📄 মুখ দ্বারা কষ্ট না দেওয়ার অর্থ
এ হাদীসে দুইটি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। একটি হলো , আর অপরটি হলো يد। অর্থাৎ, অন্য মুসলমান দুই জিনিস থেকে নিরাপদ থাকবে। এক তার মুখ থেকে, আরেক তার হাত থেকে। মুখ থেকে নিরাপদ থাকার অর্থ এই যে, এমন কোনো কথা সে বলবে না, যার দ্বারা শ্রোতার অন্তর ভেঙ্গে যায়, সে কষ্ট পায়, তার মনে দুঃখ হয়। অন্য মুসলমানকে যদি কোনো বিষয়ে আপত্তি করতেই হয়, তাহলেও এমন শব্দ ব্যবহার করবে, যার দ্বারা তার মনে মোটেই কষ্ট হবে না, বা হলেও সর্বনিম্ন পর্যায়ের হবে। উদাহরণস্বরূপ বলবে যে, আপনার অমুক বিষয় আমার ভালো লাগেনি, বা আপনি অমুক বিষয়টি চিন্তা করে দেখবেন তা সংশোধনযোগ্য, তা শরীয়তসম্মত নয়। কিন্তু এমন কোনো পন্থা অবলম্বন করা, যার দ্বারা তাকে বকা দেওয়া হয়, যেমন গালি দিলো বা ‘তিরস্কার’ করলো, এটা ঠিক নয়।
📄 সূক্ষ্ম আক্রমণের একটি বিস্ময়কর ঘটনা
‘তিরস্কার’ করার অর্থ এই যে, সরাসরি কোনো কথা বললো না ঠিক, কিন্তু এমনভাবে ঘুরিয়ে কথা বললো যে, তার অন্তরকে আহত করলো। এভাবে তিরস্কার করা, যা অন্তরকে আহত করে, এ সম্পর্কে এক আরব কবির কবিতা আছে যে-
جَرَاحَاتُ السِّنَانُ لَهَا الْتِيَامُ وَلَا يَلْتَامُ مَا جَرَحَ النِّسَانُ ‘বর্ষার আঘাত সেরে উঠে, কিন্তু জিবের আঘাত সারে না।’
এজন্যে কারো কোনো কথা যদি আপনার অপছন্দ হয়, তাহলে আপনি পরিষ্কার ভাষায় বলে দিন আপনার অমুক কথা আমার পছন্দ নয়। কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا ‘হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সরল কথা বলো।’
ঘুরানো-প্যাঁচানো কথা কাম্য ও পছন্দনীয় নয়। আজকাল কথার আঘাত একটি শাস্ত্রে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ, এমন কথা বলবে, যা শুনে প্রতিপক্ষ তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠবে। তাকে সরাসরি বলবে না, কিন্তু তাকে জড়িয়ে বলবে। এমন কথা যারা বলে, মানুষ তাদের প্রশংসা করে যে, এ লোক অত্যন্ত দক্ষ রচয়িতা। অতি সূক্ষ্মভাবে রসাত্মক আক্রমণ করতে পারে।
এক ব্যক্তি শাইখুল হিন্দ হযরত মাওলানা মাহমুদুল হাসান রহ.-এর একটি কিতাবের উত্তরে প্রবন্ধ লেখে। সে প্রবন্ধে হযরত শাইখুল হিন্দ রহ.-এর উপর কুফরের ফতওয়া আরোপ করে। নাউযুবিল্লাহ। হযরতের একজন একনিষ্ঠ ভক্ত এর উত্তরে ফার্সী ভাষায় দু'টি চরণ রচনা করেন। যা সাহিত্যের মানে বর্তমান যুগের রসাত্মক আক্রমণের উঁচু পর্যায়ের কবিতা ছিলো। কবিতাটি ছিলো এই-
مرا کافر اگر گفتی غمی نیست چراغے کذب را نبود فروغی
