📄 'মুনাযারা' দ্বারা সাধারণত উপকার হয় না
হযরত থানভী রহ. নিজেই বলেন যে, আমি যখন দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে দরসে নিযামীর নেসাব শেষ করি, তখন আমার বাতেল ফেরকার সঙ্গে 'মুনাযারা' করার আগ্রহ ছিলো। সুতরাং কখনো শিয়াদের সঙ্গে 'মুনাযারা' হতো, কখনো গাইরে মুকাল্লিদদের সঙ্গে, কখনো বেরেলবীদের সঙ্গে, কখনো হিন্দুদের সঙ্গে এবং কখনো শিখদের সঙ্গে 'মুনাযারা' হতো। নতুন নতুন পাশ করেছি, এজন্যে খুব আবেগ-উদ্দীপনা নিয়ে এসব 'মুনাযারা' করতে থাকি। কিন্তু পরবর্তীতে আমি 'মুনাযারা' থেকে তওবা করি। কারণ, আমার অভিজ্ঞতা হলো যে, এর দ্বারা উপকার হয় না, বরং নিজের আধ্যাত্মিক অবস্থার উপর এর বিরূপ প্রভাব পড়ে। এজন্যে আমি তা ছেড়ে দেই। মোটকথা, আমাদের বড়োরা যখন হক ও বাতিলের মধ্যেও 'মুনাযারা' করা পছন্দ করেননি, তখন নিজের প্রবৃত্তির চাহিদার ভিত্তিতে বা জাগতিক বিষয়ের ভিত্তিতে 'মুনাযারা' ও ঝগড়া-বিবাদ করাকে কি করে পছন্দ করবেন? ঝগড়া আমাদের অন্তরকে খারাপ করে দেয়।
📄 জান্নাতের মধ্যে ঘরের দায়িত্ব
একহাদীসে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
وَمَنْ تَرَكَ الْبِرَاءَ وَهُوَ مُحِقٌّ بُنِي لَهُ فِي وَسَطِ الْجَنَّةِ
'আমি ঐ ব্যক্তিকে জান্নাতের মাঝে ঘর দেওয়ার দায়িত্ব নিচ্ছি, যে হকের উপর থাকা সত্ত্বেও ঝগড়া ছেড়ে দেয়।' অর্থাৎ, যে ব্যক্তি হকের উপর থাকা সত্ত্বেও এ কথা চিন্তা করে যে, আমি হকের বিষয়ে অধিক দাবি খাড়া করলে ঝগড়া হবে, তাই এই হক ছেড়ে দিচ্ছি, যাতে ঝগড়া মিটে যায়। তার জন্যে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলছেন যে, আমি তাকে জান্নাতের মাঝখানে ঘর দেওয়ার দায়িত্ব নিচ্ছি।
টিকাঃ
৭. সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১৯১৬, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৫০
📄 ঝগড়ার ফল
আজ আমাদের সমাজ ঝগড়ায় ভরে গিয়েছে। এর বেবরকতী ও অন্ধকার পুরো সমাজে এ পরিমাণ ছেয়ে গিয়েছে যে, ইবাদতের নূর অনুভূত হয় না। ছোট ছোট বিষয়ে ঝগড়া চলছে। কোথাও পরিবারে পরিবারে ঝগড়া, কোথাও স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া, কোথাও বন্ধুদের মধ্যে ঝগড়া, কোথাও ভাই-বেরাদারের মধ্যে ঝগড়া, কোথাও আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে ঝগড়া, এমনকি ওলামায়ে কেরামের মাঝে পরস্পরে ঝগড়া হচ্ছে, দ্বীনদারদের মাঝে ঝগড়া হচ্ছে, পরিণতিতে দ্বীনের নূর বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে।
📄 ঝগড়া কীভাবে দূর হবে
এখন প্রশ্ন হলো, এ ঝগড়া মিটবে কীভাবে? হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ আশরাফ আলী ছাহেব রহ.-এর একটি মালফ্য আপনাদেরকে শুনাচ্ছি, যা অতি বড়ো সোনালী মূলনীতি। এই মূলনীতির উপর যদি মানুষ আমল করে, তাহলে আশা করা যায় পঁচাত্তর শতাংশ ঝগড়া তাৎক্ষণিকভাবে মিটে যাবে। হযরত বলেন,
'একটি কাজ এই করো যে, দুনিয়াদারদের থেকে আশা করা ছেড়ে দাও। যখন আশা ছেড়ে দিবে, তখন ইনশাআল্লাহ অন্তরে কখনো ঝগড়া ও বিদ্বেষের চিন্তা জাগবে না।'
অন্যদের প্রতি যেসব অভিযোগ-আপত্তি জন্মায়, যেমন অমুক ব্যক্তির এমন করা উচিত ছিলো সে তা করেনি, আমার যেভাবে সম্মান করা উচিত ছিলো সেভাবে সম্মান করেনি, যেভাবে আমার আদর-আপ্যায়ন করা দরকার ছিলো তা করেনি, বা অমুকের প্রতি আমি অমুক দয়া করেছিলাম সে তার বদলা দেয়নি ইত্যাদি। এসব অভিযোগ এজন্যে জন্মায় যে, অন্যের প্রতি আশা-প্রত্যাশা পোষণ করেছে। যখন সে আশা পুরা হয়নি, তখন পরিণতিতে অন্তরে গিট লেগেছে যে, সে আমার সঙ্গে ভালো আচরণ করেনি। অন্তরে অভিযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এমন ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূল বলেছেন যে, কারো প্রতি তোমার কোনো অভিযোগ সৃষ্টি হলে তুমি তাকে গিয়ে বলো যে, তোমার প্রতি আমার এ অভিযোগ রয়েছে। তোমার এ কাজ আমার ভালো লাগেনি। আমার পছন্দ হয়নি, আমার খারাপ লেগেছে। একথা বলে নিজের মনকে পরিষ্কার করে নাও। বর্তমানে কথা বলে মন ছাপ করার রীতি শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন ঐ বিষয় অন্তরে পোষণ করে বসে থাকে। পরবর্তীতে যখন আরেক ব্যাপার দেখা দেয় তখন আরেকটি গিট লাগে। সুতরাং আস্তে আস্তে এ গিট অন্তরে বৃদ্ধি পেতে থাকে। পরিণতিতে তা বিদ্বেষের আকার ধারণ করে। বিদ্বেষের ফলে পরস্পরে শত্রুতা সৃষ্টি হয়।