📄 যে সব আলেম ভুল ধরে দেন তাদের উপর আপত্তি কেন
আজকাল মানুষ আলেমদের প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলে যে, এই আলেমগণ প্রত্যেককে কাফের ও ফাসেক বানিয়ে থাকে। কারো উপর কাফের হওয়ার ফতওয়া দেয়, কারো উপর ফাসেক হওয়ার ফতওয়া দেয়, কারো উপর বিদআতী হওয়ার ফতওয়া দেয়। তাদের সারাজীবন অন্যদেরকে কাফের বানানোর কাজেই কাটে। এর উত্তরে হযরত মাওলানা আশরাফ আলী রহ. বলেন, আলেমগণ মানুষকে কাফের বানান না, কাফের বলেন। কোনো মানুষ যখন কুফরী কাজ করে, তখন সে নিজেই মূলত কুফরী কাজে লিপ্ত হয়। তারপর ওলামায়ে কেরাম শুধু বলেন যে, তোমার এ কাজটি কুফরী। আয়না যেমন তোমাকে বলে যে, তুমি কদাকার, তোমার চেহারায় দাগ লেগেছে। আয়না কদাকার বানায় না এবং দাগ লাগায় না, তেমনিভাবে ওলামায়ে কেরামও শুধু বলেন যে, তুমি যে আমল করেছো তা কুফরী কাজ, ফাসেকী কাজ বা বিদআতী কাজ। তাই যেভাবে আয়নাকে গাল-মন্দ করা হয় না এবং আয়নার উপর দোষারোপ করা হয় না যে, আয়না আমার চেহারায় দাগ লাগিয়ে দিয়েছে, ঠিক একইভাবে ওলামায়ে কেরামের উপরেও এই দোষ চাপানো উচিত নয় যে, তারা কাফের বা ফাসেক বানিয়েছে। তাদের প্রতিও অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা উচিত নয়। বরং তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত যে, তারা আমার দোষ বলে দিয়েছে। এখন আমি তা সংশোধন করে নিবো।
📄 ডাক্তার রোগ বলে দেয়, রোগী বানায় না
উদাহরণস্বরূপ, কতক সময় মানুষের নিজের রোগের কথা জানা থাকে না যে, আমার মধ্যে এই রোগ রয়েছে। কিন্তু যখন সে কোনো ডাক্তারের কাছে যায়, আর সে বলে দেয় যে, তোমার মধ্যে এই রোগ রয়েছে, তখন ডাক্তারকে বলা হয় না যে, তুমি এ ব্যক্তিকে রোগী বানিয়ে দিয়েছো। বরং বলা হবে যে, তোমার মধ্যে পূর্ব থেকে যেই রোগ ছিলো, আর তুমি সে ব্যাপারে গাফেল ছিলে, ডাক্তার শুধু সেই রোগ সম্পর্কে বলে দিয়েছে যে, তোমার মধ্যে এই রোগ রয়েছে, এর চিকিৎসা করো।
📄 একটি শিক্ষণীয় ঘটনা
আমার ওয়ালেদ মাজেদ হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ শফী ছাহেব রহ. তাঁর নিজের এ ঘটনা শুনিয়েছেন যে, একবার আমার ওয়ালেদ ছাহেব (অর্থাৎ, আমার দাদা) অসুস্থ ছিলেন। দেওবন্দে অবস্থান করছিলেন। সে সময় দিল্লীতে একজন বিখ্যাত অন্ধ হাকীম ছিলেন। অত্যন্ত দক্ষ এবং বিজ্ঞ হাকীম ছিলেন। তার মাধ্যমে চিকিৎসা চলছিলো। আমি ওয়ালেদ ছাহেবের অবস্থা বলে ঔষধ আনার জন্যে দেওবন্দ থেকে দিল্লী যাই। আমি তান দাওয়াখানায় পৌছি। ওয়ালেদ ছাহেবের অবস্থা বলে ঔষধ দিতে বলি। হাকীম ছাহেব ছিলেন অন্ধ। তিনি আমার আওয়াজ শুনে বললেন, আমি তোমার ওয়ালেদ ছাহেবের ঔষধ তো পরে দেবো, প্রথমে তুমি নিজের জন্যে