📘 ইসলামী মু'আশারাত পরস্পরের প্রতি কর্তব্য ও অধিকার সুন্দর ও সুখী সমাজ > 📄 সারাজীবন কাঁচা বাড়িতে কাটিয়ে দিলেন

📄 সারাজীবন কাঁচা বাড়িতে কাটিয়ে দিলেন


আমার ওয়ালেদ ছাহেবের ওস্তাদ হযরত মিয়াঁ আসগর হোসাইন ছাহেব রহ., যিনি দারুল উলূম দেওবন্দের হাদীসের ওস্তাদ ছিলেন, সাথে কিতাবের ব্যবসাও করতেন। আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ছিলেন, ধনী ছিলেন, কিন্তু তাঁর বাড়ি ছিলো কাঁচা। বৃষ্টির মৌসুমে কখনো তাঁর বাড়ির ছাদ ভেঙ্গে পড়তো, কখনো দেয়াল দুর্বল হয়ে যেতো, কখনো বারান্দা পড়ে যেতো, বর্ষার মৌসুম চলে গেলে পুনরায় তা মেরামত করাতেন। ওয়ালেদ ছাহেব বলেন যে, একদিন আমি হযরতকে বললাম, হযরত প্রতি বছর বর্ষাকালে বাড়ি ভেঙ্গে যায়, আপনি কষ্ট করেন, পুনরায় মেরামত করতে হয়, আল্লাহ তা'আলা আপনাকে সামর্থ দিয়েছেন, আপনি একবার বাড়ি পাকা করে নিন, তাহলে বার বারের এ কষ্ট থেকে মুক্তি লাভ করবেন। তাঁর স্বভাবের মধ্যে রসিকতা ছিলো, তাই উত্তরে বললেন, বাহ, মওলবী শফী ছাহেব! আপনি কতো উত্তম পরামর্শ দিয়েছেন! আমি তো বুড়ো হয়ে গেলাম, সারাজীবন কেটে গেলো, কিন্তু এতোটুকু বুদ্ধি মাথায় এলো না। বাহ, সুবহানাল্লাহ! কি বুদ্ধির কথা বলেছেন! মাশাআল্লাহ! এতো বার তিনি এ কথার পুনরাবৃত্তি করলেন যে, আমি লজ্জায় ঘেমে উঠলাম। খুব লজ্জিত হলাম। ওয়ালেদ ছাহেব বললেন, হযরত আমার প্রশ্ন করার উদ্দেশ্য আপনার কাছে এ কথা জানতে চাওয়া যে, বাড়ি পাকা না করার মধ্যে কী হিকমত রয়েছে? অনেক বেশি পীড়াপীড়ি করলে হযরত বললেন যে, আচ্ছা আমার সঙ্গে আসো। আমার হাত ধরলেন, ঘরের দরজায় নিয়ে গেলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, এই যে গলি তুমি এখান থেকে দেখতে পাচ্ছো, এর মধ্যে কোনো পাকা বাড়ি দেখতে পাচ্ছো কি? কারো বাড়ি পাকা নয়। এখন পুরো গলির সব প্রতিবেশীর বাড়ি হবে কাঁচা, আর আমার বাড়ি হবে পাকা। এমতাবস্থায় বাড়ি পাকা বানিয়ে কি আমার ভালো লাগবে। ওদিকে আমার এই পরিমাণ সামর্থ নেই যে, গলির সবার বাড়ি পাকা করে দিবো। এজন্যে আমার সব প্রতিবেশী যেমন, আমিও তেমন।

📘 ইসলামী মু'আশারাত পরস্পরের প্রতি কর্তব্য ও অধিকার সুন্দর ও সুখী সমাজ > 📄 প্রতিবেশীদের যেন আক্ষেপ না হয়

📄 প্রতিবেশীদের যেন আক্ষেপ না হয়


শুধু এ জন্যে সারা জীবন কাঁচা বাড়িতে কাটিয়ে দিয়েছেন, যাতে প্রতিবেশীদের অন্তরে এই আক্ষেপ না জন্মে যে, মিয়াঁ ছাহেবের বাড়ি পাকা, আর আমাদের বাড়ি কাঁচা। অথচ বাড়ি বানানো কোনো গোনাহের কাজ ছিলো না। শরীয়ত নিষেধ করেনি। হারাম সাব্যস্ত করেনি। কিন্তু প্রতিবেশীদের সঙ্গে সদাচরণের একটা দাবি এও ছিলো যে, তাদের অন্তরে যেন এই আক্ষেপ না জাগে যে, মিয়াঁ ছাহেবের বাড়ি পাকা, আর আমাদের বাড়ি কাঁচা।

আমার বড়ো ভাই জনাব যাকী কাইফী মরহুম তার ঘটনা শুনাতেন যে, আমি একবার হযরত মিয়াঁ ছাহেবের কাছে গেলাম। আমের মৌসুম ছিলো। মিয়াঁ ছাহেব আম দিয়ে বললেন, খাও। ঐ যুগে আম চুষে খাওয়া হতো। যখন ছিলকা ও আঁটি একত্রিত হলো তখন আমি বললাম যে, এগুলো বাইরে ফেলে দেই এবং তুলে নিয়ে দরজার দিকে হাঁটা দিলাম। হযরত জিজ্ঞাসা করলেন- কোথায় যাচ্ছো? আমি বললাম, হযরত বাইরে ফেলতে যাচ্ছি। হযরত বললেন, না, এগুলো বাইরে ফেলো না। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কেন? তিনি বললেন, বাইরের দরজায় যখন এতোগুলো ছিলকা ও আঁটি মহল্লার ছেলেরা দেখবে, তাদের মধ্যে অনেকে গরিব আছে, যাদের আম খাওয়ার সামর্থ নেই, তখন হতে পারে তাদের অন্তরে আক্ষেপ জাগবে! এই আক্ষেপ জাগা ভালো বিষয় নয়। এজন্যে এগুলো বাইরে ফেলবে না। বরং ছিলকা ছাগলকে খাইয়ে দেই। এই হলো প্রতিবেশীর হক। যাদের সম্পর্কে হ্যুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
وَأَحْسِنُ إِلَى جَارِكَ تَكُنْ مُسْلِمًا
এ হাদীসে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সদাচরণ করাকে মুসলমান হওয়ার আলামত আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

