📄 হাজ্জাজ বিন ইউসুফের গীবত
হাজ্জাজ বিন ইউসুফ সম্পর্কে কোন মুসলমান জানে না যে, সে অসংখ্য অত্যাচার করেছিলো। বহু আলেমকে শহীদ করেছে এবং বহু হাফেযকে হত্যা করেছে। এমনকি সে কাবা শরীফের উপরে আক্রমণ করেছে। এসব খারাপ কাজ সে করেছে। যে মুসলমানই তার এসব বিষয় পড়ে তার অন্তরেই তার ব্যাপারে ঘৃণা সৃষ্টি হয়। কিন্তু একবার এক ব্যক্তি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযি.-এর সামনে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের দোষ চর্চা শুরু করে তার গীবত করে। তখন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযি. সাথে সাথে ধরে বসেন এবং বলেন যে, এ কথা মনে করবে না যে, হাজ্জাজ বিন ইউসুফ জালেম বলে তার গীবত করা হালাল হয়ে গিয়েছে বা তার উপর অপবাদ দেওয়া হালাল হয়ে গিয়েছে। মনে রাখবে! যখন আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন হাজ্জাজ বিন ইউসুফ থেকে তার অন্যায়, হত্যা, জুলুম ও খুনের বদলা নিবেন, তখন তুমি তার যে গীবত করছো বা তার উপর যে অপবাদ আরোপ করছো, তার বদলাও আল্লাহ তা'আলা তোমার থেকে নিবেন। এমন নয় যে, যে ব্যক্তি দুর্নামগ্রস্থ হয়েছে তার উপর যা ইচ্ছা দোষ চাপিয়ে যাবে। অপবাদ দিতে থাকবে। গীবত করতে থাকবে। এজন্যে শত্রুতাও ভারসাম্যের সাথে করো এবং ভালোবাসাও করো ভারসাম্যের সাথে।
📄 আমাদের দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের অবস্থা
বর্তমানে আমাদের দেশে যে রাজনৈতিক পরিবেশ রয়েছে তার অবস্থা এই যে, কারো সাথে যদি রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠে, তাহলে তাকে এমনভাবে মাথায় তুলে নেয় যে, তার মধ্যে আর কোনো দোষই দেখে না। অন্য কেউ যদি তার দোষ বর্ণনা করে তা শোনাও সহ্য হয় না। সে যাবতীয় দোষ-ত্রুটি থেকে পাক-পবিত্র হয়ে যায়। আর যখন তার সাথে রাজনৈতিক শত্রুতা সৃষ্টি হয়, তখন তার মধ্যে কোনো ভালো গুণই চোখে পড়ে না। উভয় ক্ষেত্রে সীমা লঙ্ঘন চলছে। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ পদ্ধতি অবলম্বন করতে নিষেধ করেছেন।
আমি বার বার বলে থাকি যে, শুধু নামায-রোযার নাম দ্বীন নয়। এটাও দ্বীনের অংশ যে, মহব্বত করলে ভারসাম্যের সাথে করবে এবং বিদ্বেষ করলেও ভারসাম্যের সাথে করবে। যারা আল্লাহর প্রকৃত বন্দা, তারা এসব বিষয় বুঝে থাকেন। যারা শাসক, নেতা এবং জাতির পথপ্রদর্শক তাদের সাথে সম্পর্ক থাকবে সসম্মানের দূরত্ব সহকারে। তাদের সাথে সম্পর্ক হলে সীমা অতিক্রম করবে না।
📄 কাজী বাক্কার বিন কুতাইবা রহ.-এর শিক্ষণীয় ঘটনা
কাজী বাক্কার বিন কুতাইবা রহ. নামে এক কাজী ছিলেন। তিনি ছিলেন বড়ো মাপের মুহাদ্দিস। মাদরাসাসমূহে 'তহাবী শরীফ' নামে হাদীসের একটি কিতাব পড়ানো হয়। এর লেখক হলেন ইমাম তহাবী রহ.। কাজী বাক্কার বিন কুতাইবা রহ. তাঁর ওস্তাদ। ঐ যুগের বাদশাহ তাঁর প্রতি সদয় হন। এমন সদয় হন যে, সব বিষয়ে তাঁর সাথে পরামর্শ করতেন। সব ব্যাপারে তাকে ডাকতেন। সব দাওয়াতে তাকে আহবান করতেন। এমনকি তাকে পুরো দেশের কাজী বানিয়ে দেন। এখন সব ফায়সালা তার কাছে আসছে। দিন- রাত বাদশার সঙ্গে ওঠা-বসা চলছে। তিনি কোনো সুপারিশ করলে বাদশাহ তা গ্রহণ করেন। দীর্ঘ দিন পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত থাকে। তিনি তার কাজীর দায়িত্বও পালন করেন এবং উপযুক্ত পরামর্শও বাদশাহকে দেন।
