📄 আমাদের স্বার্থপরতার ঘটনা
আমি আমার নিজের ঘটনা বলছি। একবার আমাকে পি.আই.এ.-এর বিমানে নিউইয়র্ক থেকে করাচী আসতে হয়। যে পর্যন্ত শ্বেতাঙ্গদের নিয়ন্ত্রণ ছিলো, সে পর্যন্ত তো সব জায়গায় লাইন ছিলো। লাইন ধরে সব কাজ হয়ে যেতো। কিন্তু যখন বাসের মধ্যে বসার সময় এলো- তা যেহেতু আমাদের পাকিস্তানী ভাইদের নিয়ন্ত্রণে ছিলো, বৃষ্টি হচ্ছিলো, বিমান বিলম্ব হয়েছিলো, এজন্যে বাস যোগে হোটেলে যেতে হবে- তখন বাসে ওঠার জন্যে এমন ধাক্কা-ধাক্কি হয় যে, আল্লাহ রক্ষা করুন! দুর্বল মানুষের তো বাসে উঠার প্রশ্নই আসে না! প্রত্যেকেই চাচ্ছিলো যে, অন্যদেরকে পিছে হটিয়ে আমি আগে বাসে আরোহণ করবো। আমি মনে মনে বললাম, তারা ছিলো কাফের, আর এরা মাশাআল্লাহ মুসলমান। এটা হলো স্বার্থপরতা যে, আমি আগে জায়গা পাই। আমি আরোহণ করি। আমার কাজ হোক। আমি সামনে অগ্রসর হই। অন্যদরকে পিছে ফেলে দেই। এসব এজন্যে হচ্ছে যে, আমরা এগুলোকে দ্বীন থেকে বের করে দিয়েছি। আমরা মনে করি যে, দ্বীন শুধু নফল পড়া ও তাসবীহ পাঠ করার নাম।
📄 মুসাফাহা করার একটি ঘটনা
দেখুন! মুসাফাহা করা কোনো ফরয ওয়াজিব নয়। বেশির চে' বেশি সুন্নাত। এই মুসাফাহা করার জন্যে কোনো মুসলমানকে কষ্ট দেওয়া, ক্ষতি করা, ধাক্কা দেওয়া হারাম। হারাম কাজ করে আমরা সুন্নাতের উপর আমল করতে চাই। একবার সীমান্ত প্রদেশের এক এলাকায় আমার যাওয়া হয়। সেখানকার মসজিদে সমাবেশ হয়। আমার বয়ান হয়। ঐ মসজিদের দরজা ছিলো ছোট। উভয় দিকে জানালা ছিলো। বারান্দাও ছিলো। আঙ্গিনাও ছিলো। মানুষ অনেক দূর থেকে বয়ান শুনতে এসেছিলো। মসজিদের হল, বারান্দা ও আঙ্গিনা সব মানুষ দিয়ে পরিপূর্ণ ছিলো। যখন বয়ান শেষ হলো এবং মুসাফাহার পালা এলো- আপনাদেরকে আমি সত্য বলছি- বারান্দা ও আঙ্গিনার মানুষ জানালা দিয়ে ভিতরে আসার চেষ্টা করছিলো। এর ফলে মসজিদের জানালা ভেঙ্গে যায়। তাদের উদ্দেশ্য কেবল এই ছিলো যে, মুসাফাহা করার সুযোগ যেন হাতছাড়া না হয়। মাথায় এ কথা তো বদ্ধমূল ছিলো যে, মুসাফাহা করা সুন্নাত। মুসাফাহা করার ফযীলত মন-মগজে বসা ছিলো। কিন্তু এ কথা মাথায় ছিলো না যে, মসজিদের মধ্যে ধাক্কা-ধাক্কি করা এবং অন্যদেরকে কষ্ট দেওয়া হারাম। আসল কথা এই যে, আমাদের জাতির সঠিক তারবিয়াত হয়নি। এর ফলে এই বিপর্যয় ছড়িয়ে আছে।
📄 হাজরে আসওয়াদে ধাক্ষাধাক্কি
