📄 ঝগড়ার ফল
আজ আমাদের সমাজ ঝগড়ায় ভরে গিয়েছে। এর বেবরকতী ও অন্ধকার পুরো সমাজে এ পরিমাণ ছেয়ে গিয়েছে যে, ইবাদতের নূর অনুভূত হয় না। ছোট ছোট বিষয়ে ঝগড়া চলছে। কোথাও পরিবারে পরিবারে ঝগড়া, কোথাও স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া, কোথাও বন্ধুদের মধ্যে ঝগড়া, কোথাও ভাই-বেরাদারের মধ্যে ঝগড়া, কোথাও আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে ঝগড়া, এমনকি ওলামায়ে কেরামের মাঝে পরস্পরে ঝগড়া হচ্ছে, দ্বীনদারদের মাঝে ঝগড়া হচ্ছে, পরিণতিতে দ্বীনের নূর বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে।
📄 ঝগড়া কীভাবে দূর হবে
এখন প্রশ্ন হলো, এ ঝগড়া মিটবে কীভাবে? হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ আশরাফ আলী ছাহেব রহ.-এর একটি মালফ্য আপনাদেরকে শুনাচ্ছি, যা অতি বড়ো সোনালী মূলনীতি। এই মূলনীতির উপর যদি মানুষ আমল করে, তাহলে আশা করা যায় পঁচাত্তর শতাংশ ঝগড়া তাৎক্ষণিকভাবে মিটে যাবে। হযরত বলেন,
'একটি কাজ এই করো যে, দুনিয়াদারদের থেকে আশা করা ছেড়ে দাও। যখন আশা ছেড়ে দিবে, তখন ইনশাআল্লাহ অন্তরে কখনো ঝগড়া ও বিদ্বেষের চিন্তা জাগবে না।'
অন্যদের প্রতি যেসব অভিযোগ-আপত্তি জন্মায়, যেমন অমুক ব্যক্তির এমন করা উচিত ছিলো সে তা করেনি, আমার যেভাবে সম্মান করা উচিত ছিলো সেভাবে সম্মান করেনি, যেভাবে আমার আদর-আপ্যায়ন করা দরকার ছিলো তা করেনি, বা অমুকের প্রতি আমি অমুক দয়া করেছিলাম সে তার বদলা দেয়নি ইত্যাদি। এসব অভিযোগ এজন্যে জন্মায় যে, অন্যের প্রতি আশা-প্রত্যাশা পোষণ করেছে। যখন সে আশা পুরা হয়নি, তখন পরিণতিতে অন্তরে গিট লেগেছে যে, সে আমার সঙ্গে ভালো আচরণ করেনি। অন্তরে অভিযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এমন ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূল বলেছেন যে, কারো প্রতি তোমার কোনো অভিযোগ সৃষ্টি হলে তুমি তাকে গিয়ে বলো যে, তোমার প্রতি আমার এ অভিযোগ রয়েছে। তোমার এ কাজ আমার ভালো লাগেনি। আমার পছন্দ হয়নি, আমার খারাপ লেগেছে। একথা বলে নিজের মনকে পরিষ্কার করে নাও। বর্তমানে কথা বলে মন ছাপ করার রীতি শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন ঐ বিষয় অন্তরে পোষণ করে বসে থাকে। পরবর্তীতে যখন আরেক ব্যাপার দেখা দেয় তখন আরেকটি গিট লাগে। সুতরাং আস্তে আস্তে এ গিট অন্তরে বৃদ্ধি পেতে থাকে। পরিণতিতে তা বিদ্বেষের আকার ধারণ করে। বিদ্বেষের ফলে পরস্পরে শত্রুতা সৃষ্টি হয়।
📄 আশা রেখো না, ঝগড়া শেষ হয়ে যাবে
এজন্যে হযরত থানভী রহ. বলেন, এভাবে ঝগড়ার শিকড় কেটে দাও যে, কারো থেকে কোনো আশাই রেখো না। মানুষের প্রতি কেন আশা পোষণ করছো যে, অমুক এই দিবে, অমুক এই কাজ করবে, সব আশা কেবল আল্লাহ তা'আলার প্রতি রাখো, যিনি খালেক ও মালেক। বরং দুনিয়ার মানুষের প্রতি কেবল অকল্যাণের আশা রাখো যে, তাদের থেকে সবসময় অকল্যাণই পাওয়া যাবে। অকল্যাণের আশা করার পর যদি ভালো কিছু কখনো পাও তাহলে আল্লাহর শোক আদায় করো যে, হে আল্লাহ! আপনার মেহেরবানী, আপনার দয়া। আর যদি অকল্যাণ পাও তাহলে চিন্তা করো যে, আমার তো পূর্ব থেকেই অকল্যাণের আশা ছিলো। তাহলে এর ফলে অন্তরে অভিযোগ ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হবে না। তখন শত্রুতাও সৃষ্টি হবে না, ঝগড়াও হবে না। তাই কারো থেকে কোনো আশাই রেখো না।
📄 বিনিময় গ্রহণের নিয়ত করো না
এমনিভাবে হযরত থানভী রহ. আরেকটি মূলনীতি এই বলেছেন যে, তুমি যখন অন্য কারো সঙ্গে কোনো সদাচরণ করবে, তখন শুধু আল্লাহকে খুশি করার জন্যে করবে। যেমন কাউকে সাহায্য করলে বা কারো জন্যে সুপারিশ করলে বা কারো সঙ্গে সদব্যবহার করলে বা কাউকে সম্মান করলে, তখন একথা চিন্তা করো যে, আমি আল্লাহকে খুশি করার জন্যে এ আচরণ করছি। নিজের আখেরাত গড়ার জন্যে এ কাজ করছি। এ নিয়তে যখন সদাচরণ করবে তখন তার বিনিময়ের আশাই থাকবে না। এবার মনে করুন! আপনি এক ব্যক্তির সঙ্গে সদাচরণ করলেন, কিন্তু সে আপনার সঙ্গে সদাচরণের বদলায় সদাচরণ করলো না। কখনোই আপনার দয়াকে স্বীকার করলো না। এমতাবস্থায় আপনার অন্তরে অবশ্যই এ চিন্তা জাগবে যে, আমি তার সঙ্গে সদাচরণ করলাম আর সে আমার সঙ্গে উল্টা অসৎ ব্যবহার করলো। কিন্তু আপনি যদি তার সঙ্গে শুধু আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্যে সদাচরণ করে থাকেন, তাহলে এমতাবস্থায় তার অসদাচরণে আপনার অভিযোগ সৃষ্টি হবে না। কারণ, আপনার উদ্দেশ্য ছিলো কেবল আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা। এই দুই মূলনীতির উপর যদি আমরা সকলে আমল করি, তাহলে পারস্পরিক সকল ঝগড়া মিটে যাবে এবং এ হাদীসের উপরও আমল হবে, যা এখন আমি আপনাদের সামনে পাঠ করেছি। যার মধ্যে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি হকের উপর থেকে বিবাদ ত্যাগ করবে, আমি তাকে জান্নাতের মাঝখানে ঘর দেওয়ার দায়িত্ব নিবো।