📘 ইসলামী নীতিমালার আলোকে বরকত অর্জন 📄 বরকত অর্জনের অর্থ

📄 বরকত অর্জনের অর্থ


আরবীতে বলা হয় تبرك يتبرك تبركا যা আরবী 'বারাকাহ' শব্দ থেকে গৃহীত। তাহযীবুল লুগাহ নামক অভিধানে আবু মানসুর বলেন: “বারাকাহ শব্দের মূল হচ্ছে প্রাচুর্য ও প্রবৃদ্ধি।”

অতএব, বরকত মানে হচ্ছে কোনো জিনিসের সে প্রাচুর্য ও প্রবৃদ্ধি, তাবাররুকের মাধ্যমে বরকত লাভকারী যা পাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে থাকে। এ প্রাচুর্য ও প্রবৃদ্ধি কখনো স্থানের মধ্যে হতে পারে, কখনো হতে পারে ব্যক্তির মধ্যে, আর কখনো গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যে। এটা হয়ে থাকে তার ভাষা ভিত্তিক প্রয়োগ অনুযায়ী। আর শর'ঈ প্রয়োগের বিস্তারিত আলোচনা ইনশাআল্লাহ পরে আসছে।

প্রথম অর্থ (স্থানের মধ্যে বরকত) সম্পর্কে আল্লাহর বাণী: وَجَعَلَ فِيهَا رَوَاسِيَ مِن فَوْقِهَا وَبَرَكَ فِيهَا [ফাসসিলাত: ১০] “তিনি ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগে স্থাপন করেছেন অটল পর্বতমালা এবং তাতে দিয়েছেন বরকত”। [সূরা ফুসসিলাত, আয়াত: ১০]

وَأَوْرَثْنَا الْقَوْمَ الَّذِينَ كَانُوا يُسْتَضْعَفُونَ مَشَرِقَ الْأَرْضِ وَمَغَارِبَهَا الَّتِي بَارَكْنَا فِيهَا [আল-আ'রাফ: ১৩৭] “যে সম্প্রদায়কে দুর্বল গণ্য করা হত তাদেরকে আমি উত্তরাধিকারী করেছি যমীনের পূর্ব ও পশ্চিমের, যাতে আমি দিয়েছি বরকত”। [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ১৩৭]

لَفَتَحْنَا عَلَيْهِم بَرَكَاتٍ مِّنَ السَّমَاءِ وَالْأَرْضِ [আল-আ'রাফ: ৯৬] "আমরা অবশ্যই তাদের জন্য আকাশ ও যমীনের বরকত উন্মুক্ত করে দিতাম।” [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ৯৬]

وَقُل رَّبِّ أَنزِلْنِي مُنزَلًا مُبَارَكًا ﴾ [المؤمنون: ২৯] "আর বল, হে আমার রব, আমাকে এমনভাবে অবতরণ করাও, যা হবে বরকতময়”। [সূরা আল-মুমিনূন, আয়াত: ২৯]

দ্বিতীয় অর্থ (ব্যক্তির মধ্যে বরকত) সম্পর্কে আল্লাহর বাণী: وَبَارَكْنَا عَلَيْهِ وَعَلَى إِسْحَاقَ وَمِن ذُرِّيَّতِهِمَا مُحْسِنٌ وَظَالِمٌ لِنَفْسِهِ مُّبِينٌ ﴾ [আস-সাফফাত: ১১৩] “আমরা তার ওপর বরকত দান করেছিলাম এবং ইসহাকের ওপরও। তাদের বংশধরদের মধ্যে কতক সৎকর্মপরায়ণ এবং কতক নিজেদের প্রতি স্পষ্ট অত্যাচারী।” [সূরা আস-সাফফাত, আয়াত: ১১৩]

আর নূহ আলাইহিস সালামের কাহিনী বর্ণনায় আল্লাহর বাণী: اهْبِطُ بِسَلَامٍ مِنَّا وَبَرَكَتٍ عَلَيْكَ وَعَلَى أُمَمٍ مِمَّن مَّعَكَ ﴾ [হূদ: ৪৮] “অবতরণ করুন আমার পক্ষ হতে শান্তি ও বরকত সহকারে আপনার ওপর এবং যে সকল সম্প্রদায় আপনার সঙ্গে আছে তাদের ওপর”। [সূরা হূদ, আয়াত: ৪৮]

তৃতীয় অর্থ (গুণাবলীতে বরকত) সম্পর্কে আল্লাহর বাণী: ﴿فَسَلِّمُوا عَلَى أَنফُسِكُمْ تَحِيَّةً مِّنْ عِندِ اللَّهِ مُبَارَكَةً طَيِّبَةً ﴾ [আন-নূর: ৬১] “অতঃপর তোমরা তোমাদের নিজেদের ওপর সালাম করবে আল্লাহর নিকট হতে অভিবাদনস্বরূপ যা বরকতময় পবিত্র।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৬১]

আল্লাহর তা'আলার বাণী: وَهَذَا ذِكْرٌ مُبَارَكٌ أَنزَلْنَاهُ أَفَأَنتُمْ لَهُ مُنكিরُونَ ﴾ [আল-আম্বিয়া: ৫০] “আর এটি বরকতময় উপদেশ, যা আমি অবতীর্ণ করেছি। তবুও কি তোমরা তা অস্বীকার কর”? [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৫০]

আল্লাহর কিতাব নিয়ে চিন্তা করলে দেখতে পাবেন, তাতে এ বিষয়ের ওপর দলীল রয়েছে যে, বরকত আল্লাহর কাছ থেকেই অর্জিত হয় এবং একমাত্র আল্লাহর কাছেই তা চাওয়া যায়। তিনি সৃষ্টির যাকে ইচ্ছা ও যে বস্তুতে ইচ্ছা বরকত প্রদান করেন।

আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ تَبَارَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ﴾ [আল-আ'রাফ: ৫৪] “জেনে রাখ, সৃষ্টি ও আদেশ তাঁরই। বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ বরকতময়।” [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ৫৪]

তিনি আরও বলেন, ﴿تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ﴾ [আল-ফুরকান: ১] “কত বরকতময় তিনি যিনি তাঁর বান্দার ওপর ফুরকান অবতীর্ণ করেছেন!” [সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ০১]

তিনি আরও বলেন, ﴿تَبَارَكَ الَّذِي جَعَلَ فِي السَّمَاءِ بُرُوجًا﴾ [আল-ফুরকান: ৬০] “কত বরকতময় তিনি যিনি আসমানে সৃষ্টি করেছেন তারকামণ্ডলী তাদের স্থান-সমেত!” [সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৬০]

তিনি আরও বলেন, ﴿فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ﴾ [আল-মুমিনূন: ১৪] “অতএব, সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়”! [সূরা আল-মুমিনূন: ১৪]

তিনি আরও বলেন, تَبَارَكَ اسْمُ রব্বিকা যিল জালালি ওয়াল ইকরম ﴾ [আর-রহমান: ৭৮] "কত বরকতময় তোমার রবের নাম যিনি মহিমময় ও মহানুভব"! [সূরা আর-রহমান, আয়াত: ৭৮]

মূলতঃ তাবারাকা শব্দটি সম্বলিত আয়াতের সংখ্যা অনেক। তাবারাকা শব্দটি আল কুরআনে আল্লাহর দিকে সম্পর্কিত হয়েই ব্যবহৃত হয়েছে। এ শব্দটি বরকতের যতপ্রকার অর্থ রয়েছে তন্মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, উপকারী এবং সম্পর্ক ও প্রভাবের দিক দিয়ে সমধিক ব্যাপক অর্থ প্রদানকারী।

