📄 ঐ ব্যক্তির প্রতি আমার ঘৃণা সৃষ্টি হয়
এসব নসীহতের মধ্যে প্রত্যেকটি এমন পূর্ণাঙ্গ ও সর্বব্যাপী যে, কোনো মানুষ যদি এর উপর আমল করার তাওফীক লাভ করে তাহলে তার সারাজীবন গড়ে উঠবে। এ নসীহতটিও তার একটি যে, অন্যের জন্যে তাই পছন্দ করো, যা নিজের জন্যে পছন্দ করো। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মাধ্যমে এমন একটি মাপকাঠি দান করেছেন যে, সামাজিকতার যতো ইসলামী বিধান রয়েছে, তার সবগুলো এই একটি বাক্যের মধ্যে চলে আসে। কারণ, আল্লাহ তা'আলা যেই দ্বীন আমাদেরকে দান করেছেন তা আকীদা ও ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং মুআমালাত, মুআশারাত ও আখলাকের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। দ্বীনের বড়ো একটি অধ্যায় হলো মুআশারাত। অর্থাৎ, পরস্পরে দেখা-সাক্ষাৎ ও বসবাসের মধ্যে কী কী আদব থাকা উচিত, একে অপরের সঙ্গে কীভাবে জীবন কাটাবে- এগুলো মুআশারাতের অধ্যায়। হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. তার মুজাদ্দিদসূলভ তা'লীমের মধ্যে বিশেষভাবে মুআশারাতকে অনেক বেশি গুরুত্বের সঙ্গে মানুষের মন-মগজে বসানোর চেষ্টা করেছেন।
হযরত থানভী রহ. এ পর্যন্ত বলেছেন যে, আমার কোনো মুরীদের সম্পর্কে যদি জানতে পারি যে, সে যিকির, তাসবীহ বা নফল আমলের মধ্যে ত্রুটি করেছে, তাহলে অবশ্যই তার ফলে আমার কষ্ট হয়। কিন্তু কারো সম্পর্কে যদি জানতে পারি যে, সে মুআশারাতের বিধানের ক্ষেত্রে কোনো বিধান অমান্য করেছে, তাহলে তার প্রতি আমার ঘৃণা সৃষ্টি হয়। কারণ, মুআশারাতের বিধানের সম্পর্ক বান্দার হকের সঙ্গে। বান্দার হকের মাসআলা এই যে, কেউ যদি এ ব্যাপারে ত্রুটি করে তাহলে হকদার মাফ না করা পর্যন্ত তা মাফ হবে না। এজন্যে মুআশারাতের বিধান অমান্য করা মারাত্মক ব্যাপার।
📄 আমার দ্বারা যেন কেউ কষ্ট না পায়
যাই হোক, মুআশারাত ইসলামী বিধানের বড়ো একটি অধ্যায়। হযরত থানভী রহ. 'আদাবুল মুআশারাত' নামে পরিপূর্ণ একটি পুস্তিকা লিখেছেন। যেসব লোক তারবিয়াতের উদ্দেশ্যে হযরত থানভী রহ.-এর নিকট থানাভবন যেতেন, তাদের জন্যে মুআশারাতের বিধান মেনে চলার ব্যাপারে খুব গুরুত্বারোপ করা হতো। এজন্যে তিনি বলতেন যে, কারো যদি 'সূফী' হওয়ার ইচ্ছা থাকে তাহলে অন্য কোথাও চলে যাক। ('সূফী' দ্বারা উদ্দেশ্য- সাধারণ পরিভাষায় যাকে 'সূফী' বলে)। আর যদি কারো মানুষ হতে হয়, তাহলে সে যেন এখানে চলে আসে। কারণ, সেখানে এ বিষয় দেখা হতো যে, তার উঠা-বসার আঙ্গিকের মধ্যে এবং তার দেখা-সাক্ষাতের কর্মপদ্ধতির মধ্যে ইসলামের বিধান চোখে পড়ে, নাকি তার বিরুদ্ধাচরণ করে। মোটকথা, মুআশারাত দ্বীনের বিধানের বিরাট একটি অধ্যায়। মুআশারাতের সমস্ত বিধানের সার-নির্যাস হলো- الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَ يَدِهِ হাদীস।
