📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 অর্থনৈতিক ফায়দার উদ্দেশ্যে আক্রমণ

📄 অর্থনৈতিক ফায়দার উদ্দেশ্যে আক্রমণ


অর্থনৈতিক সম্পদ তো সীমিতই। তাই যেসব গোত্রের কাছে তার সদস্যদের খাওয়ানোর মতো যথেষ্ট সম্পদ নেই, তারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদের অধিকারী গোত্রদের ওপর সামরিক আক্রমণ পরিচালনা করত। এই আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল একেবারেই অর্থনৈতিক। চরম প্রয়োজন ছাড়া এক ফোঁটা রক্ত ঝরানোও নিষিদ্ধ (Hitti, 1963)। আধুনিক সমাজের দৃষ্টিকোণ থেকে এসব হামলার ব্যাপারে একেবারে কম করে হলেও বলতে হয়, এগুলো অগ্রহণযোগ্য। কিন্তু এগুলোকে তৎকালীন মন-মানসিকতার আলোকে বুঝতে হবে। এসব আক্রমণ ছিল সম্পদহীন ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে সম্পদশালীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত বলপূর্বক অভিযান। এর উদ্দেশ্য ছিল মানবসমাজে অর্থনৈতিক সম্পদের পুনর্বণ্টন করা। ওই সমাজে অর্থনৈতিক ও বিচারিক কার্যক্রমের মাধ্যমে এই পুনর্বণ্টনের দায়িত্ব পালন করার মতো রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ অনুপস্থিত ছিল। তাই ব্যক্তি নিজের হাতে আইন তুলে নিত। মরুবাসী সমাজে যে লড়াইয়ের মেজাজ এমনিতেই বিরাজ করত, সেটি এই কার্যক্রমকে আরও জোরদার করেছে বলে মনে হয়। ঐশী ধর্মগুলো থেকে যে নৈতিক মূল্যবোধ তৈরি হয়, তৎকালীন আরবে সেটা বা সেটার অভাব এসব অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সামরিক কার্যক্রম প্রতিরোধে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে দেখা যায় না। বনু তাগলিবের মতো খ্রিষ্টান গোত্রগুলোও এটি কোনো বিধিনিষেধ ছাড়াই চর্চা করত (প্রাগুক্ত)।

ইসলামের আসার পর এই চর্চাগুলোকে প্রশমিত করে আনা হয়। ধর্মীয় চেতনার ওপর গুরুত্বারোপ করে যুদ্ধবিগ্রহকে নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্যের জন্যই কেবল বৈধতা দেওয়া হয়। অযথা ধ্বংসলীলা ও রক্তপাত এড়াতে আরোপ করা হয় কঠোর নিয়মকানুন। আর এর মুখ ঘুরিয়ে দেওয়া হয় বিদেশ জয়ের দিকে। তবে ইসলামি ঐতিহ্যে ধনীর সম্পদে দরিদ্রের হক থাকার বিষয়টি সুপ্রতিষ্ঠিত। 'তাদের ধন-সম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের অধিকার।' (সূরা যারিয়াত ৫১: ১৯)। এই ব্যাপারটি ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বাস্তবায়িত হয়। জিযিয়ার মতো বিভিন্ন মাধ্যমও এতে ব্যবহার হয়। যথাস্থানে এর আলোচনা আসবে।

টিকাঃ
[১] ইসলামে সাম্রাজ্যবাদ তথা নিছক রাজ্য বিস্তার ও ভূমি সম্প্রসারণের জন্য যুদ্ধের অনুমতি নেই। ইসলামে জিহাদের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে আল্লাহর দ্বীনকে আল্লাহর ভূমিতে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। মুসলিমগণ সত্য দ্বীনের অনুসারী হিসেবে این পবিত্র দায়িত্ব পালন করে থাকেন। সাহাবিগণ জিহাদ করেছিলেন দ্বীন কায়েম ও শরীয়ত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। সহীহ বুখারি (৭৪৫৮) ও সহীহ মুসলিমে (১৯০৪) বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ -কে জিজ্ঞেস করা হয়, কেউ বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য যুদ্ধ করে, কেউ গোত্রের স্বার্থ রক্ষার জন্য যুদ্ধ করে, আর কেউ লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করে, এগুলোর মধ্যে কোনটি আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ বলে গণ্য হবে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ বললেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর বাণী সমুন্নত করার জন্য লড়াই করে, কেবল সেই আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করেছে গণ্য হবে। সম্পাদক

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 বীরত্ব এবং সংঘাতের প্রতি আগ্রহ

📄 বীরত্ব এবং সংঘাতের প্রতি আগ্রহ


সাহস আর বীরত্বের মতো গর্বের উৎস আর কিছু হতেই পারে না, হোক সেটা ব্যক্তি বা গোত্রের জন্য। এটা ছিল আরবের অধিবাসীদের ব্যক্তিত্বের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। একটা মানুষ বা গোত্রকে যতভাবে অপমান করা যায়, তার মাঝে নিকৃষ্টতম দুটি বিষয় ছিল— আতিথেয়তায় কার্পণ্য এবং ভীরুতা। সাহস ছিল গর্বের একটি বিশেষ উৎস। তাতে প্রাণ গেলে যাক। তাই প্রাচীন এক কবিকে আমরা সগর্বে গাইতে শুনি, 'মল্লযুদ্ধের আহ্বানে প্রথম সাড়া দান, কেড়ে নিল আপন গোত্রের কত যোদ্ধার প্রাণ' (Nicholson 1993)। তার স্বগোত্রীয় যোদ্ধার লড়াইয়ের দক্ষতাকে প্রশংসা করা যাচ্ছে না বটে। কিন্তু এতটুকু অন্তত বোঝা যায় যে, বিপদ বা সামরিক সংঘাতে তারা কখনো পিছপা হয়নি। সামরিক শক্তি ও মর্যাদার দিক থেকে নিজের গোত্রের যে দাপট, সেটার গুণগান করার আরেকটি উদাহরণ দেখা যায় আরেক কবির মাঝে। তিনি দম্ভ সহকারে ঘোষণা করছেন যে, তিনি ও তার গোত্র অত্যাচারী নিপীড়ক। নিজেরা কখনো নিপীড়িত হননি। তারা যখন দল বেঁধে কোনো জলাশয়ের কাছে যান, তখন তারাই আগে স্বচ্ছ ও বিশুদ্ধ পানি পান করেন। বাকিদের জন্য রেখে যান কর্দমাক্ত ও ঘোলা জল (প্রাগুক্ত)। ন্যায়ের চেতনার স্থান যেন এখানে সাহসিকতা ও অত্যাচারের চেয়ে কম, পাছে ন্যায়পরায়ণতাকে কেউ দুর্বলতা ও শিথিলতা ভেবে বসে। বলাবাহুল্য, এর বিপরীতে ইসলাম এই ঘোষণা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে যে, অন্যায়কারীদের জন্য আল্লাহর ক্রোধ ও শান্তি অবধারিত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00