অতএব, বরকত আল্লাহরই মালিকানাভুক্ত। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে, বহুবিধ সৃষ্টিকে তিনি বরকত দান করেছেন। তন্মধ্যে রয়েছে:
১. নবী ও রাসূলগণ। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَبَرَكْنَا عَلَيْهِ وَعَلَى إِسْحَاقَ ﴾ [আস-সাফ্ফাত: ১১৩] "আমরা তার ওপর বরকত দান করেছিলাম এবং ইসহাকের ওপরও”। [সূরা আস-সাফ্ফাত, আয়াত: ১১৩] আর ইবরাহীম ও তার আহলে বাইত সম্পর্কে বলেন, রব্বানা আনযিলনি মুনযালান মুবারাকান ﴾ [হূদ: ৭৩] "হে আহলে বাইত! তোমাদের প্রতি রয়েছে আল্লাহর অনুগ্রহ ও বরকত"। [সূরা হূদ, আয়াত: ৭৩] নূহ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বলেন, اهْبِطُ بِسَلَامٍ مِنَّا وَبَرَكَتٍ عَلَيْكَ ﴾ [হূদ: ৪৮] "অবতরণ কর আমার পক্ষ থেকে তোমার ওপর শান্তি ও বরকত সহকারে”। [সূরা হূদ, আয়াত: ৪৮] আর ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বলেন, وَجَعَلَنِي مُبَارَكًا أَيْنَ مَا كُنتُ) [মারইয়াম: ৩১] “যেখানেই আমি থাকি না কেন, তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন”। [সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৩১]

২. ইবাদাতের স্থানসমূহ, যেমন, মসজিদুল আকসা ও মসজিদুল হারাম। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿সুবহানাল্লাজি আসরা বিআবদিহি লাইলাম মিনাল মাসজিদিল হারামি ইলাল মাসজিদিল আকসাল্লাজি বারাকনা হাওলাহু ﴾ [আল-ইসরা: ১] “পবিত্র ও মহিমময় তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে রজনীতে ভ্রমণ করিয়েছিলেন আল-মসজিদুল হারাম থেকে আল- মসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার আশপাশকে আমরা বরকতময় করেছিলাম”। [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ০১] আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন, ﴿ইন্না আওয়াল বাইতিন উযিআ লিন্নাছি লাল্লাযি বি বাক্কাতা মুবারাকান ﴾ [আলে ইমরান: ৯৬] “নিশ্চয় মানবজাতির জন্য সর্বপ্রথম যে গৃহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা তো বাক্কায়, বরকতময়”। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৬]

৩. আল্লাহ তা'আলা যে যিকির নাযিল করেছেন সে সম্পর্কে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তা বরকতময়। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَهَذَا ذِكْرٌ مُبَارَكٌ أَنزَلْنَاهُ ﴾ [আল-আম্বিয়া: ৫০] “এটা বরকতময় উপদেশ। আমরা তা অবতীর্ণ করেছি। তবুও কি তোমরা একে অস্বীকার করবে?” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৫০] আর এ যিকির হচ্ছে মহান আল-কুরআন। যেমন, আল্লাহ বলেছেন, وَهَذَا كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ مُبারাকুন ﴾ [আল-আন'আম: ৯২] "এ হলো বরকতময় একটি কিতাব যা আমরা নাযিল করেছি”। [সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ৯২] كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِيَدَّبَّরُوا ءَايَاتِهِ ﴾ [সাদ: ২৯] “এক বরকতময় কিতাব, যা আমরা তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতসমূহ অনুধাবন করে”। [সূরা সাদ, আয়াত: ২৯]

অতএব, কুরআন হাকীম বরকতময় যিকির। আর এর আয়াতসমূহ নিয়ে চিন্তা গবেষণা করা বরকতময় আমল। আল-কুরআনের বিশেষ জ্ঞানসমূহ এ চিন্তা-গবেষণারই অন্তর্গত। সুন্নাহ কুরআনের মুজমাল ও সংক্ষিপ্ত বিষয়সমূহকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে। আর সুন্নাহও বরকতময়। কুরআন-সুন্নাহের অনুসরণও বরকতময়। কুরআনের আয়াতসমূহের গবেষণা ও সুন্নাহের সমঝ থেকে উদ্ভূত যে সকল জ্ঞান, তাও বরকতময়।

এ তিনটি প্রকারে খাস (বিশেষ) বরকত রয়েছে। এ ব্যাপারে আল কুরআন দলীল পেশ করেছে। আর কোথাও রয়েছে ব্যাপক বরকত। এ বরকতও কয়েক প্রকারে বিভক্ত। তন্মধ্যে:
১. বৃষ্টি বরকতময়। কেননা এর দ্বারা মানুষের জীবিকা ও ফসল উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি ঘটে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَنَزَّلْنَا مِنَ السَّمَاءِ مَاءً مُبَارَكًا فَأَنْবَتْنَا بِهِ جَنَّاتٍ وَحَبَّ الْحَصِيدِ [ক্বাফ: ৯] “আসমান থেকে আমরা বর্ষণ করি বরকতময় পানি এবং তদ্বারা আমরা সৃষ্টি করি বরকতময় উদ্যান ও পরিপক্ক শস্যরাজি”। [সূরা ক্বাফ, আয়াত: ০৯]

২. তন্মধ্যে আরও রয়েছে যমীতে আল্লাহর বরকত দান। যেমন, তিনি বলেন, (وَجَعেলَ فِيهَا رَوَاسِيَ مِن فَوْقِهَا وَبَرَكَ فِيهَا) [ফাসসিলাত: ১০] “তিনি ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগে স্থাপন করেছেন অটল পর্বতমালা এবং তাতে দিয়েছেন বরকত”। [সূরা ফুসসিলাত, আয়াত: ১০] ﴿মশারিকে আরদ ওয়া মাগারিবিহাল্লাতি বারাকনা ফিহা ﴾ [আল-আ'রাফ: ১৩৭] “যমীনের পূর্ব ও পশ্চিমের, যাতে আমরা দিয়েছি বরকত”। [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ১৩৭]

৩. এর মধ্যে আরও রয়েছে আসমান থেকে যা আসে এবং যমীন থেকে যা উৎপন্ন হয় তাতে আল্লাহর বরকত দান। যেমন, তিনি বলেন, وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُواْ وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِم بَرَكَاتٍ মِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ) [আল-আ'রাফ: ৯৬] “যদি সে সকল জনপদের অধিবাসীবৃন্দ ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তাহলে আমরা অবশ্যই তাদের জন্য আকাশ ও যমীনের বরকত উন্মুক্ত করে দিতাম"। [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ৯৬]

এ সকল কিছু এবং তদনুরূপ অন্যান্য বস্তু ব্যাপকার্থে বরকতময়, যদ্বারা উপকার ও কল্যাণ এবং প্রবৃদ্ধি ও প্রাচুর্য অর্জিত হয়।

সম্ভবত এতে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, যে বিশেষ বরকত ব্যক্তির সাথে সংশ্লিষ্ট, স্থান ও গুণের সাথে নয়, তা (অন্যদের মাঝেও) এমনই সঞ্চারিত যে, এতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ দ্বারা বরকত অর্জন করা যায়। কেননা এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির সাথে সংশ্লিষ্ট স্থায়ী বরকত রয়েছে। কিন্তু ইবাদাতের স্থান যেমন, মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীর সাথে খাস (বিশেষ) যে বরকত রয়েছে তা মসজিদের বিভিন্ন অংশ দ্বারা (অন্যদের মধ্যে) সঞ্চারিত হয় না। সুতরাং মুসলিমদের ইজমা' তথা সর্বসম্মত মতানুযায়ী মসজিদের স্তম্ভ ও দেওয়াল মাসেহ করা যাবে না। অথচ মসজিদসমূহ বরকতময়। ফলে জানা গেল যে, মসজিদসমূহের বরকতের অর্থ হলো ইবাদাতকারী এতে যে কল্যাণ অর্জন করে তার মধ্যে বৃদ্ধি ঘটা। কেননা মসজিদুল হারামে একটি সালাত আদায় অন্যত্র এক লক্ষ সালাত আদায়ের সমতুল্য এবং মসজিদে নববীতে একটি সালাত আদায় অন্যত্র এক হাজার সালাত আদায়ের সমতুল্য।