তিনি তো ছিলেন আলেম ও বিচারক। বাদশাহর দাস ছিলেন না। বাদশাহ একবার ভুল কাজ করে বসেন। কাজী ছাহেব ফতওয়া দেন যে, বাদশাহর এ কাজ ভুল। শরীয়ত পরিপন্থী। এখন বাদশাহ অসন্তুষ্ট হয় যে, আমি এতোদিন পর্যন্ত তাকে খাওয়াচ্ছি, পরাচ্ছি, তাকে হাদিয়া তোহফা দিচ্ছি, তার সুপারিশ কবুল করছি এখন তিনি আমারই বিরুদ্ধে ফতওয়া দিলেন। সুতরাং অবিলম্বে তাকে কাজীর পদ থেকে বরখাস্ত করে। দুনিয়ার রাজা-বাদশারা খুব ছোট মনের হয়ে থাকে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে উদার দেখা গেলেও বাস্তবে ছোট মনের হয়ে থাকে। এই বাদশাহ শুধু তাকে বিচারপতির পদ থেকে বরখাস্তই করেনি বরং তাঁর নিকট দূত পাঠিয়েছে যে, গিয়ে তাকে বলো, আজ পর্যন্ত আমি যতো হাদিয়া তোহফা দিয়েছি সব ফেরত দাও। কারণ, তুমি এখন আমার মর্জির খেলাফ কাজ শুরু করেছো। এবার আপনারা অনুমান করুন! কয়েক বছরের সব হাদিয়া, কখনো এটা দিয়েছে, কখনো ওটা দিয়েছে। বাদশাহর সেই লোক এলে তিনি তাকে বাড়ির একটা কামরার মধ্যে নিয়ে গেলেন। একটা আলমারির তালা খুললেন। পুরো আলমারি থলে দিয়ে ভরা ছিলো। তিনি ঐ দূতকে বললেন, তোমার বাদশাহ থেকে যতো হাদিয়ার থলে আসতো তা সবগুলোই এই আলমারিতে রাখা আছে। থলের উপর যে সিল- মোহর লাগানো আছে তা এখনও খোলা হয়নি। এসব থলে নিয়ে যাও। কারণ, যেদিন থেকে বাদশাহর সাথে সম্পর্ক হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ, ঐ দিন থেকেই হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ হাদীস আমার মাথায় ছিলো যে,
أَحْبِبْ حَبِيبَكَ هَوْنًا مَا عَسَى أَنْ يَكُونَ بَغِيضَكَ يَوْمًا مَّا
আমার ধারণা ছিলো যে, হয়তো এমন কোনো সময় আসবে, যখন এ সব হদিয়া আমাকে ফিরিয়ে দিতে হবে। আলহামদুল্লিাহ, বাদশাহর দেওয়া হদিয়া-তোহফার মধ্যে থেকে একটি কণাও আমি আজ পর্যন্ত ব্যবহার করিনি। এটা হলো হুযূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীর উপর হামল করার সঠিক নমুনা। এমন নয় যে, যখন বন্ধুত্ব হলো তখন সব গুনের সুবিধা ভোগ করা হচ্ছে, আর যখন শত্রুতা হলো তখন লজ্জা ও অনুতাপ হচ্ছে। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে এ থেকে রক্ষা করুন। আমীন।
টিকাঃ
৭. সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১৯২০
📄 এই দু'আ করতে থাকো
প্রথমত সঠিক অর্থে ভালোবাসা কেবল আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে হওয়া উচিত। এ কারণে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দু'আ শিক্ষা দিয়েছেন, যা প্রত্যেক মুসলমানের সবসময় করা উচিত।
اللَّهُمَّ اجْعَلْ حُبَّكَ أَحَبَّ الْأَشْيَاءِ إِلَى
'হে আল্লাহ! আপনার মহব্বতকে সকল মহব্বতের উপর প্রবল করে দিন।"
মানুষ যেহেতু দুর্বল, তার সঙ্গে মানবীয় চাহিদা লেগে আছে, এজন্যে অন্যদের সাথেও মানুষের ভালোবাসা হয়। যেমন স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা, সন্তানের প্রতি ভালোবাসা, বন্ধুর প্রতি ভালোবাসা, মা-বাবার প্রতি ভালোবাসা, আত্মীয়-স্বজনের প্রতি ভালোবাসা- এসব ভালোবাসা মানুষের সাথে লেগে আছে। এসব ভালোবাসা মানুষের সাথে থাকবে। কখনো শেষ হবে না। তবে আসল কথা এই যে, মানুষ দু'আ করবে, হে আল্লাহ! এ সমস্ত ভালোবাসা আপনার ভালোবাসার অনুগামী হোক এবং আপনার ভালোবাসা সমস্ত ভালোবাসার উপর প্রবল হোক।
টিকাঃ
১. কানযুল উম্মাল, খন্ডঃ ২, পৃঃ ১৮২ ইসলামী মুআশারাত-১৬