📘 ইসলামী মু'আশারাত পরস্পরের প্রতি কর্তব্য ও অধিকার সুন্দর ও সুখী সমাজ > 📄 ইসলামী সামাজিকতার রূপরেখা

📄 ইসলামী সামাজিকতার রূপরেখা


হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে 'আমর রাযি. থেকে বর্ণিত, নবীয়ে করীম সরোয়ারে দো-আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ 'মুসলমান সেই, যার জিব ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদে থাকে।" وَالْمُهَاجِرُ مَنْ هَجَرَ مَا نَهَى اللَّهُ عَنْهُ 'এবং প্রকৃত মুহাজির সেই, যে আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক নিষিদ্ধ কাজসমূহ পরিত্যাগ করে।'
অর্থাৎ, সাধারণভাবে মুহাজির তো তাকে বলে, যে স্বদেশ ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যায়। কিন্তু নবীয়ে করীম সরোয়ারে দো-আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন যে, প্রকৃত অর্থে মুহাজির ঐ ব্যক্তি, যে আল্লাহ তা'আলার নিষিদ্ধকৃত জিনিসমূহ পরিত্যাগ করে। অর্থাৎ, গুনাহের কাজসমূহ ছেড়ে দেয়। আর প্রথম বাক্যে বলেছেন যে, মুসলমান সেই, যার জিব ও হাত থেকে অন্যান্য মুসলমান নিরাপদে থাকে। এটা এ জন্যে বলেছেন যে, 'মুসলিম' শব্দের ধাতুর মধ্যে নিরাপত্তার অর্থ রয়েছে। তাই সেদিকে ইঙ্গিত করে বলেন যে, তুমি যখন নিজেকে মুসলমান বলো, তখন তার দাবি হলো, তুমি অন্যের জন্যে শান্তি ও নিরাপত্তার বাহক হও, কষ্টের বাহক হয়ো না। এ জন্যেই প্রত্যেক মুসলমানকে অন্যের সাথে সাক্ষাৎকালে 'আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু' বলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যার অর্থ হলো, তোমাদের উপর আল্লাহ তা'আলা শান্তি, রহমত ও বরকতসমূহ বর্ষণ করুন।
হাদীসটি পরিসরে ছোট হলেও ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ের সারাংশ এ হাদীসে সন্নিবেশিত হয়েছে। সেই অধ্যায়টি হলো 'মুআশারাত' তথা ইসলামী সামাজিকতা। ইসলামের শিক্ষাসমূহ পাঁচ শাখায় বিভক্ত। এক. আকীদা-বিশ্বাস। দুই. ইবাদত-বন্দেগী। তিন. মুআমালাত তথা লেনদেন। চার, মুআশারাত তথা সামাজিকতা পাঁচ. আখলাক তথা আত্মিক চরিত্র। পুরো দ্বীন এবং দ্বীনের সমস্ত শিক্ষা এই পাঁচ শাখায় বিভক্ত। তাই এর প্রত্যেক শাখার উপরই আমল করা জরুরী। যতোক্ষণ পর্যন্ত কোনো মানুষ দ্বীনের এই পাঁচ শাখার উপরেই আমল না করবে, ততোক্ষণ পর্যন্ত সে পরিপূর্ণ মুসলমান হতে পারবে না। উপরোক্ত হাদীসটিতে দ্বীনের চতুর্থ শাখা অর্থাৎ ইসলামী সামাজিতা সংক্রান্ত সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক শিক্ষার বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এ হাদীস ইসলামী সামাজিকতা সংক্রান্ত দ্বীনের সমস্ত বিধান ও শিক্ষার ভিত্তি। এই হাদীসের মাধ্যমে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই পয়গাম দিয়েছেন যে, তোমার দ্বারা যেন কোনো মানুষ কোনো প্রকারের সামান্যতম কষ্টও না পায়। কেউ যদি তোমার দ্বারা শারীরিক বা মানসিক কোনো কষ্ট পায়, তাহলে তোমার কামেল মুমিন হওয়ার পথে এটা অনেক বড়ো প্রতিবন্ধক হবে। এমতাবস্থায় তুমি প্রকৃত মুসলিম ও সত্যিকারের মুমিন হতে পারবে না।
ইমাম গাযালী রহ. এক জায়গায় বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা যতো পশু সৃষ্টি করেছেন এবং দুনিয়াতে যতো পশু রয়েছে তা তিন প্রকারের। এক প্রকারের ঐগুলো, যেগুলো অন্যের উপকার করে। নিজে ত্যাগ স্বীকার করে অন্যের উপকার করে। গৃহপালিত যতো পশু আছে- যেমন গরু, মহিষ, বকরী, উট, গাধা- এগুলো এমন পশু, যারা অন্যের উপকার করে। এরা কোনো প্রকার কষ্ট দেয় না, শুধু উপকার করে। মানুষ মহিষের দুধ পান করে, গরুর দুধ পান করে, বকরীর দুধ পান করে এবং উটের দুধও পান করে। উটের উপর সোয়ার হয়ে মানুষ নিজ গন্তব্যে পৌছে।
وَالْأَنْعَامَ خَلَقَهَا لَكُمْ فِيهَا دِفْعٌ وَمَنَافِعُ ، وَالْخَيْلَ وَالْبِغَالَ وَالْحَمِيرَ لِتَرْكَبُوْهَا وَ زِينَةً
আল্লাহ তা'আলা তোমাদের জন্যে এগুলোর মধ্যে তাপ গ্রহণের উপাদানও রেখেছেন। অন্যান্য উপকারও এর মধ্যে রেখেছেন। প্রয়োজন পড়লে তোমরা এগুলোকে জবাই করে এবং এগুলোর গলায় ছুরি চালিয়ে গোশত খাও।'
যাই হোক, এই নিরীহ পশুগুলো এমন যে, কোনো প্রকার কষ্ট তো দেয়ই না, উল্টা বরং উপকার করে। নিজে কুরবানী স্বীকার করে অন্যের উপকার করে। এক প্রকারের পশু হলো এগুলো।
