📄 হিজরতের একটি ঘটনা
হাদীস শরীফে এসেছে যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হিজরত করছিলেন, তখন হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. তাঁর চেহারা মুবারকে ক্ষুধার আলামত দেখতে পান। তিনি এক জায়গা থেকে দুধ এনে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে পেশ করেন, অথচ তখন তিনি নিজেও ক্ষুধার্ত ছিলেন। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুধ পান করেন। হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. পরবর্তীতে এ ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনভাবে দুধ পান করেন যে, আমি পরিতৃপ্ত হয়ে যাই। অর্থাৎ, দুধ তো পান করেন হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, কিন্তু পরিতৃপ্ত হন হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি.। একারণে বন্ধুত্ব, আত্মত্যাগ ও কষ্ট স্বীকারের যেই পর্যায় হযরত আবু বকর রাযি. দেখিয়েছেন, তা দুনিয়াতে অন্য কেউ দেখাতে পারবে না।
টিকাঃ
৪. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৩৪৬, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫৩২৯, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৩
📄 বন্ধুত্ব আল্লাহর জন্য নির্ধারিত
কিন্তু এতদসত্ত্বেও হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
لَوْ كُنْتُ مُتَّخِذًا خَلِيْلًا لَا تَّخَذْتُ أَبَا بَكْرٍ خَلِيْلًا
'আমি যদি এ দুনিয়াতে কাউকে খাঁটি বন্ধুরূপে গ্রহণ করতাম, তাহলে আবু বকরকে গ্রহণ করতাম।" অর্থাৎ, তাঁকেও বন্ধু বানাননি। কারণ, এ দুনিয়াতে প্রকৃত অর্থে বন্ধু হওয়ার যোগ্য কেউ নয়। বন্ধুত্ব কেবল আল্লাহ তা'আলার জন্যেই অবধারিত। এমন বন্ধুত্ব, যা মানুষের অন্তরে আধিপত্য বিস্তার করবে, সে যা বলবে তাই করবে, মানুষের অন্তর তার অনুগামী হয়ে যাবে, এমন বন্ধুত্ব আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সাথে শোভনীয় নয়।
টিকাঃ
৫. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৪৬, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৩৯০, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৩৫৮৮, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৯০, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৩৩৯৯
📄 নিষ্ঠাবান বন্ধুদের বিলুপ্তি
দ্বিতীয় বিষয় এই যে, এই দুনিয়ায় এমন বন্ধু পাওয়া যায় কোথায়, যার বন্ধুত্ব আল্লাহর বন্ধুত্বের অনুগামী হবে? অনেক তত্ত্ব-তালাশ করেও এমন বন্ধু পাওয়া যায় না, যাকে সঠিক অর্থে বন্ধু বলা যায়। যার বন্ধুত্ব আল্লাহর বন্ধুত্বের অনুগামী হবে এবং কঠিন পরীক্ষার সময় পোক্ত প্রমাণিত হবে, এমন বস্তু পাওয়া ভার। ভাগ্যবানেরাই এমন বন্ধু পেয়ে থাকেন। আমার ওয়ালেদ মাজেদ হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ শফী ছাহেব রহ.-এর সামনে যখন আমার বড়ো ভাইগণ তাদের বন্ধুদের কথা আলোচনা করতেন, তখন ওয়ালেদ ছাহেব তাদেরকে বলতেন যে, দুনিয়াতে তোমাদের অনেক বন্ধু। আমার ষাট বছর বয়স হয়ে গেলো কোনো বন্ধু খুঁজে পেলাম না। সারা জীবনে মাত্র দেড়জন বন্ধু পেয়েছি। একজন পুরা, আরেকজন অর্ধেক। কিন্তু তোমরা অনেক বন্ধু পেয়ে থাকো। বন্ধুত্বের মাপকাঠিতে পরিপূর্ণ প্রমাণিত হয় এবং কঠিন পরীক্ষার সময়ও পাকা ও খাঁটি প্রমাণিত হয়, এমন বন্ধু খুব কম পাওয়া যায়।
📄 বন্ধুত্ব আল্লাহর বন্ধুত্বের অনুগামী হওয়া উচিত
দুনিয়াতে যেই বন্ধুত্ব হবে, তা হবে আল্লাহর ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের অনুগামী। তাই বন্ধুর কথায় গোনাহের কাজ করা যাবে না। বন্ধুত্ব পালন করতে গিয়ে নাফরমানি করা যাবে না। প্রথম কথা তো এই যে, এ দুনিয়ার সমস্ত বন্ধুত্ব আল্লাহ তা'আলার বন্ধুত্বের ও ভালোবাসার অনুগামী হওয়া উচিত।
যাই হোক, আল্লাহ তা'আলার অনুগামী হিসেবেও যদি কাউকে বন্ধু বানাও, তাহলে সেই বন্ধুত্বের মধ্যেও এ বিষয় গুরুত্বারোপ করবে, যেন বন্ধুত্বের সীমা অতিক্রম করে না যায়। বন্ধুত্ব যেন একটি সীমার মধ্যে থাকে। এমন যেন না হয় যে, যখন বন্ধুত্ব হয়েছে তখন সকাল-সন্ধ্যায় সবসময় তার সাথেই উঠা-বসা, তার সাথেই পানাহার, নিজের গোপন কথাও তার কাছে প্রকাশ করছো, নিজের সব বিষয় তার কাছে বলে যাচ্ছো। কাল যদি বন্ধুত্ব শেষ হয়ে যায় তখন যেহেতু তোমার সব গোপন কথা তার কাছে প্রকাশ করেছো, এবার সে তোমার সব গোপন বিষয় সব জায়গায় বলতে থাকবে। যা তোমার জন্যে ক্ষতির কারণ হবে। এজন্যে বন্ধুত্ব ভারসাম্যের সাথে হওয়া উচিত। সীমা অতিক্রম করা উচিত নয়।