📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 ভূমিকা

📄 ভূমিকা


তথ্যের অপ্রতুলতার কারণে ইসলামপূর্ব আরব নিয়ে গবেষণা করা কঠিন কাজ। কিন্তু অধ্যয়ন যতই অপূর্ণাঙ্গ থাকুক, ইসলামি সভ্যতার গবেষকের জন্য এ কাজটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্যান্য প্রাচীন সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল নদীর ধারে, পানির একটি স্থায়ী উৎসের সাহায্য নিয়ে। ইসলামি সভ্যতা এদিক থেকে ব্যতিক্রম। এর উদ্ভব হয়েছে এক শুষ্ক মরুভূমিতে। ইসলামের আঁতুড়-ঘর আরবে সেরকম পর্যাপ্ত জাতীয় সম্পদ ছিল না, যা একটি সভ্যতা প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত। প্রাচীন ইতিহাসে আরবের যে পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, তাতে চূড়ান্ত ভূমিকাটা ইসলামই পালন করেছে। ইসলাম এখানকার অধিবাসীদের একটি দ্বীনের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ করার মাধ্যমে একক জাতিতে পরিণত করে। প্রশস্ত ও ধারাবাহিক বৈশ্বিক বিজয়ের জন্য তাদেরকে প্রস্তুত করে। ধর্মীয় প্রভাবকটা এখানে যথেষ্ট তীব্র। কাজেই, ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বেকার আরবের একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা তিনটি প্রধান কারণে গুরুত্বপূর্ণ:
➡ (ক) সেই সভ্যতা কতটা বিকশিত হয়েছিল, তার পরিমাণ যথাসম্ভব নিরীক্ষা করা,
➡ (খ) ইসলামের উদ্ভবের সময়ে এই সভ্যতাটির কতটুকু অস্তিত্ব ছিল এবং ইসলামি চিন্তার ওপর এটি কতটুকু প্রভাব বিস্তার করার দাবি করতে সক্ষম, তা অনুসন্ধান করা, এবং
➡ (গ) প্রাথমিক ইসলামি অর্থচিন্তার ওপর ইসলাম-পূর্ব আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা।

সূরা আসর - কুরআনে কারীমের ছোট এ সূরা মানবজাতিকে অলসতা থেকে জাগিয়ে তোলার জন্য যথেষ্ট। শুধু দরকার শোনার মতো কানের, বুঝার মতো হৃদয়ের, লাভ-লোকসান চিহ্নিত করতে সক্ষম বিবেকের এবং মনোবৃত্তির আস্তরণ পড়েনি এমন চোখের। এ সূরা প্রত্যেক মানুষকে আলাদাভাবে আলস্য ছেড়ে জেগে ওঠার আহ্বান জানাচ্ছে। আবার সামাজিকভাবে প্রত্যেককে এমন এক কর্মপদ্ধতি শিখিয়ে দিচ্ছে, যা অনুসরণ করে যে কেউ মৌলিক চরিত্রাবলি ও উন্নত মননের অধিকারী হতে পারে। এ সূরা মানবজাতিকে এমন নীতি শিক্ষা দিচ্ছে, যাকে সম্বল করে অনগ্রসর ও অনুন্নত জনগোষ্ঠীও মর্যাদা ও উন্নতির পথে হাঁটতে পারে। পক্ষান্তরে যা ছেড়ে দেওয়ার ফলে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছা জাতিও অধঃপতনে পতিত হওয়া থেকে বাঁচতে পারে না।