দ্বিতীয় প্রকারের পশু ঐগুলো, যেগুলো কেবল কষ্টই দেয়, কোনো প্রকার উপকার করে না। এটাই এগুলোর সাধারণ চরিত্র। অর্থাৎ, এগুলোর মধ্যে উপকার করার স্বভাব নেই। এগুলোর দ্বারা যদি অন্য কোনোভাবে উপকার নেওয়া হয় সে ভিন্ন কথা। কিন্তু এগুলোর মধ্যে উপকার করার স্বভাব নেই, আছে কেবল কষ্ট দেওয়ার স্বভাব। যেমন সাপ, বিচ্ছু, বাঘ, ভাল্লুক ও অন্যান্য হিংস্র প্রাণী। এগুলোর মধ্যে উপকার করার স্বভাব নেই। এগুলো অবশ্যই দংশন করবে। অবশ্যই কষ্ট দিবে। অবশ্যই মানুষকে রোগাক্রান্ত করবে। ব্যথা-বেদনায় আক্রান্ত করবে। এরা হলো দ্বিতীয় প্রকারের পশু।
তৃতীয় প্রকারের পশু ঐগুলো, যেগুলো না উপকার করে, না কষ্ট দেয়। অর্থাৎ, এগুলোর শক্তি-সামর্থ এবং এগুলোর জীবনের লক্ষ্য উপকার করাও নয় এবং কষ্ট দেয়াও নয়। যেমন, অনেক ধরনের পশু বনে-জঙ্গলে বিচরণ করে থাকে, যেগুলো না কাউকে কষ্ট দেয়, না উপকার করে। পৃথিবীতে এই তিন প্রকারের পশু রয়েছে।
হযরত ইমাম গাযালী রহ. বলেন, মানুষ! তুমি নিজেকে নিজে আশরাফুল মাখলুকাত দাবি করো। তাই তোমার উচিৎ কমপক্ষে গরু-মহিষের স্বভাবই গ্রহণ করা, বকরী-গাধার স্বভাবই গ্রহণ করা। যারা নিজেদেরকে কুরবানী দিয়ে অন্যের উপকার করে। তুমি যদি আশরাফুল মাখলুকাতই হয়ে থাকো তাহলে তোমাকে কমপক্ষে এসব পশুর মতো তো হতে হবে, যেগুলো অন্যের উপকার করে থাকে। আর তা যদি না হও তাহলে কমপক্ষে তুমি ঐগুলোর মতো হও, যেগুলো উপকারও করে না, ক্ষতিও করে না। কিন্তু তুমি যদি ঐগুলোর মতো হও, যেগুলো অন্যকে কষ্ট দেয়, তাহলে এর অর্থ তো এই দাঁড়ায় যে, তুমি সাপ-বিচ্ছুর সমান। সাপ-বিচ্ছু ও অন্যান্য হিংস্র প্রাণী অন্যকে কষ্ট দেয়, তুমি মানুষ হয়েও যদি অন্যকে কষ্ট দেও তাহলে তুমি সাপ-বিচ্ছুর পর্যায়ে নেমে গেলে। তাহলে তো তোমাকে আশরাফুল মাখলুকাত বলার কোনো স্বার্থকতা থাকে না। এ বিষয়টিই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, ভাই! সাপ-বিচ্ছু হয়ো না, ইনসান হও। আর ইনসানও হবে কামেল ইনসান, যা কেবল একজন মুসলমানই হতে পারে। তাই পরিপূর্ণ মুসলমান হও।
حَدِيْسُ الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُوْنَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ শরীয়ত এমন সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিধান দিয়েছে যে, কোনো মানুষ যদি সেগুলো চিন্তা-ভাবনা করে তাহলে বুঝতে সক্ষম হবে যে, অন্যকে কষ্ট না দেওয়া ইসলামে কতো গুরুত্বপূর্ণ ফরযে আইন। এর কয়েকটি দৃষ্টান্ত আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরছি।
আপনারা জানেন যে, মসজিদে জামাতের সাথে নামায আদায় করা কতো বড়ো ফযীলতের কাজ। আর শুধু ফযীলতের কাজই নয়, অনেক ইমাম তো জামাতের সাথে নামায পড়াকে ওয়াজিব বলেছেন। আর আমাদের হানাফী মাযহাবে জামাতের সাথে নামায আদায় করাকে ওয়াজিবের কাছাকাছি সুন্নাতে মুয়াক্কাদা বলে কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, সুন্নাতে মুয়াক্কাদা হলেও উঁচুস্তরের সুন্নাতে মুয়াক্কাদা, যা ওয়াজিবের কাছাকাছি গুরুত্ব রাখে। আর নবী করীম সরোয়ারে দো-আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঐ হাদীসও আপনারা পড়েছেন যে, তিনি বলেছেন, যে সমস্ত মানুষ জামাতে নামায পড়তে আসে না, আমার মন চায় তাদের বাড়িতে গিয়ে আগুন ধরিয়ে দেই। তিনি জামাতে না আসার কারণে এমন ধমকিও দিয়েছেন। জামাতের সাথে নামায পড়া এতো বড়ো ফযীলতের কাজ, এতো বড়ো গুরুত্বপূর্ণ আমল। কিন্তু নবী করীম সরোয়ারে দো-আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
مَنْ أَكَلَ ثَوْمًا أَوْ بَصَلًا فَلَا يَقْرَبَنَّ مَسْجِدَنَا
'যে কাঁচা পিঁয়াজ বা কাঁচা রসুন খেয়েছে, সে যেন আমাদের মসজিদের নিকটে না আসে।'
এই হাদীসের ভিত্তিতে ফুকাহায়ে কেরাম বলেন, মসজিদে যাওয়ার পূর্বে গন্ধযুক্ত কোনো জিনিস খাওয়া উচিৎ নয়। কিন্তু কেউ যদি ভুলে খেয়ে ফেলে তাহলে তার জিম্মায় জামাত আবশ্যক থাকবে না। এমতাবস্থায় তার জন্যে জামাতে নামায পড়া জায়েয নেই। এমন নয় যে, কেবল জামাত ছাড়ার অনুমতি রয়েছে, বরং যে ব্যক্তি কাঁচা পিঁয়াজ বা রসুন খেয়েছে, আর তার মুখ থেকে গন্ধ আসছে তার জন্যে জামাতে যাওয়াই জায়েয নেই। এতো বড়ো ফযীলতপূর্ণ ইবাদত এবং এতো বড়ো তাকিদপূর্ণ কাজ এ জন্যে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে যে, সে জামাতে গিয়ে দাঁড়ালে আর তার মুখ থেকে গন্ধ আসলে পাশের লোকের কষ্ট হবে। এ জন্যে এমন করা জায়েয নেই। সে ব্যক্তি ঘরে নামায পড়বে।
