📄 হাসান হোসাইন রাযি. এর একটি ঘটনা
ঘটনা বর্ণিত আছে যে, একবার হযরত হাসান ও হুসাইন রাযি, সম্ভবত ফুরাত নদীর তীর দিয়ে যাচ্ছিলেন। দু'জনে দেখলেন- নদীর তীরে এক বুড়ো মানুষ ওযু করছে, কিন্তু ভুল পদ্ধতিতে। তাদের চিন্তা হলো- তার ভুল ধরে দেওয়া উচিত। কারণ, অন্যের ভুল ধরে দেওয়াও একটি দ্বীনি দায়িত্ব। কিন্তু তিনি হলেন বড়ো আর আমরা হলাম ছোট, তাকে কীভাবে বলা উচিত, যাতে তার মন ভেঙ্গে না যায় এবং অসন্তুষ্ট না হয়? সুতরাং উভয়ে পরামর্শ করলেন এবং উভয়ে মিলে বুড়ো লোকটির কাছে গেলেন। কাছে গিয়ে বসলেন। কথাবার্তা বলতে আরম্ভ করলেন। তারপর বললেন, আপনি আমাদের বড়ো, আমরা ওযু করলে আমাদের সন্দেহ হয় যে, ওযু সুন্নাত মোতাবেক হয় কি না, এজন্যে আমরা আপনার সামনে ওযু করি, আপনি একটু দেখুন, আমাদের ওযুর মধ্যে কোনো ভুল-ভ্রান্তি বা সুন্নাতের খেলাফ কিছু নাই তো? থাকলে বলে দিন। সুতরাং দুই ভাই তাদের সামনে ওযু করলেন। তারপর তাকে জিজ্ঞাসা করলেন- এবার বলুন- আমরা এতে কোনো ভুল তো করিনি। বুড়ো লোকটি তার ভুল বুঝতে পারলেন যে, আমি যে পদ্ধতিতে ওযু করেছি তা ভুল ছিলো এবং এদের পদ্ধতি সঠিক। বুড়ো লোকটি বললেন, আসলে আমিই ভুল পদ্ধতিতে ওযু করেছি। এবার তোমাদের বলায় আমার কাছে পরিষ্কার হয়েছে। ইনশাআল্লাহ, এখন থেকে সঠিক পদ্ধতিতে ওযু করবো। এই হলো সেই পদ্ধতি, এ আয়াতে যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে,
اُدْعُ إِلَى سَبِيْلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ
'নিজের প্রভুর পথের দিকে হিকমতের সাথে আহবান করো।'
তুমি আল্লাহর ফৌজদার নও যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাকে দারোগা বানিয়েছেন। তাই তুমি মানুষকে ধমক দিতে থাকবে আর তাদেরকে লাঞ্ছিত করতে থাকবে। বরং তুমি হলে আয়না। আয়না যেমন শুধু বাস্তব অবস্থা বলে দেয়, ধমক দেয় না, কঠোরতা করে না, তোমাদেরও তেমনই করা উচিত। এ শিক্ষাটি الْمُؤْمِنُ مِرْآةُ الْمُؤْمِنِ হাদীস থেকে পাওয়া যায়।
টিকাঃ
২. মানাকেবে ইমামে আজম কুরদরী কৃত খন্ডঃ ১, পৃঃ ৩৯-৪০
৩. নাহাল: ১২৫
📄 একের দোষ অন্যের কাছে বলবে না
