📄 আশা রেখো না, ঝগড়া শেষ হয়ে যাবে
এজন্যে হযরত থানভী রহ. বলেন, এভাবে ঝগড়ার শিকড় কেটে দাও যে, কারো থেকে কোনো আশাই রেখো না। মানুষের প্রতি কেন আশা পোষণ করছো যে, অমুক এই দিবে, অমুক এই কাজ করবে, সব আশা কেবল আল্লাহ তা'আলার প্রতি রাখো, যিনি খালেক ও মালেক। বরং দুনিয়ার মানুষের প্রতি কেবল অকল্যাণের আশা রাখো যে, তাদের থেকে সবসময় অকল্যাণই পাওয়া যাবে। অকল্যাণের আশা করার পর যদি ভালো কিছু কখনো পাও তাহলে আল্লাহর শোক আদায় করো যে, হে আল্লাহ! আপনার মেহেরবানী, আপনার দয়া। আর যদি অকল্যাণ পাও তাহলে চিন্তা করো যে, আমার তো পূর্ব থেকেই অকল্যাণের আশা ছিলো। তাহলে এর ফলে অন্তরে অভিযোগ ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হবে না। তখন শত্রুতাও সৃষ্টি হবে না, ঝগড়াও হবে না। তাই কারো থেকে কোনো আশাই রেখো না।
📄 বিনিময় গ্রহণের নিয়ত করো না
এমনিভাবে হযরত থানভী রহ. আরেকটি মূলনীতি এই বলেছেন যে, তুমি যখন অন্য কারো সঙ্গে কোনো সদাচরণ করবে, তখন শুধু আল্লাহকে খুশি করার জন্যে করবে। যেমন কাউকে সাহায্য করলে বা কারো জন্যে সুপারিশ করলে বা কারো সঙ্গে সদব্যবহার করলে বা কাউকে সম্মান করলে, তখন একথা চিন্তা করো যে, আমি আল্লাহকে খুশি করার জন্যে এ আচরণ করছি। নিজের আখেরাত গড়ার জন্যে এ কাজ করছি। এ নিয়তে যখন সদাচরণ করবে তখন তার বিনিময়ের আশাই থাকবে না। এবার মনে করুন! আপনি এক ব্যক্তির সঙ্গে সদাচরণ করলেন, কিন্তু সে আপনার সঙ্গে সদাচরণের বদলায় সদাচরণ করলো না। কখনোই আপনার দয়াকে স্বীকার করলো না। এমতাবস্থায় আপনার অন্তরে অবশ্যই এ চিন্তা জাগবে যে, আমি তার সঙ্গে সদাচরণ করলাম আর সে আমার সঙ্গে উল্টা অসৎ ব্যবহার করলো। কিন্তু আপনি যদি তার সঙ্গে শুধু আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্যে সদাচরণ করে থাকেন, তাহলে এমতাবস্থায় তার অসদাচরণে আপনার অভিযোগ সৃষ্টি হবে না। কারণ, আপনার উদ্দেশ্য ছিলো কেবল আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা। এই দুই মূলনীতির উপর যদি আমরা সকলে আমল করি, তাহলে পারস্পরিক সকল ঝগড়া মিটে যাবে এবং এ হাদীসের উপরও আমল হবে, যা এখন আমি আপনাদের সামনে পাঠ করেছি। যার মধ্যে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি হকের উপর থেকে বিবাদ ত্যাগ করবে, আমি তাকে জান্নাতের মাঝখানে ঘর দেওয়ার দায়িত্ব নিবো।
📄 হযরত মুফতী ছাহেব রহ.-এর বিরাট কুরবানী
আমি আমার ওয়ালেদ মাজেদ হযরত মুফতী মুহাম্মাদ শফী ছাহেব রহ.- কে সারা জীবন এ হাদীসের উপর আমল করতে দেখেছি। বিবাদ নিরসনের জন্যে তিনি বড়ো থেকে বড়ো হক ছেড়ে দিয়ে চলে এসেছেন। তাঁর এমন একটি ঘটনা শুনাচ্ছি, বর্তমানে মানুষের যার উপর বিশ্বাস করা কঠিন মনে হয়। এই দারুল উলূম, যা এখন কৌরঙ্গীতে প্রতিষ্ঠিত, প্রথমে নানকওয়াড়ায় ছোট্ট একটি ভবনে প্রতিষ্ঠিত ছিলো। কাজ বেড়ে গেলে ঐ জায়গা দারুল উলুমের জন্যে সঙ্কীর্ণ হয়ে যায়। বিস্তৃত জায়গার প্রয়োজন পড়ে। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এমন সাহায্য লাভ হয় যে, একেবারে শহরের মাঝখানে সরকারের পক্ষ থেকে অনেক বড়ো ও বিস্তৃত জায়গা পাওয়া যায়। যেখানে বর্তমানে ইসলামিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠিত আছে। হযরত আল্লামা শাব্বীর আহমাদ ওসমানী রহ.