📄 কুঁড়ে ঘরওয়ালাও প্রতিবেশী
দ্বিতীয়ত, কারো প্রতিবেশীর হক আদায় এবং তার সঙ্গে সদাচরণ করার চিন্তা জাগলেও প্রতিবেশী কেবল তাকে মনে করা হয়, যে সম্পদের দিক থেকে তার সমপর্যায়ের। আমার পাশেই যদি ঝুপড়ির মধ্যে কেউ থাকে তাহলে সে আমার প্রতিবেশী নয়। আমার যদি বাংলো থাকে তাহলে তারও বাংলো থাকতে হবে, তাহলে সে প্রতিবেশী। সে যদি কুঁড়ে ঘরের অধিবাসী হয় তাহলে তাকে প্রতিবেশীর অধিকার দেওয়ার জন্যে আমি প্রস্তুত নই। তার ব্যাপারে এ চিন্তাই জাগে না যে, সে আমার প্রতিবেশী। এ কারণেই কি সে তোমার প্রতিবেশী নয় যে, সে বেচারা গরীব, তার বাংলো নেই, তার রয়েছে ঝুপড়ি। এর দলিল এই যে, তোমরা যখন পরস্পরে প্রতিবেশীদের একত্রিত করো, দাওয়াত দাও, তখন শুধু বাংলো ওয়ালাদের দাওয়াত দাও, কুঁড়ে ঘর ওয়ালাদেরকে দাওয়াত দাও না। এজন্যে মন-মগজে এ কথা বসে গিয়েছে যে, প্রতিবেশী সেই, যে সম্পদের দিক থেকে, পদ-পদবীর দিক থেকে, অর্থনীতির দিক থেকে আমার সমকক্ষ। অন্যথায় সে আমার প্রতিবেশী নয়।
অথচ প্রকৃতপক্ষে প্রতিবেশী সে, যে তোমার বাড়ির পাশে থাকে। সে যদি তোমার বাড়ির দেয়ালের সঙ্গে থাকে তাহলে প্রথম প্রকারের প্রতিবেশী। আর যদি একটু দূরে থাকে তাহলে দ্বিতীয় প্রকারের প্রতিবেশী। উভয়টার কোনো একটার মধ্যে অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত। যদিও সে কুঁড়ে ঘরে বাস করে। বরং কুঁড়ে ঘরে বাসকারী প্রতিবেশীর অধিকার বেশি। কারণ, কোনো দিন যদি তার বাড়িতে খাবার না থাকে, তাহলে তার প্রতিবেশী গোনাহগার হবে। বরং এক হাদীসে আছে যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ঐ ব্যক্তি মুসলমান নয়, যার প্রতিবেশে কোনো মানুষ ক্ষুধার্থ অবস্থায় ঘুমায়।
📄 মুফতী আযম হিন্দ রহ.-এর ঘটনা
আমি আমার ওয়ালেদ মাজেদের নিকট থেকে একথা কয়েকবার শুনেছি যে, হযরত মাওলানা মুফতী আযীযুর রহমান ছাহেব রহ.- যাঁর ফতওয়ার দশ ভলিউম 'ফাতাওয়া দারুল উলূম দেওবন্দ' নামে ছেপে বের হয়েছে। তিনি দারুল উলূম দেওবন্দের 'মুফতিয়ে আ'যম' ছিলেন। ফতওয়া বিষয়ে আমার ওয়ালেদ মাজেদের ওস্তাদ ছিলেন। তাঁর বাড়ির নিকটে তিন-চার জন বৃদ্ধা মহিলা থাকতেন। তাঁর নিয়ম ছিলো এই যে, দারুল উলূমে যাওয়ার জন্যে যখন বের হতেন, তখন প্রথমে ঐ বৃদ্ধাদের বাড়িতে যেতেন এবং তাদের জিজ্ঞাসা করতেন যে, বিবি! বাজার থেকে কোনো সদাই আনতে হলে বলো, আমি এনে দিচ্ছি। তখন কোনো মহিলা বলতেন, এতোটুকু ধনে পাতা, এতোটুকু পুদিনা পাতা, এতোটুকু সবজি এবং এতোটুকু টমেটে, আনবেন। সব মহিলার কাছে সদাইয়ের কথা জিজ্ঞাসা করতেন তারপর বাজারে যেতেন। বাজার থেকে সদাই ক্রয় করতেন। সব বৃদ্ধার বাড়িতে ঐ সদাই পৌছিঁয়ে দিতেন। তারপর দারুল উলূমে তাশরীফ নিয়ে যেতেন। কতক সময় এমনও হতো যে, কোনো মহিলা বলতেন, মওলবী ছাহেব! আপনি ভুল সদাই এনেছেন। আমি তো অমুক জিনিসের কথা বলেছিলাম আর আপনি অমুক জিনিস নিয়ে এসেছেন, বা বলতো যে, আমি তো এই পরিমাণ আনতে বলেছিলাম আর আপনি এই পরিমাণ এনেছেন। তিনি বলতেন, আচ্ছা বিবি! কোনো সমস্যা নেই, আমি এখনই বাজারে গিয়ে বদলিয়ে আনছি। সুতরাং পুনরায় বাজারে যেতেন এবং ঐ জিনিস বদলিয়ে এনে বিধবার হাতে দিতেন তারপর দারুল উলূমে তাশরীফ নিয়ে যেতেন। প্রতিদিন এ কাজ করতেন। তাঁর সর্বপ্রথম কাজ ছিলো প্রতিবেশীদের খবর নেওয়া।