আর এটা রাসূলগণের বরকতেরই অনুরূপ। কেননা রাসূলগণের বরকতের একপ্রকার হচ্ছে অনুসরণ ও আমলের বরকত। তাদের সুন্নাতের যারা অনুসারী এবং হিদায়াত দ্বারা যারা সুপথ-প্রাপ্ত, সাওয়াবের ক্ষেত্রে তাদের প্রাচুর্য ও প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয় (রাসূলগণের আদর্শ) অনুসরণের কারণে। এটাই উক্ত দু'প্রকারের সাথে খাস বরকতের অর্থ।

ব্যাপক বরকত এ থেকে ভিন্নতর। সে বরকত কখনো অর্জিত হয়, কখনো হয় না, কিংবা কোনো এক প্রকারে নিহিত থাকে, অন্য প্রকারে থাকে না। এটা সুস্পষ্ট যে, আকাশ থেকে যা কিছুই অবতীর্ণ হয় এবং যমীন থেকে যা কিছুই উৎপন্ন হয় সবসময় তা বরকতময় হয় না। বরং আল্লাহর পক্ষ হতে বরকতের ব্যাপারটি অন্য কিছু বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত। এসব বিষয় পাওয়া গেলে আল্লাহ বরকত দেন এবং পাওয়া না গেলে বরকত চলে যায়। সুতরাং স্থান ও পাত্রের দিক দিয়ে তা ব্যাপকার্থক বরকত। আর কালের দিক দিয়ে তা খাস বরকত, যা কোনো বস্তুর জন্য অপরিহার্য নয়।

বিষয়টি সাব্যস্ত হওয়ার পর জানা দরকার যে, কুরআন ও সুন্নাহের যে সব স্থানে বরকত কথাটি এসেছে তা দু'প্রকার:
প্রথমত: ব্যক্তি সত্তার বরকত। এ বরকতের আছর বা প্রভাব হলো, উক্ত ব্যক্তির সাথে যত কিছুরই সংযোগ রয়েছে তা বরকতময় হবে। এ প্রকার বরকত নবী ও রাসূলগণের জন্য হয়ে থাকে। এতে অন্য কেউ তাদের অংশীদার হয় না। এমন কি এতে আবু বকর, উমার, উসমান ও আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুম-এর ন্যায় বড় বড় সাহাবীগণও নবীগণের অংশীদার নন।
নবীগণের বরকতের আছর বা প্রভাব শুধু ঐ ব্যক্তিদের প্রতিই সঞ্চারিত হবে যারা নবী যে আদর্শের দাওয়াত দিয়েছেন তার ওপর চলেছেন, তার আমলের অনুসরণ করেছেন, তার নির্দেশ মান্য করেছেন এবং তার নিষেধ করা বস্তু থেকে বিরত থেকেছেন। এজন্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ যখন অহুদ যুদ্ধে তার নির্দেশ অমান্য করল এবং তার নাফরমানী করল, তখন তার বরকত তাদের দিকে সঞ্চারিত হয় নি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর এ প্রকার বরকত সঞ্চারিত হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। অবশ্য তার দেহের কোনো অংশ যদি তার মৃত্যুর পর কারো কাছে নিশ্চিতভাবে বর্তমান থাকে, তবে সেটার কথা আলাদা। আর সাহাবীদের যুগ অতিবাহিত হয়ে যাবার পর সে নিশ্চয়তাও রহিত হয়ে গেছে।

দ্বিতীয়ত: আমল ও অনুসরণ করার বরকত। এটি ঐ সকল ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যাদের আমল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত অনুযায়ী হয়। প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তি আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ যতটুকু অনুসরণ করে ও মেনে নেয়, আদেশ ও নিষেধ মান্য করার মাধ্যমে সে ততটুকু আমলের বরকত লাভ করতে পারে। এজন্য ইমাম বুখারী তার সহীহ বুখারী গ্রন্থে [৯/৫৬৯] খেজুর গাছ সম্পর্কে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন যাতে এসেছে- “নিশ্চয় এমন কিছু বৃক্ষ রয়েছে যার বরকত মুসলিম ব্যক্তির বরকতেরই অনুরূপ”। অতএব, প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির জন্য তার মর্যাদা অনুযায়ী বরকত রয়েছে।

আর এ বরকত ব্যক্তিসত্তার বরকত নয়। এটা নিশ্চিতভাবে জানা কথা এবং কেউ তা দাবীও করে নি। বরং এটা শুধু আমলেরই বরকত। আল্লাহর সৎ, অনুসারী বান্দাদের মধ্যে ততটুকু পরিমাণ আমল ও অনুসরণের বরকত রয়েছে, ঐ বরকতের যতটুকু চাহিদা মোতাবেক কাজ তাদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং সুন্নাহ বিষয়ক আলেমের রয়েছে ইলমের বরকত এবং যিনি আল্লাহর কিতাবের হাফেজ ও এর সীমারেখা মেনে চলেন, তার মধ্যে উক্ত আমলের ফলাফল স্বরূপ বরকত থাকবে। আর তদনুরূপ সকল ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য।

সৎকর্মশীলগণের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের বরকত ঐ ব্যক্তিরই হবে যিনি দীন ইসলামের সবচেয়ে বেশি অনুসরণ করেন, এর ওয়াজিবসমূহের সর্বাধিক সংরক্ষণ করেন এবং হারাম-বস্তুসমূহ থেকে সবচেয়ে বেশি দূরে থাকেন। হারাম কাজসমূহের অনেকগুলো অন্তর দ্বারা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। বহু লোক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দ্বারা যে হারাম কাজ হয়ে থাকে তা হতে দূরে থাকে, অথচ অন্তরের দ্বারা হারাম কাজ করে বেড়ায়, এ ব্যাপারে কোনো পরোয়া করে না।

এভাবে কুরআন-সুন্নাহের দলীলসমূহের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান হয়। অতএব, নবীগণের মধ্যে যে বরকত রয়েছে তা ঐ বরকতের অন্তর্গত যাতে বরকতের উভয় প্রকার বিদ্যমান। আর তারা ছাড়া অন্যান্যদের যে বরকত দেওয়া হয়েছে তা হলো আমল, ইলম ও অনুসরণের বরকত। ফলে এ বরকতের আছর ও ফলাফল আপনি আমল ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা সঞ্চারিত হতে দেখবেন না, স্বয়ং কোনো ব্যক্তি দ্বারাও নয়, আর তার অংশ বিশেষ দ্বারাও নয়।

এজন্যই তায়াম্মুম শরী'আতসম্মত হওয়ার কারণ বর্ণনায় উসাইদ ইবন হুদাইর বলেন, “হে আবু বকরের পরিবারবর্গ! আপনাদের মধ্যেই আল্লাহ মানুষের জন্য বরকত ঢেলে দিয়েছেন"। এটি ইমাম বুখারী তার সহীহ গ্রন্থের তাফসীর অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন। কথাটি যে শব্দে ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিমের কাছে বর্ণিত হয়েছে তা হলো, “হে আবু বকরের পরিবারবর্গ! এটাই আপনাদের প্রথম বরকত নয়”। কথা দু'টোর অর্থ একই। আর এটা জানা কথা যে, উসাইদ কিংবা অন্য কেউ আবু বকর কিংবা তার পরিজনের কাছে ব্যক্তি সত্তার বরকত অনুসন্ধান করেন নি, যেমন, তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চুল ইত্যাদি দ্বারা বরকত অর্জনের ক্ষেত্রে করতেন। নিশ্চয় এ ছিল আমল তথা ঈমান, সত্যতা প্রতিপন্নকরণ, (দীনের) সহায়তা ও অনুসরণেরই বরকত।

যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুওয়ায়রিয়া বিনতে আল হারেসকে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করেন, তখন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা যে বরকতের কথা উল্লেখ করেছিলেন তা এ প্রকার বরকতেরই অন্তর্ভুক্ত। তিনি বলেছিলেন, "স্বীয় জাতির কাছে তার চেয়ে বেশি বরকতময় কোনো মহিলা আমি দেখি নি"। হাদীসটি উত্তম সনদে ইমাম আহমাদ মুসনাদ গ্রন্থে ও ইমাম আবু দাউদ সুনান গ্রন্থে বর্ণনা করেন। এ হচ্ছে আমলের বরকত, কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুওয়ায়রিয়াকে বিবাহ করেছেন। ফলে তা ছিল তার জাতির বহু লোকের দাসত্ব থেকে আযাদীর ও মুক্তির কারণ।

📘 ইসলামী নীতিমালার আলোকে বরকত অর্জন 📄 নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে বরকত অর্জন

📄 নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে বরকত অর্জন


নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যক্তিসত্তার দিক দিয়ে বরকতময় ছিলেন, গুণাবলীর দিক দিয়ে বরকতময় ছিলেন, কাজকর্মেও বরকতময় ছিলেন। তাঁর ব্যক্তিসত্তায়, গুণাবলীতে ও কাজকর্মে এ বরকত নিশ্চিতরূপে বিরাজমান ছিল।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কতিপয় সাহাবী থেকে এ বিষয়টি সাব্যস্ত হয়েছে যে, তারা তাঁর শরীর হতে বিচ্ছিন্ন বস্তু যেমন, চুল, অযুর পানি, ঘাম ইত্যাদি দ্বারা বরকত অর্জন করতেন। এ বিষয়ে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে এবং হাদীসের অন্যান্য গ্রন্থে অনেক বিশুদ্ধ হাদীস এসেছে।

আল্লাহ স্বীয় রাসূলগণকে যত প্রকার বরকত দান করেছেন তম্মধ্যে সর্বোচ্চ বরকত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য নির্ধারিত। তাঁর শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের বরকত অন্যদের মাঝে সঞ্চারিত হতে পারে এবং তদ্বারা বরকত অর্জন করা জায়েয, যেমন, একদল সাহাবী করেছিলেন।

আর যে সব স্থানের সাথে তার সংশ্লিষ্টতা ছিল, যেমন, যে স্থানে তিনি চলাফেরা করেছেন কিংবা যেখানে তিনি সালাত আদায় করেছেন অথবা যে ভূমিতে তিনি অবতরণ করেছেন, শরী'আতে এমন কোনো দলীল পাওয়া যায় নি যাতে এমন ইশারা ও ইঙ্গিত রয়েছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীরের বরকত উক্ত স্থানে সঞ্চারিত হয়ে তা বরকতময় হয়েছে এবং তদ্বারা বরকত অর্জন বৈধ। এজন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় ও তার মৃত্যুর পর তার সাহাবীগণ এ কাজ কখনো করেন নি।

অতএব, যে পথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চলাফেরা করেছেন অথবা যেখানে তিনি অবতরণ করেছেন তা দ্বারা বরকত অর্জন জায়েয হবে না। কেননা এ কাজ ঐ স্থানসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কারণ হয়ে দাঁড়াবে, যে স্থানসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বৈধতা শরী'আত আমাদের জন্য প্রণয়ন করে নি। অধিকন্তু তা শির্কে লিপ্ত হওয়ার একটি মাধ্যমেও পরিণত হবে। আর যে জাতিই তাদের নবীদের স্মৃতিবিজড়িত চিহ্নসমূহের অনুসরণে লিপ্ত ছিল তারাই বিভ্রান্ত ও ধ্বংস হয়ে গেছে।

মা'রুর ইবন সুয়াইদ আল-আসাদী বলেন: আমীরুল মমিনীন উমার ইবনুল খাত্তাবের সাথে মক্কা থেকে আমরা মদীনার দিকে রওয়ানা হলাম। অতঃপর ভোর হলে তিনি আমাদেরকে নিয়ে সালাত আদায় করলেন। এরপর তিনি দেখলেন, লোকজন একটি স্থানে গমন করছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: এরা কোথায় যাচ্ছে? তাকে বলা হলো: হে আমীরুল মুমিনীন! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি মসজিদে সালাত আদায় করেছিলেন। তারা সে মসজিদে এসে সালাত পড়ে। তিনি বললেন: “তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা এ ধরনের কাজের ফলে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। তারা তাদের নবীদের স্মৃতিবিজড়িত চিহ্নসমূহের অনুসরণে লিপ্ত ছিল এবং এগুলোকে তারা উপাসনালয় ও ইবাদাতের স্থানে পরিণত করেছিল। এ সকল মসজিদে কেউ নামাযের সময় উপস্থিত হলে যেন সালাত আদায় করে নেয়। অন্যথায় সে যেন উক্ত স্থানসমূহে গমনের ইচ্ছা না করে চলে যায়”। সাঈদ ইবন মানসূর তার সুনান গ্রন্থে, ইবনু আবি শায়বা মুসান্নাফ গ্রন্থে (২/৩৭৬) এবং আন্দালুস (তথা প্রাচীন স্পেন) এর মুহাদ্দিস মুহাম্মাদ ইবন ওয়াদ্দ্যাহ আল-কুরতবী 'বিদ'আতসমূহ ও তা হতে নিষেধকরণ' নামক গ্রন্থে (পৃ. ৪১) ঘটনাটি বিশুদ্ধ সনদে বর্ণনা করেন।

এ হচ্ছে সেই খলীফায়ে রাশেদের উক্তি যার সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “নিশ্চয় আল্লাহ উমারের হৃদয়ে ও জিহ্বায় (তথা বাকযন্ত্রে) হক প্রতিভাত করেছেন"। ইমাম আহমাদ (২/৯৫) বিশুদ্ধ সনদে ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেন। তিনি ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে অন্য সনদেও (২/৫৩) হাদীসটি বর্ণনা করেন। আবু যর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে ইমাম আহমাদ (৫/১৪৫), আবু দাউদ (২৯৬২ নং হাদীস) এবং আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে ইমাম আহমাদ (২/৪০১) হাদীসটি বর্ণনা করেন। এছাড়াও আরও অনেকে এ হাদীসটি এ সকল সাহাবী ও অন্যান্য সাহাবীদের থেকেও বর্ণনা করেন।

সন্দেহ নেই, স্মৃতিবিজড়িত চিহ্নসমূহ অনুসরণের ব্যাপারে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুর উপরোক্ত বাণী সে হকেরই অন্তর্গত যা আল্লাহ তার জিহ্বায় প্রতিভাত করেছেন। আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন।

ইবন ওয়াদ্দ্যাহ রাহেমাহুল্লাহ বলেন (পৃ. ৪৩), “মালিক ইবন আনাস ও মদীনার অন্যান্য আলিমগণ ক্বোবা ও ওহুদ ছাড়া এ সকল মসজিদসমূহে এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্মৃতিবিজড়িত এ চিহ্নসমূহে আগমন করা অপছন্দ করতেন"।

