📄 এটি নতুন সভ্যতা
যতো দিন পর্যন্ত একটানা বাড়ি-ঘর হতো, ততো দিন পর্যন্ত মানুষ নিজেদের প্রতিবেশীর প্রতি লক্ষ রাখতো। তাদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকতো। কতক সময় প্রতিবেশীদের সাথে রক্তের সম্পর্কের চেয়েও অধিক শক্তিশালী সম্পর্ক হতো। কিন্তু যখন থেকে এই কুঠি-বাংলো বানানো শুরু হয়েছে, তখন থেকে অনেক সময় বছর বছর একসঙ্গে অতিবাহিত করা সত্ত্বেও প্রতিবেশী কে তা জানা থাকে না? এই নতুন সভ্যতা প্রতিবেশীর বিষয়টিই বিলুপ্ত করে দিয়েছে। আমরা ব্রাঞ্চ রোডে একটি ফ্ল্যাটে থাকতাম। যেদিন ঐ ফ্ল্যাটে গিয়ে উঠলাম, আশে-পাশের মানুষ দেখা করতে আসলো এবং পরস্পরে এমন সুসম্পর্ক হলো, যেমন আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে হয়ে থাকে। সেখানে পাঁচ বছর থাকার পর লাসবিলা হাউজে স্থানান্তরিত হই। সেখানে একটি প্লটে ওয়ালেদ ছাহেব বাড়ি বানিয়েছিলেন। ঐ বাড়ির চর্তুদিকে দেয়াল ছিলো। চর্তুদিকে ছিলো কুঠি-বাংলোয় বসবাসকারী। এবার সপ্তাহকে সপ্তাহ অতিবাহিত হয়ে যায়, কিন্তু একথা জানা যায়নি যে, ডান দিকের বাড়িতে কে থাকে, বাম দিকের বাড়িতে কে থাকে, সামনে কে আছে, আর পিছনেই বা কে আছে? কারো সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত নেই। তাই একদিন ওয়ালেদ ছাহেব অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পার্শ্ববর্তী লোকদের সঙ্গে দেখা করতে যান, যাতে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠে। তারপর বলেন যে, দেখো! যখন আমি ফ্ল্যাটে বাস করতে গিয়েছিলাম, তখন মহল্লার সব লোক দেখা করার জন্যে জমা হয়ে ছিলো। তারা আমাদেরকে স্বাগত জানিয়েছিলো। সম্পর্ক ও ভালোবাসা প্রকাশ করেছিলো। আর এখানে এই অবস্থা! বিভিন্ন এলাকার মধ্যে এই পার্থক্য হয়ে থাকে। মোটকথা, কুঠি-বাংলোর মধ্যে এ অবস্থাই হয়ে থাকে যে, বছর বছর অবস্থান করার পরও জানা যায় না যে, আমার প্রতিবেশে কে থাকে?
📄 আগুন লাগার ঘটনা
আমি একবার ইসলামাবাদে একটি রেস্ট হাউজে অবস্থান করছিলাম। সেটি ছিলো একটি বাংলো। রাত তিনটায় তাতে আগুন লেগে যায়। আল্লাহ তা'আলা আমাদের প্রতি বিশেষ মেহেরবানী করেন। আমাদের প্রাণ রক্ষা করেন। ফায়ার ব্রিগেডের লোক এসে আগুন নিভায়। কিন্তু আমি দেখলাম যে, সকাল আটটা নয়টা পর্যন্ত নিভানোর কাজ চলতে থাকে, কিন্তু পার্শ্ববর্তী বাংলো ওয়ালাদের কোনো খবর ছিলো না। কারো এ তাওফীক হলো না যে, আমাদের পার্শ্ববর্তীতে আগুন লেগেছিলো, দেখি তাদের কি অবস্থা? কেউ মরলো কি না, বা কেউ আহত হলো কি না? তাদের আসার সময়ই হলো না। কারণ, যে বিপদ এসেছে, তা অন্যদের উপর এসেছে। আমাদের উপর আসেনি। আজ আমাদের সমাজে এ অবস্থা হয়েছে যে, প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক ও সদাচরণের যেসব ফযীলতের কথা কুরআন ও হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে তা সব শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন 'নাফসী' 'নাফসী' অবস্থা। শুধু আমি আছি, আমার ঘর আছে, আমার বাড়ি আছে, আমার পরিবার আছে। এরপর আর কারো দিকে দেখার প্রয়োজন নেই।
📄 কুঁড়ে ঘরওয়ালাও প্রতিবেশী