এ সূরা দুর্বলদেরকে সত্য বলতে সাহস যোগায় এবং সেই সত্যের জন্য নিজের সবকিছুকে বিসর্জন দিতে প্রেরণা যোগায়। এ সূরা মুসলমানদের মাঝে ঈমান-অবিচলতার মশাল জ্বালায়। তাদেরকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করে সর্বদা আমলের জন্য উৎসাহিত করে। আর দুর্বল-অক্ষম মুসলমানদের মাঝে জাগায় আমলের অনুপ্রেরণা। এ সূরা দুর্বলদের অবিরাম প্রচেষ্টা ও অবদান রাখার প্রতি উৎসাহিত করে বলে, তোমরাই পারবে লাঞ্ছনার অতল গহ্বরে তলিয়ে যাওয়া মানবতাকে মর্যাদা ও সম্মানের মহাসড়কে তুলে আনতে। ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়ানো পৃথিবীকে সফলতার মুখ দেখাতে। তোমরাই পারবে মানুষকে শয়তানের ভাগাড় থেকে উদ্ধার করে রাহমানুর রাহীমের জান্নাতে পৌঁছে দিতে।

এ সূরা মুসলিম উম্মাহকে وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ তথা 'পরস্পরকে তাকীদ করে সত্যের' এবং وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ তথা 'পরস্পরকে তাকীদ করে সবরের' এর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ভবিষ্যতে মানবতার নেতৃত্ব ও মানবসমাজকে নিজেদের মতো করে রাঙানোর রহস্য বর্ণনা করছে। এ সূরার প্রত্যেকটি বাক্যকে অন্তরের কানে শোনো। কী বিশ্বাস ও আস্থায় তা পরিপূর্ণ! শত দুর্বলতা সত্ত্বেও এটি তার বিপরীত সব সভ্যতা-সংস্কৃতিকে চ্যালেঞ্জ করে ঘোষণা করছে- বাহ্যিক সাফল্যপ্রাপ্ত সমস্ত সভ্যতাই ক্ষতিগ্রস্ত এবং চিন্তানৈতিক দৈন্যতার শিকার। কিন্তু এ শরীয়াহর দাওয়াত, যা এ উম্মাহ তথা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রেমিকগণ দিয়ে যাচ্ছেন; তা-ই একমাত্র সফলতার গ্যারান্টি দিতে পারে। এ দ্বীন ছাড়া সাফল্য ও মুক্তির কোনো পথ নেই। তাদের (দ্বীনবিরোধীদের) ভাগ্যে রয়েছে শুধু ক্ষতিই ক্ষতি। তাদের প্রত্যেকটি সেকেন্ড, মিনিট ও মুহূর্ত ক্ষতির সম্মুখীন। তাদের জীবনবাজারে চলছে চরম মন্দা।

তাই তো ইমাম রাযী রহ. সূরা আসরের তাফসীরে বলেন, পূর্বসূরিদের কোনো মনীষী বলেছেন, এ সূরার তাফসীর আমি সেই বরফবিক্রেতা থেকে শিখেছি, যে ডাক দিয়ে বলে- ارحموا من يذوب رأس ماله، ارحমوا من يذوب رأس ماله 'সেই ব্যক্তিকে রহম করো, যার মাল গলে যাচ্ছে! সেই ব্যক্তিকে রহম করো, যার মাল গলে যাচ্ছে!' এ পৃথিবী যেন একটি বাজার। আর তাতে বসবাসকারীরা হচ্ছে ব্যবসায়ী। জীবনের শ্বাস- প্রশ্বাসগুলো তাদের পুঁজি। তো কার পুঁজি লাভজনক হচ্ছে, আর কে মাথায় হাত রাখছে? কার জীবন সফলতার মুখ দেখছে, আর কার জীবন লোকসানে বিপর্যস্ত হচ্ছে? তা খুব ভালো করেই জানা।

আসুন! এ সূরার মাধ্যমে আমাদের ঈমানকে মজবুত করি; যাতে ফেতনা বর্ষণকালে ঈমান- আমলের ছাতা ধরতে পারি। আসুন! এ সূরার মাধ্যমে নিজেদের বিশ্বাসকে সজীব করে তুলি; যাতে আমরা বিশ্বকুফরের সামনে ইস্পাতকঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারি। এই তিন আয়াতে ডুব দিয়ে রিক্ততার অনুভূতিসাগর থেকে বেরিয়ে আসি, যেখানে আজকের যুবসমাজকে দাজ্জালী মিডিয়া ডুবিয়ে রেখেছে। আসুন! বিশ্বকুফরী শক্তির ভয়ে ভীত হয়ে থরথর কাঁপতে থাকা দেহগুলোতে এ সূরার একটু উষ্ণতা দিই; যাতে তাওহীদের স্লোগান মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে আসে। আসুন! ইসলামের শত্রুবাহিনী ও সামরিক সংস্থাগুলোর বধ্যভূমিতে এ সূরার ঘোষণা করে দিই যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনীত শরীয়াহর দাওয়াত ও তার উপর অবিচল থাকার উপদেশই কুরআনের সম্মান রাখতে পারে।