مسلمانت بخوانم در جوابش دروغی را جزا باشد دروغی
অর্থাৎ, তুমি আমাকে কাফের বলে থাকলে এতে আমার কোনো দুঃখ নেই, কারণ মিথ্যার বাতি জ্বলে না। তুমি আমাকে কাফের বলেছো তার উত্তরে আমি তোমাকে মুসলমান বলছি, কারণ মিথ্যার বদলা মিথ্যাই হয়ে থাকে।
অর্থাৎ, তুমি আমাকে কাফের বলে মিথ্যা বলেছো, এর উত্তরে আমি তোমাকে মুসলমান বলে মিথ্যা বলছি। অর্থাৎ, বাস্তবে তুমি মুসলমান নও। এ উত্তর কোনো সাহিত্যিক ও ভাষারুচিসম্পন্ন কবিকে শুনানো হলে সে খুব সাধুবাদ জানাবে এবং পছন্দ করবে। কারণ, এ উত্তর অন্তরে বিধে যায়। কারণ, দ্বিতীয় কবিতার প্রথম চরণে বলেছে যে, 'আমি তোমাকে মুসলমান বলছি' কিন্তু দ্বিতীয় চরণ কথাটিকে একেবারে উল্টিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ, মিথ্যার বদলে তো মিথ্যাই হয়। তুমি আমাকে কাফের বলে মিথ্যা বলেছো, আর আমি তোমাকে মুসলমান বলে মিথ্যা বলছি। যাই হোক, এ কবিতা নিখে হযরতের ভক্ত হযরতের খেদমতে নিয়ে এলো। হযরত শাইখুল হিন্দ রহ. কবিতা শুনে বললেন যে, তুমি তো মারাত্মক কবিতা বলেছো। বিধে যাওয়ার মতো উত্তর দিয়েছো। কিন্তু তুমি তো ঘুরিয়ে তাকে কাফেরই বললে। অন্যদেরকে কাফের বলা আমাদের পন্থা নয়। কবিতাটি প্রতিপক্ষের নিকট পাঠালেন না।
তারপর হযরত নিজে ঐ কবিতা শুধরিয়ে দিলেন এবং আরেক লাইন বাড়িয়ে দিলেন। তিনি বললেন,
مرا کافر اگر گفتی غمی نیست چراغے کذب را نبود فروغی مسلمانت بخوانم در جوابش دہم شکر بجائے تلخ دو نے اگر تو موسنی فیہا والا دروغی را جزا باشد دروغی
অর্থাৎ, তুমি আমাকে কাফের বলেছো, এতে আমার কোনো দুঃখ নেই, কারণ মিথ্যার বাতি জ্বলে না। এর উত্তরে আমি তোমাকে মুসলমান বলছি এবং তিতা ঔষধের বিনিময়ে মিষ্টি খাওয়াচ্ছি। তুমি যদি ঈমানদার হয়ে থাকো তাহলে তো খুব ভালো, আর যদি তা না হয়ে থাকো, তাহলে মিথ্যার বদলা মিথ্যাই হয়ে থাকে।
এবার লক্ষ করুন! যেই বিরুদ্ধবাদী তাঁর উপর কুফরীর ফতওয়া লাগাচ্ছে, জাহান্নামী হওয়ার ফতওয়া দিচ্ছে, তার বিরুদ্ধেও তিনি তিরস্কারমূলক এমন কথা বলা পছন্দ করেননি, যা সীমালঙ্ঘন করেছে। কারণ, এই তিরস্কার তো দুনিয়াতে থেকে যাবে, কিন্তু যেই শব্দ মুখ থেকে বের হচ্ছে, তা আল্লাহ তা'আলার নিকট রেকর্ড হয়ে থাকবে। কিয়ামতের দিন তার সম্পর্কে উত্তর দিতে হবে যে, অমুকের ব্যাপারে এ শব্দ তুমি কীভাবে ব্যবহার করেছিলে? এজন্যে সীমাবহির্ভূত এ ধরনের তিরস্কার কখনই পছন্দনীয় নয়। তাই যখনই কারো সাথে কিছু বলার থাকবে, পরিষ্কার ও সরল ভাষায় বলা উচিত। তাকে জড়িয়ে তিরস্কার করে কথা বলা উচিত নয়।
টিকাঃ
