📄 হিংসা ও বিদ্বেষের উত্তম চিকিৎসা
বিদ্বেষ সৃষ্টি হয় হিংসা থেকে। অন্তরে প্রথমে অন্যের প্রতি হিংসা সৃষ্টি হয় যে, সে আগে বেড়ে গিয়েছে, আমি পিছে রয়ে গিয়েছি। তার আগে বাড়ার কারণে অন্তরে জ্বালা-পোড়া শুরু হয়। সংকোচন শুরু হয়। অন্তরে এ বাসনা জাগে যে, যে কোনোভাবে আমি তার ক্ষতি করবো। কিন্তু ক্ষতি করা তার ক্ষমতাভুক্ত না হওয়ার ফলে মনে যে চাপ সৃষ্টি হয়, তার পরিণতিতে মানুষের অন্তরে বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়। এজন্যে বিদ্বেষ থেকে বাঁচার প্রথম পথ এই যে, নিজের অন্তর থেকে প্রথমে হিংসা দূর করবে। বুযুর্গগণ হিংসা দূর করার স্মৃতি এই বলেছেন যে, তার জন্যে দু'আ করবে- হে আল্লাহ! তাকে আরো বেশি উন্নতি দান করুন। তার জন্যে দু'আ করার সময় অন্তরে অনেক বেশি কষ্ট হবে। কারণ, অন্তর তো তার অবনতি চাচ্ছে, বরং তার ক্ষতি কামনা করছে, কিন্তু মুখে সে দু'আ করছে যে, হে আল্লাহ! তাকে আরো উন্নতি দান করুন। মনে যতো কষ্টই হোক, কিন্তু জোর করে তার জন্যে দু'আ করবে। হিংসা দূর হওয়ার এটা উত্তম চিকিৎসা। হিংসা দূর হলে ইনশাআল্লাহ বিদ্বেষও দূর হবে। এজন্যে প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের অন্তরে অনুসন্ধান করবে, যার সম্পর্কেই মনে হবে যে, তার ব্যাপারে অন্তরে বিদ্বেষ রয়েছে, তাকে পাঁচওয়াক্ত নামাযের দু'আর মধ্যে শামিল করে নিবে। এটা হিংসা-বিদ্বেষের উত্তম চিকিৎসা।
📄 শত্রুর প্রতি দয়া করা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ
লক্ষ করুন! মক্কার মুশরিকরা হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরামের উপর জুলুম-অত্যাচার ও কষ্ট-নিপীড়নে কোনোরূপ ত্রুটি করেনি। এমনকি তার রক্তপিপাসু হয়েছে। ঘোষণা করে দিয়েছে, যে ব্যক্তি হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ধরে আনবে, তাকে একশ' উট পুরস্কার দেওয়া হবে। উহুদ যুদ্ধের সময় তার উপর তীরের বৃষ্টি বর্ষণ করেছে। এমনকি তাঁর নূরানী চেহারা আহত হয়। তাঁর পবিত্র দাত শহীদ হয়। কিন্তু তাঁর মুখে তখন এই দু'আ ছিলো-
رَبِّ اغْفِرْ لِقَوْمِي فَإِنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ হে আল্লাহ! আমার কওমকে হেদায়েত দান করুন। তারা জানে না, এর অজ্ঞ-মূর্খ। আমার কথা বুঝতে পারছে না এবং এ কারণে আমার উপর জুলুম করছে।
চিন্তা করুন! তারা ছিলো জালেম। তাদের জুলুমের ব্যাপারে কোনো সন্দেহ ছিলো না, কিন্তু এতদসত্ত্বেও তাঁর অন্তরে কাফেরদের প্রতি বিদ্বেষের কোনো চিন্তা জাগেনি। তাই এটাও নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরাট সুন্নাত। তাঁর আদর্শ হলো, অকল্যাণের বদলা অকল্যাণের মাধ্যমে দিবে না, বরং তাদের জন্যে দু'আ করবে। এটাই হিংসা ও বিদ্বেষ দূর করার উত্তম চিকিৎসা।
যাই হোক, আমি বলছিলাম যে, পারস্পরিক ঝগড়া অবশেষে অন্তরে হিংসা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। ঝগড়া যখন লম্বা হয়, তখন অন্তরে অবশ্যই বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়। আর যখন বিদ্বেষ সৃষ্টি হয় তখন অন্তর জগত ধ্বংস হয়ে যায়। অন্তর নষ্ট হয়ে যায়। তার ফলে মানুষ আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। এ কারণে হুকুম এই যে, পরস্পরে ঝগড়া থেকে বাঁচো। বিবাদ- বিতর্ক থেকে দূরে থাকো।
