📄 ভৌগোলিক অবস্থা ও জনপ্রকৃতি
মোটাদাগে হিসেব করলে আরব অঞ্চলকে ভৌগোলিকভাবে তিনটি আলাদা অংশে ভাগ করা যায়—উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণ। এই পুরোটা অঞ্চল জুড়েই আরব উপদ্বীপ। এটি উত্তরদিকে ফিলিস্তিনের দক্ষিণাংশ থেকে শুরু হয়ে পূর্বদিকে পারস্য ও ওমান উপসাগর এবং পশ্চিমে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। দক্ষিণে ভারত মহাসাগরে এর শেষ সীমানা। এ এক বিশাল ভূমি। আকারে ইউরোপের এক-চতুর্থাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের এক-তৃতীয়াংশের সমান। ভূমির প্রকৃতি এবং প্রাচীন আরবে গড়ে ওঠা সভ্যতার স্তরের ভিত্তিতে উপদ্বীপকে এই তিনটি অংশে ভাগ করা হয়েছে। উত্তর আর দক্ষিণ অংশ ছিল উর্বর ভূমিতে পরিপূর্ণ। এর ফলে টেকসই অর্থনীতির বিকাশ সম্ভব হয় এবং এর সহায়তায় গড়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতা (Della Vida, 1944)।
কিন্তু কিছু ছড়ানো ছিটানো মরুদ্যানের কথা বাদ দিলে মধ্যাংশটি ছিল একেবারেই শুষ্ক। ইসলামের আবির্ভাব হয় এখানেই। কয়েক শতাব্দী যাবৎ ইসলামের বিজয়রথের নেতৃত্ব দিয়েছে আরবদের যে জনগোষ্ঠী, তাদের বসতিও এই এলাকাটিই। উত্তর বা দক্ষিণের সাথে তুলনীয় কোনো সভ্যতা যে এখানে গড়ে উঠেছিল, এমনটা বলার মতো কোনো প্রমাণই পাওয়া যায়নি।
কিন্তু মধ্য-আরব কি চিরকালই শুষ্ক ছিল? সেমিটিক জাতির উদ্ভব ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে একটি ‘তত্ত্ব’ আবিষ্কার করার জন্য ইতিহাসবিদগণ এই প্রশ্নটি করেছেন। শুকিয়ে যাওয়া নদীতলকে বলে ‘ওয়াদি’। এগুলোর অস্তিত্ব থেকে ধারণা করা যায় যে, প্রাগৈতিহাসিক আরব ছিল উর্বর ভূমি। সেখানে মানুষ বসবাস করতে পারত। তারপর ইতিহাস শুরুর আগ পর্যন্ত এটি ক্রমাগত শুষ্ক হতে থাকে (প্রাগুক্ত)। শুক নদীতল বা 'ওয়াদি' মধ্য-আরবে বাণিজ্য বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা পালন করেছে। দক্ষিণ ও উত্তরের মাঝে বাণিজ্যিক পথ হিসেবে কাজ করত এগুলো। প্রতিকূলতম এক ভূমিতে সেগুলো অনুকূলতম পথ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
প্রাগৈতিহাসিক মধ্য আরবের ভূমিপ্রকৃতি যেমন এক অমীমাংসিত রহস্য, সেই ভূমির আদি অধিবাসীদের উৎপত্তি-রহস্যও তা-ই। তারা কি পুরোপুরিই সেমিটিক ছিল, নাকি অসেমিটিক মিশ্রণও ছিল—এই প্রশ্নটি নৃবিজ্ঞানীদের মাঝে কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। হেমিটিক ও সেমিটিক ভাষার মাঝে কিছুটা সম্পর্ক বিদ্যমান। এখান থেকে এই অনুমানের প্রতি সমর্থন মেলে যে, আদিবাসীরা আফ্রিকা থেকে এসে থাকবে হয়তো। পক্ষান্তরে হেমিটো-সেমিটিক, ইন্দো-ইউরোপীয় ও ইউরাল-অলটাইক ভাষার মাঝে সাদৃশ্য থেকে আবার মনে হয় যেন আদি অধিবাসীরা উত্তর দিক থেকে আগত (প্রাগুক্ত)। বাইবেলীয় উৎসগুলো বলে যে, কিছু অধিবাসী শেমের এবং কিছু অধিবাসী হেমের বংশধর। নূহ-এর এই দুই ছেলে আরবের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমে বসবাস করতেন। এর মাঝে কিছু গোত্র হয়তো লোহিত সাগর ধরে দক্ষিণ দিকে সরে এসেছে। আরবের অধিবাসীরা যে উত্তর দিক থেকে এসেছে, তার স্বপক্ষে ধর্মতাত্ত্বিক সমর্থন পাওয়া যায় এখান থেকে। আর ইবরাহীম