📄 মওলবীগিরি বিক্রির জিনিস নয়
হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী ছাহেব রহ. তাঁর কোনো ওস্তাদ বা শাইখের ঘটনা বর্ণনা করে বলেন যে, একবার তিনি এক দোকানে একটি জিনিস ক্রয় করতে যান। তিনি ঐ জিনিসের মূল্য জিজ্ঞাসা করেন। দোকানদার মূল্য বলে। তিনি মূল্য পরিশোধ করছিলেন, এমন সময় অন্য এক ব্যক্তি সেখানে আসে, যে ঐ মাওলানা ছাহেবকে চিনতো। দোকানদার তাকে চিনতো না। ঐ লোকটি দোকানদারকে বললো যে, ইনি অমুক মাওলানা ছাহেব, তাকে ছাড় দিয়েন। তখন মাওলানা ছাহেব বললেন, আমি আমার মওলবী হওয়ার মূল্য নিতে চাই না। এই জিনিসের প্রকৃত মূল্য যা তাই আমার থেকে নাও। এ কারণে যে, প্রথমে তুমি যেই মূল্য বলেছিলে, সেই মূল্যে তুমি খুশি মনে এই জিনিস দিতে প্রস্তুত ছিলে। এখন যদি অন্য মানুষের কথায় তুমি ছাড় দাও, আর তাতে তোমার দিল পরিতৃপ্ত না থাকে, তাহলে তা খুশি মনে দেওয়া হবে না। তখন এ জিনিসের মধ্যে আমার বরকত হবে না এবং তা নেওয়া আমার জন্যে হালাল হবে না। এজন্যে তুমি আমাকে যেই পরিমাণ মূল্য বলেছিলে, ঐ পরিমাণ মূল্যই নাও।
এ ঘটনা দ্বারা এদিকে ইঙ্গিত করেন যে, মওলবীগিরি বিক্রির জিনিস নয় যে, বাজারে তা বিক্রি করা হবে, আর মানুষ এর কারণে জিনিসের মূল্য কম রাখবে।
📄 ইমাম আবু হানীফা রহ.-এর ওসীয়ত
আমাদের ইমাম হযরত আবু হানীফা রহ. তাঁর শাগরিদ হযরত ইমাম আবু ইউসুফ রহ.-কে ওসীয়ত করেন যে, যখন তুমি কোনো জিনিস ক্রয় করবে বা ভাড়া নিবে, যেই পরিমাণ মূল্য ও ভাড়া সাধারণ মানুষ দিয়ে থাকে তুমি তার থেকে কিছু বেশি দিবে। এমন যেন না হয় যে, তোমার কম দেওয়ার কারণে ইলম ও দ্বীনের অসম্মান ও অমর্যাদা হয়।
যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা সতর্কতার এই মাকাম দান করেন, তারা এই পরিমাণ লক্ষ রাখেন যে, অন্যের কোনো জিনিস যেন তার অন্তরের সন্তুষ্টি ছাড়া আমার কাছে না আসে। যেমন আপনি কারো থেকে কোনো জিনিস চাইবেন, চাওয়ার আগে একটু চিন্তা করুন যে, অন্য কেউ যদি আপনার কাছে এ জিনিস চাইতো, তাহলে কি আপনি তাকে খুশি মনে তা দিতেন? আপনি যদি খুশি মনে রাজি না হতেন, তাহলে ঐ জিনিস অন্যের থেকে চাইবেন না। কারণ, হতে পারে ভদ্রতার খাতিরে সে আপনাকে ঐ জিনিস দিলো, কিন্তু তার অন্তর খুশি নয়। এর ফলে আপনি হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই বাণীর লক্ষ্যে পরিণত হলেন যে, 'কোনো মুসলমানের সম্পদ তার খুশি মনের অনুমতি ছাড়া হালাল নয়।'
📄 হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সতর্কতার একটি ঘটনা
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কতো উঁচু মাকাম ছিলো যে, তিনি এ পরিমাণ সতর্কতা অবলম্বন করতেন যে, একবার তিনি হযরত ওমর ফারুক রাযি.-কে বলেন, আল্লাহ তা'আলা তোমার জন্যে জান্নাতের মধ্যে যেই মহল বানিয়েছেন আমি তা নিজ চোখে দেখেছি। সে মহল এতো সুন্দর ছিলো যে, আমার মন চাইলো ঐ মহলের ভিতরে প্রবেশ করি। আমি যখন ভিতরে যাওয়ার ইচ্ছা করলাম তখন তোমার আত্মমর্যাদাবোধের কথা স্মরণ হলো। অর্থাৎ, আল্লাহ তা'আলা তোমাকে অনেক বেশি আত্মমর্যাদা দান করেছেন। অন্য কোনো ব্যক্তি যদি তোমার অনুমতি ছাড়া তোমার ঘরে প্রবেশ করে তাহলে তোমার আত্মমর্যাদায় বাঁধে। এজন্যে আমি চিন্তা করলাম যে, তোমার অনুমতি ছাড়া এ ঘরে প্রবেশ করা উচিত নয়। এজন্যে আমি তাতে প্রবেশ করিনি। হযরত ওমর ফারুক রাযি. এ কথা শুনে কেঁদে ফেললেন এবং নিবেদন করলেন- أَوَعَلَيْكَ أَغَارُ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ 'হে আল্লাহর রাসূল! আমার মা-বাপ আপনার উপর কোরবান হোক। আপনার ব্যাপারেও কি আমি আত্মমর্যাদা দেখাবো?'
টিকাঃ
৪. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৪০৩, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৪০৮, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৩৮০১
📄 উম্মতের জন্য শিক্ষা
এবার আপনারা অনুমান করুন যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতেন ওমর ফারুক রাযি.-এর মতো মানুষ নিজের জান-মাল, ইজ্জত-আব্রু সবকিছু তাঁর উপর কোরবান করতে প্রস্তুত আছেন। তাঁর কাছে বড়ো থেকে বড়ো কোনো সম্পদ থাকলে আর তা হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যবহারে আসলে তিনি নিজের জন্যে গর্বের বিষয় মনে করবেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তিনি তাঁর মহলের মধ্যে প্রবেশ করেননি। অথচ তা ছিলো জান্নাতের জায়গা। যেখানে কোনো কষ্ট নেই। ওলামায়ে কেরাম বলেন, এ হাদীস দ্বারা মূলত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে এই শিক্ষা দিতে চেয়েছেন যে, দেখো! আমি নিজেও আমার এমন নিবেদিতপ্রাণ সাহাবীর ঘরে তার অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করিনি। তাহলে তোমাদের জন্যে সাধারণ অবস্থায় স্বতঃস্ফূর্ত অনুমতি ছাড়া অন্যের জিনিস ব্যবহার করা কি করে জায়েয হতে পারে?