আসুন! এ সূরা সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করি; যেটি সম্পর্কে ইমাম শাফিঈ রহ. বলেছেন- لو لم ينزل غير هذه السورة لكفت الناس لأنها شملت جميع علوم القرآن 'যদি কুরআন মাজীদে শুধু এই সূরাই থাকত, তা একাই বিশ্বমানবতার জন্য যথেষ্ট হতো। কারণ, তাতে রয়েছে কুরআনের সব জ্ঞান।'

بسم الله الرحمن الرحيم.
وَالْعَصْرِ ﴿1﴾ إِنَّ الْإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ ﴿2﴾ إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بالصبر ﴿3﴾

"কসম যুগের (সময়ের), নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত; কিন্তু তারা নয়, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে তাকীদ করে সত্যের এবং তাকীদ করে সবরের।" (সূরা আসর: ১-৩)

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 বাইবেলীয় সূত্র থেকে

📄 বাইবেলীয় সূত্র থেকে


'আরব' শব্দটির শব্দগত উৎস প্রাচীন ইতিহাসে নিহিত। বাইবেলীয় উৎস অনুযায়ী, শব্দটির একটি সেমিটিক উৎসের কথা জানা যায়। এটি এসেছে হিব্রু মূল শব্দ 'আরাতি' থেকে, যার অর্থ 'শুষ্ক' (Aid to Bible Understanding, 1971)। আরবকে শুষ্ক ভূমি বা 'মরু প্রান্তর' (ইসাইয়া ২১: ১৩) হিসেবে উল্লেখ করলে শব্দটির বাইবেলীয় অর্থ ফুটে উঠে। তা ছাড়া এ শব্দটি 'আরাবাহ' শব্দেরই আরেকটি সংস্করণ হতে পারে, হিব্রু ভাষায় যার অর্থও অনুরূপ: মরু প্রান্তর (দ্বিতীয় বিবরণ ৩: ৬, যিহোশূয় ৩: ১৬, ১১: ১৬ এবং জেরেমিয়া ৫২: ৭)। বাইবেলীয় এই অর্থ যদিও গ্যালিলি হ্রদ থেকে নিয়ে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকাকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে, কিন্তু শুষ্ক ভূমি বা মরু প্রান্তর হিসেবে আরব বা আরাবাহ'র এই সংজ্ঞার ভেতরে ইয়েমেনের উত্তর দিক পর্যন্ত সকল শুষ্ক ভূমিই অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। উপদ্বীপের কেন্দ্রে অবস্থানকারী ভূমি শুষ্কতা বা পানির উৎসের অভাবের দিক দিয়ে বাইবেলে উল্লেখিত সেই অঞ্চলের তুলনায় কোনো দিক দিয়ে কম, এমনটা ভাবার কোনো প্রমাণ নেই।