ইবন ওয়াদ্দ্যাহ বলেন: "আয়িম্মায়ে হুদা তথা হিদায়াতের ইমামরূপে যারা পরিচিত, তোমাদের ওপর ওয়াজিব তাদের অনুসরণ করা। পূর্ববর্তীদের কেউ কেউ বলেন, এমন অনেক ব্যাপার রয়েছে যা আজ বহু লোকের কাছে সৎকর্ম-রূপে প্রতীয়মান, পূর্ববর্তীদের কাছে তা ছিল অন্যায়, প্রিয় হবার জন্য করা হচ্ছে অথচ তা তার ওপর ঘৃণার উদ্রেককারী, নৈকট্য লাভের জন্য করা হচ্ছে অথচ তা তাকে দূরে নিক্ষেপ করে। আর প্রত্যেক বেদআতের ওপরই লেপটে আছে সৌন্দর্য ও আনন্দ"। লক্ষ্য করুন ইবন ওয়াদ্দ্যাহের এ সুদৃঢ় উক্তির প্রতি। তার মৃত্যু হয়েছিলো হিজরী ২৮৬ সালে।

এ কথার উদ্দেশ্য হলো সালাফ তথা পূর্ববর্তী ইমামগণ স্মৃতিবিজড়িত প্রাচীন স্থানসমূহ দ্বারা বরকত অর্জনকে অস্বীকার করতেন। তারা এগুলো নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করা এবং বরকত লাভের আশায় এগুলোর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা সমর্থন করতেন না।

ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা ছাড়া আর কেউ এ ব্যাপারে খেলাফ করেন নাই। তিনি সে সকল স্থানসমূহের অনুসন্ধানে ব্যাপৃত ছিলেন যেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাত পড়েছেন। অতঃপর তিনি সে সকল স্থানে সালাত পড়েন যেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাত আদায় করেছিলেন। অনুরূপ অন্যান্য ক্ষেত্রেও তিনি এ রকম আমল করেছিলেন। ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা ছাড়া অন্য কোনো সাহাবী থেকে এটা বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত হয়নি যে, তাদের কেউ স্মৃতি বিজড়িত স্থানসমূহে ইবন উমারের মতই আমল করেছেন।

আর ইবন উমার স্থানের বরকত তালাশ করেন নি। তিনি চেয়েছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বাবস্থায় যত আমল করেছেন, প্রত্যেকটি আমলের পরিপূর্ণ অনুসরণ করতে। এমন কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সকল স্থানে সালাত পড়েছেন, তিনি তার সব কয়টি স্থানে সালাত পড়তে চেয়েছেন। তিনি সে সবের সন্ধান করতেন এবং জানতেন। প্রতীয়মান হয় যে, স্থানের মাধ্যমে বরকত লাভের উদ্দেশ্যে তার এ আমল ছিল না, যে রকম পরবর্তীরা মনে করেছেন, বরং পূর্ণ অনুসরণই উদ্দেশ্য ছিল। তিনি ভিন্ন মুহাম্মাদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আর কোনো সাহাবী সে আমল করেন নি এবং তাতে সায়ও দেন নি, বরং তার পিতা স্মৃতি বিজড়িত সে সব স্থান অনুসন্ধান করতে লোকদেরকে নিষেধ করেছেন।

মতভেদের সময় তার কথা তার ছেলের মতের ওপর সর্বসম্মতিক্রমে প্রাধান্য পাবে। আর সাহাবীগণ কর্তৃক ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমার আমল ত্যাগ করার ওপর তাদের মতৈক্যের মোকাবেলায় এ মতভেদ ধোপে টিকে না। সন্দেহ নেই, এ ব্যাপারে হক ও সঠিক কথা ছিল উমার ও অন্য সকল সাহাবীদের। আর এটাই হচ্ছে অনুসরণের উপযোগী এবং মতভেদের সময় সর্বশেষ সিদ্ধান্ত। আল্লাহই অধিক পরিজ্ঞাত।

📘 ইসলামী নীতিমালার আলোকে বরকত অর্জন 📄 সৎ ব্যক্তিবর্গের ব্যক্তিসত্তার দ্বারা বরকত অর্জন

📄 সৎ ব্যক্তিবর্গের ব্যক্তিসত্তার দ্বারা বরকত অর্জন


ইতোপূর্বে বলা হয়েছে যে, ব্যক্তিসত্তার বরকত শুধু ঐ ব্যক্তির জন্যই প্রযোজ্য হতে পারে যাকে এ বরকত দেওয়ার কথা আল্লাহ উল্লেখ করেছেন। যেমন, নবী ও রাসূলগণ।

কিন্তু তারা ব্যতীত আল্লাহর অন্যান্য সৎ বান্দাগণের বরকত হচ্ছে আমলের বরকত। অর্থাৎ এ বরকত তাদের ইলম, আমল ও অনুসরণ থেকে উদ্ভূত, তাদের ব্যক্তিসত্তা থেকে নয়। সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের বরকতের মধ্যে রয়েছে মানুষকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করা, তাদের জন্য দোয়া করা এবং সৎ নিয়তে সৃষ্টির প্রতি ইহসান করার মাধ্যমে উপকার পৌঁছানো প্রভৃতি।

তাদের আমলের বরকতের মধ্যে রয়েছে ঐ সব কল্যাণ যা আল্লাহ তাদের কারণে দান করেছেন এবং তাদের সংস্কার কাজের বরকতে যে শাস্তি ও ব্যাপক আযাব আল্লাহ প্রতিরোধ করেছেন। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿وَمَا كَانَ রব্বুকা লিইউহলিকাল কুরা বিযুলমিন ওয়া আহলুহা মুসলিহুন ﴾ [হূদ: ১১৭] “আর আপনার প্রভু এমন নয় যে, তিনি অন্যায়ভাবে জনপদ ধ্বংস করবেন অথচ তার অধিবাসীরা সংশোধনকারী”। [সূরা হূদ, আয়াত: ১১৭]

আর এমন বিশ্বাস করা যে, তাদের ব্যক্তিসত্তা বরকতময় হওয়ার কারণে বরকতের উদ্দেশ্যে সর্বদা তাদেরকে স্পর্শ করা, তাদের উচ্ছিষ্ট পান করা ও তাদের হাতে চুমু খাওয়া এবং তদনুরূপ আমল করা যেতে পারে- মূলতঃ এ ধরণের বিশ্বাস নবীগণ ছাড়া অন্যদের ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ। তার কারণ হলো:

প্রথমত: কোনো ব্যক্তিই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে পৌঁছতে পারেন নি। অতএব, বরকতে ও মর্যাদায় কিভাবে তিনি তাঁর সমকক্ষ হবেন?

