📄 অল্প সময়ের সঙ্গী
প্রতিবেশীর তৃতীয় প্রকার এই বর্ণনা করেছে যে, الصَّاحِبُ بِالْجُنْبِ। আমি এর অর্থ করে থাকি- ক্ষণিকের সঙ্গী। এর উদ্দেশ্য এই যে, আপনি কোনো বাহনে- যেমন বাসে- সফর করছেন। আপনার পাশের সীটে একজন এসে বসলো। তাকে اَلصَّاحِبُ بِالْجَنْبِ বলা হবে। আপনি রেল গাড়িতে বা বিমানে সফর করছেন। পাশ্ববর্তী সীটে অপর একজন বসেছে, সে ا الصَّاحِبُ بِالْجَنْبِ অথচ ঐ ব্যক্তি অপরিচিত, ইতিপূর্বে কখনো তাকে দেখেননি, তার সাথে সাক্ষাত হয়নি এবং ভবিষ্যতেও তার সঙ্গে দেখা হওয়ার আশা নেই, কিন্তু যেহেতু সে অল্প সময়ের জন্যে আপনার সঙ্গী হয়েছে, কুরআনে কারীম বলে যে, তারও হক রয়েছে। তার সঙ্গে সদাচরণ করো। অথবা আপনি কোথাও লাইন ধরেছেন। ঐ লাইনে আপনার সামনে আরেকজন লোক দাঁড়ানো। আপনার পিছনে অন্য একজন দাঁড়ানো। এই দুই ব্যক্তি আপনার صَّاحِبُ। انان। এদেরও হক রয়েছে। এদের সঙ্গেও সদাচরণের নির্দেশ রয়েছে।
📄 ঐ বান্দা আল্লাহর অতি প্রিয়
কুরআনে কারীম প্রতিবেশীদের এই তিন প্রকার পৃথক পৃথক করে এজন্যে বর্ণনা করেছে যে, আল্লাহ তা'আলার নিকট ঐ বান্দা অতি প্রিয়, যে তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে সদাচরণ করে। এতোটুকু তো সব মুসলমান জানে ও মানে যে, প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো আচরণ করতে হবে। কিন্তু কার্যত কতগুলো ভুল বুঝাবুঝি পাওয়া যায়, যেগুলো দূর করা জরুরী। কারণ, আমলের সময় নফস ও শয়তান মানুষকে বিভিন্ন ব্যাখ্যা বুঝায়। সাথে কিছু ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টি করে, যার ফলে এই হুকুমের উপর আমল করা থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়।
📄 এটি নতুন সভ্যতা
যতো দিন পর্যন্ত একটানা বাড়ি-ঘর হতো, ততো দিন পর্যন্ত মানুষ নিজেদের প্রতিবেশীর প্রতি লক্ষ রাখতো। তাদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকতো। কতক সময় প্রতিবেশীদের সাথে রক্তের সম্পর্কের চেয়েও অধিক শক্তিশালী সম্পর্ক হতো। কিন্তু যখন থেকে এই কুঠি-বাংলো বানানো শুরু হয়েছে, তখন থেকে অনেক সময় বছর বছর একসঙ্গে অতিবাহিত করা সত্ত্বেও প্রতিবেশী কে তা জানা থাকে না? এই নতুন সভ্যতা প্রতিবেশীর বিষয়টিই বিলুপ্ত করে দিয়েছে। আমরা ব্রাঞ্চ রোডে একটি ফ্ল্যাটে থাকতাম। যেদিন ঐ ফ্ল্যাটে গিয়ে উঠলাম, আশে-পাশের মানুষ দেখা করতে আসলো এবং পরস্পরে এমন সুসম্পর্ক হলো, যেমন আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে হয়ে থাকে। সেখানে পাঁচ বছর থাকার পর লাসবিলা হাউজে স্থানান্তরিত হই। সেখানে একটি প্লটে ওয়ালেদ ছাহেব বাড়ি বানিয়েছিলেন। ঐ বাড়ির চর্তুদিকে দেয়াল ছিলো। চর্তুদিকে ছিলো কুঠি-বাংলোয় বসবাসকারী। এবার সপ্তাহকে সপ্তাহ অতিবাহিত হয়ে যায়, কিন্তু একথা জানা যায়নি যে, ডান দিকের বাড়িতে কে থাকে, বাম দিকের বাড়িতে কে থাকে, সামনে কে আছে, আর পিছনেই বা কে আছে? কারো সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত নেই। তাই একদিন ওয়ালেদ ছাহেব অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পার্শ্ববর্তী লোকদের সঙ্গে দেখা করতে যান, যাতে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠে। তারপর বলেন যে, দেখো! যখন আমি ফ্ল্যাটে বাস করতে গিয়েছিলাম, তখন মহল্লার সব লোক দেখা করার জন্যে জমা হয়ে ছিলো। তারা আমাদেরকে স্বাগত জানিয়েছিলো। সম্পর্ক ও ভালোবাসা প্রকাশ করেছিলো। আর এখানে এই অবস্থা! বিভিন্ন এলাকার মধ্যে এই পার্থক্য হয়ে থাকে। মোটকথা, কুঠি-বাংলোর মধ্যে এ অবস্থাই হয়ে থাকে যে, বছর বছর অবস্থান করার পরও জানা যায় না যে, আমার প্রতিবেশে কে থাকে?
📄 আগুন লাগার ঘটনা
আমি একবার ইসলামাবাদে একটি রেস্ট হাউজে অবস্থান করছিলাম। সেটি ছিলো একটি বাংলো। রাত তিনটায় তাতে আগুন লেগে যায়। আল্লাহ তা'আলা আমাদের প্রতি বিশেষ মেহেরবানী করেন। আমাদের প্রাণ রক্ষা করেন। ফায়ার ব্রিগেডের লোক এসে আগুন নিভায়। কিন্তু আমি দেখলাম যে, সকাল আটটা নয়টা পর্যন্ত নিভানোর কাজ চলতে থাকে, কিন্তু পার্শ্ববর্তী বাংলো ওয়ালাদের কোনো খবর ছিলো না। কারো এ তাওফীক হলো না যে, আমাদের পার্শ্ববর্তীতে আগুন লেগেছিলো, দেখি তাদের কি অবস্থা? কেউ মরলো কি না, বা কেউ আহত হলো কি না? তাদের আসার সময়ই হলো না। কারণ, যে বিপদ এসেছে, তা অন্যদের উপর এসেছে। আমাদের উপর আসেনি। আজ আমাদের সমাজে এ অবস্থা হয়েছে যে, প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক ও সদাচরণের যেসব ফযীলতের কথা কুরআন ও হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে তা সব শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন 'নাফসী' 'নাফসী' অবস্থা। শুধু আমি আছি, আমার ঘর আছে, আমার বাড়ি আছে, আমার পরিবার আছে। এরপর আর কারো দিকে দেখার প্রয়োজন নেই।