📄 আয়াতের শানে নুযুল
শ্রদ্ধেয় সুধীমন্ডলী ও প্রিয় ভাইগণ! কয়েক জুমা ধরে সূরা হুজরাতের তাফসীর চলছে। যার মধ্যে আল্লাহ তাবারকা ওয়া তা'আলা আমাদের সামাজিক জীবনের সাথে সম্পৃক্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দান করেছেন। এ সূরারই একটি আয়াত এখন আমি আপনাদের সম্মুখে তিলাওয়াত করেছি। এ আয়াতের তরজমা এই যে, হে ঈমানদারগণ! কোনো পাপী ব্যক্তি যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে তাহলে তোমরা বিচক্ষণতার সঙ্গে কাজ নিবে। অর্থাৎ, প্রত্যেক ব্যক্তির প্রত্যেক কথার উপর বিশ্বাস করে কোনো পদক্ষেপ নিবে না। বিচক্ষণতার সঙ্গে কাজ করার অর্থ হলো, বিষয়টি যাচাই করবে যে, এ সংবাদ বাস্তবিক সত্য কি না? তোমরা যদি এমনটি না করো তাহলে হতে পারে যে, অজ্ঞতার ভিত্তিতে তোমরা কিছু
মানুষকে কষ্ট দিবে। পরবর্তীতে তোমাদের নিজেদের কর্মের কারণে লজ্জা ও অনুতাপ হবে যে, আমরা এ কি কাজ করলাম! এটা হলো আয়াতের তরজমা। এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা সমস্ত মুসলমানকে এ হেদায়েত দান করেছেন যে, তারা প্রত্যেক শোনা কথার উপর ভরসা করে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করবে না, বরং যে সংবাদ পাবে তা পুরোপুরি যাচাই না করা এবং সঠিক প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তার ভিত্তিতে কোনো কথা বলা জায়েয নেই এবং তার ভিত্তিতে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করাও জায়েয নেই।
বিভিন্ন বর্ণনা দ্বারা জানা যায় যে, পবিত্র এই আয়াত বিশেষ এক ঘটনার প্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়েছিলো, পরিভাষায় যাকে 'শানে নুযূল' বলা হয়। ঘটনা হয়েছিলো এই যে, আরবে বণু মুস্তালিক নাকে এক গোত্রের বসবাস ছিলো। বণু মুস্তালিকের সর্দার হারেস বিন যাররার- যাঁর মেয়ে জুয়াইরিয়া বিনতে হারেস উম্মাহাতুল মুমিনীনের একজন- তিনি নিজের এ ঘটনা বর্ণনা করেন যে, আমি হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হই। তিনি আমাকে ইসলামের দাওয়াত দেন এবং যাকাত আদায় করার হুকুম দেন। আমি ইসলাম কবুল করি এবং যাকাত আদায়ের কথা স্বীকার করি। আমি আরো নিবেদন করি যে, আমি আমার কওমের মধ্যে ফিরে গিয়ে তাদেরকেও ইসলামের এবং যাকাত প্রদানের দাওয়াত দিবো। যারা আমার কথা মানবে এবং যাকাত প্রদান করবে তাদের যাকাত সংগ্রহ করবো। আপনি অমুক মাসের অমুক তারিখে আপনার কোনো দূত পাঠিয়ে দিবেন, যাতে যাকাতের যেই অর্থ আমার কাছে জমা হবে তা তার কাছে দিয়ে দিতে পারি।
টিকাঃ
* ইসলাহী খুতুবাত, খন্ডঃ ১৬, পৃঃ ২৬৮-২৮৪, আসরের নামাযের পর, বাইতুল মুকাররম জামে মসজিদ, করাচী
১. হুজরাত: ৬
📄 দূতের সংবর্ধনায় জনগণের বাইরে চলে আসা