দ্বিতীয়ত: এমন কোনো শর'ঈ দলীল পাওয়া যায় নি যদ্বারা প্রমাণিত হয় যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া অন্যরাও শারীরিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দ্বারা বরকত অর্জনের ক্ষেত্রে তাঁর সমকক্ষ। অতএব, এ বিষয়টি তাঁর অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের মতোই তাঁর সাথেই সুনির্দিষ্ট।

তৃতীয়ত: অলী হওয়ার দিক দিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর অন্যদেরকে কিয়াস করার আলোচনায় ইমাম শাতেবী রাহেমাহুল্লাহ তার আলই'তেসাম গ্রন্থে (খ. ২, পৃ. ৬-৭) বলেন, "এ (কিয়াসের) ক্ষেত্রে একটি নিশ্চিত (ভাষ্যের দিক থেকে) শক্তিশালী দলীল আমাদের বিরোধিতা করছে, যা উক্ত কিয়াস বাস্তবায়নের অন্তরায়। আর তা হলো, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর তাঁর কোনো খলীফার ব্যাপারে কোনো সাহাবীর পক্ষ থেকেই এমন কিছু ঘটেনি। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মাতের মধ্যে তাঁর পর আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর চাইতে উত্তম কাউকে রেখে যান নি। অতএব, তিনিই ছিলেন তাঁর খলীফা। অথচ তার দ্বারা (বরকত লাভের) ঐ সব কিছুই করা হয় নি। আর উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু দ্বারাও করা হয়নি, অথচ তিনি ছিলেন আবু বকরের পর উম্মাতের সর্বোত্তম ব্যক্তি। অনুরূপভাবে উসমান, আলী ও সকল সাহাবীদের কারো দ্বারাই বরকত লাভের কোনো ঘটনা সংঘটিত হয় নি, উম্মাতের মধ্যে যাদের চেয়ে উত্তম কেউ নেই। তদুপরি জানা বিশুদ্ধ পন্থায় তাদের কারো ক্ষেত্রেই এটা সাব্যস্ত হয়নি যে, বরকত অর্জনে প্রত্যাশী কোনো ব্যক্তি উপরোক্ত কিংবা অনুরূপ কোনো পন্থায় তাদের কারো দ্বারা বরকত লাভের প্রয়াস পেয়েছেন'। বরং তারা এ সকল সাহাবীদের ক্ষেত্রে সে সব আমল, কথা ও সীরাতের অনুসরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছেন যেগুলোতে তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরই অনুসরণ করেছিলেন। মূলতঃ এ ছিল উক্ত জিনিসসমূহ পরিহারের ব্যাপারে তাদের ইজমা' তথা সর্বসম্মত মত"।

অনুরূপভাবে হাসান ও হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুমা এবং ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহার ক্ষেত্রেও তারা উক্ত আমল করেন নি।

সুতরাং ব্যক্তিসত্তার বরকত বীর্য দ্বারা স্থানান্তরিত হয় না। চরমপন্থি শিয়া ও তাদের অনুসারী অন্যান্য মোকাল্লেদরাই এ ছাড়া ভিন্ন মত পোষণ করে থাকে।

চতুর্থত: 'সাদ্দুয যারায়ে' তথা হারামে লিপ্ত হওয়ার পথ রুদ্ধ করা শরী'আতের একটি বড় মূলনীতি। এ ব্যাপারে আল-কুরআনের বিভিন্ন স্থানে দলীল রয়েছে। আর সুন্নাহেও এ সম্পর্কে বহু বিশুদ্ধ দলীল রয়েছে, যা একশতের কাছাকাছি পৌঁছবে। সম্ভবত এ কারণেই সৎ ব্যক্তিবর্গের ব্যক্তিসত্তা দ্বারা বরকত লাভের ব্যাপারটি ধারাবাহিকতা পায় নি, বরং তা নবীদের সাথেই খাস ছিল।

পঞ্চমত: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া অন্য কারো দ্বারা এ ধরনের বরকত অর্জনের কাজটি সাধিত হলে তা ঐ ব্যক্তিকে ফেতনা থেকে মুক্ত থাকার কিংবা তদ্বারা আত্মপ্রসাদ লাভ থেকে মুক্ত থাকার কোনো নিরাপত্তা দেয় না। ফলে এ দ্বারা সে ব্যক্তি গৌরব, অহংকার, লোক দেখানো ও আত্মপ্রশংসায় ব্যাপৃত হয়ে যেতে পারে। এ সবই অন্তর দ্বারা কৃত হারাম কাজসমূহের অন্তর্ভুক্ত।

টিকাঃ
' এখানে তিনি শরীরের ঘাম, চুল ও অযুর পানি ইত্যাদি দ্বারা বরকত অর্জন বুঝিয়েছেন।

📘 ইসলামী নীতিমালার আলোকে বরকত অর্জন 📄 পরিচ্ছেদ

📄 পরিচ্ছেদ


‘আল-মাফাহীম’ নামক গ্রন্থের লেখক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যক্তিসত্তা কিংবা কোনো অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দ্বারা বরকত অর্জনের ব্যাপারে হাদীস ও আছার বর্ণনা করার পর ১৫৬ পৃষ্ঠায় বলেন, “এ আছার ও হাদীসগুলোর মোদ্দাকথা হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে, তার চিহ্নসমূহের মাধ্যমে ও তার সাথে সম্পর্কিত সকল কিছুর মাধ্যমে বরকত অর্জন সুন্নাতে মারফুআ' এবং শরী'আতসম্মত প্রশংসিত পন্থা”।

আমি বলি, এ কথার মধ্যে অস্পষ্টতা রয়েছে। নিরীক্ষণ না করা এবং হাদীসের উক্তিসমূহ নিয়ে চিন্তা গবেষণা না করাই এর কারণ। কেননা 'আল মাফাহীম' গ্রন্থকার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যক্তিসত্তা কিংবা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন অংশ দ্বারা বরকত অর্জন এবং যে সকল স্থানে তিনি সালাত পড়েছেন কিংবা বসেছেন সে সব স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহ দ্বারা বরকত অর্জনের মধ্যে কোনো পার্থক্য নিরূপণ করেন নি।

বরকত অর্জনের প্রথম বিষয়টি (যেমন, ইতোপূর্বে বর্ণিত হয়েছে) নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপস্থিতিতেই করা হয়েছে এবং তিনি তা অনুমোদনও করেছেন। অতএব, তা সুন্নাত ও শরী'আতসম্মত।

কিন্তু দ্বিতীয় বিষয়টি তথা স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহ দ্বারা বরকত অর্জন শরী'আতসম্মত নয়। এজন্যই 'আল মাফাহীম' গ্রন্থকার এমন কোনো দলীল নিয়ে আসতে পারেননি যদ্বারা “মারফু' সুন্নাত” বলে তিনি যে দাবী তুলেছেন তার সত্যতা প্রতিপন্ন হয়। এ বক্তব্য মূলতঃ পৃথক বস্তুসমূহের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ না করা এবং মুহাক্কিক উলামাদের পথ পরিত্যাগ করারই শামিল।

স্মৃতি বিজড়িত স্থানসমূহ দ্বারা বরকত অর্জন যে শরী'আতসম্মত নয়, বরং তা নব-আবিস্কৃত আমল, সে ব্যাপারে প্রমাণ বহনকারী বিষয়ের মধ্যে রয়েছে:

প্রথমত: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে বরকত অর্জনের এ প্রকারটি ছিল না। এ বিষয়ে বিশুদ্ধ, উত্তম ও দুর্বল কোনো সনদেই সঠিকভাবে কোনো কিছুই বর্ণিত হয়নি। কেননা এমন কোনো বর্ণনা নেই যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে তাঁর চিহ্ন সম্বলিত কোনো স্থানের মাধ্যমে কেউ বরকত অর্জন করেছেন।

অতএব, এ ধরনের বর্ণনার কার্যকারণ যথেষ্ট পরিমাণে থাকা সত্ত্বেও এবং এর চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বর্ণনার হিম্মত থাকা সত্ত্বেও যখন তা বর্ণিত হয়নি, জানা গেল যে, তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যমানায় ছিল না। আর এমন ধরনের বিষয়ে নতুন কিছু সৃষ্টি করা বিদ'আত। প্রত্যেক বিদ'আতই ভ্রষ্টতা। বিদ'আত থেকে নিষেধ করা এবং তার বিরোধিতা করা ওয়াজিব।