টিকাঃ
৫. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪১৭, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৩৪৭, সুনানে ইবনে মাজাহ্ হাদীস নং ৪০১৫, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৩৪২৯
📄 ঝগড়া ইলমের নূর নষ্ট করে দেয়
এমনকি ইমাম মালেক রহ. বলেন যে, এক ঝগড়া তো হয় দৈহিক, যার মধ্যে হাতাহাতি হয়। আরেক ঝগড়া হয় শিক্ষিত মানুষ ও আলেমদের মাঝে তাকে বলে 'মুজাদালা', 'মুনাযারা' ও 'মুবাহাসা'। এক আলেম একটা কথা তুলে ধরলো, আরেকজন তার বিপরীত বললো। সে একটি দলিল দিলো, অপরজন তার দলিল খন্ডন করলো। প্রশ্ন-উত্তর ও খন্ডনের এক অন্তহীন ধারা শুরু হলো। এটাকেও বুযুর্গগণ কখনো পছন্দ করেননি। এর ফলে অন্তরের নূর দূর হয়ে যায়। সুতরাং ইমাম মালেক বিন আনাস রহ. বলেন,
الْبَرَاءُ وَالْجِدَالُ فِي الْعِلْمِ يَذْهَبُ بِنُورِ الْعِلْمِ ইলমী ঝগড়া ইলমের নূরকে দূর করে দেয়।
লক্ষ করুন! এক তো হলো 'মুযাকারা', যেমন এক আলেম একটি মাসআলা তুলে ধরলো, অন্য আলেম বললো যে, এ মাসআলার মধ্যে আমার এই প্রশ্ন রয়েছে। এবার উভয়ে বসে বোঝাপড়ার মাধ্যমে এ মাসআলার সমাধান করতে লাগলো, একে বলে 'মুযাকারা'- এটা খুবই ভালো কাজ। কিন্তু এভাবে ঝগড়া করা যে, এক আলেম অপরের বিরুদ্ধে কোনো মাসআলার বিষয়ে বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে দিলো, লিফলেট বা পুস্তিকা প্রকাশ করলো। অপরজন তার বিরুদ্ধে কিতাব ছাপিয়ে দিলো। এভাবে ধারা চলতে থাকলো। এক আলেম অন্যের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিলো, দ্বিতীয় জন এর বিরুদ্ধে বক্তব্য দিলো। এভাবে কেবলই বিরোধিতার উদ্দেশ্যে বিরোধিতা চলতে থাকলো, একে 'মুজাদালা' ও ঝগড়া বলে। যাকে আমাদের বুযুর্গগণ ও ইমামগণ মোটেই পছন্দ করেননি।
টিকাঃ
৬. তারতীবুল মাদারিক ও তাকরীবুল মাসালিক
📄 হযরত থানভী রহ.-এর বাকশক্তি
হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী ছাহেব রহ.-কে আল্লাহ তা'আলা এমন বাকশক্তি দান করেছিলেন যে, কোনো ব্যক্তি যে কোনো বিষয়ে বাহাস করতে এলে তিনি কয়েক মিনিটের মধ্যে তাকে নিরুত্তর করে দিতেন। আমাদের হযরত ডাক্তার আব্দুল হাই ছাহেব রহ. ঘটনা শুনিয়েছিলেন যে, একবার হযরত থানভী রহ. অসুস্থ ছিলেন, বিছানায় শোয়া ছিলেন, তখন তিনি ইরশাদ করেন,
'আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ তা'আলার রহমতের উপর ভরসা করে বলছি যে, সারা দুনিয়ার সকল বুদ্ধিমান একত্র হয়ে এলে এবং ইসলামের যে কোনো সাধারণ মাসআলার উপর কোনো আপত্তি করলে এ অধম ইনশাআল্লাহ দুই মিনিটের মধ্যে তাদেরকে নিরুত্তর করতে সক্ষম। তারপর বলেন, আমি তো একজন সাধারণ তালিবে ইলম, আলেমদের শান তো অনেক উর্ধ্বে।' সুতরাং বাস্তবেই হযরত থানভী রহ.-এর নিকট কেউ কোনো বিষয়ে কথা বললে সে কয়েক মিনিটের অধিক অগ্রসর হতে পারতো না।