📄 কোনো সম্প্রদায়ের ভাগাড় ব্যবহার করা
ফুকাহায়ে কেরাম এই একই প্রশ্ন অন্য একটি হাদীসের উপরেও গিরিয়েছেন। সেই হাদীস শরীফটি এই যে, একবার হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোথাও যাচ্ছিলেন। পথে তাঁর পেশাব করার প্রয়োজন হয়। এক জায়গায় এক সম্প্রদায়ের ভাগাড় ছিলো। সেখানে মানুষ তাদের ময়লা-আবর্জনা ফেলতো। ঐ ভাগাড়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পেশাব করেন। হাদীসের শব্দ এই-
أَتَى سُبَاطَةَ قَوْمٍ
'এক সম্প্রদায়ের ময়লা ফেলার জায়গায় তিনি এলেন।' ৭ ফুকাহায়ে কেরাম এই হাদীসের উপর প্রশ্ন উঠিয়েছেন যে, ঐ ভাগাড় কোনো সম্প্রদায়ের মালিকানাভুক্ত ছিলো। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের অনুমতি ছাড়া তা কীভাবে ব্যবহার করলেন? তারপর فুকাহায়ে কেরাম নিজেরাই এর উত্তর দিয়েছেন যে, মূলত তা সাধারণের ব্যবহারের জায়গা ছিলো। এ উদ্দেশ্যেই ঐ জায়গা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিলো। এ কারণে কোনো ব্যক্তির মালিকানায় হস্তক্ষেপ করার প্রশ্নই উঠে না।
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২১৭, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪০২, সুনানে তিরমিযী, হাদীস ২১০, সুনানে নাসাঈ, হাদীস নং ১৮, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ২১, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৩০১, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ২২১৫৭
📄 মেজবানের ঘরের জিনিস ব্যবহার করা
এ হাদীস দ্বারা আপনারা অনুমান করুন যে, শরীয়ত অন্যের জিনিস ব্যবহার করার বিষয়ে কি পরিমাণ অনুভূতিপরায়ণ! উদাহরণস্বরূপ, আমরা মান্যর বাড়ির মেহমান হয়ে গেলাম। এখন যদি তার ঘরের কোনো জিনিস ব্যবহার করতে হয় তাহলে ব্যবহারের পূর্বে একটু চিন্তা করে দেখুন যে, আমার জন্যে এটা ব্যবহার করা জায়েয কি না এবং চিন্তা করে দেখুন যে, আমি এটা ব্যবহার করলে মেজবান খুশি হবে, নাকি তার অন্তরে সঙ্কোচন সৃষ্টি হবে। যদি তার অন্তরে সঙ্কোচন সৃষ্টি হওয়ার ব্যাপারে সামান্য আশঙ্কাও দেখা দেয়, সেমতাবস্থায় ঐ জিনিস ব্যবহার করা আপনার জন্যে জায়েয নেই।
আমাদের সমাজে এ বিষয়ে খুবই অসতর্কতা পাওয়া যায়। বন্ধুর বাড়িতে যায়, আর চিন্তা করে যে, এতো আমার অকৃত্রিম বন্ধু। এখন বন্ধুত্বের অজুহাতে তাকে লুট করতে আরম্ভ করে। তার জিনিস ব্যবহার করতে আরম্ভ করে। এটা জায়েয নেই। কারণ, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন যে, ঠাট্টা করেও অন্যের জিনিস নিয়ে ব্যবহার করা জায়েয নেই। তাহলে বাস্তবে কি করে তা জায়েয হতে পারে? এজন্যে আমাদের জরিপ চালিয়ে দেখা উচিত যে, অকৃত্রিমতার সুবাদে আমরা কোথায় কোথায় হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই হুকুমের বিরুদ্ধাচরণ করে চলছি।
📄 সন্তানের ঘরে প্রবেশ করার জন্য অনুমতি