খলিফায়ে রাশিদ উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু এ কাজ থেকে ও স্মৃতি চিহ্ন বিজড়িত স্থান তালাশ করা থেকে নিষেধ করার প্রতিই দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন, যা ইতোপূর্বে মা'রূর ইবন সুয়াইদ আল আসাদীর বর্ণনায় এসেছে।

দ্বিতীয়ত: নবী ও রাসূলগণের ব্যক্তিসত্তার বরকত ভূ-স্থানের প্রতি সঞ্চারিত হয় না। অন্যথায় এ বিষয়টি অবধারিত হয়ে যাবে যে, তারা যে সকল স্থান মাড়িয়েছেন কিংবা যে স্থানে বসেছেন অথবা যে স্থান দিয়ে তারা অতিক্রম করেছেন, সে সব স্থানের বরকত অনুসন্ধান করে তা দ্বারা বরকত অর্জন করা যাবে। আর সন্দেহাতীতভাবে যেহেতু এ ব্যাপারটি বাতিল, অতএব, এ দ্বারা যা অবধারিত হলো তাও বাতিল বলে গণ্য।

তৃতীয়ত: স্থানের মাধ্যমে বরকত অর্জনের অন্বেষা আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্বেকার সকল নবীদের সুন্নাতের খেলাফ। কেননা তারা তাদের পূর্ববর্তী নবীদের চিহ্ন সম্বলিত স্থান অনুসন্ধান করেন নি এবং তা করতে নির্দেশও দেননি। এর বিপরীত যা কিছুই হয়েছে, তা পরবর্তী লোকেরাই (যারা এমন কাজ করতো যার নির্দেশ তাদেরকে দেওয়া হয় নি) তাদের নবীদের পর উদ্ভাবন করেছে, যখন শর'ঈ বিধান মেনে চলা তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছিল। ফলে তারা চিহ্ন সম্বলিত স্থান দ্বারা বিদ'আতী পন্থায় বরকত অর্জনের মাধ্যমে পাপের ক্ষমাপ্রাপ্তি ও অধিক হারে পুণ্য অর্জনের প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়ে। এজন্যই উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা এরকম কাজের ফলেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। তারা তাদের নবীগণের স্মৃতি বিজড়িত চিহ্নসমূহের অনুসরণ করত”। ইতোপূর্বে এ হাদীসটি কোথায় কোথায় সংকলিত হয়েছে তা বর্ণনা করা হয়েছে।

চতুর্থত: কোনো স্থানে সার্বক্ষণিক ইবাদাতে মশগুল থাকার মাধ্যমেই শুধু সে স্থান বরকতময় হতে পারে। আর ইবাদাতে মশগুল থাকাটাই মূলতঃ সে স্থানে আল্লাহর বরকত দেওয়ার কারণ। এজন্যই মসজিদসমূহ বরকতময়। ইবাদাত না হলে এ স্থানসমূহের বরকত আর থাকে না।

এর একটি উদাহরণ হলো: যে সমস্ত মসজিদ কুফুরী শক্তির কুক্ষিগত হয়েছে এবং তারা সেগুলোকে গির্জায় রূপান্তরিত করেছে, সেগুলো থেকে মসজিদের ঐ বরকত চলে গিয়েছে, ইবাদাত কর্ম সম্পাদনকালে যে বরকত সেগুলোতে বিদ্যমান ছিল। কিন্তু সেখানে শির্কী কার্য সম্পাদন হওয়ার পর এবং ইসলামী শরী'আত ছাড়া অন্য নিয়মে তাতে ইবাদাত হওয়ার পর এখানকার বরকত চলে যায়। এ ব্যাপারে কোনো বিতর্ক ও বিবাদে লিপ্ত হওয়ার কোনো অবকাশই নেই।

পঞ্চমত: স্মৃতি বিজড়িত স্থান দ্বারা বরকত অর্জনের বিষয়টি সে স্থানকে পবিত্র বলে সাব্যস্তকরণ ও সে সমস্ত স্থানে (বিশেষ বিশেষ উদ্দেশ্য হাসিলের মতো) বিশ্বাস করার ন্যায় আরও বড় ভয়াবহ ভ্রান্তিতে লিপ্ত হওয়ার মাধ্যম। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কেননা ঐতিহাসিকগণ ইসমাইল আলাইহিস্ সালামের সন্তানদের সম্পর্কে বলেন: “মক্কা তাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে গেল। আর তাদের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ ঘটল এবং শত্রুতা সৃষ্টি হলো। তারা একে অন্যকে বের করে দিল। অতঃপর তারা বিভিন্ন দেশে জীবিকার সন্ধানে ছড়িয়ে পড়ল। আর যা তাদেরকে প্রতিমা ও পাথর পূজার দিকে ঠেলে দিয়েছিল তা হলো, হারামের প্রতি সম্মান প্রদর্শননার্থে এবং মক্কার প্রতি ভালবাসা পোষণের কারণে। প্রত্যেক মুসাফিরই তার সাথে হারামের কোনো একটি পাথর না নিয়ে মক্কা থেকে সফর করত না"।²

আর যার বৈশিষ্ট্য এমন- তা নিষিদ্ধ হওয়ার অধিক উপযোগী। কেননা শরী'আতসম্মত নয় এমন বিষয়ের দিকে যে মাধ্যম ধাবিত করে, সে মাধ্যমটিও শরী'আত-অসমর্থিত, যেন উক্ত কাজের দ্বার রুদ্ধ হয় এবং মাধ্যমটির মূলোচ্ছেদ ঘটে।

আরবী কবি বলেন:
"নিশ্চয় সালমা ও তার প্রতিবেশিনী থেকে সালামাত তথা নিরাপত্তা লাভের উপায় হলো, সে যেন তার উপত্যকায় আগমনকারী কোনো ব্যক্তির কাছে গমন না করে"।

ষষ্ঠত: (রাসূলের সাথে সম্পৃক্ত) বরকতের যে দু' প্রকার আজ আমাদের কাছে অবশিষ্ট রয়েছে, তার মাধ্যমেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, তার থেকে বরকত লাভের প্রত্যাশা ও তা যাচাই- বাছাইয়ের কাজ সাধিত হতে পারে। আর সে বরকত হলো তাকে অনুসরণের (মাধ্যমে অর্জিত) বরকত, তার সুন্নাত অনুযায়ী আমলের বরকত, তার সুন্নাতের যারা শত্রু ও শরী'আতের নির্দেশের যারা বিরোধিতাকারী এবং যে সব মুনাফিক মানুষকে ফেতনায় লিপ্ত করে ও বিভ্রান্ত করে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদের (মাধ্যমে অর্জিত) বরকত।

এর প্রতিই তাবেয়ীন ও সঠিক পথের দিশা-দানকারী ইমামগণ প্রমুখ সালাফে সালেহীন উৎসাহ প্রদান করেছেন যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সত্যিকারভাবে মহব্বত করেছেন। অতঃপর তাকে অনুসরণের ততটুকু বরকত তাদের অর্জিত হয়েছে যতটুকু আল্লাহ মঞ্জুর করেছেন। এতদ্ব্যতীত স্মৃতিচিহ্ন বিজড়িত স্থান দ্বারা বরকত অর্জন তারা পরিত্যাগ করেছেন। অতএব, বুঝা গেল যে, যে কাজটি তারা পরিত্যাগ করেছিলেন সেটি তাদের মাঝে পরিচিত ছিল না, আর শরী'আতসম্মতও ছিল না।

হিদায়াত ও আল্লাহর পক্ষ থেকে তাওফীক প্রত্যাশীর জন্য এ বিষয়গুলোর মধ্যে পর্যাপ্ত উপাদান রয়েছে। আর সঠিক কথা ও কাজে আগ্রহী ব্যক্তির জন্য রয়েছে যথেষ্ট উপকরণ। নিশ্চয় হক তথা সত্য-ই অনুসৃত হওয়ার সর্বাধিক উপযোগী। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি সৎকর্মসমূহের তাওফীকদাতা।

