📄 মুসলমানকে নিঃস্বভাবে ছেড়ে দিবে না
হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই মূলনীতি যেমন বলেছেন যে, সমস্ত মুসলমান ভাই ভাই, তেমনি তার ফলাফলও নিজেই বলেছেন যে,
الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ لَا يَظْلِمُهُ وَلَا يُسَلِّمُهُ 'প্রত্যেক মুসলমান অন্য মুসলমানের ভাই। তাই এক মুসলমান অন্য মুসলমানের উপর জুলুম করবে না এবং তাকে নিঃস্ব অবস্থায় ছেড়ে দিবে না।'
তার উপর জুলুম অত্যাচার হতে থাকলে তাকে জালেমের দয়ার উপর ছেড়ে দেওয়া মুসলমানের কাজ নয়। বরং তোমার উপর ফরয তার সঙ্গ দেওয়া, তাকে সাহায্য করা। এটা কেবল নৈতিক নির্দেশনা নয়, বরং তোমার ধর্মীয় দায়িত্ব যে, তোমার সাধ্য মতো জুলুম থেকে রক্ষা করবে।
টিকাঃ
৬. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২২৬২, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৬৫০, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১৩৪৬, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪২৪৮, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৫১০৩
📄 ধনী সমাজের অবস্থা
আজ আমাদের সমাজে এই দৃশ্য দেখা যায় যে, যারা গরীব কিসিমের লোক, তারা তো একে অপরের সাহায্যের জন্যে প্রস্তুত হয়, কিন্তু ধনী সমাজের মধ্যে কারো এর পরোয়াই নেই যে, আমার প্রতিবেশীর কি অবস্থা হচ্ছে? তার উপর দিয়ে কি পরিস্থিতি অতিবাহিত হচ্ছে? বরং প্রত্যেকে নিজের অবস্থা নিয়ে ব্যস্ত। একবার আমি নিজে এই দৃশ্য দেখেছি যে, একটি কার এক ব্যক্তিকে ধাক্কা মারে। লোকটি সড়কের উপর পড়ে যায়। গাড়িওয়ালা তাকে আঘাত করে চলে যায়। সে এ কথা চিন্তা করে না যে, আমার দ্বারা সীমালঙ্ঘন হয়েছে, তাই আমার কর্তব্য, তাকে কিছু চিকিৎসা বাবৎ সাহায্য করা। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলছেন যে, একজন মুমিনের এ কাজ নয় যে, সে অন্য মুমিনকে নিঃস্ব অবস্থায় ছেড়ে চলে যাবে, বরং যেখানে সুযোগ আছে এবং যতোটুকু সাধ্য আছে, অন্য মুমিনকে সাহায্য করবে।
📄 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' কালেমার সম্পর্ক
যাই হোক, এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সমস্ত মুমিন পরস্পরে ভাই, সে তোমার ভাষায় কথা না বললেও এবং তোমার বংশের লোক না হলেও। যদি মুমিন হয়ে থাকে তাহলে সে তোমার ভাই।
আল্লাহ তা'আলা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' কালেমার এমন মজবুত সম্পর্ক জুড়ে দিয়েছেন যে, এটা কোনো ভাষার মুখাপেক্ষী নয়। আমি ঐ দৃশ্য কখনোই ভুলতে পারি না যে, আজ থেকে প্রায় পনের-বিশ বছর পূর্বে আমার চীনে যাওয়ার সুযোগ হয়। সে সময় চীনে বাইরের লোকদের নতুন আসা-যাওয়া শুরু হয়েছিলো। এখনো সেখানে বিরাট সংখ্যক মুসলমানের বাস রয়েছে। মুসলমানদের একটি অঞ্চল দিয়ে আমার যাওয়ার সুযোগ হয়। তখন সেখানে তুষার পড়ছিলো। তাপমাত্রা ষোল ডিগ্রি মাইনাস ছিলো। ফজরের সময় আমাদের এক এলাকা অতিক্রম করতে হয়। সেখানে মুসলমানদের অধিবাস রয়েছে। ঐ অঞ্চলের মুসলমানরা জানতে পারে যে, পাকিস্তানের মুসলমানদের একটি প্রতিনিধি দল আসছে। সুতরাং তারা কয়েক ঘণ্টা পূর্ব থেকে পাহাড়ী অঞ্চলের মধ্যে তুষারপাতের মধ্যে শুধুমাত্র বাইরের মুসলমানদেরকে এক ঝলক দেখার জন্যে দাঁড়িয়ে ছিলো। যখন আমাদের কাফেলা তাদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করে তখন তাদের মুখে শুধু একটি শ্লোগান ছিলো- 'আসসালামু আলাইকুম'। সালাম করতেই তাদের চোখ থেকে অশ্রু ঝরে পড়ছিলো। কারণ, তারা জীবনে এই প্রথম বাইরের কোনো মুসলমানের চেহারা দেখছিলো। আমি চিন্তা করছিলাম যে, আমরা না তাদের ভাষা জানি, না তাদের সাথে কথা বলতে পারি, না এরা আমাদের কথা বুঝবে, না আমরা এদের কথা বুঝবো। পারিবারিকভাবে, বংশীয়ভাবে, ভাষার দিক থেকে তাদের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই, কিন্তু শুধু এ জন্যে অন্তরে ভালোবাসার সাগর তরঙ্গায়িত হচ্ছিলো যে, তারা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' পাঠ করে। إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ -এর এক দৃশ্য আল্লাহ তা'আলা সেখানে আমাকে দেখিয়েছেন।
📄 কুরআনী শিক্ষা থেকে দূরত্বের ফল
মন-মগজে যদি একথা বসে যায় যে, প্রত্যেক মুসলমান আমার ভাই, তাহলে না জানি কতো ঝগড়া, কতো ফাসাদ, কতো লড়াই ও কতো হত্যাকাণ্ড খতম হয়ে যায়। আফসোস এই যে, আজ আমরা এ শিক্ষা ভুলে যাচ্ছি। আজ মুসলমান মুসলমানের গলা কাটছে। আজ মুসলমান মুসলমানের বিরুদ্ধে সারিবদ্ধ। আজ মুসলমান মুসলমানকে হত্যা করার চিন্তায় লিপ্ত। মাযহাবের নামে, দ্বীনের নামে, ইবাদতের নামে এসব কাজ হচ্ছে। ইবাদতখানাও নিরাপদ নয়। সেগুলোর উপরও আক্রমণ করা হচ্ছে। এসব বিপর্যয় একারণে হচ্ছে যে, আজ আমরা কুরআনে কারীমের শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাচ্ছি।