এর উপর কিয়াস করেই আমাদের ফুকাহায়ে কেরাম লিখেছেন- ফাতাওয়া শামীতে এ মাসআলা লেখা আছে যে, কারো মুখ থেকে যদি এমনিতেই গন্ধ আসে- সে পিঁয়াজও খায়নি, রসুনও খায়নি, কিন্তু তার মুখ থেকে দুর্গন্ধ আসে- আরবীতে যাকে 'বুখার' বলে। অর্থাৎ, মুখ থেকে উদগত দুর্গন্ধ। কারো মুখ থেকে যদি এমন দুর্গন্ধ আসে তাহলে তার জন্যেও মসজিদে যাওয়া জায়েয নেই। সে বাড়িতে নামায পড়বে। এতো বড়ো তাকিদপূর্ণ কাজ এবং এতো বড়ো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ছেড়ে দেয়া জায়েয হয়েছে কেবল তাই নয়, বরং ওয়াজিব হয়ে গেছে। কারণ, যখন সে নামাযের কাতারে দাঁড়াবে, তখন পার্শ্ববর্তী লোকের কষ্ট হবে। তাই বলা হয়েছে, জামাত ছেড়ে দাও, ঘরে নামায পড়ো।
এমনিভাবে ফুকাহায়ে কেরام বলেছেন যে, কারো শরীরে কোনো ক্ষত থাকে। ক্ষতের মধ্যে পুঁজ থাকে, দুর্গন্ধ থাকে। এমতাবস্থায় তার জন্যে মসজিদে গিয়ে নামায পড়া জায়েয নেই। সে ঘরে নামায পড়বে। কেন? কারণ, তার এ ক্ষত দেখে অন্যদের খারাপ লাগবে। মানুষের কষ্ট হবে। এ কারণে তার জন্যে মসজিদে যাওয়াকে নাজায়েয করা হয়েছে। ভেবে দেখুন! কতো সূক্ষ্মতার সাথে শরীয়ত এ ব্যাপারে বিধান দিয়েছে। জামাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ছেড়ে দেওয়ার হুকুম দিয়েছে।
হাজরে আসওয়াদ চুমু খাওয়া কতো বড়ো ফযীলতের কাজ। হাদীস শরীফে এসেছে- যে ব্যক্তি হাজরে আসওয়াদ চুমু খাবে তার গুনাহ ঝরে যাবে। কিয়ামতের দিন হাজরে আসওয়াদ এমনভাবে আসবে যে, তার জিব থাকবে এবং সে কথা বলবে। যে ব্যক্তি তাকে চুমু খেয়েছে তার পক্ষে সে ঈমানের সাক্ষ্য দেবে। এতো বড়ো ফযীলত! কিন্তু ফুকাহায়ে কেরাম বলেছেন, হাজরে আসওয়াদকে চুমু দেওয়ার জন্যে যদি মানুষকে ধাক্কা দিতে হয় তাহলে এমতাবস্থায় চুমু খাওয়া জায়েয নেই, হারাম। অথচ কতো বড়ো ফযীলতের কাজ। কিন্তু তার পর্যন্ত পৌছতে যদি মানুষকে ধাক্কা দিতে হয়, মানুষের কষ্ট হয় তাহলে তা সম্পূর্ণরূপে হারাম হয়ে যায়। আপনারা চিন্তা করে দেখুন! এখন হাজরে আসওয়াদে এই দৃশ্য চোখে পড়ে যে, মানুষ একে অপরের উপর লাফিয়ে পড়ে, একে অপরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং একে অপরকে কষ্ট দিয়ে হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত পৌছার চেষ্টা করে। কিন্তু শরীয়তে এটা হারাম। সামাজিকতার এ সমস্ত আদব ও আহকাম শরীয়ত প্রদান করেছে।
তাই বলছিলাম, আজ আমরা নিজেদের দ্বীনকে শুধু আকীদা ও ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে নিয়েছি। আমাদের মধ্যে শুধুমাত্র আকীদা আছে। আলহামদুলিল্লাহ, এর গুরুত্ব তো সবচে' বেশি এবং এ ব্যাপারে আমাদের মধ্যে কিছু হলেও গুরুত্ব আছে। আলহামদুলিল্লাহ, ইবাদতের ব্যাপারেও আমাদের অন্তরে কমবেশি গুরুত্ব আছে। আল্লাহ তা'আলা এতে আরো উন্নতি দান করুন। আর বাহ্যিক বেশভূষা, জামা-কাপড়, টুপি ইত্যাদি বিষয়েও কিছু গুরুত্ব আছে। কিন্তু মুআমালাত, মুআশারাত ও আখলাক এই তিন শাখাকে আমরা যেন দ্বীন থেকে একেবারে বের করে দিয়েছি। কোনো অনুভূতি নেই, কোনো চিন্তা নেই। মুআশারাতের আদব এবং তার আহকামসমূহ পালন করার অনুভূতিই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ দিকে লক্ষই করা হয় না যে, আমি যে কাজ করছি তাতে অন্যের কষ্ট হচ্ছে।
লক্ষ করুন! 'আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু' বলে সালাম দেওয়া কতো বড়ো ফযীলতের কাজ। নবীয়ে করীম সরোয়ারে দো-আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ হাদীস আপনারা এই বুখারী শরীফেই পড়েছেন যে,
إِفْشَاءُ السَّلَامِ مِنَ الْإِيْمَانِ 'সালামের প্রসার ঘটানো ঈমানের একটি অংশ।'
'তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক, আল্লাহর রহমত এবং আল্লাহর বরকতসমূহ বর্ষিত হোক।' এতো বড়ো ফযীলতের কাজ এটি! এতো বড়ো দু'আ এই সালাম! এটি এমন একটি দু'আ যে, যদি একবারও এটি কবুল হয়ে যায় তাহলে মানুষের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। সালাম দেওয়া সুন্নত এবং উত্তর দেওয়া ওয়াজিব। এর অনেক গুরুত্বও বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু সাথে সাথে এও বলা হয়েছে যে, কোনো মানুষ যখন কোনো কাজে মশগুল থাকে, আর সালাম দিলে তার চিন্তা বিক্ষিপ্ত হবে এবং তার কষ্ট হবে বলে আশংকা হয় তাহলে এ অবস্থায় সালাম দেওয়া জায়েয নেই।
আল্লামা শামী রহ. 'রদ্দুল মুহতার' কিতাবে অনেকগুলো শে'র (আরবী কবিতা) উদ্ধৃত করেছেন। এর মধ্যে এমন অনেকগুলো ক্ষেত্র উল্লেখ করেছেন, যেখানে সালাম দেওয়া জায়েয নেই। অবশেষে বলেছেন, আহাররত ব্যক্তিকেও সালাম দিবে না। কারণ, হতে পারে খানা খাওয়া অবস্থায় উত্তর দিতে গিয়ে তার কষ্ট হবে। তবে সঙ্গে আমি একথাও বলে দিচ্ছি যে, এখানে খানা খাওয়ার সাধারণ অবস্থা উদ্দেশ্য নয়, বরং এর ব্যাখ্যায় ফুকাহায়ে কেরাম বলেছেন যে, যখন মুখের মধ্যে খাবারের গ্রাস আছে, বা খাবারের গ্রাস মুখে গ্রহণ করছে, তখন সালাম দেওয়া নিষেধ। তবে মুখে যদি গ্রাস না থাকে বা গ্রাস গ্রহণ করছে না, তাই গ্রাস আটকে যাওয়ার আশংকাও নেই, তাহলে সালাম দিতে পারবে। আমি এ বিষয়টি বলতে চাচ্ছি যে, ফুকাহায়ে কেরাম কতো সূক্ষ্ম দৃষ্টির সাথে এ সমস্ত আহকাম সংকলন করেছেন। আহারকারীকে সালাম দিও না। যিকিরকারীকে সালাম দিও না। কেউ দরস দান করছে, মানুষ তার আলোচনা শুনছে, তখন সেখানে এসে চুপিসারে বসে পড়ো, সালাম দিও না। কেউ দ্রুত তার কোনো কাজে যাচ্ছে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে যে, গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজের জন্যে সে দ্রুত যাচ্ছে। তাহলে এমন সময় সালাম দিও না। এমন সময় সালাম দেওয়া নিষেধ। এতো বড়ো ফযীলতের কাজ কিন্তু অন্যের কষ্ট হবে বলে তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শরীয়তে এতো তাকিদ করা হয়েছে এ বিষয়ে। হাদীস ও ফিকহের অনেক জায়গাতেই আপনারা দেখতে পাবেন, পদে পদে এর প্রতি লক্ষ রাখা হয়েছে। আপনারা হাদীস শরীফে পড়েছেন যে, নামাযরত ব্যক্তির সামনে সুতরা না থাকলে তার সামনে দিয়ে অতিক্রম করা জায়েয নেই।
হাদীস শরীফে আরো এসেছে যে, সে যদি চল্লিশ- বর্ণনাকারী বলেন, আমার মনে নেই, চল্লিশ দিন বলেছেন, চল্লিশ মাস বলেছেন, না কি চল্লিশ বছর বলেছেন, নামাযরত কোনো মানুষের সামনে দিয়ে অতিক্রম করার চেয়ে এতো দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা ভালো। কিন্তু ফুকাহায়ে কেরام বলেছেন, কোনো ব্যক্তি যদি নামায পড়ার জন্যে মানুষের যাতায়াতের পথে নিয়ত করে দাঁড়িয়ে যায় এবং এভাবে সে মানুষের যাতায়াতের পথ বন্ধ করে দেয়। এমতাবস্থায় যদি কেউ তার সামনে দিয়ে অতিক্রম করে তাহলে অতিক্রমকারীর গোনাহ হবে না, গোনাহ হবে যে নামায পড়ছে তার। তাহলে লক্ষ করে দেখুন! এতো বড়ো গোনাহের কাজ ছিলো, কিন্তু যেহেতু সে মানুষকে কষ্টে ফেলেছে, মানুষকে যাতায়াতে বাধা দিচ্ছে এজন্যে গোনাহ তার হবে, অতিক্রমকারীর হবে না। কয়েকটিমাত্র উদাহরণ আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম। অন্যথায় ফিকহের কিতাবসমূহ এ ধরনের মাসআলা দিয়ে পরিপূর্ণ যে, নিজের কোনো কাজ দ্বারা অন্যকে সামান্যতম কষ্ট দেয়াও জায়েয নেই।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ হাদীসে বলেছেন,
مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ
'যার অনিষ্ট থেকে মুসলমানগণ নিরাপদে থাকে।' এ ব্যাপারেও ফুকাহায়ে কেরام বলেছেন যে, এখানে 'মুসলমানগণ' এ জন্যে বলেছেন যে, সে সময় সমাজের বেশির ভাগ লোকই ছিলেন মুসলমান। কোনো দারুল ইসলামের ব্যাপারে স্বাভাবিকভাবেই এরূপ ধারণা হয় যে, সেখানের বেশিরভাগ লোকই হবে মুসলমান। তবে ফুকাহায়ে কেরام বলেন যে, কোনো যিম্মী কাফেরকেও অন্যায়ভাবে কষ্ট দেওয়া তেমনই নিন্দনীয় ও হারাম, যেমন কোনো মুসলমানকে কষ্ট দেওয়া হারাম। এমনকি যিম্মীদের ব্যাপারে আপনারা এ কথাও পড়ে থাকবেন যে, ইমাম আবূ হানীফা রহ. বলেন, যিম্মীকে হত্যা করার কারণেও কিসাস আসবে। অর্থাৎ, কোনো মুসলমান যদি কোনো যিম্মীকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে তবে বিনিময়ে তাকেও হত্যা করা হবে। কোনো যিম্মীকেও শারীরিক বা মানসিকভাবে কষ্ট দেওয়া জায়েয নেই। ফাতাওয়া আলমগীরিয়াতে মাসআলা লেখা আছে যে, কোনো যিম্মীকে 'হে কাফের' বলে সম্বোধন করা মাকরূহ। যদি তাকে কাফের বলার দ্বারা তার কষ্ট হয় তবে 'হে কাফের' বলাও মাকরূহ হবে। কেন? কারণ, এতে সে কষ্ট পায়। উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা এ কথা বলা উদ্দেশ্য যে, তোমরা এমন প্রাণী হও, যে অন্যের উপকার করে। এমন হয়ো না, যে অন্যকে অন্যায়ভাবে কষ্ট দেয়। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মূলনীতি, যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ হাদীসে বর্ণনা করেছেন। আমাদের বাস্তব জীবনে যদি আমরা এটা মেনে চলি তাহলে আমাদের জীবনের কতো ঝগড়া, কতো ফেত্না এবং কতো জটিলতা যে মিটে যাবে তা বলে শেষ করা যাবে না।
লক্ষ করুন! আমরা এখন একান্ত নিজেদের বৈঠকে বসে কথা বলছি, যেখানে লৌকিকতার কোনো প্রশ্ন নেই। তাই এখানে এমন কথা বলা প্রয়োজন, যা লৌকিকতামুক্ত হবে এবং আমাদের ইসলাহের বিষয়ও তাতে থাকবে। এখন একটু চিন্তা করে দেখুন! এই যে মুসাফাহা, এটি অবশ্যই সুন্নাত। নিঃসন্দেহে একটি ভালো কাজ। মুসাফাহা সম্পর্কে হাদীস শরীফে এসেছে যে, দুইজন মুসলমান যখন পরস্পরে মহব্বতের সাথে মুসাফাহা করে, তখন উভয়ের গোনাহ ঝরে যায়। নিঃসন্দেহে এটি বড়ো একটি ফযীলত। কিন্তু সালামের ব্যাপারে আমি যেমন আরয করেছি যে, সালাম অনেক বড়ো ফযীলতের কাজ, কিন্তু সালাম দেওয়ার দ্বারা যদি কেউ কষ্ট পায় তাহলে তখন সালাম দেওয়া মাকরূহ। একই বিধান মুসাফাহার ক্ষেত্রেও।
মুসাফাহা করার কারণে যদি কোনো একজন মানুষেরও কষ্ট হয় তবে মুসাফাহা করা মুস্তাহাব নয় শুধু তাই নয়, বরং এমতাবস্থায় মুসাফাহা করা নাজায়েয। কিন্তু যেহেতু মুআশারাতের আহকামের ব্যাপারে কোনো অনুভূতি নেই, এ কারণে আমাদের সমাজে বিষয়টি এমন হয়ে গিয়েছে যে, মুসাফাহা করা জরুরী, ওয়াজিব ও ফরয হয়ে গিয়েছে। সর্বাবস্থায় তা করতেই হবে। কাউকে ধাক্কা দিতে হোক, কেউ পড়ে যাক, কারো উপর দিয়ে লাফিয়ে যেতে হোক, কাউকে আহত করতে হোক, কিন্তু মুসাফাহা অবশ্যই করতে হবে।
আমি শুধু এখানকার কথাই বলছি না। আমাদের পাকিস্তানেও এই একই অবস্থা। পাকিস্তানের এক জায়গায় আমার বয়ান ছিলো। অনেক দিন পরে সেখানে যাওয়ার সুযোগ হয়। সে এলাকার সমস্ত মাদরাসার আলেম-তালিবে ইলম সকলেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। মসজিদের মধ্যে বয়ান হচ্ছিলো। বাইরে অনেক দূর পর্যন্ত কেবল মানুষের মাথা আর মাথা দেখা যাচ্ছিলো। বয়ান শেষে সব মানুষ মুসাফাহা করার জন্যে ঝাঁপিয়ে পড়লো। মসজিদের মধ্যে যারা ছিলো তারা তো কোনোভাবে মুসাফাহা করলো। মসজিদের বাইরের লোকেরা যখন দেখলো যে, মসজিদের ভিতরের লোকেরা মুসাফাহা করছে, আমরা তো বঞ্চিত হয়ে গেলাম। তখন তারা করলো কি? মসজিদের জানালা ভেঙ্গে ভিতরে প্রবেশ করলো। বলা বাহুল্য যে, যখন জানালা ভেঙ্গে ভিতরে প্রবেশ করবে, তখন কারো উপর গিয়ে পড়বে। তাই হলো, কেউ কারো উপর লাফিয়ে পড়লো, কেউ বা পড়ে গেলো। কিন্তু মুসাফাহা করা জরুরী, মুসাফাহা করা ফরয। এটা এমন একটা মেজাজে পরিণত হয়েছে, যা শরীয়তের বিলকুল খেলাফ, হারাম কাজ। কারণ, আমার ওয়ালেদ মাজেদ রহ. বলতেন যে, মুসলমানকে কষ্ট দেওয়া কবীরা গোনাহ। আর একটা মুস্তাহাব কাজ করার জন্যে কবীরা গোনাহে লিপ্ত হওয়া কতো বড়ো নাদানী, কতো বড়ো নির্বুদ্ধিতা, কতো বড়ো বে-দ্বীনী ও গোমরাহী! কিন্তু এদিকে কোনো খিয়াল নেই, কোনো অনুভূতি নেই।
ছাত্ররা ছাত্রাবাসের টয়লেট ব্যবহার করতে খুব বেশি অসতর্কতা করে থাকে। ময়লা রেখে চলে আসে। পরবর্তীতে কেউ টয়লেটে গেলে তার যে কষ্ট হবে সেদিকে কোনো খিয়াল করে না। একবার একজন পর্যাপ্ত পরিমাণ পানির ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও নাপাকী পরিষ্কার না করেই বাইরে চলে আসে। তাই হযরত ওয়ালেদ ছাহেব (কাদ্দাসাল্লাহু সিররাহুল আযীয- আল্লাহ তা'আলা তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করুন) বললেন, এভাবে তুমি কবীরা গোনাহ করেছো। কারণ, পরবর্তীতে যে যাবে তার কষ্ট হবে। আমরা একটু চিন্তা করে দেখি, আমাদের মধ্যে কতো জন এমন আছে, যে এ বিষয়ে লক্ষ রাখে। এখন আমি আপনাদেরকে এর বিপরীত একটি ঘটনা শুনাচ্ছি। আমার ওয়ালেদ মাজেদ রহ. বলতেন, বাতেলের মধ্যে উন্নতি করার কোনো শক্তিই নেই।
إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا 'বাতেল তো বিলুপ্ত হবেই।'৪