দ্বিতীয়ত, কারো প্রতিবেশীর হক আদায় এবং তার সঙ্গে সদাচরণ করার চিন্তা জাগলেও প্রতিবেশী কেবল তাকে মনে করা হয়, যে সম্পদের দিক থেকে তার সমপর্যায়ের। আমার পাশেই যদি ঝুপড়ির মধ্যে কেউ থাকে তাহলে সে আমার প্রতিবেশী নয়। আমার যদি বাংলো থাকে তাহলে তারও বাংলো থাকতে হবে, তাহলে সে প্রতিবেশী। সে যদি কুঁড়ে ঘরের অধিবাসী হয় তাহলে তাকে প্রতিবেশীর অধিকার দেওয়ার জন্যে আমি প্রস্তুত নই। তার ব্যাপারে এ চিন্তাই জাগে না যে, সে আমার প্রতিবেশী। এ কারণেই কি সে তোমার প্রতিবেশী নয় যে, সে বেচারা গরীব, তার বাংলো নেই, তার রয়েছে ঝুপড়ি। এর দলিল এই যে, তোমরা যখন পরস্পরে প্রতিবেশীদের একত্রিত করো, দাওয়াত দাও, তখন শুধু বাংলো ওয়ালাদের দাওয়াত দাও, কুঁড়ে ঘর ওয়ালাদেরকে দাওয়াত দাও না। এজন্যে মন-মগজে এ কথা বসে গিয়েছে যে, প্রতিবেশী সেই, যে সম্পদের দিক থেকে, পদ-পদবীর দিক থেকে, অর্থনীতির দিক থেকে আমার সমকক্ষ। অন্যথায় সে আমার প্রতিবেশী নয়।
অথচ প্রকৃতপক্ষে প্রতিবেশী সে, যে তোমার বাড়ির পাশে থাকে। সে যদি তোমার বাড়ির দেয়ালের সঙ্গে থাকে তাহলে প্রথম প্রকারের প্রতিবেশী। আর যদি একটু দূরে থাকে তাহলে দ্বিতীয় প্রকারের প্রতিবেশী। উভয়টার কোনো একটার মধ্যে অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত। যদিও সে কুঁড়ে ঘরে বাস করে। বরং কুঁড়ে ঘরে বাসকারী প্রতিবেশীর অধিকার বেশি। কারণ, কোনো দিন যদি তার বাড়িতে খাবার না থাকে, তাহলে তার প্রতিবেশী গোনাহগার হবে। বরং এক হাদীসে আছে যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ঐ ব্যক্তি মুসলমান নয়, যার প্রতিবেশে কোনো মানুষ ক্ষুধার্থ অবস্থায় ঘুমায়।
📄 মুফতী আযম হিন্দ রহ.-এর ঘটনা
আমি আমার ওয়ালেদ মাজেদের নিকট থেকে একথা কয়েকবার শুনেছি যে, হযরত মাওলানা মুফতী আযীযুর রহমান ছাহেব রহ.- যাঁর ফতওয়ার দশ ভলিউম 'ফাতাওয়া দারুল উলূম দেওবন্দ' নামে ছেপে বের হয়েছে। তিনি দারুল উলূম দেওবন্দের 'মুফতিয়ে আ'যম' ছিলেন। ফতওয়া বিষয়ে আমার ওয়ালেদ মাজেদের ওস্তাদ ছিলেন। তাঁর বাড়ির নিকটে তিন-চার জন বৃদ্ধা মহিলা থাকতেন। তাঁর নিয়ম ছিলো এই যে, দারুল উলূমে যাওয়ার জন্যে যখন বের হতেন, তখন প্রথমে ঐ বৃদ্ধাদের বাড়িতে যেতেন এবং তাদের জিজ্ঞাসা করতেন যে, বিবি! বাজার থেকে কোনো সদাই আনতে হলে বলো, আমি এনে দিচ্ছি। তখন কোনো মহিলা বলতেন, এতোটুকু ধনে পাতা, এতোটুকু পুদিনা পাতা, এতোটুকু সবজি এবং এতোটুকু টমেটে, আনবেন। সব মহিলার কাছে সদাইয়ের কথা জিজ্ঞাসা করতেন তারপর বাজারে যেতেন। বাজার থেকে সদাই ক্রয় করতেন। সব বৃদ্ধার বাড়িতে ঐ সদাই পৌছিঁয়ে দিতেন। তারপর দারুল উলূমে তাশরীফ নিয়ে যেতেন। কতক সময় এমনও হতো যে, কোনো মহিলা বলতেন, মওলবী ছাহেব! আপনি ভুল সদাই এনেছেন। আমি তো অমুক জিনিসের কথা বলেছিলাম আর আপনি অমুক জিনিস নিয়ে এসেছেন, বা বলতো যে, আমি তো এই পরিমাণ আনতে বলেছিলাম আর আপনি এই পরিমাণ এনেছেন। তিনি বলতেন, আচ্ছা বিবি! কোনো সমস্যা নেই, আমি এখনই বাজারে গিয়ে বদলিয়ে আনছি। সুতরাং পুনরায় বাজারে যেতেন এবং ঐ জিনিস বদলিয়ে এনে বিধবার হাতে দিতেন তারপর দারুল উলূমে তাশরীফ নিয়ে যেতেন। প্রতিদিন এ কাজ করতেন। তাঁর সর্বপ্রথম কাজ ছিলো প্রতিবেশীদের খবর নেওয়া।