আরবজাতির উদ্ভবের ব্যাপারেও বাইবেলে উল্লেখ রয়েছে। কিছু গোত্র ছিল সেমিটিক, যারা নূহ-এর ছেলে শেম বা সেম (সেখান থেকে সেমিটিক) থেকে জোকতানের বংশে উদ্ভূত। অপর কিছু গোত্র হেমিটিক, যাদের উদ্ভব নূহ-এর ছেলে হেম থেকে কুশের বংশে (আদি পুস্তক ১০: ৬, ৭, ২৬-৩০)। ছেলে ইসমাঈল -এর মাধ্যমে নবি ইবরাহীম -এর কিছু বংশধরও আরবে বসবাস করে এবং 'অস্থায়ী বাসস্থান গড়ে তোলে মিশরের কাছে শুরের নিকট হাভিলা থেকে অ্যাসিরিয়া পর্যন্ত এলাকায়' (আদি পুস্তক ২৫: ১-৪, ১২-১৮)। সাঈরের পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসকারী (ফিলিস্তিনে অবস্থিত) ইসাউ'র বংশধররাও সাধারণভাবে আরবের সংজ্ঞার ভেতর আসে (আদি পুস্তক ৩৬: ১-৪৩, Aid to Bible Understanding, 1971)। তবে সাধারণভাবে আরবদের বোঝাতে বাইবেলে ব্যবহৃত পরিভাষা হলো ইসমাঈলীয়। কারণ ইহুদিরা আরবদেরকে ইবরাহীমেরই আরেক ধারার বংশধর হিসেবে দেখত। আর তাদের (ভুল ধারণা) মতে, ইসহাকের জন্মের ফলে বড় ছেলে ইসমাঈল প্রতিশ্রুত ভূমির স্বাভাবিক উত্তরাধিকারীর মর্যাদা থেকে ছিটকে পড়েন (পিটার ম্যানসফিল্ড, ১৯৮২)।

প্রথম যুগের মুসলিম বা আরবগণ নিজেদেরকে ইসমাঈলের বংশধর হিসেবে মানে। ইসমাঈলের বাবা ইবরাহীমকে ধরা হয় একেশ্বরবাদীদের পিতা হিসেবে। ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, নবি ইবরাহীম তাঁর মিশরীয় দ্বিতীয় স্ত্রী হাজের ও তাঁর গর্ভের ছেলে ইসমাঈলকে মক্কা উপত্যকায় নিয়ে এসেছিলেন। তারপর যৎসামান্য খাবারদাবার-সহ তাঁদেরকে সেখানেই রেখে চলে যান। তারপর ইবরাহীম একক সত্য উপাস্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, 'হে আমার প্রতিপালক! আমি আমার কতিপয় সন্তানকে আপনার সম্মানিত ঘরের আশেপাশে এমন এক উপত্যকায় এনে বসবাস করিয়েছি, যেখানে কোনো ক্ষেত-খামার নেই। হে আমার প্রতিপালক! এটি করেছি যাতে তারা নামাজ কায়েম করে। কাজেই আপনি লোকদের মনকে এদের প্রতি আকৃষ্ট করুন এবং ফল-ফলাদি দিয়ে এদের আহারের ব্যবস্থা করুন, হয়তো এরা শোকরগুজার হবে।' (সূরা ইবরাহীম, ১৪: ৩৭)। আদি পুস্তক অনুযায়ী, নবি ইবরাহীমকে আল্লাহ তাআলা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তাদের কোনো ক্ষতি হবে না। 'তোমার ক্রীতদাসী ও তার সন্তানের বিষয়ে তুমি এত ব্যথিত হোয়ো না। আমি ওই ক্রীতদাসীর ছেলে হতেও একটি জাতি উৎপন্ন করব, কারণ সেও তোমার বংশধর।' (আদি পুস্তক ২১: ১৩)। কিছু পার্থক্য সত্ত্বেও বাইবেলীয় ও কুরআনীয়-উভয় সংস্করণেই বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তাঁদেরকে পানি ও নানা অনুগ্রহ দিয়ে চলেন। শিশুটি মক্কা উপত্যকায়, পারানের ঊষর অঞ্চলে বড় হতে থাকে এবং তিরন্দাজে পরিণত হয়।