বাতেল এসেছেই বিলুপ্ত হওয়ার জন্যে। কিন্তু কোনো বাতেল কওমকে যদি দুনিয়াতে উন্নতি করতে দেখো তাহলে বুঝবে যে, কোনো হক জিনিস তার সাথে যুক্ত হয়েছে, যা তাকে উপরে উঠিয়েছে। বাতেলের মধ্যে উন্নতি করার শক্তি নেই। কোনো হক জিনিস যুক্ত হয়ে তাকে উন্নত করছে। এ দুনিয়া দারুল আমল। তাই এখানে কাফেরও যদি সঠিক পদ্ধতিতে কাজ করে তাহলে তাকে আল্লাহ তা'আলা তার কাজ অনুপাতে উন্নতি দান করেন। আখেরাতে তো তার কোনো অংশ নেই। তবে দুনিয়াতে সে তার প্রতিদান পেয়ে যায়।
এবার আমি আপনাদেরকে সেই ঘটনা শুনাচ্ছি। আমার কখনো কখনো ইউরোপ-আমেরিকায় যাওয়ার সুযোগ হয়। তো সেখানে সাধারণের জন্যে উন্মুক্ত কিছু টয়লেট আছে, যেখানে সবারই যাওয়ার অনুমতি আছে। সেখানে গিয়ে আপনি দেখুন, কেউ তা পরিষ্কার না করে চলে আসবে না। আপনি যখনই সেখানে যাবেন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পাবেন। কেউ সেখানে পানি ছিটয়ে রাখবে না। তাতে ময়লা থাকবে না। একবার আমি ইংল্যান্ডে এ ধরনের একটি ট্রেনে সফর করছিলাম। আমার টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন হলো। আমি গিয়ে দেখি টয়লেটের উপর 'ব্যস্ত' লেখা আছে। তাই আমি এ কথা চিন্তা করে ফিরে এসে সীটে বসলাম যে, টয়লেট খালি হলে যাবো। একটু পরে দেখি যে, এক মহিলা ঐ টয়লেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি তাকে বললাম যে, আপনার টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন থাকলে আপনি যান। সে বললো, না, আমি টয়লেট থেকে অবসর হয়েছি। আমি পেশাব করতে গিয়েছিলাম, যখন অবসর হই, তখন ট্রেন স্টেশনে এসে প্লাটফরমে দাঁড়িয়ে যায়। প্লাটফরমে দাঁড়ানো অবস্থায় পানি দিয়ে নাপাকী ভাসিয়ে দেওয়া আদবের খেলাফ, তাই আমি পানি প্রবাহিত করতে পারি নাই। এ জন্যে অপেক্ষা করছি, গাড়ি চলতে আরম্ভ করলে পানি প্রবাহিত করে তবে সীটে ফিরে যাবো। সেখানে এটা একটা সাধারণ মেজাজে পরিণত হয়ে গিয়েছে।
কোনো কাজ করতে গিয়ে যদি অনেক মানুষ হয়ে যায় তবে নিজে নিজেই তারা সারিবদ্ধ হয়ে যায়। ধাক্কাধাক্কি করার চিন্তাই তাদের মাথায় নেই। এ জিনিস নবী করীম সরোয়ারে দো-আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছিলেন, আজ তা অমুসলিমরা গ্রহণ করেছে আর আমরা ছেড়ে দিয়েছি। তাই হযরত ওয়ালেদ ছাহেব রহ. বলতেন যে, এই হক তাদের সাথে যুক্ত হয়েছে, যা তাদেরকে দুনিয়াতে উন্নত করছে। আর আমরা ছেড়ে দিয়েছি, ফলে আমরা লাঞ্ছিত হচ্ছি। তাই আমি বলতে চাচ্ছি যে, এ হাদীসটি আমরা পড়ে থাকি এবং প্রতিদিন পড়ে থাকি। এমন কোনো তালিবে ইলম পাওয়া হয়তো কঠিন হবে, যার الْمُسْلِمَن سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَأْنِهِ وَيَدِهِ হাদীসটি অজানা আছে। কিন্তু এর উপর আমল
আছে কতোটুকু? আমরা প্রত্যেকে চিন্তা করে দেখি যে, আমরা এ হাদীসের উপর কতোটুকু আমল করছি। যদি না করে থাকি তাহলে সরকারে দো-আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিসাব অনুযায়ী আমরা মুসলমানের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নই। তারপর তিনি বলেন, জিব দ্বারাও কষ্ট দিও না এবং হাত দ্বারাও কষ্ট দিও না। জিব দ্বারা কষ্ট দেওয়ার অর্থ কী? এমন কোনো কথা বলা, যা অন্যের কাছে অপছন্দ হয়। এমন কথা বলাও মুসলমানের চরিত্র নয়। আজ-কাল আমরা অন্য ধর্মের লোক, অন্য দলের মুসলমান, বা ইলমী কোনো বিষয়ে দ্বিমত পোষণকারী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বলায় ও লেখায় এমন সব শব্দ ব্যবহার করি, যার ফলে তার মনে কষ্ট হয়। প্রশ্ন হলো, এটা কি 'আলামুসলিমু' হাদীসের পরিপন্থী কাজ নয়? আমাদের মতো আলেমদের পক্ষ থেকে যদি এমন কথা ও লেখা পাওয়া যায়, যা অন্যের উপর কাদা ছোড়ে, যা অন্যের মনোকষ্টের কারণ হয়- হোক সে আমার বিরোধী- কিন্তু এমনটি করলে সেটা মুসলমানের কাজ হবে না। 'আলমসলিমু' হাদীসের দাবি এটা নয়।
