📄 যে ভুল ধরে দিবে সে তিরস্কার করবে না
এ হাদীসে দ্বিতীয় শিক্ষা রয়েছে ঐ ব্যক্তির জন্যে, যে ভুল ধরে দেয়। হাদীসে যে ভুল ধরে দেয় তাকে আয়নার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। আয়নার কাজ এই যে, কোনো ব্যক্তি তার সামনে এসে দাঁড়ালে সে বলে যে, তোমার চেহারায় এতো বড়ো দাগ লেগে আছে। একথা বলার ক্ষেত্রে সে কম-বেশি করে না এবং ঐ ব্যক্তিকে তিরস্কারও করে না যে, এই দাগ কোথেকে লাগিয়েছো, বরং শুধু দাগের কথা বলে দেয়। এমনিভাবে যে মুমিন ভুল ধরে দিবে, সে আয়নার মতো শুধু ততোটুকু ভুলের কথা বলবে, যতোটুকু তার মধ্যে বাস্তবেই বিদ্যমান রয়েছে। বাড়িয়ে বলবে না, অতিরঞ্জন করবে না। এমনিভাবে শুধু তাকে বলবে যে, তোমার মধ্যে এই দোষ রয়েছে। কিন্তু এই দোষের কারণে তাকে তিরস্কার করা বা মানুষের সামনে তাকে লাঞ্ছিত করা, এটা ঈমানদারের কাজ নয়। কারণ, ঈমানদার তো আয়নার মতো। এজন্যে ততোটুকু ভুলের কথাই বলবে, যতোটুকু তার মধ্যে রয়েছে। তাকে তিরস্কার করবে না।
📄 যে ভুল করে তাকে লাঞ্ছিত করো না
আজকাল আমরা এ বিষয়ে লক্ষই করি না যে, অন্য মুমিনকে তার ভুলের ব্যাপারে সতর্ক করা আমার একটি দায়িত্ব। একজন মুসলমান ভুল পদ্ধতিতে নামায পড়ছে এবং তোমার জানা আছে যে, এ পদ্ধতি ভুল, তখন তাকে তার ভুল সম্পর্কে বলে দেওয়া তোমার উপর ফরয। কারণ, এটাও 'আমর বিল মা'রূফ' ও 'নাহি আনিল মুনকার'-এর অন্তর্ভুক্ত। আর এটা সব মুসলমানের উপর ফরয। আজকাল কারো এ কথার অনুভূতিই জাগে না যে, তার ভুল ধরে দেই, বরং মনে করে যে, ভুল পড়ছে পড়ুক। আর যদি কারো ভুল ধরার অনুভূতি হয়ও তাহলে তার এতো তীব্র অনুভূতি হয় যে, সে নিজেকে আল্লাহর সৈন্য মনে করে। অন্যের ভুল যখন সে ধরে দেয়, তখন ধমকাতে আরম্ভ করে। মানুষের সামনে তাকে লজ্জিত করতে আরম্ভ করে। অথচ হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন যে, তুমি হলে আয়না। তুমি ধমক দিবে না, তিরস্কার করবে না, তাকে লাঞ্ছিত করবে না। বরং এমন পদ্ধতিতে বলবে, যেন তার অন্তরে কথা গেঁথে যায়।
📄 হাসান হোসাইন রাযি. এর একটি ঘটনা
ঘটনা বর্ণিত আছে যে, একবার হযরত হাসান ও হুসাইন রাযি, সম্ভবত ফুরাত নদীর তীর দিয়ে যাচ্ছিলেন। দু'জনে দেখলেন- নদীর তীরে এক বুড়ো মানুষ ওযু করছে, কিন্তু ভুল পদ্ধতিতে। তাদের চিন্তা হলো- তার ভুল ধরে দেওয়া উচিত। কারণ, অন্যের ভুল ধরে দেওয়াও একটি দ্বীনি দায়িত্ব। কিন্তু তিনি হলেন বড়ো আর আমরা হলাম ছোট, তাকে কীভাবে বলা উচিত, যাতে তার মন ভেঙ্গে না যায় এবং অসন্তুষ্ট না হয়? সুতরাং উভয়ে পরামর্শ করলেন এবং উভয়ে মিলে বুড়ো লোকটির