📄 নিষ্ঠাবান বন্ধুদের বিলুপ্তি
দ্বিতীয় বিষয় এই যে, এই দুনিয়ায় এমন বন্ধু পাওয়া যায় কোথায়, যার বন্ধুত্ব আল্লাহর বন্ধুত্বের অনুগামী হবে? অনেক তত্ত্ব-তালাশ করেও এমন বন্ধু পাওয়া যায় না, যাকে সঠিক অর্থে বন্ধু বলা যায়। যার বন্ধুত্ব আল্লাহর বন্ধুত্বের অনুগামী হবে এবং কঠিন পরীক্ষার সময় পোক্ত প্রমাণিত হবে, এমন বস্তু পাওয়া ভার। ভাগ্যবানেরাই এমন বন্ধু পেয়ে থাকেন। আমার ওয়ালেদ মাজেদ হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ শফী ছাহেব রহ.-এর সামনে যখন আমার বড়ো ভাইগণ তাদের বন্ধুদের কথা আলোচনা করতেন, তখন ওয়ালেদ ছাহেব তাদেরকে বলতেন যে, দুনিয়াতে তোমাদের অনেক বন্ধু। আমার ষাট বছর বয়স হয়ে গেলো কোনো বন্ধু খুঁজে পেলাম না। সারা জীবনে মাত্র দেড়জন বন্ধু পেয়েছি। একজন পুরা, আরেকজন অর্ধেক। কিন্তু তোমরা অনেক বন্ধু পেয়ে থাকো। বন্ধুত্বের মাপকাঠিতে পরিপূর্ণ প্রমাণিত হয় এবং কঠিন পরীক্ষার সময়ও পাকা ও খাঁটি প্রমাণিত হয়, এমন বন্ধু খুব কম পাওয়া যায়।
📄 বন্ধুত্ব আল্লাহর বন্ধুত্বের অনুগামী হওয়া উচিত
দুনিয়াতে যেই বন্ধুত্ব হবে, তা হবে আল্লাহর ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের অনুগামী। তাই বন্ধুর কথায় গোনাহের কাজ করা যাবে না। বন্ধুত্ব পালন করতে গিয়ে নাফরমানি করা যাবে না। প্রথম কথা তো এই যে, এ দুনিয়ার সমস্ত বন্ধুত্ব আল্লাহ তা'আলার বন্ধুত্বের ও ভালোবাসার অনুগামী হওয়া উচিত।
যাই হোক, আল্লাহ তা'আলার অনুগামী হিসেবেও যদি কাউকে বন্ধু বানাও, তাহলে সেই বন্ধুত্বের মধ্যেও এ বিষয় গুরুত্বারোপ করবে, যেন বন্ধুত্বের সীমা অতিক্রম করে না যায়। বন্ধুত্ব যেন একটি সীমার মধ্যে থাকে। এমন যেন না হয় যে, যখন বন্ধুত্ব হয়েছে তখন সকাল-সন্ধ্যায় সবসময় তার সাথেই উঠা-বসা, তার সাথেই পানাহার, নিজের গোপন কথাও তার কাছে প্রকাশ করছো, নিজের সব বিষয় তার কাছে বলে যাচ্ছো। কাল যদি বন্ধুত্ব শেষ হয়ে যায় তখন যেহেতু তোমার সব গোপন কথা তার কাছে প্রকাশ করেছো, এবার সে তোমার সব গোপন বিষয় সব জায়গায় বলতে থাকবে। যা তোমার জন্যে ক্ষতির কারণ হবে। এজন্যে বন্ধুত্ব ভারসাম্যের সাথে হওয়া উচিত। সীমা অতিক্রম করা উচিত নয়।
📄 শত্রুতার মধ্যে ভারসাম্য
এমনিভাবে কারো সাথে শত্রুতা থাকলে এবং সম্পর্ক ভালো না থাকলে সবসময় যেন তার দোষ বের করা না হয়। তার সব কাজে খুঁত তালাশ করা না হয়। আরে ভাই কোনো মানুষ খারাপ হয়ে থাকলে তার মধ্যে আল্লাহ তা'আলা ভালো গুণও তো রেখেছেন। এমন যেন না হয় যে, শত্রুতার কারণে তার ভালো গুণগুলোকেও তুমি দৃষ্টির আড়াল করে চলছো। কুরআনে কারীমে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করছেন,
وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَانُ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا 'কোনো জাতির সাথে শত্রুতা তোমাদেরকে যেন তাদের প্রতি অবিচার করতে উদ্বুদ্ধ না করে।"
নিঃসন্দেহে তার সঙ্গে তোমার শত্রুতা আছে, কিন্তু এই শত্রুতার অর্থ এই নয় যে, এখন তার কোনো গুণই তুমি স্বীকার করবে না। বরং সে যদি কোনো ভালো কাজ করে তাহলে তা স্বীকার করা উচিত। কিন্তু যেহেতু হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ বাণী সাধারণত আমাদের দৃষ্টির সামনে থাকে না, এ কারণে ভালোবাসার ক্ষেত্রেও সীমা অতিক্রম হয় এবং বিদ্বেষ ও শত্রুতার ক্ষেত্রেও সীমা লঙ্ঘন হয়।
টিকাঃ
৬. মায়েদা: ৮
📄 হাজ্জাজ বিন ইউসুফের গীবত
হাজ্জাজ বিন ইউসুফ সম্পর্কে কোন মুসলমান জানে না যে, সে অসংখ্য অত্যাচার করেছিলো। বহু আলেমকে শহীদ করেছে এবং বহু হাফেযকে হত্যা করেছে। এমনকি সে কাবা শরীফের উপরে আক্রমণ করেছে। এসব খারাপ কাজ সে করেছে। যে মুসলমানই তার এসব বিষয় পড়ে তার অন্তরেই তার ব্যাপারে ঘৃণা সৃষ্টি হয়। কিন্তু একবার এক ব্যক্তি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযি.-এর সামনে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের দোষ চর্চা শুরু করে তার গীবত করে। তখন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযি. সাথে সাথে ধরে বসেন এবং বলেন যে, এ কথা মনে করবে না যে, হাজ্জাজ বিন ইউসুফ জালেম বলে তার গীবত করা হালাল হয়ে গিয়েছে বা তার উপর অপবাদ দেওয়া হালাল হয়ে গিয়েছে। মনে রাখবে! যখন আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন হাজ্জাজ বিন ইউসুফ থেকে তার অন্যায়, হত্যা, জুলুম ও খুনের বদলা নিবেন, তখন তুমি তার যে গীবত করছো বা তার উপর যে অপবাদ আরোপ করছো, তার বদলাও আল্লাহ তা'আলা তোমার থেকে নিবেন। এমন নয় যে, যে ব্যক্তি দুর্নামগ্রস্থ হয়েছে তার উপর যা ইচ্ছা দোষ চাপিয়ে যাবে। অপবাদ দিতে থাকবে। গীবত করতে থাকবে। এজন্যে শত্রুতাও ভারসাম্যের সাথে করো এবং ভালোবাসাও করো ভারসাম্যের সাথে।