়েমেনের দিকে রওনা হয়। দুটি পথেই ডুবে যায়। বাকি চারটি ৫৭৫ খ্রিষ্টাব্দে ইয়েমেনে গিয়ে পৌঁছে আবিসিনীয় সেনাঘাঁটিকে পরাজিত করে (আত-তাবারি)। বিজয়ীরা সাধারণত নিছক সাহায্যের জন্য না এসে দখল করার উদ্দেশ্যে এসে থাকে। পারসিয়ানও তা-ই করে। ইয়েমেন অচিরেই পরিণত হয় পারস্যের একটি প্রদেশে। এক প্রভুর কাছ থেকে চলে যায় আরেক প্রভুর হাতে। ইয়েমেন ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিমদের হস্তগত হয় এবং পঞ্চম ও সর্বশেষ পারসিয়ান শাসক ইসলাম গ্রহণ করেন।
দক্ষিণ আরবীয় রাজ্যগুলোর রাজনৈতিক শক্তির ভিত্তি ছিল শক্তিশালী অর্থনীতি। আগেই যেমনটি বলা হয়েছে, ভূমির উর্বরতা এবং বাণিজ্যপথের ওপর কৌশলগত অবস্থানের দ্বৈত সুবিধা গ্রহণ করে দক্ষিণ আরব তার অর্থনৈতিক সামর্থ্য গড়ে তোলে। কৃষির বিকাশের সাথে সাথে উৎপন্ন হয় নানারকম কৃষিপণ্য: ভুট্টা, সবজি, ফলমূল, তরুলতা এবং বাণিজ্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মশলা, গন্ধরস ও লোবান। শেষের তিনটির চাহিদা ছিল ব্যাপক। নিজেদের উৎপাদিত পণ্য তো তারা রপ্তানি করেই, পাশাপাশি তাদের অঞ্চলটির অবস্থান ছিল ভারতের দিকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বাণিজ্যপথের ওপর। সাবা ছিল বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত নানারকম পণ্যের পরিবহন-সড়ক। সেসব পণ্যের মধ্যে ছিল পারস্য উপসাগর থেকে আগত মুক্তা, চীনের রেশম, ভারতের তরবারি ও তৈরি পোশাক, ইথিওপিয়ার স্বর্ণ, হাতির দাঁত, উটপাখির পালক প্রভৃতি। হিট্টির ভাষ্যমতে, সাবাবাসীরা ছিল দক্ষিণ সাগরের ফিনিশিয়ান (Hitti, 1963)। তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল বাণিজ্যিক জাহাজের এক শক্তিশালী বহর। এটি দুই প্রান্তে ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ আরবের সংযোগ স্থাপন করেছিল। তা ছাড়া লোহিত সাগরে দিকনির্ণয় সমস্যার কারণে আরব উপদ্বীপের পশ্চিম উপকূল ধরে ইয়েমেন ও সিরিয়ার মাঝে স্থলবাণিজ্যপথ গড়ে ওঠে। মক্কা, পেত্রা ও পালমিরার মতো কাফেলা নগরীগুলো এই পথের ওপর অবস্থিত। আরেকটি বাণিজ্যপথ গড়ে ওঠে হাদরামাউত ও মা'রিবের মাঝে, যেটি দক্ষিণ-থেকে-উত্তর পথের সংযোগ স্থাপনকারী।
তৃতীয় খ্রিষ্টীয় শতাব্দীর শেষদিকে এসে দক্ষিণ আরবের অর্থনৈতিক বিকাশ একটি বিপত্তির সম্মুখীন হয়। এই বিপত্তির প্রধান কারণ হিসেবে তিনটি বিষয়কে চিহ্নিত করা যায়: বাহ্যিক সামুদ্রিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং মা'রিব বাঁধের ভাঙন। বাহ্যিক সামুদ্রিক প্রতিযোগিতার প্রথম আবির্ভাব ঘটে টলেমিদের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে। যদিও তার পেছন পেছন আসে রোমানরা। টলেমিরা এত শক্তিশালী একটি নৌবাহিনী গড়ে তোলে যে, তারা লোহিত সাগরের উত্তর অংশকে একটি টলেমীয় হ্রদে পরিণত করে। প্রায় ১৭০০ বছর আগে সেসোস্ট্রিস শাসনামলে নীলনদ ও লোহিত সাগরের মাঝে একটি খাল খনন করা হয়েছিল। দ্বিতীয় টলেমি এসে সেটিকে পুনরায় খুলে দেন। ফলে দক্ষিণ আরবীয়দের নিয়ন্ত্রণাধীন স্থলবাণিজ্যের একাংশ স্থানান্তরিত হয়ে যায় লোহিত সাগরে। সর্বশেষ আঘাতটা আসে খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের শেষে। টলেমিরা লোহিত সাগরের দক্ষিণদিকে বর্ষাকালে দিকনির্ণয় সমস্যার সমাধান বের করে। ভারত মহাসাগরে ঢুকে গিয়ে ভারত ও মিশরের মাঝে প্রতিষ্ঠা করে সরাসরি বাণিজ্যপথ (Della Vida, 1944)। সেই থেকে দক্ষিণ আরবের অর্থনৈতিক পতনের সূচনা হয়। নব্য ধর্মান্তরিত খ্রিষ্টান, ইহুদি ও পৌত্তলিক আরবদের মাঝে অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় দ্বন্দ্ব নতুন এক রাজনৈতিক টানাপোড়েন উসকে দেয়। সামন্ততান্ত্রিক আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা সেই দ্বন্দ্ব দূরীকরণে কোনো সাহায্য করেনি। যথারীতি রাজনৈতিক নৈরাজ্য থেকে শুরু হয় অর্থনীতির ওপর এর বিরূপ প্রভাব। সম্ভবত আবিসিনীয় শাসনামলে মা'রিব বাঁধ ভেঙে যায়, যা ছিল আরেকটি অর্থনৈতিক বিপর্যয়। বাঁধ ভাঙার কারণ নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তবে অদক্ষ ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করা যায় এর জন্য। যা-ই হোক, অন্যান্য কারণের পাশাপাশি এই বাঁধের ভাঙন সে অঞ্চলে নাটকীয় এক অর্থনৈতিক ধস নিয়ে আসে (Haykal, 1976)1
টিকাঃ
[১] তারিখুত তাবারি: ২/১২১-১২৪। -সম্পাদক
[২] সূরা ফীলের ভাষ্যমতে, সমুদ্রের দিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ে এসেছিল। তাদের সঙ্গে ছিল কঙ্কর। নিক্ষিপ্ত কঙ্করের আঘাতে আবরাহার বাহিনী ধ্বংস হয়ে যায়। এভাবে আল্লাহ তাআলা পরাক্রমশালী একটি বাহিনীকে নিজ কুদরতে শায়েস্তা করেন ও ঔদ্ধত্যের চরম শাস্তি দেন। কুরআনের সুস্পষ্ট বর্ণনাকে গুটিবসন্ত বলে ব্যাখ্যার মাধ্যমে বিকৃত করার সুযোগ নেই। লেখক মূলত ওরিয়েন্টালিস্টদের প্রভাবে আসমানী আযাবকে বস্তুবাদ দ্বারা ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন।-সম্পাদক