ঘটনার বাকি অংশ ইসলামি আন্দোলনের জন্য আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম-পূর্ব আরবের অর্থনীতিতে এটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। ইসলামের ইতিহাস বলে, আল্লাহর দেওয়া একটি পানির উৎস ইসমাঈলের পায়ের নিচ থেকে বেরিয়ে আসে। হাজেরা এটিকে হাত দিয়ে থামানোর চেষ্টা করেন, যেন তা বালুরাশির দিকে চলে না যায়। মুখে বলতে থাকেন, 'যাম-যাম', অর্থাৎ থামো এবং জড়ো হও। পরবর্তীকালে পবিত্র এই পানির উৎসের নামই হয়ে যায় যামযাম। এখন পর্যন্ত এ নামেই একে ডাকা হয়। ইবরাহীম যখন তাঁদের খোঁজ নিতে ফিরে আসেন, তখন দেখতে পান বেদুইনরা এই পানির উৎসকে ঘিরে জনবসতি গড়ে তুলেছে। ইসমাঈল-কে সাথে নিয়ে তিনি সত্যিকার একক উপাস্যের ইবাদতখানা হিসেবে কাবা নির্মাণ করেন। মক্কার এই পবিত্র ঘর-কেন্দ্রিক এলাকার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করেছে এই পানির উৎস। ইসলামের আবির্ভাবের পরে যেমন, তেমনি এর আগেও হজযাত্রীরা একে সমীহ করে এসেছে। তখন থেকেই হজ এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে আরব উপদ্বীপের জীবনে।

টিকাঃ
[১] সূরা বাকারা, সূরা ইবরাহীম-সহ কুরআনের বিভিন্ন স্থানে ইসমাঈল আলাইহিস সালামের শৈশব প্রসঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। সহীহ বুখারির (৩৩৬৪, ৩৩৬৫) বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, তিনি তিরন্দাজ ছিলেন এবং শিকারের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতেন। - সম্পাদক
[২] সহীহ বুখারির (২৩৬৮, ৩৩৬৪) বর্ণনা থেকে জানা যায়, জুরহুম গোত্র মক্কার সেই অঞ্চল অতিক্রম করার সময় পানির উৎসের সন্ধান পেয়ে হাজেরার অনুমতি নিয়ে বসতি স্থাপন করে। জুরহুম গোত্র ছিল আরব আরিবাহর অন্তর্ভুক্ত। তাদের আদি বসতি ছিল ইয়েমেনে। দ্রষ্টব্য: আখবারু মাক্কাহ (২/৯), আল-ইকদুল ফারীদ (৩/৩১৯) মুজামু কাবায়িলিল আরব (১/১৮৩)। সম্পাদক

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 ভৌগোলিক অবস্থা ও জনপ্রকৃতি

📄 ভৌগোলিক অবস্থা ও জনপ্রকৃতি


মোটাদাগে হিসেব করলে আরব অঞ্চলকে ভৌগোলিকভাবে তিনটি আলাদা অংশে ভাগ করা যায়—উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণ। এই পুরোটা অঞ্চল জুড়েই আরব উপদ্বীপ। এটি উত্তরদিকে ফিলিস্তিনের দক্ষিণাংশ থেকে শুরু হয়ে পূর্বদিকে পারস্য ও ওমান উপসাগর এবং পশ্চিমে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। দক্ষিণে ভারত মহাসাগরে এর শেষ সীমানা। এ এক বিশাল ভূমি। আকারে ইউরোপের এক-চতুর্থাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের এক-তৃতীয়াংশের সমান। ভূমির প্রকৃতি এবং প্রাচীন আরবে গড়ে ওঠা সভ্যতার স্তরের ভিত্তিতে উপদ্বীপকে এই তিনটি অংশে ভাগ করা হয়েছে। উত্তর আর দক্ষিণ অংশ ছিল উর্বর ভূমিতে পরিপূর্ণ। এর ফলে টেকসই অর্থনীতির বিকাশ সম্ভব হয় এবং এর সহায়তায় গড়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতা (Della Vida, 1944)।

