📄 অমুসলিমদেরকেও কষ্ট দেওয়া জায়েয নেই
এ হাদীসে বলা হয়েছে যে, মুসলসমান সেই, যার হাত ও মুখ থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদে থাকে। এর দ্বারা অনেক সময় মানুষ বুঝে যে, এ হাদীসে শুধু মুসলমানদেরকে কষ্ট না দেওয়ার হুকুম দেওয়া হয়েছে। অমুসলিমকে কষ্ট দেওয়ার নিষেধাজ্ঞা এ হাদীসের মধ্যে নেই। এ কথা ঠিক নয়। কারণ, হাদীসের মধ্যে মুসলমানের উল্লেখ এ কারণে করা হয়েছে যে, একজন মুসলমান যে পরিবেশে বসবাস করে, সেখানে সাধারণত মুসলমানদের সঙ্গেই সম্পর্ক রাখতে হয়। এজন্যে হাদীসের মধ্যে বিশেষভাবে মুসলমানদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যথায় এ হুকুম মুসলমান ও অমুসলমান সকলের জন্যে সমান। নিজের দ্বারা কোনো অমুসলমানকেও 'নিরাপত্তা অবস্থায়' কষ্ট দেওয়া জায়েয নেই। তবে কাফেরদের সঙ্গে জিহাদ চলাকালে কাফেরদের শান-শওকত ভাঙ্গার এটা একটা মাধ্যম। এ সময় কষ্ট দেওয়া জায়েয। কিন্তু যেসব কাফেরের সঙ্গে যুদ্ধ চলছে না, তাদেরকে কষ্ট দেওয়ার হুকুমও এটাই।
📄 নাজায়েয হওয়ার দলিল
এর দলিল এই যে, হযরত মূসা আলাইহিস সালাম ফেরাউনের শাসনকালে মিসরে থাকতেন। হযরত মূসা আলাইহিস সালাম ছাড়া পুরো জাতি কুফর ও গোমরাহীর মধ্যে লিপ্ত ছিলো। তখন এই ঘটনা ঘটে যে, এক ইসরাঈলী ও কিবতীর মধ্যে ঝগড়া হয়। হযরত মূসা আলাইহিস সালাম কিবতীকে একটা ঘুষি মারেন, ফলে সে মারা যায়। সেই কিবতী কাফের হওয়া সত্ত্বেও হযরত মূসা আলাইহি সালাম তার মৃত্যুকে নিজের জন্যে গোনাহ সাব্যস্ত করে বলেন,
وَلَهُمْ عَلَيَّ ذَنْبٌ فَأَخَافُ أَنْ يَقْتُلُونِ অর্থাৎ, আমার দ্বারা তাদের একটি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, যে কারণে আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে, আমি যদি তাদের কাছে যাই তাহলে তারা আমাকে হত্যা করবে। হযরত মূসা আলাইহিস সালাম ঐ কাফেরের হত্যাকে গোনাহ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এখন প্রশ্ন জাগে যে, সে তো কাফের ছিলো, আর কাফেরকে হত্যা করা জিহাদের একটি অংশ, তারপরেও তিনি এটাকে গোনাহ আখ্যা দিলেন কেন এবং এর উপর ইসতিগফার করলেন কেন? এর উত্তর এই যে, ঐ কিবতী যদিও কাফের ছিলো, কিন্তু অবস্থা ছিলো নিরাপত্তার। যদি মুসলমান ও কাফের একসঙ্গে বসবাস করে আর নিরাপত্তার অবস্থা হয়, সে অবস্থায় জাগতিক দিক থেকে কাফেরেরও সেই অধিকার রয়েছে, যেই অধিকার রয়েছে একজন মুসলমানের। অর্থাৎ, যেভাবে মুসলমানদেরকে কষ্ট দেওয়া জায়েয নেই, একইভাবে কাফেরকেও কষ্ট দেওয়া জায়েয নেই। কারণ, এটা মানুষের হক। আর মানুষের প্রথম ফরয হলো তাকে মানুষ হতে হবে। মুসলমান হওয়া ও সূফী হওয়া তো পরের বিষয়। প্রথম কাজ হলো মানুষকে প্রকৃত মানুষ হতে হবে। আর মনুষ্যত্বের দাবি হলো, নিজের দ্বারা কাউকে কষ্ট দিবে না। এক্ষেত্রে মুসলমান ও অমুসলমান সকলে সমান।
টিকাঃ
৭. শু'আরা: ১৪
📄 ওয়াদাখেলাপী করা মুখ দ্বারা কষ্ট দেওয়ার শামিল
কতক কাজ এমন আছে, যাকে মানুষ জিব দ্বারা কষ্ট দেওয়ার মধ্যে গণ্য করে না, অথচ তা মুখ দ্বারা কষ্ট দেওয়ার অন্তর্ভুক্ত। যেমন ওয়াদাখেলাফী করা। আপনি কারো নিকট ওয়াদা করেছেন যে, অমুক সময় আপনার নিকট আসবো বা অমুক সময় আপনার কাজ করে দেবো। কিন্তু যথাসময়ে ওয়াদা পুরা করলেন না, যার ফলে সে কষ্ট পেলো। এ ক্ষেত্রে একদিকে তো ওয়াদাখেলাফীর গোনাহ হলো, অপরদিকে অন্যকে কষ্ট দেওয়ার গোনাহও হলো। এটা মুখ দ্বারা কষ্ট দেওয়ার অন্তর্ভুক্ত।
📄 কুরআন তিলাওয়াতের সময় সালাম করা
কতক সময় মানুষ বুঝতেও পারে না যে, আমি মুখ দ্বারা কষ্ট দিচ্ছি। বরং সে মনে করে যে, আমি তো সওয়াবের কাজ করছি। অথচ বাস্তবে সে গোনাহের কাজ করছে। এর মাধ্যমে অন্যকে কষ্ট দিচ্ছে। যেমন সালাম করা অনেক বড়ো সওয়াবের কাজ। কিন্তু শরীয়ত অন্যকে কষ্ট না দেওয়ার প্রতি এ পরিমাণ লক্ষ রেখেছে যে, সালাম দেওয়ার ক্ষেত্রেও বিধান দিয়েছে যে, সবসময় সালাম দেওয়া জায়েয নেই। বরং কতক সময় সালাম দিলে সওয়াবের পরিবর্তে গোনাহ হবে। কারণ, সালাম দিয়ে তুমি অন্যকে কষ্ট দিয়েছো। যেমন একব্যক্তি কুরআনে কারীম তিলাওয়াতে মগ্ন, তাকে সালাম করা জায়েয নেই। কারণ, একদিকে তো তোমার সালামের কারণে তার তিলাওয়াতের মধ্যে বিঘ্ন ঘটবে, অপরদিকে তিলাওয়াত ছেড়ে তোমার দিকে মনোযোগী হতে তার কষ্ট হবে, এমতাবস্থায় সালাম করা মুখ দ্বারা কষ্ট দেওয়ার অন্তর্ভুক্ত। তেমনিভাবে মানুষ মসজিদে বসে যিকিরে মগ্ন থাকলে মসজিদে প্রবেশ করার সময় তাদেরকে সালাম দেওয়া জায়েয নেই। কারণ, তারা আল্লাহর স্মরণে মশগুল। আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তাদের মুখে যিকির চলছে। তোমার সালামের কারণে তাদের যিকিরের মধ্যে বিঘ্ন ঘটবে। এদিকে মনোযোগ দেওয়ায় তার কষ্ট হবে।