📄 পার্শ্ববর্তী দোকানদার প্রতিবেশী
প্রতিবেশী শুধুমাত্র ঘরে বসবাস করার ক্ষেত্রেই হয় না, দোকানের ক্ষেত্রেও প্রতিবেশী হয়। আপনার দোকানের সঙ্গে অন্যের দোকান থাকলে সেও আপনার প্রতিবেশী। তারও হক রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে হলো প্রতিযোগিতার যুগ। এজন্যে আমাদের উপর পার্শ্ববর্তী দোকানদারের হক থাকার প্রশ্ন আসে না। যে কোনোভাবে আমি তার চে' এগিয়ে যাবো। কিন্তু শরীয়তের দৃষ্টিতে সে প্রতিবেশী। প্রতিবেশী হওয়ার কারণে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ হাদীসের ভিত্তিতে সে তোমার সদাচরণের হকদার। যে সমাজে ইসলামী শিক্ষার বাস্তবায়ন ছিলো, যে সমাজ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাতে পার্শ্ববর্তী দোকনদারও প্রতিবেশীর হক পেতো। তার সঙ্গেও অসাধারণভাবে সদাচরণ করা হতো।
📄 একটি শিক্ষণীয় ঘটনা
আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর পূর্বের ১৯৬৬ সালের ঘটনা। মক্কা মুকাররমায় আমি ওমরার জন্যে যাই। আমার বড়ো ভাই জনাব ওলী রাযী ছাহেব সাথে ছিলেন। সে সময় মক্কা মুকাররমায় প্রাচীনতার ছাপ ছিলো। এমন আধুনিকতা তখন আসেনি। আমরা সেখানে প্রায় দুই মাস অবস্থান করি। তখন আমাদের তারুণ্য ছিলো। সব জায়গায় যাওয়ার এবং পুরান পুরান জায়গা দেখার আগ্রহ ছিলো। এক বাজারে আমরা গেলাম। তখন সেখানের এক অধিবাসী বললেন যে, এখানে তো বিস্ময়কর দৃশ্য। আযান হতেই সামানার উপর কাপড় দিয়ে দোকান খোলা রেখে নামাযের জন্যে চলে যায়। চুরি-ডাকাতির কোনো ভয় নেই। একজন বলতে লাগলো আমি এরচে' বিস্ময়কর অবস্থা দেখেছি। এ বাজারেই আমি একবার এক দোকানে কাপড় কিনতে যাই। কাপড় দেখে আমি পছন্দ করি। দামও ছিলো উপযুক্ত। আমি বললাম, এ পরিমাণ কাপড় ছিঁড়ে দাও! দোকানদার জিজ্ঞাসা করলো- এ কাপড় আপনার পছন্দ হয়েছে? আমি বললাম, হ্যাঁ। সে বললো, দাম ঠিক আছে? আমি বললাম, ঠিক আছে। তারপর দোকানদার বললো, এ কাপড়ই সামনের দোকান থেকে নিন। আমি বললাম, ওখান থেকে কেনো নিবো? দরদাম তো আপনার সঙ্গে হয়েছে। দোকানদার বললো, এই বিতর্কে জড়ানোর দরকার নেই, এ কাপড়ই এ দামেই আপনি ওখানে পেয়ে যাবেন। সেখান থেকে নিন। আমি বললাম, ওটা কি আপনার দোকান? সে বললো, না, আমার দোকান না। আমি বললাম, আমার দরদাম তো আপনার সঙ্গে হয়েছে। আমি তো আপনার থেকেই নিবো। আমি আরো বললাম, যে পর্যন্ত কারণ না বলবেন, সে পর্যন্ত নিবো না। দোকানদার বললো, আসল কথা এই যে, সকাল থেকে নিয়ে এ পর্যন্ত আমার নিকট আট-দশ জন গ্রাহক এসেছে, আর সামনের দোকানে সকাল থেকে এ পর্যন্ত কোনো গ্রাহক আসেনি। তাই আমি চাইলাম তারও বিক্রি হোক। এজন্যে আমি আপনাকে তার কাছে পাঠাচ্ছি। এই হলো মুসলমান সমাজের একটি দ্যুতি, যা তখন পর্যন্ত অবশিষ্ট ছিলো।