আমি আমার নিজেরই একটি ঘটনা শুনাচ্ছি। আপনারা জানেন, আমাদের পাকিস্তানে আইয়ুব খানের আমলে 'পারিবারিক আইন' জারী করা হয়েছিলো। যা ছিলো শরীয়তবিরোধী আইন। একব্যক্তি তার পক্ষে একটি কিতাব লেখে। হযরত ওয়ালেদ ছাহেব রহ. আমাকে বলেন, এর উত্তর লেখো। আমি সবেমাত্র দাওরায়ে হাদীস ফারেগ হয়েছি। আবেগ-উদ্দীপনাও ছিলো। মগজে খান্নাসও ছিলো। সাহিত্যপূর্ণ এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মতো তীর্যক বাক্য লেখার প্রতি বিশেষ আগ্রহও ছিলো। যাই হোক, আমি আমার আঙ্গিকে পারিবারিক আইনের পক্ষে যে ব্যক্তি কিতাব লিখে ছিলো তার বিরুদ্ধে একটি কিতাব লেখি। তাতে বিভিন্ন পয়েন্টে আমি তাকে হারিয়ে দেই। তীর্যক বাক্য লেখি। সাহিত্যপূর্ণ বাক্যে তাকে ঘায়েল করি। অপমান করি। সে সময় আমি যে কোনো লেখা তৈরী করার পর প্রথমে হযরত ওয়ালেদ মাজেদ রহ.-কে পুরোটা শুনাতাম। হযরত ওয়ালেদ ছাহেব রহ. সত্যায়ন করলে তবে সেটা ছাপা হতো। যাই হোক, আমি দুই শ' পৃষ্ঠার একটি কিতাব লিখি। তারপর তা পড়ে হযরত ওয়ালেদ ছাহেব রহ.-কে শুনাই। দুই শ' পৃষ্ঠার এই কিতাব শুনে শেষ করার পর হযরত ওয়ালেদ ছাহেব রহ. বললেন, তুমি সাহিত্যের দিক থেকে তো খুব উন্নত মানের কিতাব লিখেছো এবং তথ্য-উপাত্তের দিক থেকেও তা উন্নত মানের হয়েছে। কিন্তু তুমি বলো- এই কিতাব লেখার পেছনে তোমার উদ্দেশ্য কী ছিলো? যে সব লোক ভ্রান্ত পথে চলছে তাদেরকে সঠিক পথ দেখানো তোমার উদ্দেশ্য, নাকি যে সব লোক আগে থেকেই তোমার পক্ষের তাদের থেকে বাহবা কুড়ানো তোমার উদ্দেশ্য? তোমার পক্ষের লোকদের তেকে প্রশংসা কুড়ানো যদি তোমার উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলে তোমার কিতাব খুব সফল। আর এর ফলে তোমার পক্ষের লোকদের কাছে যখন এ কিতাব পৌছবে, তখন তারা খুব প্রশংসা করবে। তারা বলবে- কেমন মুখভাঙ্গা জওয়াব দিয়েছে! কেমন দাঁতভাঙ্গা জওয়াব দিয়েছে! বড়ো সাহিত্যপূর্ণ লেখা লিখেছে! মানুষ খুব প্রশংসা করবে। আর যদি বিপথগামী লোকদেরকে সঠিক পথে আনা তোমার উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তাহলে তোমার কিতাবের এক কড়িও মূল্য নেই। এক পয়সাও মূল্য নেই। কারণ, তুমি তাদের বিরুদ্ধে এমন এমন বাক্য লিখেছো, যেগুলো দেখে তাদের মনে তোমার বিরুদ্ধে জিদ তৈরী হবে। ফলে তারা হক তলবের উদ্দেশ্যে তোমার কিতাব পড়বে না। পরিণতিতে শত্রুতা সৃষ্টি হবে।
এটা নবীগণের তরীকা নয়। নবীসুলভ দাওয়াতের তরীকা এটা নয়। এরপর ওয়ালেদ ছাহেব রহ. বললেন, নবীগণের তরীকা তো এই ছিলো যে, কাফেররা নবীকে বলেছে, إِنَّا لَنَرْبِكَ فِي سَفَاهَةٍ وَإِنَّا لَنَظُنُّكَ مِنَ الْكَذِبِينَ 'আমরা তো তোমাদেরকে নির্বুদ্ধিতায় লিপ্ত দেখছি এবং তোমাদেরকে আমরা মিথ্যুক মনে করি।"
আজ কেউ হলে জওয়াব দিতো- তুই মিথ্যাবাদী, তোর বাপ মিথ্যাবাদী, তোর দাদা মিথ্যাবাদী। কিন্তু নবী কী জওয়াব দিয়েছেন? يَا قَوْمِ لَيْسَ بِي سَفَاهَةٌ وَلَكِنِّي رَسُولٌ مِّنْ رَّبِّ الْعَالَمِينَ এটা হলো নবীর জওয়াব। গালির জওয়াব গালি দ্বারা দেননি। তিনি বলেছেন, ভাই! আমি বেউকুফ নই। তবে আমাকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পয়গাম্বর বানিয়ে পাঠিয়েছেন। এটা হলো নবীর জওয়াব।
ফেরাউনের মতো জালেম ও জাবের বাদশার কাছে হযরত মূসা ও হারূন আলাইহিমাস সালামের মতো নবীদ্বয়কে পাঠানো হচ্ছে- যার ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলার 'ইলমে আযলী'তে রয়েছে যে, তার হেদায়াত লাভ হবে না। ফেরাউনের ভাগ্যে হেদায়াত জুটবে না। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা বলছেন, وَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَّيْنَا 'তোমরা দু'জন তার সাথে নরমভাবে কথা বলবে।''
আরো বলেছেন, لَعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشُى 'অসম্ভব কি যে, সে নসীহত কবুল করবে বা আল্লাহর ভয় তার অন্তরে পয়দা হবে।'
এ কথা কে বলছেন? আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা। অথচ আল্লাহ জানেন, সে নসীহত কবুল করবে না। ঈমান নসীব হবে না। গোমরাহ অবস্থায় সে মারা যাবে। কিন্তু তিনি বলছেন যে, হকের দা'য়ী যে হবে তার নিরাশ হওয়া যাবে না। হকের দা'য়ীর এই অনুভূতি থাকবে যে, আমি এমন পন্থা অবলম্বন করবো, যার দ্বারা সে নসিহত লাভ করবে। যার কারণে তার অন্তরে আল্লাহর ভয় জন্মাবে। আমার ওয়ালেদ ছাহেব রহ. বলেন, তুমি মূসা এবং হারুন আলাইহিমাস সালামের চেয়ে বড়ো মুসলিহ হতে পারো না, আর তোমার বিরুদ্ধবাদীও ফেরাউনের চেয়ে বড়ো গোমরাহ হতে পারে না। তাদেরকেই যখন নরম কথা বলার হুকুম দেওয়া হচ্ছে, তাহলে তুমি বকাঝকা দেওয়ার এবং কঠোর কথা বলার অনুমতি কোথায় পেলে?
