📄 মানসিক কষ্টে লিপ্ত করা হারাম
হযরত থানভী রহ. বলেন যে, এ হাদীসে জিব ও হাত দ্বারা বাহ্যিক আমলের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। কিন্তু আপনি যদি জিব বা হাত দ্বারা এমন কোনো কাজ করেন, যার দ্বারা অন্যের মানসিক কষ্ট হয় তাহলে তাও এ হাদীসের অন্তর্ভুক্ত। উদাহরণস্বরূপ, আপনি কারো থেকে ঋণ নিলেন এবং তার সাথে ওয়াদা করলেন যে, এতো দিনের মধ্যে পরিশোধ করবো। আপনি যদি যথাসময়ে পরিশোধ করতে সক্ষম না হন তাহলে তাকে জানিয়ে দিন যে, আমি এখন পরিশোধ করতে পারছি না। এতোদিন পরে পরিশোধ করবো। এর পরেও পরিশোধ করতে না পারলে আবারও জানিয়ে দিন। কিন্তু তাকে ঝুলিয়ে রাখা ঠিক নয়। সে মানসিক অস্বস্তির মধ্যে থাকবে। সে বেচারা অপেক্ষায় আছে যে, আপনি আজকে ঋণ পরিশোধ করবেন, বা কাল দিয়ে দিবেন। কিন্তু আপনি না তাকে জানালেন, না ঋণ পরিশোধ করলেন। এভাবে আপনি তাকে মানসিক কষ্টে ফেললেন। সে এখন আর কোনো প্লান তৈরি করতে পারবে না। কোনো প্রোগ্রাম বানাতে পারবে না। কারণ তার জানাই নেই যে, সে ঋণ ফিরে পাবে কি না? পেলে কবে পাবে? আপনার এই কর্মপদ্ধতিও নাজায়েয ও হারাম।
📄 চাকরদের উপর মানসিক বোঝা ফেলা
এমনকি হযরত থানভী রহ. বলেন যে, আপনার একজন চাকর আছে। আপনি একসঙ্গে তাকে চারটি কাজ বলে দিলেন। প্রথমে এ কাজ করবে, তারপর এ কাজ করবে, তারপর এ কাজ করবে, তারপর এ কাজ করবে। এভাবে চারটি কাজ মনে রাখার বোঝা আপনি তার মাথার উপর চাপিয়ে দিলেন। যদি ভীষণ প্রয়োজন না হয় তাহলে একসঙ্গে চার কাজের বোঝা তার মাথায় চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। বরং তাকে প্রথমে একটি কাজ বলুন। সে প্রথম কাজটি সেরে ফেললে এবার দ্বিতীয়টি বলুন। এটা শেষ করলে তারপর তৃতীয় কাজের কথা বলুন। তিনি নিজে নিজের কর্মপদ্ধতি বলেন যে, আমি আমার চাকরকে এক সময়ে একটি কাজের কথা বলি। তার দ্বারা যে দ্বিতীয় কাজটি করা হবে, তা মনে রাখার বোঝা নিজের মাথায় রাখি। চাকরের মাথার উপর চাপাই না। যাতে সে মানসিক চাপে না পড়ে। সে একটি কাজ করে শেষ করলে তখন দ্বিতীয় কাজের কথা বলি। এর দ্বারা অনুমান করুন যে, হযরতের দৃষ্টি কতো সুদূরপ্রসারী ছিলো!