হযরত হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ.-এ হাদীসের অধীনে একটি রহস্য এই বলেছেন যে, আয়নার কাজ হলো, যে ব্যক্তি তার সামনে আসবে তার চেহারায় যদি কোনো দাগ থাকে তাহলে আয়না শুধু তাকেই বলবে যে, তোমার মধ্যে এই দাগ রয়েছে। আয়না অন্যদেরকে বলবে না যে, অমুকের মধ্যে এই দাগ রয়েছে। অন্যদের সামনে এই দোষের কথা আলোচনাও করবে না। এমনিভাবে মুমিনও একটি আয়না। সে যদি অন্যের মধ্যে কোনো দোষ দেখে তাহলে শুধু তাকেই নির্জনে-নীরবে বলে দিবে যে, তোমার মধ্যে এই দোষ রয়েছে। অন্যের নিকট গিয়ে বলা যে, অমুকের মধ্যে এ দোষ রয়েছে এবং অন্যের সামনে এর আলোচনা করা ঈমানদারের কাজ নয়। এটা তো প্রবৃত্তির কাজ। অন্তরে যদি এ চিন্তা থাকে যে, আমি আল্লাহকে খুশি করার জন্যে তার এ দোষের কথা বলে দিচ্ছি, তাহলে কখনোই সে অন্যের সামনে এর আলোচনা করবে না। আর মনে প্রবৃত্তির তাড়না থাকলে এই দোষের কারণে তাকে লাঞ্ছিত করার চিন্তা জাগবে। অথচ মুসলমানকে লাঞ্ছিত করা হারাম।
📄 আমাদের কর্মপদ্ধতি
আজ আমরা আমাদের সমাজে জরিপ চালিয়ে দেখলে এমন লোক খুব কম চোখে পড়বে, যে অন্যের ভুল দেখে তার কল্যাণ কামনা করে বলবে যে, তোমার এ বিষয়টি আমার পছন্দ হলো না বা এ কাজ শরীয়তবিরোধী। কিন্তু বিভিন্ন মজলিসের মধ্যে তার ভুলের আলোচনা করার লোক অসংখ্য দেখা যাবে। যার ফলে গীবতের গোনাহে লিপ্ত হচ্ছে। অপবাদের গোনাহে লিপ্ত হচ্ছে। মিথ্যা ও অতিরঞ্জনের গোনাহ হচ্ছে। একজন মুসলমানের দুর্নাম করার গোনাহ হচ্ছে। পক্ষান্তরে উত্তম পদ্ধতি এই ছিলো যে, নির্জনে তাকে বুঝিয়ে দিবে- তোমার মধ্যে এই দোষ রয়েছে তা দূর করো। তাই কোনো মুসলমান ভাইয়ের মধ্যে কোনো দোষ দেখলে অন্যদেরকে বলবে না, শুধু তাকে বলবে। এই শিক্ষাও الْمُؤْمِنُ مِرَاةُ الْمُؤْمِنِ হাদীস দ্বারা জানা যায়। ৪
টিকাঃ
৪. সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪২৭২
📄 ভুল ধরে দিয়ে নিরাস হয়ে বসে পড়েনা
এ হাদীস থেকে একটি শিক্ষা এই লাভ হয় যে, আয়নার কাজ হলো, যে ব্যক্তি তার সামনে এসে দাঁড়ায় আয়না তার দোষের কথা বলে দেয় যে, তোমার মধ্যে এই দোষ রয়েছে। দ্বিতীয়বার যদি ঐ ব্যক্তি আয়নার সামনে আসে তাহলে দ্বিতীয়বারও বলে দেয়। যখন তৃতীয়বার সামনে আসে তখন তৃতীয়বারও বলে। কিন্তু ঐ আয়না তোমার পিছনে লাগবে না যে, তোমার এই দোষ অবশ্যই দূর করো। ঐ ব্যক্তি যদি তার দোষ দূর না করে তাহলে আয়না রাগ হয়ে এবং ক্লান্ত হয়ে হার মেনে বসে যায় না। তুমি তোমার দোষ দূর করো না, তাই আর তোমাকে বলবো না। বরং ঐ ব্যক্তি যতোবার আয়নার সামনে আসবে আয়না ততোবারই তাকে বলবে যে, এই দোষ এখনো বিদ্যমান আছে। সে বলা ছাড়বে না এবং মনও খারাপ করবে না। দারোগা হয়ে বলবে না যে, এ ব্যক্তি যতোক্ষণ পর্যন্ত নিজের দোষ দূর না করবে ততোক্ষণ পর্যন্ত তার সাথে সম্পর্ক রাখবো না।