📘 ইসলামী মু'আশারাত পরস্পরের প্রতি কর্তব্য ও অধিকার সুন্দর ও সুখী সমাজ > 📄 পার্শ্ববর্তী দোকানদার প্রতিবেশী

📄 পার্শ্ববর্তী দোকানদার প্রতিবেশী


প্রতিবেশী শুধুমাত্র ঘরে বসবাস করার ক্ষেত্রেই হয় না, দোকানের ক্ষেত্রেও প্রতিবেশী হয়। আপনার দোকানের সঙ্গে অন্যের দোকান থাকলে সেও আপনার প্রতিবেশী। তারও হক রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে হলো প্রতিযোগিতার যুগ। এজন্যে আমাদের উপর পার্শ্ববর্তী দোকানদারের হক থাকার প্রশ্ন আসে না। যে কোনোভাবে আমি তার চে' এগিয়ে যাবো। কিন্তু শরীয়তের দৃষ্টিতে সে প্রতিবেশী। প্রতিবেশী হওয়ার কারণে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ হাদীসের ভিত্তিতে সে তোমার সদাচরণের হকদার। যে সমাজে ইসলামী শিক্ষার বাস্তবায়ন ছিলো, যে সমাজ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাতে পার্শ্ববর্তী দোকনদারও প্রতিবেশীর হক পেতো। তার সঙ্গেও অসাধারণভাবে সদাচরণ করা হতো।

📘 ইসলামী মু'আশারাত পরস্পরের প্রতি কর্তব্য ও অধিকার সুন্দর ও সুখী সমাজ > 📄 একটি শিক্ষণীয় ঘটনা

📄 একটি শিক্ষণীয় ঘটনা


আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর পূর্বের ১৯৬৬ সালের ঘটনা। মক্কা মুকাররমায় আমি ওমরার জন্যে যাই। আমার বড়ো ভাই জনাব ওলী রাযী ছাহেব সাথে ছিলেন। সে সময় মক্কা মুকাররমায় প্রাচীনতার ছাপ ছিলো। এমন আধুনিকতা তখন আসেনি। আমরা সেখানে প্রায় দুই মাস অবস্থান করি। তখন আমাদের তারুণ্য ছিলো। সব জায়গায় যাওয়ার এবং পুরান পুরান জায়গা দেখার আগ্রহ ছিলো। এক বাজারে আমরা গেলাম। তখন সেখানের এক অধিবাসী বললেন যে, এখানে তো বিস্ময়কর দৃশ্য। আযান হতেই সামানার উপর কাপড় দিয়ে দোকান খোলা রেখে নামাযের জন্যে চলে যায়। চুরি-ডাকাতির কোনো ভয় নেই। একজন বলতে লাগলো আমি এরচে' বিস্ময়কর অবস্থা দেখেছি। এ বাজারেই আমি একবার এক দোকানে কাপড় কিনতে যাই। কাপড় দেখে আমি পছন্দ করি। দামও ছিলো উপযুক্ত। আমি বললাম, এ পরিমাণ কাপড় ছিঁড়ে দাও! দোকানদার জিজ্ঞাসা করলো- এ কাপড় আপনার পছন্দ হয়েছে? আমি বললাম, হ্যাঁ। সে বললো, দাম ঠিক আছে? আমি বললাম, ঠিক আছে। তারপর দোকানদার বললো, এ কাপড়ই সামনের দোকান থেকে নিন। আমি বললাম, ওখান থেকে কেনো নিবো? দরদাম তো আপনার সঙ্গে হয়েছে। দোকানদার বললো, এই বিতর্কে জড়ানোর দরকার নেই, এ কাপড়ই এ দামেই আপনি ওখানে পেয়ে যাবেন। সেখান থেকে নিন। আমি বললাম, ওটা কি আপনার দোকান? সে বললো, না, আমার দোকান না। আমি বললাম, আমার দরদাম তো আপনার সঙ্গে হয়েছে। আমি তো আপনার থেকেই নিবো। আমি আরো বললাম, যে পর্যন্ত কারণ না বলবেন, সে পর্যন্ত নিবো না। দোকানদার বললো, আসল কথা এই যে, সকাল থেকে নিয়ে এ পর্যন্ত আমার নিকট আট-দশ জন গ্রাহক এসেছে, আর সামনের দোকানে সকাল থেকে এ পর্যন্ত কোনো গ্রাহক আসেনি। তাই আমি চাইলাম তারও বিক্রি হোক। এজন্যে আমি আপনাকে তার কাছে পাঠাচ্ছি। এই হলো মুসলমান সমাজের একটি দ্যুতি, যা তখন পর্যন্ত অবশিষ্ট ছিলো।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00