ওয়াদা মতো হযরত হারেস বিন যাররার রাযি. ঈমানদারদের থেকে যাকাত সংগ্রহ করলেন। দূত পাঠানোর নির্ধারিত মাস ও তারিখ অতিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও যখন হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো দূত পৌঁছলো না, তখন হযরত হারেস রাযি.-এর মনে এ আশঙ্কা জাগলো যে, হয়তো হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কোনো কাজে অসন্তুষ্ট হয়েছেন, অন্যথায় ওয়াদা মোতাবেক লোক না পাঠানো তাঁর পক্ষে অসম্ভব। হযরত হারেস রাযি. ইসলাম গ্রহণকারী সর্দারদের নিকট এ আশঙ্কার কথা আলোচনা করলেন এবং এঁরা সকলে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হওয়ার ইচ্ছা করলেন। কতক বর্ণনায় একথাও এসেছে যে, বণু মুস্তালিক গোত্রের লোকদের জানা ছিলো যে, অমুক তারিখে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দূত আসবে। ঐ তারিখে সম্মান প্রদর্শনপূর্বক দূতকে স্বাগত জানানোর উদ্দেশ্যে তারা জনপদের বাইরে চলে আসেন।
📄 হযরত ওয়ালীদ ইবনে উকবা রাযি.-এর ফিরে যাওয়া
অপরদিকে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্ধারিত তারিখে হযরত ওলীদ ইবনে উকবা রাযি.-কে নিজের দূত বানিয়ে যাকাত উসূল করার জন্যে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু হযরত ওলীদ ইবনে উকবা রাযি. পথের মধ্যে চিন্তা করেন যে, ঐ গোত্রের লোকদের সঙ্গে আমার পুরাতন শত্রুতা রয়েছে, তারা আবার আমাকে হত্যা করে না ফেলে। যেহেতু তারা স্বাগত জানানোর জন্যে জনপদের বাইরেও চলে এসেছিলো, এজন্যে হযরত ওলীদ ইবনে উকবার রাযি.-এর আরো দৃঢ় বিশ্বাস হয় যে, এসব লোক হয়তো পুরাতন শত্রুতার কারণে আমাকে হত্যা করতে এসেছে। সুতরাং তিনি রাস্তা থেকেই ফিরে আসেন এবং হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেন যে, তারা যাকাত দিতে অস্বীকার করেছে এবং আমাকে হত্যা করার ইচ্ছা করেছে, এজন্যে আমি ফিরে চলে এসেছি।
📄 যাচাই করার ফলে বাস্তবতা প্রকাশ পায়
হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা শুনে রাগান্বিত হন এবং মুজাহিদদের একটি বাহিনী হযরত খালেদ ইবনে ওলীদ রাযি.-এর নেতৃত্বে পাঠিয়ে দেন। এদিকে মুজাহিদবাহিনী যাত্রা করে, ওদিকে হযরত হারেস ইবনে যাররার রাযি. নিজের সঙ্গীদের নিয়ে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হওয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। যখন তারা মুখোমুখি হন, তখন হযরত হারেস রাযি. জিজ্ঞাসা করেন যে, আপনারা আমাদের উপর আক্রমণ করার জন্যে কেন এসেছেন? কারণ, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছিলো যে, আপনাদের মধ্য থেকে কোনো একজন যাকাত উসূল করার জন্যে আসবে। সৈন্যবাহিনীর লোকেরা উত্তর দিলো যে, যাকাত উসূল করার জন্যে এক ব্যক্তি এসেছিলো, কিন্তু আপনারা তার উপর আক্রমণ করার জন্যে সৈন্যসমাবেশ ঘটান। বণু মুস্তালিকের লোকেরা উত্তর দেয় যে, আমাদের নিকট কোনো লোক আসেনি এবং আমরা সৈন্যসমাবেশও ঘটাইনি। বরং হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দূতকে স্বাগত জানানোর উদ্দেশ্যে আমরা প্রতিদিন বাইরে এসে একত্রিত হতাম। তখন বাস্তবতা সামনে চলে আসে এবং হযরত খালেদ বিন ওলীদ রাযি. ফিরে এসে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পুরো ঘটনা শুনান যে, এই ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে। ফলে এ পরিস্থিতির অবসান ঘটে। এক্ষেত্রে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।২
টিকাঃ
২. তাফসীরে ইবনে কাসীর খন্ডঃ ৪, পৃঃ ২৬৫-২৬৬