📄 আমার দ্বারা যেন কেউ কষ্ট না পায়
যাই হোক, মুআশারাত ইসলামী বিধানের বড়ো একটি অধ্যায়। হযরত থানভী রহ. 'আদাবুল মুআশারাত' নামে পরিপূর্ণ একটি পুস্তিকা লিখেছেন। যেসব লোক তারবিয়াতের উদ্দেশ্যে হযরত থানভী রহ.-এর নিকট থানাভবন যেতেন, তাদের জন্যে মুআশারাতের বিধান মেনে চলার ব্যাপারে খুব গুরুত্বারোপ করা হতো। এজন্যে তিনি বলতেন যে, কারো যদি 'সূফী' হওয়ার ইচ্ছা থাকে তাহলে অন্য কোথাও চলে যাক। ('সূফী' দ্বারা উদ্দেশ্য- সাধারণ পরিভাষায় যাকে 'সূফী' বলে)। আর যদি কারো মানুষ হতে হয়, তাহলে সে যেন এখানে চলে আসে। কারণ, সেখানে এ বিষয় দেখা হতো যে, তার উঠা-বসার আঙ্গিকের মধ্যে এবং তার দেখা-সাক্ষাতের কর্মপদ্ধতির মধ্যে ইসলামের বিধান চোখে পড়ে, নাকি তার বিরুদ্ধাচরণ করে। মোটকথা, মুআশারাত দ্বীনের বিধানের বিরাট একটি অধ্যায়। মুআশারাতের সমস্ত বিধানের সার-নির্যাস হলো- الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَ يَدِهِ হাদীস।
অর্থাৎ, তোমার দ্বারা অন্য কোনো মুসলমান যেন কোনো প্রকারের কষ্ট না পায়। দৈহিক, আত্মিক, মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক কোনো প্রকার কষ্ট যেন না পায়। সে হলো মুসলমান, যার ব্যক্তিসত্তা কোনোভাবেই অন্যের জন্যে কষ্টের কারণ হয় না। চিন্তা করলে দেখা যাবে যে, মুআশারাতের যাবতীয় বিধান এই হাদীসকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় যে, মানুষ এ ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করবে, আমার দ্বারা কেউ যেন কষ্ট না পায়।
📄 প্রত্যেক বিষয়কেই মাপকাঠিতে ওজন করো
মানুষ প্রত্যেক কাজেই লক্ষ রাখবে যে, আমার এ কাজ দ্বারা অন্য কেউ কষ্ট পাচ্ছে না তো। এ বিষয়টি লক্ষ রাখলে মুআশারাতের যাবতীয় বিধান মানা এবং বান্দার সব হক আদায় করা হয়ে যাবে। কিন্তু এটা কীভাবে বোঝা যাবে যে, আমার দ্বারা অন্যে কষ্ট পাচ্ছে কি না, وَأَحِبُّ لِلنَّاسِ مَا تُحِبُّ لِنَفْسِكَ হাদীস তার মাপকাঠি। অর্থাৎ, অন্যের জন্যে তাই পছন্দ করো যা নিজের জন্যে পছন্দ করো। প্রত্যেক বিষয়কে এ মাপকাঠিতে ওজন করে দেখো, তাহলে অন্যে কষ্ট পাচ্ছে কি না, জানতে পারবে? যদি অন্যে কষ্ট পায়, তাহলে তা ত্যাগ করো।
📄 খাওয়ার পরে পান খাওয়া
হযরত থানভী রহ. বলতেন যে, আমাদের এখানে তো এ জাতীয় হাসাওউফ রয়েছে। যদি মুরাকাবা-মুজাহাদার তাসাওউফ চাও তাহলে অন্যত্র চলে যাও। আমাদের এখানে তো এ তারবিয়াতই দেওয়া হয় যে, এক মানুষ যেন অন্য মানুষের জন্যে কষ্টের কারণ না হয়।
আমি এ ঘটনা আপনাদেরকে এর আগেও শুনিয়েছি যে, আমার ভাই জনাব মুহাম্মাদ যাকী কাইফী মরহুম- আল্লাহ তা'আলা তার মর্যাদা বৃদ্ধি করুন, আমীন- তিনি শিশু বয়সে হযরত ওয়ালেদ ছাহেবের সঙ্গে হযরত থানভী রহ.-এর খেদমতে যাতায়াত করতেন। হযরত শিশুদেরকে খুব আদর করতেন। কারণ, এটা হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত। হযরত ওয়ালেদ ছাহেব রহ. প্রতি বছর রমাযান মাস থানা ভবনে পরিবার-পরিজন নিয়ে কাটাতেন। শিশুদের ব্যাপারে কোনো নিয়ম-কানুন ছিলো না। বড়ো বড়ো মানুষ খানকার মধ্যে অবস্থানকালে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতেন যে, কোনো কাজ যেন হযরতের মেজাজের খেলাফ না হয়। কিন্তু শিশুরা স্বাধীনভাবে হযরতের নিকট চলে যেতো। হযরতের নিয়ম এই ছিলো যে, খানা খাওয়ার পর চুন, সুপারি ও খর ছাড়া পান পাতা চাবাতেন। কারণ, পান হজমের কাজ দেয়। এতে কোনো ক্ষতি নেই। আমার বড়ো ভাই জনাব যাকী কাইফী মরহুমের উপর খানা খাওয়ার পর ঘর থেকে পান আনার দায়িত্ব ছিলো। এ কারণে হযরত তার নাম দিয়েছিলেন 'পানী'।
📄 পাঠকের যেন কষ্ট না হয়
ভাই ছাহেব মরহুম যখন লিখতে শিখলেন, তখন হযরত ওয়ালেদ ছাহেব বললেন যে, তুমি প্রথম চিঠি হযরত থানভী রহ.-কে লিখো। ওয়ালেদ ছাহেব তার দ্বারা চিঠি লিখিয়ে হযরতের খেদমতে পাঠিয়ে দিলেন। হযরত থানভী রহ. তার উত্তরে ইলমের একটি অধ্যায় উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। উত্তরে হযরত বলেন, 'তোমার চিঠি পেলাম। মন খুব আনন্দিত হলো যে, তুমি লিখতে শিখেছো। এখন তুমি নিজের লেখাকে আরো ভালো করার চেষ্টা করো। আর নিয়ত এই করো যে, পাঠকের যেন কষ্ট না হয়। দেখো! আমি তোমাকে এখন থেকেই সূফী বানাচ্ছি।'
যেই শিশু মাত্র লেখা শিখছে, বলাবাহুল্য যে, সে আঁকা-বাঁকা লিখবে। সে সময় শিশুটিকে বলা হচ্ছে যে, হাতের লেখা ঠিক করো, যাতে পাঠকের কষ্ট না হয়। সাথে এ কথাও বলছেন যে, দেখো! আমি এখন থেকেই তোমাকে সূফী বানাচ্ছি! কেউ যদি জিজ্ঞাসা করে যে, হাতের লেখা ঠিক হওয়ার সঙ্গে সূফীর কী সম্পর্ক? কারণ, আমাদের মাথায় বদ্ধমূল যে, যে ব্যক্তি যতো বেশি এলোমেলো, সে ততো বড়ো সূফী! যে যতো বেশি ময়লা ও অপরিষ্কার, সে ততো বড়ো সূফী! যার কোনো কাজেরই শৃঙ্খলা নেই, সে হলো বড়ো সূফী!