📄 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' কালেমার সম্পর্ক
যাই হোক, এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সমস্ত মুমিন পরস্পরে ভাই, সে তোমার ভাষায় কথা না বললেও এবং তোমার বংশের লোক না হলেও। যদি মুমিন হয়ে থাকে তাহলে সে তোমার ভাই।
আল্লাহ তা'আলা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' কালেমার এমন মজবুত সম্পর্ক জুড়ে দিয়েছেন যে, এটা কোনো ভাষার মুখাপেক্ষী নয়। আমি ঐ দৃশ্য কখনোই ভুলতে পারি না যে, আজ থেকে প্রায় পনের-বিশ বছর পূর্বে আমার চীনে যাওয়ার সুযোগ হয়। সে সময় চীনে বাইরের লোকদের নতুন আসা-যাওয়া শুরু হয়েছিলো। এখনো সেখানে বিরাট সংখ্যক মুসলমানের বাস রয়েছে। মুসলমানদের একটি অঞ্চল দিয়ে আমার যাওয়ার সুযোগ হয়। তখন সেখানে তুষার পড়ছিলো। তাপমাত্রা ষোল ডিগ্রি মাইনাস ছিলো। ফজরের সময় আমাদের এক এলাকা অতিক্রম করতে হয়। সেখানে মুসলমানদের অধিবাস রয়েছে। ঐ অঞ্চলের মুসলমানরা জানতে পারে যে, পাকিস্তানের মুসলমানদের একটি প্রতিনিধি দল আসছে। সুতরাং তারা কয়েক ঘণ্টা পূর্ব থেকে পাহাড়ী অঞ্চলের মধ্যে তুষারপাতের মধ্যে শুধুমাত্র বাইরের মুসলমানদেরকে এক ঝলক দেখার জন্যে দাঁড়িয়ে ছিলো। যখন আমাদের কাফেলা তাদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করে তখন তাদের মুখে শুধু একটি শ্লোগান ছিলো- 'আসসালামু আলাইকুম'। সালাম করতেই তাদের চোখ থেকে অশ্রু ঝরে পড়ছিলো। কারণ, তারা জীবনে এই প্রথম বাইরের কোনো মুসলমানের চেহারা দেখছিলো। আমি চিন্তা করছিলাম যে, আমরা না তাদের ভাষা জানি, না তাদের সাথে কথা বলতে পারি, না এরা আমাদের কথা বুঝবে, না আমরা এদের কথা বুঝবো। পারিবারিকভাবে, বংশীয়ভাবে, ভাষার দিক থেকে তাদের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই, কিন্তু শুধু এ জন্যে অন্তরে ভালোবাসার সাগর তরঙ্গায়িত হচ্ছিলো যে, তারা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' পাঠ করে। إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ -এর এক দৃশ্য আল্লাহ তা'আলা সেখানে আমাকে দেখিয়েছেন।
📄 কুরআনী শিক্ষা থেকে দূরত্বের ফল
মন-মগজে যদি একথা বসে যায় যে, প্রত্যেক মুসলমান আমার ভাই, তাহলে না জানি কতো ঝগড়া, কতো ফাসাদ, কতো লড়াই ও কতো হত্যাকাণ্ড খতম হয়ে যায়। আফসোস এই যে, আজ আমরা এ শিক্ষা ভুলে যাচ্ছি। আজ মুসলমান মুসলমানের গলা কাটছে। আজ মুসলমান মুসলমানের বিরুদ্ধে সারিবদ্ধ। আজ মুসলমান মুসলমানকে হত্যা করার চিন্তায় লিপ্ত। মাযহাবের নামে, দ্বীনের নামে, ইবাদতের নামে এসব কাজ হচ্ছে। ইবাদতখানাও নিরাপদ নয়। সেগুলোর উপরও আক্রমণ করা হচ্ছে। এসব বিপর্যয় একারণে হচ্ছে যে, আজ আমরা কুরআনে কারীমের শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাচ্ছি।