ঔষধ নাও। আমি বললাম, আমি তো ঠিক আছি, কোনো রোগ নেই। হাকীম ছাহেব বললেন, না, তুমি নিজের জন্যে এ ঔষধ নাও। সকালে এটা খাবে, দুপুরে এটা খাবে এবং সন্ধ্যায় এটা খাবে। এক সপ্তাহ পরে যখন আসবে তখন তোমার অবস্থা জানাবে। সুতরাং তিনি প্রথমে আমাকে ঔষধ দিলেন তারপর ওয়ালেদ ছাহেবের ঔষধ দিলেন। আমি যখন বাড়িতে ফিরে আসলাম এবং ওয়ালেদ ছাহেবকে বললাম, হাকীম সাহেব এভাবে আমাকেও ঔষধ দিয়েছেন। ওয়ালেদ ছাহেব বললেন, যেভাবে হাকীম ছাহেব বলেছেন সেভাবে করো। তার ঔষধ ব্যবহার করো। এক সপ্তাহ পর যখন পুনরায় হাকীম সাহেবের কাছে গেলাম তখন আমি বললাম যে, হাকীম সাহেব এখনো পর্যন্ত আমার এ রহস্য বুঝে আসেনি এবং কোনো রোগ ধরা পড়েনি। হাকীম সাহেব বললেন, গত সপ্তাহে তুমি যখন এসেছিলে তখন তোমার আওয়াজ শুনে আমার অনুমান হয় যে, তোমার ফুসফুসে সমস্যা হয়েছে এবং পরবর্তীতে টিবি রোগ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এজন্যে আমি তোমাকে ঔষধ দিয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ! এখন তুমি এ রোগ থেকে বেঁচে গিয়েছো।
দেখুন! রোগীর খবর নেই যে, আমার মধ্যে কী রোগ রয়েছে? ডাক্তার বলে দিচ্ছে যে, তোমার মধ্যে এই রোগ রয়েছে, এটা তার দয়া। তাই একথা বলা হবে না যে, ডাক্তার রোগী বানিয়ে দিয়েছে। বরং সে বলে দিয়েছে যে, তোমার মধ্যে এই রোগ আছে, যাতে তুমি চিকিৎসা করতে পারো। এখন এভাবে বলার দ্বারা ডাক্তারের প্রতি রাগান্বিত হওয়া এবং অসন্তুষ্ট হওয়ার প্রয়োজন নেই।
📄 যে রোগ বলে দেয় তার প্রতি অসন্তুষ্ট হওয়া উচিত নয়
তবে রোগ বলার বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। কেউ আপনার দোষের কথা এবং আপনার খারাবীর কথা উত্তম পদ্ধতিতে বললো, আর কেউ খারাপভাবে বললো। কেউ যদি আপনার দোষের কথা এমন পদ্ধতিতে বলে, যেভাবে বলা সমীচীন নয়, তারপরও সে আপনাকে আপনার একটি রোগ সম্পর্কে অবগত করলো। এজন্যে তার প্রতি আপনার কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। আরবী ভাষার একটি কবিতার অর্থ এই- আমার প্রতি সবচে' বড়ো কৃপাশীল সেই, যে আমাকে দোষের হাদিয়া দেয়। যে বলে দেয় আমার মধ্যে কী দোষ রয়েছে?'
আর যে ব্যক্তি প্রশংসা করছে- তুমি এমন, তুমি তেমন। যে ব্যক্তি উপরে তুলে ধরছে, যার ফলে অন্তরে অহংকার ও গর্ব সৃষ্টি হচ্ছে, বাহ্যিকভাবে দেখতে তো এটা ভালো মনে হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে সে ক্ষতি করছে। যে ব্যক্তি আপনার দোষ বলছে তার প্রতি কৃতজ্ঞ হোন। মোটকথা, এ হাদীস একদিকে তো এ কথা বলছে যে, কোনো ব্যক্তি যদি তোমাকে তোমার দোষ বলে তাহলে তার প্রতি অসন্তুষ্ট না হয়ে তার এ বলাকে গণীমত মনে করো। যেমন আয়নার বলাকে গণীমত মনে করে থাকো।