কিন্তু কিছু ছড়ানো ছিটানো মরুদ্যানের কথা বাদ দিলে মধ্যাংশটি ছিল একেবারেই শুষ্ক। ইসলামের আবির্ভাব হয় এখানেই। কয়েক শতাব্দী যাবৎ ইসলামের বিজয়রথের নেতৃত্ব দিয়েছে আরবদের যে জনগোষ্ঠী, তাদের বসতিও এই এলাকাটিই। উত্তর বা দক্ষিণের সাথে তুলনীয় কোনো সভ্যতা যে এখানে গড়ে উঠেছিল, এমনটা বলার মতো কোনো প্রমাণই পাওয়া যায়নি।

কিন্তু মধ্য-আরব কি চিরকালই শুষ্ক ছিল? সেমিটিক জাতির উদ্ভব ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে একটি ‘তত্ত্ব’ আবিষ্কার করার জন্য ইতিহাসবিদগণ এই প্রশ্নটি করেছেন। শুকিয়ে যাওয়া নদীতলকে বলে ‘ওয়াদি’। এগুলোর অস্তিত্ব থেকে ধারণা করা যায় যে, প্রাগৈতিহাসিক আরব ছিল উর্বর ভূমি। সেখানে মানুষ বসবাস করতে পারত। তারপর ইতিহাস শুরুর আগ পর্যন্ত এটি ক্রমাগত শুষ্ক হতে থাকে (প্রাগুক্ত)। শুক নদীতল বা 'ওয়াদি' মধ্য-আরবে বাণিজ্য বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা পালন করেছে। দক্ষিণ ও উত্তরের মাঝে বাণিজ্যিক পথ হিসেবে কাজ করত এগুলো। প্রতিকূলতম এক ভূমিতে সেগুলো অনুকূলতম পথ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

প্রাগৈতিহাসিক মধ্য আরবের ভূমিপ্রকৃতি যেমন এক অমীমাংসিত রহস্য, সেই ভূমির আদি অধিবাসীদের উৎপত্তি-রহস্যও তা-ই। তারা কি পুরোপুরিই সেমিটিক ছিল, নাকি অসেমিটিক মিশ্রণও ছিল—এই প্রশ্নটি নৃবিজ্ঞানীদের মাঝে কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। হেমিটিক ও সেমিটিক ভাষার মাঝে কিছুটা সম্পর্ক বিদ্যমান। এখান থেকে এই অনুমানের প্রতি সমর্থন মেলে যে, আদিবাসীরা আফ্রিকা থেকে এসে থাকবে হয়তো। পক্ষান্তরে হেমিটো-সেমিটিক, ইন্দো-ইউরোপীয় ও ইউরাল-অলটাইক ভাষার মাঝে সাদৃশ্য থেকে আবার মনে হয় যেন আদি অধিবাসীরা উত্তর দিক থেকে আগত (প্রাগুক্ত)। বাইবেলীয় উৎসগুলো বলে যে, কিছু অধিবাসী শেমের এবং কিছু অধিবাসী হেমের বংশধর। নূহ-এর এই দুই ছেলে আরবের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমে বসবাস করতেন। এর মাঝে কিছু গোত্র হয়তো লোহিত সাগর ধরে দক্ষিণ দিকে সরে এসেছে। আরবের অধিবাসীরা যে উত্তর দিক থেকে এসেছে, তার স্বপক্ষে ধর্মতাত্ত্বিক সমর্থন পাওয়া যায় এখান থেকে। আর ইবরাহীম সম্পর্কে ইসলামি উৎসগুলোতে বলা হয়েছে, তিনি নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী ও তাঁর গর্ভজাত পুত্র ইসমাঈলকে মক্কা উপত্যকায় নিয়ে এসেছিলেন। তাই এ থেকে আরও ধারণা করা যায়, কিছু আরব গোত্র ইসমাঈল -এর বংশধর। আর ইসমাঈল ও তাঁর মা-কে আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া পানির উৎস দেখে যেসব বেদুইনরা এসে জড়ো হয়েছে, তারা এসেছে অন্য কোনো জায়গা থেকে। তবে নৃবিজ্ঞানী ও ধর্মবেত্তারা সব বিষয়ে পুরোপুরি একমত হননি।