সম্পর্কে ইসলামি উৎসগুলোতে বলা হয়েছে, তিনি নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী ও তাঁর গর্ভজাত পুত্র ইসমাঈলকে মক্কা উপত্যকায় নিয়ে এসেছিলেন। তাই এ থেকে আরও ধারণা করা যায়, কিছু আরব গোত্র ইসমাঈল -এর বংশধর। আর ইসমাঈল ও তাঁর মা-কে আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া পানির উৎস দেখে যেসব বেদুইনরা এসে জড়ো হয়েছে, তারা এসেছে অন্য কোনো জায়গা থেকে। তবে নৃবিজ্ঞানী ও ধর্মবেত্তারা সব বিষয়ে পুরোপুরি একমত হননি।
টিকাঃ
[১] ওয়াদি/ভ্যালি এর বাংলা প্রতিশব্দ উপত্যকা। উপত্যকা হলো একটি দীর্ঘায়িত নিম্ন এলাকা যা দুটি পাহাড় বা পর্বতশ্রেণির মধ্যে অবস্থিত। পাহাড়ের মধ্যে অবস্থিত উপত্যকাগুলো সমতল বা অসমতল হতে পারে। এর ভেতর দিয়ে নদী প্রবাহিত হতেও পারে, না-ও পারে। বরফ গলা পানি বা বৃষ্টি যখন পাহাড়ের ঢাল বেয়ে দ্রুতবেগে নেমে আসে, তখন বছরের পর বছর পাহাড়ের শিলা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে উপত্যকার সৃষ্টি হয়। আবার কখনো কখনো কোন নদী গতিপথ বদলালে এর পুরাতন অববাহিকাটি উপত্যকার জন্ম দেয়। আবহমান কাল ধরে মরু-আরবে উপত্যকা পানির অন্যতম উৎস, কারণ তা বৃষ্টির পানিকে দীর্ঘদিন ধরে রাখে। সারকথা, উপত্যকা শুকিয়ে যাওয়া নদীর নিশ্চিত আলামত নয়। -সম্পাদক
📄 সামাজিক সংগঠন এবং বসতির ধরন
আরবের অধিবাসীদের সমাজ-প্রকৃতিকে দুটি অসম শ্রেণিতে ভাগ করা যায়—যাযাবর ও নাগরিক। একটু পরই আমরা দেখব দক্ষিণ আরবে কিভাবে কিছু সভ্যতা বিকশিত হয়েছিল। কিন্তু সেটা ছাড়া বাকি সব স্থায়ী জনবসতি গড়ে উঠেছিল প্রধানত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আরবের মরুদ্যানগুলো কেন্দ্র করে। সেইসাথে উন্নত দক্ষিণ ও উর্বর উত্তরের মধ্যকার বাণিজ্যিক সড়ক ঘিরে গড়ে ওঠা প্রধান শহরগুলোতে। প্রথম ধরনের স্থায়ী জনবসতিগুলো কৃষিকেন্দ্রিক, যেমন ইয়াসরিব (মদীনা) এবং নাজরান। আর দ্বিতীয় ধরনের বসতিগুলো বাণিজ্যের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে মক্কা, পেত্রা এবং পালমিরা। ইসলাম আবির্ভাবের স্থান মক্কার কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে ধর্মীয় কারণে। সেই তখন থেকে নিয়ে আজও পর্যন্ত এটি হাজিদের চূড়ান্ত গন্তব্য। এটি মক্কাকে আরব শহরগুলোর মাঝে এক বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করেছে। এই মর্যাদার কারণে এর নাম হয়েছে 'উম্মুল কুরা'-সব শহরের জননী। এই জনবসতিগুলোর অস্তিত্ব সত্ত্বেও আরবের প্রধান জীবনপদ্ধতি ছিল যাযাবরীয়। যাযাবর ও নাগরিক জনবসতির মাঝে পার্থক্য খুব সূক্ষ্ম যদিও। আধা-যাযাবর ও আধা-নাগরিক কিছু ধরন রয়েছে। সাবেক বেদুইনদের অনেকে তাদের যাযাবর জীবনকে পেছনে ফেলে ক্রমশ নাগরিক হয়ে ওঠে। আবার কিছু বেদুইন তখনো পুরোপুরি নগরবাসী হয়ে ওঠেনি (Hitti, 1963)। এমনকি এও বলা হয় যে, নগরবাসীরাও আদতে বেদুইনই ছিল। উন্নততর জীবনের খোঁজ করতে করতে তারা মরুদ্যানগুলোর দখল নিয়ে নেয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে হয়তো আগে থেকে দখল হয়ে থাকা মরুদ্যানে পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে এসে ঢুকে পড়ে (শহীদ, ১৯৭০)।