📄 সে ব্যক্তি প্রকৃত মুসলমান নয়
হযরত আবু মূসা আশআরী রাযি. থেকে বর্ণিত আছে যে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, 'মুসলমান সে, যার জিব ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদে থাকে।" অর্থাৎ, তার মুখ দ্বারাও কেউ কষ্ট পায়না এবং তার হাত দ্বারাও কেউ কষ্ট পায় না। এ হাদীসে যেন মুসলমানের পরিচয় বলা হয়েছে যে, মুসলমান বলাই হয় তাকে, যার মধ্যে এই গুণ পাওয়া যায়। এজন্যে যে মুসলমানের হাত ও মুখ থেকে অন্য লোক নিরাপদ নয়, মূলত সে মুসলমান বলার উপযুক্তই নয়। যেমন এক ব্যক্তি নামায পড়ে না। এখন কোনো মুফতী এ কারণে তার উপর কুফরীর ফতওয়া দিবে না যে, এ ব্যক্তি যেহেতু নামায পড়ে না তাই সে কাফের হয়ে গিয়েছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সে মুসলমান বলার উপযুক্ত নয়। কারণ, সে আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরয বিধানকে সম্পাদন করছে না। এমনিভাবে যে ব্যক্তির হাত ও মুখ দ্বারা অন্য মানুষ কষ্ট পায় তার উপর যদি মুফতী কুফরীর ফতওয়া দিবে না, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সে মুসলমান বলার যোগ্য নয়। কারণ, সে মুসলমানের কাজ করছে না। এ হাদীসের উদ্দেশ্য এই।
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৯, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫৮, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৫৫১, সুনানে নাসাঈ, হাদীস নং ৪৯১০, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ২১২২
📄 মুআশারাতের অর্থ
ইসলামের পাঁচটি শাখা রয়েছে- এক. আকায়েদ দুই. ইবাদাত তিন. মুআমালাত চার. আখলাক পাঁচ. মুআশারাত এ হাদীস মূলত ইসলামের পাঁচশাখার অন্যতম শাখা মুআশারাতের ভিত্তি। মুআশারাতের অর্থ এই যে, এ দুনিয়ায় কোনো মানুষই একা থাকে না এবং একা থাকার হুকুম দেওয়াও হয়নি। দুনিয়াতে বাস করতে কারো না কারো সাথে সম্পর্ক রাখতে হয়। পরিবারের লোকদের সাথে সম্পর্ক, বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক, প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ক, বাজারওয়ালাদের সাথে সম্পর্ক, যে জায়গায় কাজ করে সেখানের লোকদের সাথে সম্পর্ক রাখতে হয়। অন্যের সাথে সম্পর্ক রাখতে তাদের সঙ্গে যেভাবে আচরণ করা উচিত, তাকে মুআশারাতের বিধান বলা হয়। এটাও দ্বীনের বড়ো পাঁচ শাখার একটা শাখা। কিন্তু আমাদের নির্বুদ্ধিতা ও আমলহীনতার কারণে দ্বীনের এ শাখা একেবারে দৃষ্টির আড়ালে চলে গিয়েছে। একে দ্বীনের অংশই মনে করা হয় না। এ বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যেসব বিধান দিয়েছেন, সেদিকে মনোযোগ যায় না।
📄 মুআশারাতের বিধানের গুরুত্ব
আল্লাহ তা'আলাও মুআশারাতের বিধান বর্ণনার প্রতি অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, মুআশারাতের একটি মাসআলা এই যে, যখন অন্য কোনো ব্যক্তির ঘরে প্রবেশ করবে, তখন ভিতরে প্রবেশ করার পূর্বে তার থেকে অনুমতি নাও যে, আমি ভিতরে আসতে পারি কি? এই অনুমতি নেওয়াকে আরবী ভাষায় 'ইসতীযান' (استیذان) বলা হয়। আল্লাহ তা'আলা ইসতীযানে'র বিধান বর্ণনা করার জন্যে কুরআনে কারীমের পরিপূর্ণ দুটি রুকু' অবতীর্ণ করেছেন। পক্ষান্তরে কুরআনে কারীমে নামায পড়ার হুকুম সম্ভবত বাষট্টি জায়গায় এসেছে, কিন্তু নামায কীভাবে পড়তে হবে, তার বিস্তারিত বর্ণনা কুরআনে কারীম বলেনি। বরং তা হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বর্ণনার উপর ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু 'ইসতীযানে'র বিস্তারিত বিবরণ কুরআনে কারীম নিজে দিয়েছে। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বর্ণনার উপর ছেড়ে দেয়নি। তাছাড়া কুরআনে কারীমে সূরায়ে হুজরাতের বড়ো একটা অংশ মুআশারাতের বিধানসম্বলিত। একদিকে মুআশারাতের বিধানের এতো গুরুত্ব, অপরদিকে আমাদের প্রতিদিনের জীবনে আমরা এসমস্ত বিধানের উপর আমল করা ছেড়ে দিয়েছি। এসব বিধানের প্রতি আমরা লক্ষ রাখি না।
📄 হযরত থানভী রহ.-এর মুআশারাতের বিধান পুনর্জীবিত করা
আল্লাহ তা'আলা হাকীমুল উম্মত মুজাদ্দিদুল মিল্লাত হযরত মাওলানা মাশরাফ আলী ছাহেব রহ.-এর দ্বারা এ যুগে দ্বীনের তাজদীদের কাজ নিয়েছেন। দ্বীনের যেসব বিধান মানুষ ছেড়ে দিয়েছিলো এবং দ্বীন থেকে তা বের করে দিয়েছিলো তিনি সেগুলোর গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। মানুষের নিকট সেগুলোর বিধান বর্ণনা করেছেন। নিজের খানকায় সেগুলোর আমলী তারবিয়াতের ইহতিমাম করেছেন। সাধারণত মানুষ বুঝতো যে, খানকা বলা হয়, যার কক্ষসমূহে বসে 'আল্লাহ' 'আল্লাহ' করা হয়। যিকির, তাসবীহ ও ইবাদাতে মশগুল থাকা হয়। আর কিছু নয়। কিন্তু হযরত থানভী রহ. তাঁর খানকায় যিকির, তাসবীহ ও নফল ইবাদতের উপর এতো অধিক জোর দেননি, যতো অধিক জোর দিয়েছেন মুআশারাতের এই মাসআলার উপর যে, নিজের দ্বারা অন্য কোনো মানুষ যেন কষ্ট না পায়। হযরত থানভী রহ. বলতেন যে, যেসব মুরীদ নিজেদের ইসলাহের জন্যে আসে, তাদের কারো সম্পর্কে যদি আমি জানতে পারি যে, তাকে যেসব আমল দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে সে ত্রুটি করে। উদাহরণস্বরূপ, দশ তাসবীহের জায়গায় পাঁচ তাসবীহ পাঠ করে। তাহলে এজন্যে কষ্ট তো হয় যে, তাকে একটি আমল দেওয়া হয়েছে তার উপর সে আমল করে না। কিন্তু যখন কারো সম্পর্কে জানতে পারি যে, সে মুআশারাতের বিধানসমূহের মধ্য থেকে কোনো একটি বিধান অমান্য করেছে, সে অন্য মুসলমানকে কষ্ট দিয়েছে, তখন তার প্রতি আমার ঘৃণা সৃষ্টি হয়।