টিকাঃ
[১] ওয়াদি/ভ্যালি এর বাংলা প্রতিশব্দ উপত্যকা। উপত্যকা হলো একটি দীর্ঘায়িত নিম্ন এলাকা যা দুটি পাহাড় বা পর্বতশ্রেণির মধ্যে অবস্থিত। পাহাড়ের মধ্যে অবস্থিত উপত্যকাগুলো সমতল বা অসমতল হতে পারে। এর ভেতর দিয়ে নদী প্রবাহিত হতেও পারে, না-ও পারে। বরফ গলা পানি বা বৃষ্টি যখন পাহাড়ের ঢাল বেয়ে দ্রুতবেগে নেমে আসে, তখন বছরের পর বছর পাহাড়ের শিলা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে উপত্যকার সৃষ্টি হয়। আবার কখনো কখনো কোন নদী গতিপথ বদলালে এর পুরাতন অববাহিকাটি উপত্যকার জন্ম দেয়। আবহমান কাল ধরে মরু-আরবে উপত্যকা পানির অন্যতম উৎস, কারণ তা বৃষ্টির পানিকে দীর্ঘদিন ধরে রাখে। সারকথা, উপত্যকা শুকিয়ে যাওয়া নদীর নিশ্চিত আলামত নয়। -সম্পাদক

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 সামাজিক সংগঠন এবং বসতির ধরন

📄 সামাজিক সংগঠন এবং বসতির ধরন


আরবের অধিবাসীদের সমাজ-প্রকৃতিকে দুটি অসম শ্রেণিতে ভাগ করা যায়—যাযাবর ও নাগরিক। একটু পরই আমরা দেখব দক্ষিণ আরবে কিভাবে কিছু সভ্যতা বিকশিত হয়েছিল। কিন্তু সেটা ছাড়া বাকি সব স্থায়ী জনবসতি গড়ে উঠেছিল প্রধানত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আরবের মরুদ্যানগুলো কেন্দ্র করে। সেইসাথে উন্নত দক্ষিণ ও উর্বর উত্তরের মধ্যকার বাণিজ্যিক সড়ক ঘিরে গড়ে ওঠা প্রধান শহরগুলোতে। প্রথম ধরনের স্থায়ী জনবসতিগুলো কৃষিকেন্দ্রিক, যেমন ইয়াসরিব (মদীনা) এবং নাজরান। আর দ্বিতীয় ধরনের বসতিগুলো বাণিজ্যের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে মক্কা, পেত্রা এবং পালমিরা। ইসলাম আবির্ভাবের স্থান মক্কার কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে ধর্মীয় কারণে। সেই তখন থেকে নিয়ে আজও পর্যন্ত এটি হাজিদের চূড়ান্ত গন্তব্য। এটি মক্কাকে আরব শহরগুলোর মাঝে এক বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করেছে। এই মর্যাদার কারণে এর নাম হয়েছে 'উম্মুল কুরা'-সব শহরের জননী। এই জনবসতিগুলোর অস্তিত্ব সত্ত্বেও আরবের প্রধান জীবনপদ্ধতি ছিল যাযাবরীয়। যাযাবর ও নাগরিক জনবসতির মাঝে পার্থক্য খুব সূক্ষ্ম যদিও। আধা-যাযাবর ও আধা-নাগরিক কিছু ধরন রয়েছে। সাবেক বেদুইনদের অনেকে তাদের যাযাবর জীবনকে পেছনে ফেলে ক্রমশ নাগরিক হয়ে ওঠে। আবার কিছু বেদুইন তখনো পুরোপুরি নগরবাসী হয়ে ওঠেনি (Hitti, 1963)। এমনকি এও বলা হয় যে, নগরবাসীরাও আদতে বেদুইনই ছিল। উন্নততর জীবনের খোঁজ করতে করতে তারা মরুদ্যানগুলোর দখল নিয়ে নেয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে হয়তো আগে থেকে দখল হয়ে থাকা মরুদ্যানে পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে এসে ঢুকে পড়ে (শহীদ, ১৯৭০)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00