📄 নামাযরত ব্যক্তির জন্যে কোথায় অপেক্ষা করা উচিত
কিংবা এক ব্যক্তি নামায পড়ছে, তার সাথে আপনার কিছু কাজ আছে। এখন আপনি তার একেবারে নিকটে গিয়ে বসলেন। তার মাথায় এই চিন্তা চাপিয়ে দিলেন যে, আমি তোমার অপেক্ষায় আছি। তুমি জলদি নামায শেষ করো। আমি তোমার সাঙ্গে দেখা করবো। কাজ করাবো। সুতরাং আপনি নিকটে বসার কারণে তার নামাযের মধ্যে বিঘ্ন ঘটছে। তার মস্তিষ্কে চাপ পড়ছে যে, এ ব্যক্তি আমার অপেক্ষায় আছে, তার অপেক্ষার সমাধান করা উচিত। তাড়াতাড়ি নামায শেষ করে তার সঙ্গে দেখা করা উচিত। অথচ এটা আদবের অন্তর্ভুক্ত যে, আপনার যদি নামায রত কোনো ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করতে হয়, তাহলে আপনি দূরে বসে তার অবসর হওয়ার অপেক্ষা করবেন। সে নিজের থেকে অবসর হলে তখন দেখা করবেন। কিন্তু তার একেবারে কাছে বসে তার উপর এই প্রভাব বিস্তার করা যে, আমি তোমার অপেক্ষায় আছি, এজন্যে তাড়াতাড়ি নামায শেষ করো- এটা আদবের খেলাফ। এসব বিষয় অন্যকে মানসিক কষ্টে ফেলার অন্তর্ভুক্ত। আলহামদুলিল্লাহ! যে সকল বুযুর্গকে আমরা দেখেছি এবং যাঁদের থেকে আল্লাহ তা'আলা দ্বীন শেখার তাওফীক দান করেছেন, তাঁদের উপর দ্বীনের সমস্ত শাখাকে আল্লাহ তা'আলা সমান রেখেছিলেন। এমন ছিলো না যে, দ্বীনের এক বা দুই শাখার উপর আমল আছে, আর অবশিষ্ট সব শাখা দৃষ্টির আড়ালে রয়েছে। সেগুলোর ব্যাপারে উদাসীনতা রয়েছে। কুরআনে কারীমে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السَّلْمِ كَافَّةً
'হে ঈমানদারগণ! ইসলামের মধ্যে পরিপূর্ণরূপে অন্তর্ভুক্ত হও।'১১ এমন যেন না হয় যে, নামায-রোযা ইত্যাদি ইবাদত তো করলে, কিন্তু মুআশারাত, মুআমালাত ও আখলাকের বিষয়ে দ্বীনের বিধি-বিধানের পারোয়া করলে না। অথচ এ সব কিছু দ্বীনের অংশ।
📄 'আদাবুল মুআশারাত' পাঠ করুন
হযরত থানভী রহ.-এর ছোট্ট একটি পুস্তিকা রয়েছে 'আদাবুল মুআশারাত'। তাতে তিনি মুআশারাতের আদবসমূহ লিপিবদ্ধ করেছেন। পুস্তিকাটি প্রত্যেক মুসলমানের পড়া উচিত। পুস্তিকার ভূমিকায় হযরত থানভী রহ. লিখেছেন যে, আমি এই কিতাবের মধ্যে মুআশারাতের সমস্ত আদব লিখতে পারিনি। বিক্ষিপ্তভাবে যেসব আদবের কথা মাথায় এসেছে সেগুলো এখানে সংকলন করেছি। তোমরা এসব আদব পড়লে আপনাআপনি তোমাদের মন-মগজ এদিকে ধাবিত হবে যে, এ বিষয়টি যখন আদবের অন্তর্ভুক্ত, তখন অমুক জায়গায়ও আমার এমন করা উচিত। ধীরে ধীরে আপনাআপনি তোমার মাথায় ঐ সমস্ত আদবের কথা আসতে থাকবে। আল্লাহ তা'আলা তোমার মাথাকে খুলে দিবেন। মুআশারাতের একটি আদব এই যে, এমন জায়গায় গাড়ি খাড়া করবে, যেন এর কারণে অন্যদের পথ বন্ধ হয়ে না যায়। অন্যের কষ্ট না হয়। এটাও দ্বীনের একটা অংশ। আজ আমরা এসব বিষয় ভুলে গিয়েছি। এর ফলে আমরা শুধু গোনাহগারই হচ্ছি না, বরং দ্বীনের ভুল প্রতিনিধিত্ব করছি। সুতরাং আমাদেরকে দেখে বাইরের মানুষ বলবে যে, এরা নামায তো পড়ে, কিন্তু খুব ময়লা ছড়ায়। অন্যদেরকে কষ্ট দেয়। এতে করে ইসলামের কেমন চেহারা সামনে আসবে! তারা এসব জিনিসের কারণে ইসলামের দিকে আকর্ষণ অনুভব করবে, নাকি ইসলাম থেকে দূরে পালাবে? আল্লাহ রক্ষা করুন। আমরা দ্বীনের একটা ভালো নমুনা পেশ করে মানুষের জন্যে আকর্ষণের কারণ না হয়ে দ্বীনের পথে প্রতিবন্ধকতার কারণ হচ্ছি। মুআশারাতের এই অধ্যায়কে আমরা বিশেষভাবে ছেড়ে দিয়েছি। আল্লাহ তা'আলা আমাকে ও আপনাদের সকলকে এ ত্রুটি থেকে অতি দ্রুত মুক্তি দান করুন। আমাদের বুঝ সঠিক করে দিন। আমাদেরকে দ্বীনের সকল শাখার উপর আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
টিকাঃ
১১. বাকারাহ: ২০৮