৪. আহযাব : ৭০
📄 জিব দ্বারা দংশন করার একটি ঘটনা
আমার ওয়ালেদ মাজেদ হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ শফী ছাহেব রহ. বলতেন যে, কতক মানুষের জিবে দংশন থাকে। এরা কারো সাথে কথা বললেই দংশন করে। খোঁটা দেয়। তিরস্কার করে। আপত্তি করে কথা বলে। অথচ এভাবে কথা বলার ফলে অন্তরে গিট পড়ে যায়। তারপর একটি ঘটনা শোনালেন যে, এক ব্যক্তি তার কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে গেলো। গিয়ে দেখলো তাদের বউ খুব রাগান্বিত অবস্থায় আছে। শাশুড়িকে গাল-মন্দ করছে। শাশুড়িও পাশে বসা ছিলো। লোকটি তার শাশুড়িকে জিজ্ঞাসা করলো- কি হয়েছে? সে এতো রাগ হচ্ছে কেন? উত্তরে শাশুড়ি বললো, এমন কিছুই হয়নি, আমি শুধু দুটি কথা বলেছি, এই ভুলের জন্যে আমাকে ধরা হয়েছে। আর সে নেচে নেচে গেয়ে ফিরছে, রাগ হচ্ছে। লোকটি জিজ্ঞাসা করলো- সেই কথা দুটি কি ছিলো? শাশুড়ি বললো, আমি শুধু এতোটুকু বলেছিলাম যে, তোমার বাপ গোলাম, আর তোমার মা বান্দি। তারপর থেকে সে নেচে বেড়াচ্ছে।
দেখুন! সে শুধু দুটি কথা বলেছিলো। কিন্তু দুটি কথা এমন ছিলো যা মানুষের মধ্যে আগুন ধরিয়ে দেয়। এজন্যে তিরস্কারের আঙ্গিকে কথা বলা পরিবারকে ধ্বংস করে। অন্তরে ঘৃণা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। এ থেকে বাঁচা উচিত। সবসময় পরিষ্কার ও সরল কথা বলা উচিত।
📄 প্রথমে চিন্তা করো, তারপর কথা বলো
জিব ব্যবহারের পূর্বে একটু চিন্তা করে নাও। যে কথা আমি বলতে যাচ্ছি, তার পরিণতি কী হবে? অন্যের উপরে এর কী প্রভাব পড়বে? আরো চিন্তা করো যে, যে কথা আমি অন্যকে বলতে যাচ্ছি, অন্য কেউ যদি আমাকে এ কথা বলে, তাহলে আমার উপরে এর কী প্রভাব পড়বে? আমার ভালো লাগবে, না খারাপ। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে এই শিক্ষা দিয়েছেন এবং মূলনীতি বলেছেন যে-
أَحِبُّ لِلنَّاسِ مَا تُحِبُّ لِنَفْسِكَ
'অন্যের জন্যে তাই পছন্দ করো, যা নিজের জন্যে পছন্দ করো।"
আমরা যে দুই ধরনের মাপ বানিয়ে রেখেছি, নিজের জন্যে এক ধরনের মাপ, আর অন্যের জন্যে অন্য রকমের মাপ। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বিলোপ সাধন করেছেন। এই মানদন্ড যদি আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে সৃষ্টি করে দেন, তাহলে সব ধরনের ঝগড়া বিবাদ ও ফেৎনা-ফাসাদ মিটে যাবে।
টিকাঃ
৫. সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২২২৭, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৪২০৭, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৭৭৪৮