📄 হযরত ওমর ফারুক রাযি.-এর যুগের একটি ঘটনা
হযরত ওমর ফারুক রাযি.-এর যুগে এক ব্যক্তি মসজিদে নববীতে এসে ওয়ায করতো। হযরত আয়েশা রাযি.-এর কামরা মসজিদে নববীর একেবারে সংলগ্ন ছিলো। যদিও সে যুগে লাউড স্পিকার ছিলো না, কিন্তু ঐ লোক খুব উঁচু আওয়াজে ওয়ায করতো। তার আওয়াজ হযরত আয়েশা রাযি.-এর কামরার ভিতর পৌছতো। তিনি নিজের ইবাদত, তিলাওয়াত, যিকির বা অন্য কাজে মশগুল থাকতেন। ঐ ব্যক্তির আওয়াজে তাঁর কষ্ট হতো। হযরত আয়েশা রাযি. হযরত ওমর ফারুক রাযি.-এর নিকট সংবাদ পাঠান যে, এক ব্যক্তি আমার কামরার নিকট এসে এভাবে ওয়ায করে। এতে আমার কষ্ট হয়। আপনি তাকে বলে দিন- অন্য কোথাও গিয়ে ওয়ায করুক, না হয় আস্তে আওয়াজে ওয়ায করুক। হযরত ওমর ফারুক রাযি. তাকে ডেকে বুঝালেন যে, আপনার আওয়াজে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাযি.-এর কষ্ট হয়। আপনি এখানে ওয়ায করা বন্ধ করে দিন। সুতরাং সে থেমে গেলো। কিন্তু লোকটির ওয়াযের প্রতি আগ্রহ ছিলো। কিছুদিন পর আবারও ওয়ায করতে শুরু করলো। হযরত ওমর ফারুক রাযি. জানতে পারলেন যে, সে পুনরায় ওয়ায করতে শুরু করেছে। তিনি পুনরায় তাকে ডাকলেন এবং বললেন যে, এবার আমি আপনাকে শেষবারের মতো নিষেধ করলাম। এর পর যদি আমি জানতে পারি যে, আপনি এখানে ওয়ায করেন, তাহলে এই ছড়ি আপনার উপর ভাঙ্গবো। অর্থাৎ, এ পরিমাণ প্রহার করবো যে, আপনার উপর এই ছড়ি ভেঙ্গে যাবে।
📄 বর্তমানে আমাদের অবস্থা
বর্তমানে আমরা এর প্রতি মোটেই লক্ষ করি না। মসজিদে ওয়ায হচ্ছে। পুরো আওয়াজে লাউড স্পিকার ছাড়া আছে। পুরো মহল্লার লোককে কষ্টে ফেলা হয়েছে। মহল্লায় কেউ ঘুমাতে পারে না। কোনো ব্যক্তি গিয়ে নিষেধ করলে তাকে তিরস্কার করা হয় যে, সে দ্বীনের কাজে বাধা দিচ্ছে। অথচ এই ওয়াযের মাধ্যমে শরীয়তের বিধানকে পদদলিত করা হচ্ছে। অন্যদেরকে কষ্ট দেওয়া হচ্ছে। আলেমের আদবসমূহের মধ্যে এ কথাও লেখা আছে যে,
يَنْبَغِي لِلْعَالِمِ أَنْ لَا يَعْدُ وَ صَوْتَهُ مَجْلِسَهُ 'আলেমের আওয়াজ তার মজলিস থেকে যেন দূরে না যায়।" এসব বিষয় জিব দ্বারা কষ্ট দেওয়ার অন্তর্ভুক্ত। এই জিব আল্লাহ তা'আলা এজন্যে দিয়েছেন যে, এটা আল্লাহর যিকির করবে, সত্য কথা বলবে। এই জিব এজন্যে দেওয়া হয়েছে যে, এর মাধ্যমে তোমরা মানুষের অন্তরে প্রলেপ দিবে। এই জিব এজন্যে দেওয়া হয়নি যে, এর মাধ্যমে তোমরা মানুষকে কষ্ট দিবে।
📄 ঐ মহিলা জাহান্নামী
হাদীস শরীফে আছে, একবার একমহিলা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয় যে, ঐ মহিলা সারাদিন রোযা রাখে এবং সারারাত ইবাদত করে, কিন্তু সে প্রতিবেশীদেরকে কষ্ট দেয়, ঐ মহিলা কেমন? তিনি উত্তর দিলেন, ঐ মহিলা জাহান্নামী, সে জাহান্নামে যাবে।"
