📄 জালেমকে জুলুম থেকে বাধা দাও
একদিকে তো এই মূলনীতি বলেছেন যে, জালেমকে সঙ্গ দিও না, বরং মাজলুমের পক্ষ অবলম্বন করো। সেই জালেম তোমার বংশের হোক, তোমার দেশের হোক, বা তোমার ভাষাভাষি হোক। এই মূলনীতি বর্ণনার পর একদিন হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিস্ময়কর এই বক্তব্য দিলেন যে,
انْصُرْ أَخَاكَ ظَالِمًا أَوْ مَظْلُومًا
'নিজের ভাইয়ের সাহায্য করো, সে যদি জালেম হয় তবুও সাহায্য করো, আর যদি মাজলুম হয় তবুও সাহায্য করো। সাহাবায়ে কেরাম এ কথা শুনে খুবই অবাক হলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন যে, হে আল্লাহর রাসূল! মাজলুমকে সাহায্য করা তো বুঝে আসে, আমরা মাজলুমকে সাহায্য করবো, কিন্তু জালেমকে সাহায্য করার অর্থ কি? হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন যে, জালেমের সাহায্য এই যে, তাকে জুলুম থেকে প্রতিহত করবে।
যেহেতু সে জুলুম করার কারণে জাহান্নামের দিকে যাচ্ছে, নিজের আখেরাত বরবাদ করছে, আল্লাহ তা'আলার গযব মাথা পেতে নিচ্ছে, এখন তাকে সাহায্য করা এই যে, তাকে জুলুম থেকে বাধা দাও। তাকে বলো যে, তুমি যে পথে চলছো, তা জুলুমের পথ, দোযখের পথ, এথেকে বাঁচো। মানুষকে জাহান্নামে যাওয়া থেকে বাধা দেওয়া এবং আল্লাহর আযাব ও গযব থেকে বাঁচানো হলো প্রকৃত সাহায্য।
টিকাঃ
৪. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২২৬৩, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৬৮১, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২১৮১, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১১৫১১
📄 উভয়ের মধ্যে আপোস করিয়ে দাও
পবিত্র আয়াত যেই মূলনীতি বর্ণনা করেছে তা এই যে, মানুষ দেখবে জালেম কে, আর মাজলুম কে। জালেম যদি তার জুলুম থেকে ফিরে না আসে তাহলে তোমার উপর ফরয তার সঙ্গে লড়াই করা। যতোক্ষণ না সে আল্লাহর হুকুমের দিকে ফিরে আসে। এরপর বলেন, যদি সে আল্লাহর হুকুমের দিকে ফিরে আসে অর্থাৎ, তোমার কথা শোনে এবং জুলুম ছেড়ে দেয়, তাহলে এমতাবস্থায় এই দুই দলের মধ্যে আপোস করিয়ে দাও। জালেম অস্ত্র সমর্পন করলো এবং জুলুম থেকে ফিরে এলো, কিন্তু উভয় দলের অন্তরের মধ্যে এখনো ক্লেদ রয়েছে। এই ক্লেদ দূর করার জন্যে ইনসাফের সাথে উভয়ের মধ্যে আপোস করিয়ে দাও। এ কারণে যে, দুই দলের মধ্যে যখন বিবাদ হয় এবং উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রত হয়, তখন মোটের উপর একদল হকের উপর এবং অপরদল অন্যায়ের উপর থাকলেও লড়াইয়ের সময় উভয়ের পক্ষ থেকে কিছু না কিছু বাড়াবাড়ি হয়ে থাকে। প্রসিদ্ধ প্রবাদ আছে যে, একহাতে তালি বাজে না। মাজলুম ব্যক্তির পক্ষ থেকেও কোনো না কোনো ভুল অবশ্যই হয়েছে, যে কারণে লড়াইয়ের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। তাই জালেম যখন তার জুলুম থেকে ফিরে এলো, এবার প্রত্যেক দলকে ন্যায়সঙ্গতভাবে তার ভুল বুঝানোর চেষ্টা করো যে, তোমার এই অবস্থান ঠিক ছিলো, কিন্তু অমুক কথাটি ভুল ছিলো। আগামীতে তা থেকে বিরত থাকবে। এজন্যে সম্মুখে আল্লাহ তা'আলা বলেন, আপোস করার ক্ষেত্রে ন্যায়সঙ্গতভাবে কাজ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা ন্যায়বিচারকারীদেরকে পছন্দ করেন। প্রথম আয়াতে এই মূলনীতি বর্ণনা করেছেন।
📄 ইসলামী ভ্রাতৃত্বের ভিত্তি ঈমানের উপর
এরপর পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ তা'আলা এরচে' বড়ো মূলনীতি বর্ণনা করেছেন,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ 'সব ঈমানদার পরস্পরে ভাই ভাই।'
যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান রাখে, আল্লাহর কিতাবের উপর এবং আখেরাতের উপর ঈমান রাখে, সে-ই তোমার ভাই। এর মাধ্যমে এই মূলনীতি বলেছেন যে, ইসলামে যেই ভ্রাতৃত্ব রয়েছে, তা মূলত ঈমান ও আকীদার ভিত্তিতে। বর্ণ, বংশ, দেশ ও গোত্রের ভিত্তিতে নয়। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজ্বে ঘোষণা করেন যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের থেকে জাহেলিয়াতের অহমিকা, গর্ব ও অহংকারের সমস্ত উপকরণ বিলুপ্ত করে দিয়েছেন। তিনি আরো বলেন,
لَا فَضْلَ لِعَرَبِي عَلَى عَجَمِي وَلَا لِأَبْيَضَ عَلَى أَسْوَدَ إِلَّا بِالتَّقْوَى 'কোনো আরবের কোনো আজমের উপর কোনো প্রকারের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কোনো সাদার কোনো কালোর উপর শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কারো ফযীলত থাকলে তা কেবল তাকওয়ার ভিত্তিতে রয়েছে।"
যে মুত্তাকী সে শ্রেষ্ঠ, সে একটি সাধারণ গোত্রের লোক হলেও। যে মুত্তাকী নয়, বাহ্যিকভাবে তার খুব শান-শওকত দেখা গেলেও সে অন্যদের তুলনায় নিকৃষ্ট।
টিকাঃ
৫. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ২২৩৯১
📄 মুসলমানকে নিঃস্বভাবে ছেড়ে দিবে না
হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই মূলনীতি যেমন বলেছেন যে, সমস্ত মুসলমান ভাই ভাই, তেমনি তার ফলাফলও নিজেই বলেছেন যে,
الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ لَا يَظْلِمُهُ وَلَا يُسَلِّمُهُ 'প্রত্যেক মুসলমান অন্য মুসলমানের ভাই। তাই এক মুসলমান অন্য মুসলমানের উপর জুলুম করবে না এবং তাকে নিঃস্ব অবস্থায় ছেড়ে দিবে না।'
তার উপর জুলুম অত্যাচার হতে থাকলে তাকে জালেমের দয়ার উপর ছেড়ে দেওয়া মুসলমানের কাজ নয়। বরং তোমার উপর ফরয তার সঙ্গ দেওয়া, তাকে সাহায্য করা। এটা কেবল নৈতিক নির্দেশনা নয়, বরং তোমার ধর্মীয় দায়িত্ব যে, তোমার সাধ্য মতো জুলুম থেকে রক্ষা করবে।
টিকাঃ
৬. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২২৬২, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৬৫০, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১৩৪৬, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪২৪৮, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৫১০৩