আমার ওয়ালেদ মাজেদ হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ শফী ছাহেব রহ.-এর সারাজীবন আমরা এই নিয়ম দেখেছি যে, যখনই তিনি কোনো কাজের জন্যে তার সন্তানদের কামরায় প্রবেশ করার ইচ্ছা করতেন, তখন প্রবেশ করার পূর্বে অনুমতি নিতেন। অথচ ঐ কামরা আমাদের মালিকানাভুক্ত ছিলো না। তাঁরই মালিকানাধীন ছিলো। এতদসত্ত্বেও অনুমতি নিতেন। আর যদি কখনো হযরত ওয়ালেদ ছাহেব রহ.-এর আমাদের ব্যবহারাধীন কোনো জিনিস ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিতো, তখন সবসময় অনুমতি চাইতেন যে, তোমার এ জিনিসটা আমি ব্যবহার করি? এবার আপনারা চিন্তা করে দেখুন যে, একজন বাপ তার ছেলের কাছে জিজ্ঞাসা করছে যে, আমি তোমার জিনিস ব্যবহার করি? অথচ হাদীস শরীফে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
أَنْتَ وَمَالُكَ لِأَبِيكَ 'তুমি নিজে এবং তোমার সম্পদ সব তোমার বাবার।
কিন্তু এতদসত্ত্বেও এ পরিমাণ সতর্কতা ছিলো যে, সন্তানের কাছে জিজ্ঞাসা করে তার জিনিস ব্যবহার করছেন। নিজের সন্তানের জিনিস ব্যবহারের ক্ষেত্রে যদি এ পরিমাণ সতর্ক থাকতে হয়, তাহলে যাদের সাথে এ ধরনের আত্মীয়তা নেই, তাদের জিনিস অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা কতো মারাত্মক ব্যাপার!
টিকাঃ
৮. সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ২২৮২, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৬৬০৮
📄 অনুমতি ছাড়া অন্যের ঘরে প্রবেশ করা
এসব বিষয়কে আমরা আমাদের দ্বীন থেকে বের করে দিয়েছি। আজকাল শুধু ইবাদত ও নামায-রোযার নাম দ্বীন মনে করেছি। এর বাইরে যেসব মুআমালা আছে সেগুলোকে আমরা দ্বীন থেকে বের করে দিয়েছি। যেমন অন্য কারো বাড়িতে পূর্ব অবগতি ছাড়া খানা খাওয়ার সময় যাওয়া দ্বীনের খেলাফ। যেমন বর্তমানে হয়ে থাকে যে, পীর ছাহেব তার মুরীদান বাহিনী নিয়ে কোনো মুরীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। পীর ছাহেব মনে করছেন যে, এতো আমার মুরীদ। তাই সর্বাবস্থায় আমার আদর-যত্ন তাকে করতেই হবে। এটা আমি স্বচক্ষে দেখা ঘটনা বলছি। এখন মুরীদ বেচারা পেরেশান যে, উপস্থিত মুহূর্তে আমি কি ব্যবস্থা করবো? এতো বড়ো বাহিনী এসেছে, এর জন্যে কোথেকে আদর-আপ্যায়নের ব্যবস্থা করবো? আপনারা লক্ষ করুন! নামাযও হচ্ছে, তাহাজ্জুদ, ইশরাক, চাশত, যিকির-আযকার সব ইবাদত হচ্ছে, পীর ছাহেব হয়ে বসে আছে। কিন্তু পূর্ব অবগতি ছাড়া মুরীদের বাড়িতে চলে গেলো। মনে রাখবেন! এটা এ হাদীসের অন্তর্ভুক্ত, যার মধ্যে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
لَا يَحِلُّ مَالُ امْرِي إِلَّا بِطِيبٍ نَفْسٍ مِنْهُ
কিন্তু পীর ছাহেবের এ বিষয়ে কোনো পরোয়া নেই যে, এর ফলে মুরীদের কষ্ট হচ্ছে বা পেরেশানী হচ্ছে বা তার সম্পদ তার স্বতঃস্ফূর্ত অনুমতি ছাড়া ভোগ করা হচ্ছে। আজ আমাদের সমাজে এসব বিষয় মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। একে দ্বীনের অংশই মনে করা হয় না। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন এবং প্রত্যেক জিনিসকে যথাস্থানে রাখার রুচি দান করুন, আমীন। যে জিনিসের যে অবস্থান, সে অনুপাতেই যেন তার উপর আমল হয়।
টিকাঃ
১. সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৩০১২, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৯৭৭৪