হাজরে আসওয়াদে গিয়ে দেখুন কি হচ্ছে? সকল আলেম ও ফকীহ এ মাসআলা লিখে গিয়েছেন যে, হাজরে আসওয়াদকে চুম্বন করা অনেক বড়ো ফযীলতের কাজ। কাউকে কষ্ট দেওয়া ছাড়া যদি চুম্বন করা সম্ভব হয় তাহলে দাও, অন্যথায় চুম্বন করা কোনো জরুরী নয়। ফরয-ওয়াজিব নয়। কিন্তু আজকাল সেখানে ধাক্কা-ধাক্কি হচ্ছে। অন্যকে কষ্ট দেওয়া হচ্ছে। ফযীলত লাভের জন্যে গোনাহ করা হচ্ছে। এসব কেন হচ্ছে? এজন্যে যে, আজকাল এগুলোকে দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত মনে করা হয় না যে, অন্যকে কষ্ট দেওয়া গোনাহের কাজ এবং হারাম। যাই হোক, আমরা সকলে মিলে যদি এক কাজের জন্যে যাই তাহলে আমরা সকলে পরস্পরের জন্যে اَلصَّاحِبُ بِالْجَنْبِ। তখন প্রত্যেকের অপরের উপর হক রয়েছে। যদি লাইন বানিয়ে নেই তাহলে সবাই সুযোগ লাভ করবে, কিন্তু এদিকে কারো মনোযোগই নেই।
📄 একটি সোনালী বাণী
আমার ওয়ালেদ মাজেদ রহ. একটি সোনালী কথা বলতেন, যা অন্তরে অঙ্কন করে নেওয়ার মতো। তিনি বলতেন যে, বাতিলের মধ্যে উন্নতির কোনো যোগ্যতাই নেই। কুরআনে কারীম বলে-
إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا 'নিশ্চয়ই বাতিল বিলুপ্ত হবেই।" বাতিল তো বিলুপ্ত হওয়ার জন্যে এবং অবদমিত হওয়ার জন্যে এসেছে। তা কখনোই মাথা উঁচু করতে পারে না। কোনো বাতেল সম্প্রদায়কে যদি তোমরা দেখো যে, তারা দুনিয়াতে মাথা উঁচু করছে, উন্নতি করছে, তাহলে বুঝবে যে, তার সঙ্গে কোনো হক জিনিস যুক্ত হয়েছে। ঐ হক জিনিস তাকে উঁচু করছে। অন্যথায় বাতিলের মধ্যে উঁচু হওয়ার যোগ্যতা নেই। আজ আমরা আমেরিকা, বৃটিশ ও পশ্চিমা শক্তিসমূহকে যতো গাল-মন্দ করি, তাদের উপর যতো অভিশম্পাত করি, কিন্তু তাদের উন্নতি তাদের অশ্লীলতা ও নগ্নতার কারণে নয়, তাদের গলদ আকীদার কারণে নয়, বরং তাদের উন্নতি হচ্ছে ঐ সব গুণের কারণে, যেগুলো মূলত ইসলামের শিক্ষা দেওয়া গুণ। তারা ঐসব গুণ গ্রহণ করেছে। যেমন পরিশ্রম, কষ্ট-সাধনা, সাধুতা, ব্যবসায় আমাতনদারী, মানুষের হকের প্রতি লক্ষ রাখা- এসব বিষয় তাদেরকে দুনিয়াতে উন্নত করেছে। আখেরাতে তো তাদের কোনো অংশ নেই। তবে দুনিয়াতে আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেকের সঙ্গে এই আচরণ করেন যে, যে ব্যক্তি যেমন উপকরণ অবলম্বন করবে, সে ব্যক্তি দুনিয়াতে তেমন ফল লাভ করবে।
টিকাঃ
৫. বানী ইসরাঈল : ৮১