📄 হযরত থানভী রহ.-এর মুআশারাতের বিধান পুনর্জীবিত করা
আল্লাহ তা'আলা হাকীমুল উম্মত মুজাদ্দিদুল মিল্লাত হযরত মাওলানা মাশরাফ আলী ছাহেব রহ.-এর দ্বারা এ যুগে দ্বীনের তাজদীদের কাজ নিয়েছেন। দ্বীনের যেসব বিধান মানুষ ছেড়ে দিয়েছিলো এবং দ্বীন থেকে তা বের করে দিয়েছিলো তিনি সেগুলোর গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। মানুষের নিকট সেগুলোর বিধান বর্ণনা করেছেন। নিজের খানকায় সেগুলোর আমলী তারবিয়াতের ইহতিমাম করেছেন। সাধারণত মানুষ বুঝতো যে, খানকা বলা হয়, যার কক্ষসমূহে বসে 'আল্লাহ' 'আল্লাহ' করা হয়। যিকির, তাসবীহ ও ইবাদাতে মশগুল থাকা হয়। আর কিছু নয়। কিন্তু হযরত থানভী রহ. তাঁর খানকায় যিকির, তাসবীহ ও নফল ইবাদতের উপর এতো অধিক জোর দেননি, যতো অধিক জোর দিয়েছেন মুআশারাতের এই মাসআলার উপর যে, নিজের দ্বারা অন্য কোনো মানুষ যেন কষ্ট না পায়। হযরত থানভী রহ. বলতেন যে, যেসব মুরীদ নিজেদের ইসলাহের জন্যে আসে, তাদের কারো সম্পর্কে যদি আমি জানতে পারি যে, তাকে যেসব আমল দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে সে ত্রুটি করে। উদাহরণস্বরূপ, দশ তাসবীহের জায়গায় পাঁচ তাসবীহ পাঠ করে। তাহলে এজন্যে কষ্ট তো হয় যে, তাকে একটি আমল দেওয়া হয়েছে তার উপর সে আমল করে না। কিন্তু যখন কারো সম্পর্কে জানতে পারি যে, সে মুআশারাতের বিধানসমূহের মধ্য থেকে কোনো একটি বিধান অমান্য করেছে, সে অন্য মুসলমানকে কষ্ট দিয়েছে, তখন তার প্রতি আমার ঘৃণা সৃষ্টি হয়।
📄 প্রথমে মানুষ হও
এমনিভাবে হযরত থানভী রহ.-এর একটি প্রসিদ্ধ উক্তি আছে যে, তুমি সূফী হতে চাইলে বা আবেদ-যাহেদ হতে চাইলে তার জন্যে অনেক খানকা খোলা আছে, সেখানে চলে যাও, আর যদি মানুষ হতে চাও, তাহলে এখানে আসো। কারণ, এখানে তো মানুষ বানানো হয়। মুসলমান হওয়া, আলেম হওয়া এবং সূফী হওয়া তো পরের বিষয়। উচ্চস্তরের ব্যাপার। আগে মানুষ হও। পশুর কাতার থেকে বের হয়ে আসো। ইসলামী মুআশারাতের আদব না জানা এবং তার উপর আমল না করা পর্যন্ত একজন মানুষ প্রকৃত মানুষ হয় না।
📄 পশু তিন প্রকার
ইমাম গাযালী রহ. 'ইহইয়াউল উলূমে' লিখেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা পৃথিবীতে তিন ধরনের প্রাণী সৃষ্টি করেছেন। এক. এক ধরনের প্রাণী সেগুলো, যেগুলো মানুষের উপকার করে। খুব কমই তাদের দ্বারা ক্ষতি হয়। যেমন গরু, ছাগল ইত্যাদি। এসব পশু দুধ দিয়ে তোমাদের উপকার করে। দুধ দেওয়া বন্ধ করলে তাকে জবাই করে তোমরা গোশত খাও। তোমাদের উপকারের জন্যে এভাবে তারা নিজেদের জান দিয়ে দেয়। এসব প্রাণী ক্ষতি করে না। দুই. দ্বিতীয় প্রকারের প্রাণী সেগুলো, যেগুলো কেবলই কষ্ট দেয়। বাহাত সেগুলোর কোনো উপকার নেই। যেমন সাপ, বিচ্ছু, হিংস্র প্রাণী ইত্যাদি। এগুলো কষ্টদায়ক প্রাণী। কোনো মানুষকে পেলে এরা কষ্ট দেয়, দংশন করে। তিন. তৃতীয় প্রকারের প্রাণী সেগুলো, যেগুলো না কষ্ট দেয়, না উপকার করে। যেমন বনে বসবাসকারী প্রাণীসমূহ। শিয়াল, গেদোড় ইত্যাদি। এগুলোর দ্বারা মানুষ বিশেষ কোনো উপকারও লাভ করে না, আবার বিশেষ কোনো ক্ষতিও হয় না।
এই তিন শ্রেণির প্রাণীর বর্ণনা দিয়ে ইমাম গাযালী রহ. মানুষকে লক্ষ করে বলেন, হে মানুষ! তুমি আশরাফুল মাখলুকাত। সমস্ত প্রাণীর উপর তোমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছে। তুমি যদি মানুষ হতে না চাও, বরং পশু হতে চাও তাহলে কমপক্ষে প্রথম প্রকারের পশু হও। যেগুলো অন্যের উপকার তো করে কিন্তু ক্ষতি করে না। যেমন গরু, বকরী ইত্যাদি। আর যদি তার থেকেও নিচে নামতে চাও তাহলে তৃতীয় শ্রেণির প্রাণী হও, যেগুলো না ক্ষতি করে, না উপকার। আর যদি তুমি অন্যের উপকারের পরিবর্তে ক্ষতি করতে আরম্ভ করো, তাহলে সাপ, বিচ্ছু ও হিংস্র প্রাণীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।
📄 আমি মানুষ দেখেছি
যাই হোক, মুসলমান অমুসলমানের কথা পরে, আলেম অনালেম এবং আবেদ-অনাবেদের কথা তো অনেক পরে। প্রথম বিষয় তো হলো মানুষকে মানুষ হতে হবে। মানুষ হওয়ার জন্যে ইসলামী মুআশারাত অনেক জরুরী। যাতে তার দ্বারা অন্য কেউ সামান্যও কষ্ট না পায়। তার হাত দ্বারা, মুখ দ্বারা ও কাজ দ্বারা কেউ কষ্ট পাবে না। একবার হযরত থানভী রহ, নিতান্ত বিনয়ের সাথে বললেন যে, পাকা ও পুরা একশ' ভাগ মানুষ তো আমিও হতে পারিনি, কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ মানুষ দেখেছি যে, মানুষ কেমন হয়। কোনো বলদ এসে আমাকে ধোঁকা দিতে পারবে না যে, আমি মানুষ। তাই কখনো যদি মানুষ হতে চাই, তাহলে মানুষই হবো, মানুষের ধোঁকায় বলদ হবো না।