এ হাদীস বর্ণনা করার পর এর ব্যাখ্যায় হযরত থানভী রহ. বলেন, এ হাদীসে মানুষকে অন্যায়ভাবে কষ্ট দেওয়ার নিন্দা করা হয়েছে এবং মুআমালা যে ইবাদতের উপর অগ্রগণ্য, তা উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, মানুষের সাথে আচার-ব্যবহার ঠিক করা ইবাদতের তুলনায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তারপর বলেন, মুআমালাতের বিষয় কার্যত এ পরিমাণ পরিত্যক্ত হয়ে গিয়েছে যে, বর্তমানে কেউ অন্যকে এ কথা বুঝায়ও না এবং শিখায়ও না যে, এটাও দ্বীনের একটা অংশ।
টিকাঃ
৮. আল জামে' লি আখলাকির রাবী ওয়া আদাবিস সামে', লিল খাতীবিল বাগদাদী, খন্ডঃ ৩, পৃঃ ১৪৪, উক্তিটি হযরত আতা রহ.-এর দিকে সম্পৃক্ত
৯. মুসনাদে আহমাদ ইবনে হাম্বল, হাদীস নং ৯২৯৮
📄 হাত দ্বারা কষ্ট দিবেন না
এ হাদীসে দ্বিতীয় যে জিনিসের কথা উল্লেখ করেছেন তা হলো হাত। অর্থাৎ, তোমারদের হাত দ্বারা কেউ যেন কষ্ট না পায়। হাত দ্বারা কষ্ট দেওয়ার কিছু পদ্ধতি তো আছে স্পষ্ট, যেমন কাউকে মারলো। যে কেউ দেখে বলবে যে, সে হাত দ্বারা কষ্ট দিয়েছে। কিন্তু হাত দ্বারা কষ্ট দেওয়ার এমন অনেক পদ্ধতি আছে, মানুষ যাকে কষ্ট দেওয়া বলে গণ্য করে না। হাদীস শরীফে হাতের কথা উল্লেখ করে হাত দ্বারা সংঘটিত কর্মসমূহের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। কারণ, বেশির ভাগ কাজ মানুষ হাত দ্বারা সম্পাদন করে থাকে। এ কারণে ওলামায়ে কেরাম হাতের মধ্যে সমস্ত কর্মকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। যদিও সে কাজে হাতকে সরাসরি জড়িত দেখা যায় না।
কোনো জিনিসকে অনুপোযুক্ত জায়গায় রাখা
উদাহরণস্বরূপ, একটি যৌথ বাড়িতে আপনি অন্যদের সাথে বসবাস করেন। ঐ বাড়িতে যৌথ ব্যবহারের জিনিস রাখার একটি নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে। যেমন তোয়ালে রাখার একটি নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে। আপনি তোয়ালে ব্যবহার করে তা অন্য জায়গায় ফেলে রাখলেন। ফলে অন্য ব্যক্তি ওযু করে এসে ঐ জায়গায় তোয়ালে তালাশ করে পেলো না। এখন সে তোয়ালে খোঁজ করছে। তার কষ্ট হচ্ছে। এই যে কষ্ট সে পেলো, এটা আপনার হাতের কর্মের ফল। আপনি নির্দিষ্ট জায়গা থেকে তোয়ালে নিয়ে অন্যত্র ফেলে রেখেছেন, এতে কষ্ট দেওয়া হলো, যা এ হাদীসের ভিত্তিতে হারাম। তোয়ালে দিয়ে একটি উদাহরণ দেওয়া হলো। অন্যথায় যৌথ বদনা হোক, সাবান হোক, গ্লাস হোক, ঝাড়ু হোক ইত্যাদি, এগুলো নির্দিষ্ট জায়গা থেকে নিয়ে অন্য জায়গায় রাখা হাত দ্বারা কষ্ট দেওয়ার অন্তর্ভুক্ত।