📄 এঁরা কেমন লোক ছিলেন
এমন ব্যক্তি, যাঁর সুনামের ডঙ্কা বাজছে। এমন ব্যক্তি, যাঁর ফতওয়াকে অথরীটি বলে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। সারা দুনিয়ার মানুষ তাঁর কাছে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে আসছে। কতো মানুষ তাঁর হাত-পা চুম্বন করার জন্যে প্রস্তুত। কিন্তু তাঁর অবস্থা এই যে, ফতওয়ার কাজ শুরু করার পূর্বে বিধবা মহিলাদের খবর নিচ্ছেন। এসব লোক এমনিতেই বড়ো হননি। আমার ওয়ালেদ মাজেদ বলতেন যে, আল্লাহ তা'আলা এঁদের মাধ্যমে সাহাবায়ে কেরামের যুগের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। বাস্তবতাও ছিলো তাই। ওলামায়ে দেওবন্দের নাম যে আমরা নিয়ে থাকি, তা কেবল এ জন্যে নয় যে, তাঁদের প্রতি আমাদের ভক্তি সৃষ্টি হয়েছে, বরং বাস্তবতা এই যে, তাঁদের একেক সদস্য সুন্নাতে নববীর জীবন্ত প্রতীক ছিলেন। শুধু নামায-রোযার ব্যাপারে নয়, বরং জীবনের প্রত্যেকটি শাখায় তাঁরা সুন্নাতে নববীর উপর আমলকারী ছিলেন।
📄 সারাজীবন কাঁচা বাড়িতে কাটিয়ে দিলেন
আমার ওয়ালেদ ছাহেবের ওস্তাদ হযরত মিয়াঁ আসগর হোসাইন ছাহেব রহ., যিনি দারুল উলূম দেওবন্দের হাদীসের ওস্তাদ ছিলেন, সাথে কিতাবের ব্যবসাও করতেন। আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ছিলেন, ধনী ছিলেন, কিন্তু তাঁর বাড়ি ছিলো কাঁচা। বৃষ্টির মৌসুমে কখনো তাঁর বাড়ির ছাদ ভেঙ্গে পড়তো, কখনো দেয়াল দুর্বল হয়ে যেতো, কখনো বারান্দা পড়ে যেতো, বর্ষার মৌসুম চলে গেলে পুনরায় তা মেরামত করাতেন। ওয়ালেদ ছাহেব বলেন যে, একদিন আমি হযরতকে বললাম, হযরত প্রতি বছর বর্ষাকালে বাড়ি ভেঙ্গে যায়, আপনি কষ্ট করেন, পুনরায় মেরামত করতে হয়, আল্লাহ তা'আলা আপনাকে সামর্থ দিয়েছেন, আপনি একবার বাড়ি পাকা করে নিন, তাহলে বার বারের এ কষ্ট থেকে মুক্তি লাভ করবেন। তাঁর স্বভাবের মধ্যে রসিকতা ছিলো, তাই উত্তরে বললেন, বাহ, মওলবী শফী ছাহেব! আপনি কতো উত্তম পরামর্শ দিয়েছেন! আমি তো বুড়ো হয়ে গেলাম, সারাজীবন কেটে গেলো, কিন্তু এতোটুকু বুদ্ধি মাথায় এলো না। বাহ, সুবহানাল্লাহ! কি বুদ্ধির কথা বলেছেন! মাশাআল্লাহ! এতো বার তিনি এ কথার পুনরাবৃত্তি করলেন যে, আমি লজ্জায় ঘেমে উঠলাম। খুব লজ্জিত হলাম। ওয়ালেদ ছাহেব বললেন, হযরত আমার প্রশ্ন করার উদ্দেশ্য আপনার কাছে এ কথা জানতে চাওয়া যে, বাড়ি পাকা না করার মধ্যে কী হিকমত রয়েছে? অনেক বেশি পীড়াপীড়ি করলে হযরত বললেন যে, আচ্ছা আমার সঙ্গে আসো। আমার হাত ধরলেন, ঘরের দরজায় নিয়ে গেলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, এই যে গলি তুমি এখান থেকে দেখতে পাচ্ছো, এর মধ্যে কোনো পাকা বাড়ি দেখতে পাচ্ছো কি? কারো বাড়ি পাকা নয়। এখন পুরো গলির সব প্রতিবেশীর বাড়ি হবে কাঁচা, আর আমার বাড়ি হবে পাকা। এমতাবস্থায় বাড়ি পাকা বানিয়ে কি আমার ভালো লাগবে। ওদিকে আমার এই পরিমাণ সামর্থ নেই যে, গলির সবার বাড়ি পাকা করে দিবো। এজন্যে আমার সব প্রতিবেশী যেমন, আমিও তেমন।