এরপর ওয়ালেদ ছাহেব রহ. এ ঘটনাও শুনালেন যে, হযরত শাহ ইসমাঈল শহীদ রহ. ওয়ায করছেন। ওয়ায চলাকালে এক বিরুদ্ধবাদী ভর মজমার মধ্যে দাঁড়িয়ে বলে- মাওলানা! আমরা শুনেছি যে, আপনি হারামযাদা? এখন বলুন! এতো বড়ো একজন আলেমকে ভর মজলিসে বলা হচ্ছে যে, আপনি হারামযাদা। হযরত ইসমাঈল শহীদ রহ. তার প্রতি ক্রোধ বা অসন্তোষ প্রকাশ না করে বললেন, ভাই! আপনি ভুল সংবাদ পেয়েছেন। আমার মায়ের বিয়ের সাক্ষী তো এখনো দিল্লীতে রয়েছে। তিনি তার গালিকে মাসআলা বানিয়ে এভাবে উত্তর দিলেন। যাই হোক, আমার ওয়ালেদ ছাহেব রহ. বললেন, তুমি এ কিতাবে যে তরীকা অবলম্বন করেছো তা ইসলাহের তরীকা নয়। এটা ফাসাদ বিস্তারের তরীকা। এর কারণে যে মানুষের মনে কষ্ট দেওয়া হবে তা গোনাহ। এর কারণে যদি কেউ হক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তার গোনাহ তোমার উপর বর্তাবে। তাই এটা সঠিক পদ্ধতি নয়। আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ তা'আলা আমার উপর ফযল ও করম করেছিলেন ফলে হযরত ওয়ালেদ ছাহেব রহ.-এর কথা আমার অন্তরে বসে গিয়েছিলো। আলহামদুলিল্লাহ, তখন আমি বললাম, হযরত! আমি আপত্তিজনক সব কথা ঠিক করে পুনরায় লিখবো। সুতরাং আমি ঐ দুই শ' পৃষ্ঠা কিতাবের আপত্তিজনক সব কথা ঠিক করে এবং তীর্যকপূর্ণ সমস্ত বাক্য ও উপস্থাপন বাদ দিয়ে নতুন করে কিতাব লিখি। যা এখন 'হামারে আয়েলী মাসায়েল' (ہمارے عائلی مسائل) নামে ছেপে বের হয়েছে।
সে সময় হযরত ওয়ালেদ মাজেদ রহ. আরেকটি কথা বলেছিলেন। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে তার উপর আমল করার তাওফীক দান করুন। তিনি বলেছিলেন- যখনই কোনো কথা বলবে বা লিখবে, তখন চিন্তা করবে যে, আমাকে এ কথা কোনো আদালতে প্রমাণ করতে হবে। তোমার কাছে যদি এমন পোক্ত প্রমাণ থাকে যে, তুমি আদালতে প্রমাণ করতে পারবে তাহলে সে কথা বলবে বা লিখবে। কিন্তু তোমার কাছে যদি এমন প্রমাণ না থাকে তাহলে এমন কথা না মুখে বলবে, না কলমে লিখবে। কেন? কারণ, হতে পারে কেউ তোমার বিরুদ্ধে মামলা করে দিলো আর তোমাকে আদালতে তা প্রমাণ করতে হলো। আর দুনিয়ার কোনো আদালতে যদি তোমাকে প্রমাণ করতে নাও হয়, আখেরাতে তো একটা আদালত নিশ্চয়ই আসছে, যেখানে অবশ্যই তোমাকে প্রমাণ করতে হবে। এ কারণে এমন কোনো কথা মুখ দিয়ে বের করবে না, যা প্রমাণ করতে পারবে না।
এটা হলো একজন মুসলমানের সঠিক কর্মপদ্ধতি, একজন তালিবে ইলমের সঠিক কর্মপদ্ধতি এবং একজন হকের দা'য়ীর সঠিক কর্মপদ্ধতি যে, তার দ্বারা কেউ সামান্যতম কষ্টও পাবে না। সে অন্যের জন্যে শান্তির পয়গাম বয়ে আনবে। মুসলমানের সঠিক চিত্র তুলে ধরবে। সরকারে দো-আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত হাদীস শরীফে আমাদেরকে এ হুকুমই দিয়েছেন। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা যদি আমাদের অন্তরে এই হাদীসের উপর আমল করার অনুভূতি সৃষ্টি করে দেন এবং এ সম্পর্কে শরীয়তের যে আহকাম রয়েছে সেগুলোর প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি করে দেন তাহলে এ মজলিস সার্থক, ইন্‌শাআল্লাহ। আর যদি তা না হয় তাহলে ভাই! লম্বা-চওড়া তাকরীরও বেকার, লম্বা-চওড়া দরসও বেকার এবং জ্ঞান-গবেষণাও বেকার। এখন আমি দু'আ করছি- আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাঁর ফযল ও করমে এবং তাঁর রহমতে আমাদেরকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই বাণী সঠিকভাবে বোঝার এবং তার উপর সঠিকভাবে আমল করার তাওফীক দান করুন।
'আদাবুল মুআশারাত' নামে হযরত হাকীমুল উম্মাত থানভী রহ.-এর একটি পুস্তিকা আছে। পুস্তিকাটি কলেবরে ছোট হলেও তাতে মুআশারাতের অনেক তা'লীম সন্নিবেশিত হয়েছে। তালিবে ইলমদের সেটি মুতালাআ করা উচিত। আমাদের দারুল উলুম করাচীতে প্রতিদিন আসরের নামাযের পর আমরা তার এক-দুই সতর করে পড়ে শুনিয়ে থাকি। এখানেও যদি এ নিয়ম চালু করা হয় তাহলে খুব ভালো হবে। আর তা না হলে প্রত্যেক তালিবে ইলম ব্যক্তিগতভাবে তা মুতালাআ করবে এবং সে অনুপাতে নিজের আমলকে শুধরানোর চেষ্টা করবে। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আমাদের সকলকে তাওফীক দান করুন।

টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৯, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫৮, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৫৫১, সুনানে নাসাঈ, হাদীস নং ৪৯১০, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ২১২২
২. সূরা নাহল: ৫
৩. সূরা নাহল: ৮
৪. সূরা বনী ইসরাইল: ৮১
৫. সূরা আ'রাফ: ৬৬
৬. সূরা আ'রাফ: ৬৭
৭. সূরা তহা : ৪৪
৮. সূরা তহা: ৪৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00