-এর মাযারও সেখানে রয়েছে। এই বিস্তৃত জায়গা দারুল উলুম করাচীর নামে এলোট হয়। জায়গার কাগজ হাতে চলে আসে। জায়গা দখলে চলে আসে। একটি কক্ষও বানিয়ে দেওয়া হয়। টেলিফোনের সংযোগও দেওয়া হয়। তারপর দারুল উলূমের ভিত্তিপ্রস্তর রাখার সময় একটা সমাবেশও করা হয়। যার মধ্যে পুরো পাকিস্তানের বড়ো বড়ো আলেম তাশরীফ আনেন। ঐ সমাবেশের সময় কিছু লোক ঝগড়া শুরু করে যে, এই জায়গা দারুল উলূমের পাওয়া উচিত ছিলো না, বরং অমুকের পাওয়া উচিত ছিলো। ঘটনাক্রমে ঝগড়ার মধ্যে তারা এমন কিছু বড়ো ব্যক্তিত্বকেও শামিল করে নেয়, যারা ছিলেন হযরত ওয়ালেদ ছাহেবের জন্যে সম্মানের পাত্র। ওয়ালেদ ছাহেব তো প্রথমে যে কোনোভাবে ঝগড়া মিটাতে চাইলেন, কিন্তু ঝগড়া শেষ হলো না। ওয়ালেদ ছাহেব চিন্তা করলেন, যে মাদরাসার সূচনাই হচ্ছে ঝগড়ার মাধ্যমে, তার মধ্যে কী বরকত হবে? সুতরাং হযরত ওয়ালেদ ছাহেব তার এই ফয়সালা শুনিয়ে দিলেন যে, আমি এ জায়গা ছেড়ে দিচ্ছি।
📄 আমি এর মধ্যে বরকত দেখছি না
দারুল উলূমের ব্যবস্থাপনা পরিষদ এ সিদ্ধান্ত শুনে হযরত ওয়ালেদ ছাহেবকে বললেন, হযরত! এ আপনি কেমন ফয়সালা করছেন? এতো বড়ো জায়গা তাও শহরের মাঝখানে এমন জায়গা পাওয়া তো কঠিন। এ জায়গা আপনি পেয়েছেন, তা আপনার দখলেও আছে, আপনি এমন জায়গা ছেড়ে দিচ্ছেন! হযরত ওয়ালেদ ছাহেব উত্তরে বললেন যে, আমি ব্যবস্থাপনা পরিষদকে এ জায়গা ছাড়তে বাধ্য করবো না। কারণ, ব্যবস্থাপনা পরিষদ মূলত এই জায়গার মালিক হয়ে গিয়েছে। আপনারা চাইলে এখানে মাদরাসা করুন। আমি এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবো না। কারণ, যে মাদরাসার ভিত্তি ঝগড়ার উপর রাখা হচ্ছে, ঐ মাদরাসার মধ্যে আমি বরকত দেখছি না। তারপর হাদীস শোনালেন যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি হকের উপর থেকে ঝগড়া ছেড়ে দিবে তাকে জান্নাতের মাঝখানে ঘর দেওয়ার জন্যে আমি দায়িত্ব নিবো। আপনারা বলছেন যে, শহরের মাঝখানে এমন জায়গা কোথায় পাওয়া যাবে, কিন্তু হুযুর সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলছেন যে, আমি তাকে জান্নাতের মাঝখানে ঘর দেওয়াবো। একথা বলে ঐ জায়গা ছেড়ে দেন। বর্তমান যুগে এর দৃষ্টান্ত পাওয়া কঠিন যে, এমন ঝগড়ার কারণে কোনো ব্যক্তি এতো বড়ো জায়গা ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথার উপর যার পরিপূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে, সেই এ কাজ করতে পারে। এরপর আল্লাহ তা'আলা এমন মেহেরবানী করলেন যে, কয়েক মাস পরেই ঐ জমির থেকে কয়েকগুণ বড়ো জমি দান করলেন। যেখানে বর্তমানে দারুল উলূম প্রতিভাত। এটা তো আমি আপনাদের সামনে একটা দৃষ্টান্ত বর্ণনা করলাম। অনাবশ্যক হযরত ওয়ালেদ হাফেযকে আমি সারাজীবন এ হাদীসের উপর যথাসাধ্য আমল করতে দেখেছি। হ্যাঁ, তবে যদি অন্য ব্যক্তি ঝগড়ার মধ্যে জড়িয়েই ফেলে, প্রতিহত করা ছাড়া কোনো উপায় না থাকে, তবে সে ভিন্ন কথা। আমরা ছোট ছোট বিষয় নিয়ে বসে যাই যে, অমুক সময় অমুক ব্যক্তি এ কথা বলেছিল, অমুক এই করেছিলো, এখন সবসমস্যার জন্য তা অন্তরে বসিয়ে নেই। ঝগড়া দাঁড়িয়ে যায়। আজ আমাদের পুরো সমাজে এই জিনিস ধ্বংস করছে। ঝগড়া মানুষের দ্বীনকে ম্লান করে। মানুষের অন্তরকে বরবাদ করে। এজন্য আল্লাহ্র ওয়াস্তে পরস্পরে ঝগড়া মিটিয়ে দিন। যদি দুই মুসলমানের মধ্যে ঝগড়া দেখেন, তাহলে তাদের মধ্যে আপোস করার পুরোপুরি চেষ্টা করুন।