📄 আজ দুনিয়া উপার্জনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে
আমাদের মধ্যে আজ যেই মসিবত এসেছে যে, অন্যে পাক চাই না পাক, আমাকে পেতে হবে। বরং অন্যেরটা ছিনিয়ে নিয়ে আত্মসাৎ করতে হবে। অন্যেরটা লুট করতে হবে। এই আপদ এসেছে দুনিয়া অর্জনের প্রতিযোগিতার কারণে। উপরের ঘটনায় লক্ষ করুন! দোকানের প্রতিবেশীর প্রতি লক্ষ করা হচ্ছে, তার সঙ্গে সদাচরণ করা হচ্ছে। যে মুসলমানের অন্তরে আল্লাহর ভয় থাকবে, যার অন্তরে আল্লাহর রাসূলের আযমত ও মহব্বত থাকবে, কেবল সেই এমন আচরণ করতে পারবে। অন্যে তা করতে পারবে না। কারণ, ব্যবসায়ী তো বলবে যে, আমি লাভের জন্যে এখানে বসেছি। নিজের মাল বিক্রির জন্যে এখানে বসেছি। অন্যের দোকানের মাল বিক্রির জন্যে বসিনি। কিন্তু যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ঈমান রাখে এবং আল্লাহর রাসূলের এই বাণীর উপর ঈমান রাখে যে, নিজের প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচরণ করো তাহলে তুমি মুসলমান হয়ে যাবে, সে ব্যক্তি নিজের প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচরণ করতে পারবে, অন্যে পারবে না।
📄 উপমহাদেশে ইসলামের সূচনা কীভাবে হয়েছে
আমরা যদি আমাদের উপমহাদেশের ইতিহাস দেখি, তাহলে দেখতে পাবো যে, এ অঞ্চলে ইসলামের যে আলো এসেছে, আল্লাহ তা'আলা এখানে ইসলামের যে নূর ছড়িয়ে দিয়েছেন, তা মূলত হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই বাণীর উপর আমলের ফল। শুরুতে কোনো ইসলামী সেনাবাহিনী এ অঞ্চল জয় করার জন্যে আসেনি। এমন কোনো তাবলীগ জামাতও এখানে আসেনি, যারা তাবলীগ করে মানুষকে মুসলমান বানিয়েছে। বরং এখানে সর্ব প্রথম মালাবার অঞ্চলে কতিপয় তাবেঈ- কোনো কোনো বর্ণনা দ্বারা জানা যায়- কিছু সাহাবীও মালাবারের উপকূলে অবতরণ করেন। সেখানে তারা ব্যবসা আরম্ভ করেন। সেই ব্যবসায় তারা যে সততা, আমানতদারী, দিয়ানতদারী ও মানব-প্রেমের প্রমাণ দেন, তার ফলে মানুষের মন তাদের দিকে আকৃষ্ট হতে থাকে। মানুষের মাথায় এ কথা আসে যে, যেই দ্বীন তাদেরকে এ শিক্ষা দিয়েছে, তা আমাদেরও গ্রহণ করা উচিত। সুতরাং সেই ব্যবসায়ীদেরকে দেখে মানুষ মুসলমান হয়ে যায়। এভাবে সর্বপ্রথম মালাবারে ইসলাম আসে। তারপর মালাবার থেকে পুরো উপমহাদেশে ইসলাম বিস্তার লাভ করে। তাই হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বলছেন, প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচরণ করো তাহলে তুমি মুসলমান হয়ে যাবে, এর অর্থ হলো, তোমার মুসলমান হওয়ার একটি নিদর্শন দুনিয়ার সামনে আসবে। তখন আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ইসলাম গ্রহণ করার তাওফীক দান করবেন।