'আলমাফাহীম' গ্রন্থকার ১৫৬ পৃষ্ঠায় বলেন: “কুরআন-হাদীসের যে সকল দলীল আমরা বর্ণনা করেছি তা দ্বারা ঐ ব্যক্তির অসত্যতা স্পষ্ট হয়ে উঠে, যে ধারণা করে- ইবন উমার ছাড়া আর কোনো সাহাবী এ কাজের প্রতি গুরুত্ব দেন নি এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আর কোনো সাহাবী ইবন উমারের সমর্থনে অনুরূপ আমল করেন নি। এটা হলো মূর্খতা কিংবা মিথ্যাবাদিতা অথবা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ধুম্রজাল সৃষ্টি করা। কেননা ইবন উমার ছাড়াও আরও অনেকে এ আমল করেছেন এবং তৎপ্রতি গুরুত্বও আরোপ করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন: খোলাফায়ে রাশেদীন রাদিয়াল্লাহু আনহুম, উম্মে সালামাহ, খালেদ ইবন ওয়ালীদ, ওয়াসিলা ইবন আলআসকা, সালামা ইবন আকওয়া, আনাস ইবন মালেক, উম্মে সুলাইম, উসাইদ ইবন হুদাইর, সাওয়াদ ইবন গাযিয়া, সাওয়াদ ইবন আমর, আবদুল্লাহ ইবন সালাম, আবু মূসা, আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আযাদকৃত দাস সাফীনাহ, উম্মে সালামার খাদেম সাররা, মালেক ইবন সিনান, আসমা বিনতে আবু বকর, আবু মাহযুরা, মালেক ইবন আনাস এবং মদীনাবাসী তার অনেক মাশাইখ যেমন, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়েব, ইয়াহইয়া ইবন সায়ীদ”।

সাহাবী ও তাবেঈদের প্রতি সম্পর্কিত করে যে বিবরণ এখানে পেশ করা হলো সে ব্যাপারে আমার বক্তব্য দীর্ঘায়িত না করেই আমি বলবো, এখানে কয়েকটি বিষয় রয়েছে:

এক. ইবন উমার একাই স্মৃতিচিহ্ন সম্বলিত স্থানের মাধ্যমে বরকত অর্জনের ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেছেন বলে বক্তব্য পেশকারীর প্রতি 'আলমাফাহীম' গ্রন্থকার মিথ্যাচার, মূর্খতা ও ধুম্রজাল সৃষ্টির যে অপবাদ দিয়েছেন তা অতীব মন্দ ও নিন্দনীয়। কেননা হাদীস, ফিক্‌হ ও দীনের বড় বড় যে সকল ইমামগণ ইবন উমার এককভাবে উক্ত আমল করেছেন বলে বক্তব্য পেশ করেছেন, এটা ভাবা যায় না যে, তাদের কনিষ্ঠরা তাদেরকে এ ব্যাপারে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করেছে।

দুই. (আল-মাফাহীম গ্রন্থকারের) এ বক্তব্যই বরং অজ্ঞতা ও মূর্তার প্রতি সম্পর্কিত হওয়ার অধিক উপযোগী। কেননা ব্যক্তিসত্তার বরকত ও স্মৃতিচিহ্ন সম্বলিত স্থানের মধ্যে যে ব্যক্তি পার্থক্য নিরূপণ করে না, তার কথা প্রত্যাখ্যান করাই অধিক যুক্তিযুক্ত।

তিন. যারা এ সকল সাহাবীগণের নাম উল্লেখ করেছেন, তারা তাদের থেকে এটাই বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর তারা তার দেহের যে সব চিহ্ন বর্তমান ছিল তা দ্বারা এবং তার ঘাম, জুব্বা ও চাদর প্রভৃতি দ্বারা বরকত অর্জন করেছেন, যদি এ বর্ণনা শুদ্ধ হয়ে থাকে। অন্যথায় তাহকীক করলে দেখা যাবে, এ বিষয়ে সামান্য কিছু ছাড়া আর বিশুদ্ধ কিছুই পাওয়া যায় না।

সুতরাং যিনি (পূর্বোক্ত বিষয় দু'টির মধ্যে) পার্থক্য করেছেন, তাকে মিথ্যাবাদী বলা যাবে না, বরং এটাই বিশুদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি এবং শক্তিশালী কথা। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি জ্ঞানকে পরিমাপ করে দেখেনি এবং সবচেয়ে কম দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও কম জানা লোকের সমকক্ষ হয়েও তুষ্ট থেকেছে, জ্ঞানবানদের কাছে তার কথার কোনো মূল্যই নেই।

আল-মাফাহীম গ্রন্থকারের এ অন্ধ গোঁড়ামী দ্বারা সে সব লোক প্রতারিত হবে যারা তার প্রতি সুধারণা রাখে এবং তার ইলমের ওপর ভরসা রাখে। কিয়ামতের দিন তাদের হবে কঠিন অবস্থা। আল্লাহ তা'আলা বলেন: (ইয তাবাররাআল্লাযিনাত্তুবিউ মিনাল্লাযিনাত্তাবাউ) [আল-বাকারাহ: ১৬৬] "যখন অনুসৃতগণ অনুসারীদের দায়িত্ব অস্বীকার করবে”। [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৬৬]

'আল-মাফাহীম' গ্রন্থকার ইবন উমার ছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্য কোনো সাহাবী থেকে সহীহ কিংবা উত্তম সনদে এটা বর্ণনা করতে পারবেন না যে, তিনি স্মৃতি বিজড়িত স্থান দ্বারা বরকত অর্জন করেছেন।

চার. মদীনার ইমাম ও আলিম ইমাম মালেকের সাথে উক্ত বরকত অর্জনের যে সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে তা শুদ্ধ নয়। কেননা মালেক রাহিমাহুল্লাহ স্মৃতিচিহ্ন সম্বলিত স্থান অনুসন্ধান করতে নিষেধ করতেন। বরং তিনি মদীনার বড় বড় তাবেয়ীন থেকে তা বর্ণনা করেছেন। আর মালিকের সাথীদের গ্রন্থে এ বিষয়ে অনেক সুস্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে।

তন্মধ্যে স্পেনের মুহাদ্দিস ইবন ওয়াদ্দ্যাহ স্বীয় “বিদআত ও তা থেকে নিষেধকরণ” নামক গ্রন্থের ৪৩ পৃষ্ঠায় বলেন: “মালেক ইবন আনাস ও মদীনার অপরাপর আলিমগণ উক্ত মসজিদসমূহে আসা অপছন্দ করতেন। অথচ সে সবই ছিল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরই স্মৃতিচিহ্ন, একমাত্র কোবা ও উহুদ ছাড়া”।

সুতরাং ইমাম মালিকের মাযহাবের প্রতি যিনি সম্পর্কিত, কেন এ মাসায়েলগুলোতে তিনি মালেকী হতে পারলেন না, হতে পারলেন না সালাফী? যেমন, ছিলেন ইমাম মালেক (আল্লাহ তাকে প্রশস্ত রহমাত দিয়ে করুণা করুন)।

টিকাঃ
² দেখুন, আল-আসনাম পৃ. ৬। তবে আমি দলীল নেওয়ার জন্য এ উদ্ধৃতি পেশ করি নি, বরং তাদের অবস্থা সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তা বর্ণনার জন্য।
³ এখানে খুদাইর লিখা ছিল। আমি তা শুদ্ধ করে দিলাম।

ফন্ট সাইজ
15px
17px