কাছে গেলেন। কাছে গিয়ে বসলেন। কথাবার্তা বলতে আরম্ভ করলেন। তারপর বললেন, আপনি আমাদের বড়ো, আমরা ওযু করলে আমাদের সন্দেহ হয় যে, ওযু সুন্নাত মোতাবেক হয় কি না, এজন্যে আমরা আপনার সামনে ওযু করি, আপনি একটু দেখুন, আমাদের ওযুর মধ্যে কোনো ভুল-ভ্রান্তি বা সুন্নাতের খেলাফ কিছু নাই তো? থাকলে বলে দিন। সুতরাং দুই ভাই তাদের সামনে ওযু করলেন। তারপর তাকে জিজ্ঞাসা করলেন- এবার বলুন- আমরা এতে কোনো ভুল তো করিনি। বুড়ো লোকটি তার ভুল বুঝতে পারলেন যে, আমি যে পদ্ধতিতে ওযু করেছি তা ভুল ছিলো এবং এদের পদ্ধতি সঠিক। বুড়ো লোকটি বললেন, আসলে আমিই ভুল পদ্ধতিতে ওযু করেছি। এবার তোমাদের বলায় আমার কাছে পরিষ্কার হয়েছে। ইনশাআল্লাহ, এখন থেকে সঠিক পদ্ধতিতে ওযু করবো। এই হলো সেই পদ্ধতি, এ আয়াতে যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে,
اُدْعُ إِلَى سَبِيْلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ
'নিজের প্রভুর পথের দিকে হিকমতের সাথে আহবান করো।'
তুমি আল্লাহর ফৌজদার নও যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাকে দারোগা বানিয়েছেন। তাই তুমি মানুষকে ধমক দিতে থাকবে আর তাদেরকে লাঞ্ছিত করতে থাকবে। বরং তুমি হলে আয়না। আয়না যেমন শুধু বাস্তব অবস্থা বলে দেয়, ধমক দেয় না, কঠোরতা করে না, তোমাদেরও তেমনই করা উচিত। এ শিক্ষাটি الْمُؤْمِنُ مِرْآةُ الْمُؤْمِنِ হাদীস থেকে পাওয়া যায়।
টিকাঃ
২. মানাকেবে ইমামে আজম কুরদরী কৃত খন্ডঃ ১, পৃঃ ৩৯-৪০
৩. নাহাল: ১২৫
📄 একের দোষ অন্যের কাছে বলবে না
হযরত হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ.-এ হাদীসের অধীনে একটি রহস্য এই বলেছেন যে, আয়নার কাজ হলো, যে ব্যক্তি তার সামনে আসবে তার চেহারায় যদি কোনো দাগ থাকে তাহলে আয়না শুধু তাকেই বলবে যে, তোমার মধ্যে এই দাগ রয়েছে। আয়না অন্যদেরকে বলবে না যে, অমুকের মধ্যে এই দাগ রয়েছে। অন্যদের সামনে এই দোষের কথা আলোচনাও করবে না। এমনিভাবে মুমিনও একটি আয়না। সে যদি অন্যের মধ্যে কোনো দোষ দেখে তাহলে শুধু তাকেই নির্জনে-নীরবে বলে দিবে যে, তোমার মধ্যে এই দোষ রয়েছে। অন্যের নিকট গিয়ে বলা যে, অমুকের মধ্যে এ দোষ রয়েছে এবং অন্যের সামনে এর আলোচনা করা ঈমানদারের কাজ নয়। এটা তো প্রবৃত্তির কাজ। অন্তরে যদি এ চিন্তা থাকে যে, আমি আল্লাহকে খুশি করার জন্যে তার এ দোষের কথা বলে দিচ্ছি, তাহলে কখনোই সে অন্যের সামনে এর আলোচনা করবে না। আর মনে প্রবৃত্তির তাড়না থাকলে এই দোষের কারণে তাকে লাঞ্ছিত করার চিন্তা জাগবে। অথচ মুসলমানকে লাঞ্ছিত করা হারাম।