📄 মুসলমানকে হত্যা করার শাস্তি
আজ আমরা অভ্যাসগত কিছু ইবাদতের নাম দিয়েছি দ্বীন। কিন্তু দ্বীনের বিস্তৃত যেই শিক্ষা কুরআনে কারীম আমাদেরকে দান করে, আমরা তা থেকে কেবল গাফেলই নই, বরং তাকে দ্বীনের অংশ বলে স্বীকার করতেও প্রস্তুত নই। কুরআনে কারীমে আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَمَنْ يَّقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَآؤُهُ جَهَنَّمُ خٰلِدًا فِیْهَا 'যে ব্যক্তি কোনো মুমিনকে জেনে-শুনে হত্যা করবে তার শাস্তি জাহান্নাম, তার মধ্যে সে চিরদিন অবস্থান করবে।'৭ অন্যত্র ইরশাদ করেন, مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا 'যদি কোনো ব্যক্তি কোনো একজন মানুষকে কাউকে হত্যা করা বা জমিনে বিপর্যয় সৃষ্টি করা ব্যতীত হত্যা করে, তাহলে ঐ ব্যক্তি এমন, যেমন কি না সে সমস্ত মানুষকে হত্যা করেছে।'৮ যেই দ্বীনের মধ্যে এমন সব হেদায়েত রয়েছে, সেই দ্বীনের অনুসারী হয়ে একে অপরকে হত্যা করার কাজে জড়িত। এতো বড়ো আপদ আজ আমাদের উপর চেপে বসেছে! আল্লাহ তা'আলা নিজ দয়ায় আমাদেরকে এ থেকে বাঁচার তাওফীক দান করুন।
টিকাঃ
৭. নিসা: ৯৩
৮. মায়েদা: ৩২
📄 এসময় কাউকে সঙ্গ দিবে না
এ সম্পর্কে শেষ কথা এই বলছি যে, কুরআনের আয়াতে যে হুকুম দেওয়া হয়েছে যে, জালেমের পক্ষ অবলম্বন করবে না, বরং মাজলুমের পক্ষ অবলম্বন করবে এ হুকুম তখন, যখন একথা স্পষ্টভাবে জানা যাবে যে, এ ব্যক্তি ন্যায়ের উপর আছে এবং অপর ব্যক্তি আছে অন্যায়ের উপর। তখন ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিকে সঙ্গ দেওয়া ফরয। কিন্তু অনেক সময় এমন হয় যে, সেখানে হক পরিষ্কার হয় না। যেমন দুই দল পরস্পরে লড়ছে, কিন্তু বোঝা যাচ্ছে না যে, কে হকের উপর, আর কে বাতিলের উপর আছে? এমন অবস্থা সম্পর্কে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে ইরশাদ করেছেন যে, এমন এক সময় আসবে, যখন দুই দল পরস্পরে লড়বে এবং উভয় দলকে মুসলমান বলা হবে এবং এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা কঠিন হবে যে, কে হকের উপর আছে, আর কে বাতিলের উপর? হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন যে, এসব লোক অন্ধ পতাকার নিচে লড়বে। এমন সময়ের ব্যাপারে তিনি এ হেদায়েত দিয়েছেন যে,
فَاعْتَزِلْ تِلْكَ الْفِرَقَ كُلَّهَا
তোমরা সেসময় সমস্ত দল থেকে পৃথক থাকবে। কাউকে সঙ্গ দিবে না। কাউকে সাহায্য করবে না। কারো বিরোধিতাও করবে না। বরং নীরব থেকে নিজের কাজ করতে থাকবে। কারণ, তোমরা যদি কাউকে সঙ্গ দাও, তখন এমন হতে পারে যে, কোনো মাজলুমের উপর তোমাদের পক্ষ থেকে জুলুম হয়ে গেলো। মোটকথা, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমতাবস্থায় পৃথক থাকার হুকুম দিয়েছেন এবং এমন অবস্থাকে ফেৎনা বলে আখ্যা দিয়েছেন।