📄 অন্যায়ায় মাজলুমকে সঙ্গ দাও
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, মুসলমানদের দুই দলের মধ্যে যদি বিবাদ হয়, তাহলে অন্যান্য মুসলমানের জন্যে হুকুম হলো, তারা তাদের মধ্যে আপোস করাবে। অর্থাৎ, যখন মুসলমানদের দুটি দল পরস্পরে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তাদের মধ্যে বিবাদ আরম্ভ হয়, তখন অন্যান্য মুসলমানের দায়িত্বে সর্বপ্রথম যেই কাজ জরুরী তা এই যে, উভয় দলের মধ্যে মধ্যস্থতা করে সন্ধি করাবে। যথাসাধ্য তাদেরকে ঝগড়া-বিবাদ থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করবে। এভাবে যদি কাজ হয়ে যায় তাহলে তো খুবই ভালো, উদ্দেশ্য লাভ হলো।
এরপর আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন,
فَإِنْ بَغَتْ إِحْدُهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ অর্থাৎ, যদি বলা-কওয়ার মাধ্যমে ঝগড়া বন্ধ না হয় এবং আপোসের কোনো পন্থা দৃষ্টিগোচর না হয়, তাহলে এটা দেখবে যে, তাদের মধ্যে মাজলুম কে এবং জালেম কে? কে অত্যাচার করছে, আর কে অত্যাচারের শিকার হচ্ছে? যদি এ বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তাদের মধ্যে একটি দল অত্যাচার করছে এবং জুলুম করছে, তখন তোমাদের উপর ফরয মাজলুমকে সঙ্গ দেওয়া এবং জালেমের বিরুদ্ধে লড়াই করা। যখন আপোসের চেষ্টা কার্যকর হবে না, তখন জালেমকে প্রতিহত করা এবং মাজলুমের পক্ষে দাঁড়ানো প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব। আল্লাহর হুকুমের দিকে প্রত্যাবর্তন না করা পর্যন্ত জালেমের সঙ্গে লড়তে থাকবে।২
টিকাঃ
* ইসলাহী খুতুবাত, খন্ডঃ ১৬, পৃঃ ৩০৮-৩১৮, আসরের নামাযের পর, বাইতুল মুকাররম জামে মসজিদ, করাচী
১. হুজরাত: ৯-১০
২. হুজরাত: ৯
📄 বংশ বা ভাষার ভিত্তিতে সঙ্গ দিও না
এখানে হাদীস শরীফের আলোকে দুটি বিষয় বুঝে আসে। এক. কুরআনে কারীম পুরো বিষয়টির ভিত্তি রেখেছে এটা দেখার উপর যে, কে ন্যায়ের উপরে আছে, আর কে অন্যায়ের উপর। কে জালেম, আর কে মাজলুম? এ ভিত্তিতে কারো সঙ্গ দিও না যে, সে আমার দেশী, সে আমার ভাষাভাষি, বা সে আমার দলের লোক। এর ভিত্তিতে সঙ্গ দিও না। বরং সঙ্গ দেওয়া বা লড়াই করা উভয়টা এই ভিত্তির উপর হওয়া উচিত যে, কে জালেম, আর কে মাজলুম। জাহেলিয়াতের যুগ থেকে যেই চিন্তা মাথায় চলে আসছে- আফসোস এই যে, আজও তা মুসলমানদের মধ্যে বিদ্যমান- তা হলো, যে ব্যক্তি আমার বংশের লোক, সে আমার লোক। যে আমার ভাষায় কথা বলে, সে আমার। যে কোনো মূল্যে আমাকে তাকে সঙ্গ দিতে হবে। এটা দেখবে না যে, সে জালেম, না মাজলুম। সে ন্যায়ের উপর আছে, না অন্যায়ের উপর। এটা জাহেলিয়াতের চিন্তাধারা। যার সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন- আজ আমি এ চিন্তা-ধারাকে আমার পায়ের নিচে পদদলিত করলাম। কিন্তু আফসোসের বিষয় এই যে, আজও আমাদের মধ্যে এ অবস্থা বিদ্যমান যে, মানুষ নিজের ভাষার ভিত্তিতে, নিজের বংশের ভিত্তিতে এবং নিজের দেশের ভিত্তিতে দল বানিয়ে নিয়েছে এবং মনে করছে যে, যে কোনো মূল্যে আমাকে এর সঙ্গ দিতে হবে।
📄 এমন চুক্তির অনুমতি নেই
এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, لَا حِلْفَ فِي الْإِسْلَامِ অর্থাৎ, জাহেলিয়াতের যুগে বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে চুক্তি সম্পাদিত হতো যে, যে কোনো মূল্যে আমি তোমাকে সঙ্গ দিবো, ইসলামে এ ধরনের চুক্তির কোনো সুযোগ নেই। একজন মুমিনের কাজ হলো, সে ন্যায় ও অন্যায় দেখবে এবং জালেম ও মাজলুমকে চিনবে। যদি তুমি দেখো যে, মুসলমান জুলুম করছে তাহলে এই জুলুম থেকে তাকে প্রতিহত করার চেষ্টা করা তোমার উপর ফরয।
টিকাঃ
৩. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২১৩০, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৫৯৩, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ২৫৩৬, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৫৬৭
📄 জালেমকে জুলুম থেকে বাধা দাও
একদিকে তো এই মূলনীতি বলেছেন যে, জালেমকে সঙ্গ দিও না, বরং মাজলুমের পক্ষ অবলম্বন করো। সেই জালেম তোমার বংশের হোক, তোমার দেশের হোক, বা তোমার ভাষাভাষি হোক। এই মূলনীতি বর্ণনার পর একদিন হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিস্ময়কর এই বক্তব্য দিলেন যে,
انْصُرْ أَخَاكَ ظَالِمًا أَوْ مَظْلُومًا
'নিজের ভাইয়ের সাহায্য করো, সে যদি জালেম হয় তবুও সাহায্য করো, আর যদি মাজলুম হয় তবুও সাহায্য করো। সাহাবায়ে কেরাম এ কথা শুনে খুবই অবাক হলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন যে, হে আল্লাহর রাসূল! মাজলুমকে সাহায্য করা তো বুঝে আসে, আমরা মাজলুমকে সাহায্য করবো, কিন্তু জালেমকে সাহায্য করার অর্থ কি? হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন যে, জালেমের সাহায্য এই যে, তাকে জুলুম থেকে প্রতিহত করবে।
যেহেতু সে জুলুম করার কারণে জাহান্নামের দিকে যাচ্ছে, নিজের আখেরাত বরবাদ করছে, আল্লাহ তা'আলার গযব মাথা পেতে নিচ্ছে, এখন তাকে সাহায্য করা এই যে, তাকে জুলুম থেকে বাধা দাও। তাকে বলো যে, তুমি যে পথে চলছো, তা জুলুমের পথ, দোযখের পথ, এথেকে বাঁচো। মানুষকে জাহান্নামে যাওয়া থেকে বাধা দেওয়া এবং আল্লাহর আযাব ও গযব থেকে বাঁচানো হলো প্রকৃত সাহায্য।
টিকাঃ
৪. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২২৬৩, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৬৮১, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২১৮১, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১১৫১১