অর্থাৎ, তোমার দ্বারা অন্য কোনো মুসলমান যেন কোনো প্রকারের কষ্ট না পায়। দৈহিক, আত্মিক, মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক কোনো প্রকার কষ্ট যেন না পায়। সে হলো মুসলমান, যার ব্যক্তিসত্তা কোনোভাবেই অন্যের জন্যে কষ্টের কারণ হয় না। চিন্তা করলে দেখা যাবে যে, মুআশারাতের যাবতীয় বিধান এই হাদীসকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় যে, মানুষ এ ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করবে, আমার দ্বারা কেউ যেন কষ্ট না পায়।
📄 প্রত্যেক বিষয়কেই মাপকাঠিতে ওজন করো
মানুষ প্রত্যেক কাজেই লক্ষ রাখবে যে, আমার এ কাজ দ্বারা অন্য কেউ কষ্ট পাচ্ছে না তো। এ বিষয়টি লক্ষ রাখলে মুআশারাতের যাবতীয় বিধান মানা এবং বান্দার সব হক আদায় করা হয়ে যাবে। কিন্তু এটা কীভাবে বোঝা যাবে যে, আমার দ্বারা অন্যে কষ্ট পাচ্ছে কি না, وَأَحِبُّ لِلنَّاسِ مَا تُحِبُّ لِنَفْسِكَ হাদীস তার মাপকাঠি। অর্থাৎ, অন্যের জন্যে তাই পছন্দ করো যা নিজের জন্যে পছন্দ করো। প্রত্যেক বিষয়কে এ মাপকাঠিতে ওজন করে দেখো, তাহলে অন্যে কষ্ট পাচ্ছে কি না, জানতে পারবে? যদি অন্যে কষ্ট পায়, তাহলে তা ত্যাগ করো।
📄 খাওয়ার পরে পান খাওয়া
হযরত থানভী রহ. বলতেন যে, আমাদের এখানে তো এ জাতীয় হাসাওউফ রয়েছে। যদি মুরাকাবা-মুজাহাদার তাসাওউফ চাও তাহলে অন্যত্র চলে যাও। আমাদের এখানে তো এ তারবিয়াতই দেওয়া হয় যে, এক মানুষ যেন অন্য মানুষের জন্যে কষ্টের কারণ না হয়।
আমি এ ঘটনা আপনাদেরকে এর আগেও শুনিয়েছি যে, আমার ভাই জনাব মুহাম্মাদ যাকী কাইফী মরহুম- আল্লাহ তা'আলা তার মর্যাদা বৃদ্ধি করুন, আমীন- তিনি শিশু বয়সে হযরত ওয়ালেদ ছাহেবের সঙ্গে হযরত থানভী রহ.-এর খেদমতে যাতায়াত করতেন। হযরত শিশুদেরকে খুব আদর করতেন। কারণ, এটা হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত। হযরত ওয়ালেদ ছাহেব রহ. প্রতি বছর রমাযান মাস থানা ভবনে পরিবার-পরিজন নিয়ে কাটাতেন। শিশুদের ব্যাপারে কোনো নিয়ম-কানুন ছিলো না। বড়ো বড়ো মানুষ খানকার মধ্যে অবস্থানকালে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতেন যে, কোনো কাজ যেন হযরতের মেজাজের খেলাফ না হয়। কিন্তু শিশুরা স্বাধীনভাবে হযরতের নিকট চলে যেতো। হযরতের নিয়ম এই ছিলো যে, খানা খাওয়ার পর চুন, সুপারি ও খর ছাড়া পান পাতা চাবাতেন। কারণ, পান হজমের কাজ দেয়। এতে কোনো ক্ষতি নেই। আমার বড়ো ভাই জনাব যাকী কাইফী মরহুমের উপর খানা খাওয়ার পর ঘর থেকে পান আনার দায়িত্ব ছিলো। এ কারণে হযরত তার নাম দিয়েছিলেন 'পানী'।