📄 আমার সাথে যদি এমন আচরণ হতো, তাহলে?
এর মাপকাঠি হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বলেছেন যে, যখনই কারো সঙ্গে আচরণ করবে, তখনই তাকে নিজের জায়গায় এবং নিজেকে তার জায়গায় খাড়া করবে এবং দেখবে যে, আমার সঙ্গে যদি এমন আচরণ করা হতো তাহলে আমার কেমন অবস্থা হতো। আমি এতে খুশি হতাম, না বেজার হতাম। এর দ্বারা আমি আরাম পেতাম, না কষ্ট পেতাম। এ কথা চিন্তা করো। এ আচরণ দ্বারা যদি তোমার কষ্ট হতো তাহলে তুমি অন্যের সঙ্গে এমন আচরণ কোরো না। আমরা যে দুই রকমের মাপ বানিয়ে নিয়েছি, নিজেদের জন্যে এক রকম আর অন্যদের জন্যে অন্য রকম, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ হাদীস দ্বারা সে পথ বন্ধ করে দিয়েছেন। মাপ এক রকম হওয়া উচিত। নিজের জন্যে যেই মাপ, অন্যের জন্যেও একই মাপ।
📄 দায়িত্বের পরোয়া নেই, অধিকার আদায়ের চিন্তা আগে
এক ব্যক্তি কোথাও চাকুরী করে বা শ্রমিকের কাজ করে। তার এ হাদীস তো খুব মনে আছে যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, শ্রমিকের ঘام শুকানোর পূর্বে তার পারিশ্রমিক পরিশোধ করো। এ হাদীস তো খুব স্মরণ আছে, কিন্তু এ বিষয়ে চিন্তা নেই যে, ঘام আদৌও বের হলো কি না। যেই কাজের জন্যে তাকে চাকর রেখেছে, তা সে সঠিকভাবে সম্পাদন করেছে কিনা- এ বিষয়ে কোনো চিন্তা-ফিকির নেই। আজকাল বিভিন্ন সংগঠন ও সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সারা দুনিয়ায় এ ধরনের সংগঠন রয়েছে। যেমন, শ্রমিকদের অধিকার সংরক্ষণ সংগঠন, চাকুরীজীবিদের অধিকার সংগঠন, নারী-অধিকার সংগঠন ইত্যাদি। এর ফল এই হয়েছে যে, প্রত্যেকে নিজের অধিকার আদায়ের দাবি করছে যে, আমার অধিকার আমাকে পেতে হবে, কিন্তু আমার দায়িত্বে অন্যের যে হক আছে, তার প্রতি কোনো লক্ষ নেই। শ্রমিক বলছে যে, আমার পুরো পারিশ্রমিক পেতে হবে, কিন্তু আমার দায়িত্বে যে আট ঘণ্টা ডিউটি রয়েছে, তার পুরা সময় শ্রমের পিছনে দিচ্ছি, নাকি সেখানে ফাঁকি দিচ্ছি- এদিকে মোটেই ভ্রুক্ষেপ নেই। অফিসে বিলম্বে যাচ্ছে। বিলম্বে গিয়েও নিজের দায়িত্ব পালন করছে না। অফিসে টাইমে নিজের ব্যক্তিগত কাজ করছে। এসব কেন হচ্ছে? এ কারণে যে, যা কিছু নিজের জন্যে পছন্দ করছে তা অন্যের জন্যে পছন্দ করছে না। নিজের জন্যে এক মাপকাঠি, আর অন্যের জন্যে অন্য মাপকাঠি। এখন যদি তাকে বলা হয় যে, যেহেতু তুমি পুরো সময় দাওনি, এজন্যে তোমার বেতন কাটা হবে, তাহলে এর বিরুদ্ধে লড়াই-ঝগড়া ও সভা-সমাবেশ শুরু হয়ে যাবে যে, কর্মচারীদের অধিকার হরণ করা হচ্ছে।
📄 চাকুরীর ক্ষেত্রে কর্মপদ্ধতি
এসব এজন্যে হচ্ছে যে, নিজের জন্যে এক মাপকাঠি, আর অন্যের জন্যে ভিন্ন মাপকাঠি। নিজের দায়িত্বের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া হচ্ছে না। শুধু নিজের অধিকারের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া হচ্ছে। এ শুধু সরকারি চাকুরীজীবীদের ক্ষেত্রে নয়, বরং যেসব আলেম মাদরাসায় শিক্ষকতা করছেন, বা মাদরাসায় চাকুরীরত আছেন, তাদের মধ্য থেকে খুব কম মানুষের অন্তরে একথা জাগে যে, আমার এ বেতন হালাল হচ্ছে কি না? আমাদের দারুল উলূম করাচীতে নিয়ম রয়েছে যে, সমস্ত ওস্তাদ ও কর্মচারী তাদের আগমন ও বর্হিগমনের সময় লিখে রাখেন। শ্রেণিকক্ষে যেতে বেশি বিলম্ব হলে তার বেতন আপনাআপনি কাটা যায়।
📄 বেতন কমানোর আবেদন
থানা ভবনে হযরত থানভী রহ.-এর যে মাদরাসা ছিলো, যদিও সেখানে এধরনের ব্যবস্থা ছিলো না, কিন্তু ওস্তাদ নিজে মাসের শেষে একটি আবেদনপত্র লিখতেন যে, এ মাসে আমার এ পরিমাণ দেরি হয়েছে বা আমার এতো দিন অনুপস্থিতি হয়েছে, এজন্যে আমার বেতন থেকে এ পরিমাণ কেটে নেওয়া হোক। আজ প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের অধিকার আদায়ের শ্লোগান দিচ্ছে, কিন্তু কারো একথা চিন্তা হয় না যে, আমার দায়িত্ব আদায়ে কতোটুকু ত্রুটি করলাম।
শাইখুল হিন্দ হযরত মাওলানা মাহমুদুল হাসান ছাহেব রহ.- আল্লাহ তা'আলা তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করুন- দারুল উলূম দেওবন্দের প্রথম তালিবে ইলম ছিলেন। তারপর তিনি সেখানকার ওস্তাদ হন এবং পরবর্তীতে শাইখুল হাদীস হন। বুখারী শরীফ পড়াতে পড়াতে দীর্ঘ সময় অতিক্রম করলে মজলিসে শূরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, হযরতের বেতন বাড়ানো উচিত। কারণ, তিনি দীর্ঘ দিন ধরে পড়াচ্ছেন। সে সময় তার বেতন ছিলো মাসিক দশ টাকা। এজন্যে মাসিক বেতন করা হয় পনের টাকা। হযরত শাইখুল হিন্দ রহ. বিষয়টি জানতে পেরে মজলিসে শূরা বরাবর যথানিয়মে একটি দরখাস্ত লিখলেন। তাতে তিনি লিখলেন, 'আমি জানতে পেরেছি যে, মজলিসে শূরা আমার বেতন বৃদ্ধি করেছে। কিন্তু আমি এর কোনো বৈধতা দেখছি না। কারণ, পূর্বে আমার শারীরিক শক্তি বেশি ছিলো, সময়ও দিতাম বেশি। এখন তো আমার শক্তিও কমে গিয়েছে এবং সময়ও বেশি দিতে পারি না। এজন্যে আমার বেতন না বাড়িয়ে কমানো হোক।' আপনারা তো বেতন বাড়ানোর দরখাস্ত করতে দেখেছেন, কিন্তু সেখানে বেতন কমানোর জন্যে দরখাস্ত করা হচ্ছিলো।