📄 হক আদায় করা সুন্নাতের অনুসরণ
অন্য এক হাদীসে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা'আলা যেমনিভাবে ইবাদত ফরয করেছেন এবং ইবাদতের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন, তেমনিভাবে তোমাদের উপরে কিছু হকও আরোপ করেছেন। তোমাদের জানেরও তোমাদের উপর হক রয়েছে, তোমাদের স্ত্রীরও তোমাদের উপর হক রয়েছে, তোমাদের চোখেরও তোমাদের উপর হক রয়েছে, তোমাদের সঙ্গী-সাথীদেরও তোমাদের উপর হক রয়েছে।
তোমরা যদি এসব হক আদায় করো, তাহলে সুন্নাতের অনুসরণ হবে। আর যদি দুনিয়াবিরাগীদের মতো বনে-জঙ্গলে গিয়ে বসে যাও, আর বলো যে, আমি দুনিয়াকে ত্যাগ করে এখানে 'আল্লাহ' 'আল্লাহ' করবো, তাহলে এটা হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের অনুসরণ হবে না। যাই হোক, এ আয়াতের তৃতীয় অর্থ এই যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল থেকে সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করো না, বরং যে কাজকে যে সীমার মধ্যে করার নির্দেশ তাঁরা দিয়েছেন, সে কাজকে ঐ সীমার মধ্যেই রাখো, তারচে' সম্মুখে অগ্রসর হয়ো না。
টিকাঃ
৬. সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৩৩৭
📄 অনুসরণের নাম দ্বীন
মনে রাখবেন! নিজের ইচ্ছা ও নিজের আগ্রহ পুরা করার নাম দ্বীন নয়, বরং দ্বীন হলো অনুসরণের নাম। আল্লাহর হুকুম এবং তাঁর রাসূলের সুন্নাতের অনুসরণের নাম দ্বীন। এজন্যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের যখন যে হুকুম আসবে এবং তাঁর অনুসরণের যে দাবি হবে, সেটাই কল্যাণকর, সেটাই আনুগত্য। তার মধ্যে তোমাদের দুনিয়া আখেরাতের সফলতা। নিজের পক্ষ থেকে কোনো পথ নির্ধারণ করে চলতে আরম্ভ করা যে, আমি তো এটা করবো, এটা ঠিক নয়। তাই আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করো না। কেউ যদি একথা চিন্তা করে যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কাজ করেছেন তা করতে আমার লজ্জা বোধ হয়, তাহলে সে যেন দাবি করছে যে, আমার মর্যাদা হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উর্ধ্বে, আমি বড়ো মানুষ, এজন্যে আমি এ কাজ করি না। নাউযুবিল্লাহ। এটাও মূলত হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার অন্তর্ভুক্ত। এর বিভিন্ন দৃষ্টান্ত সাহাবায়ে কেরামের ঘটনায় পাওয়া যায়。
📄 বৃষ্টির সময় ঘরে নামায পড়ার ছাড়
একবার হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুকুম দিলেন যে, যদি বৃষ্টি হয়, আর কাদা এতো বেশি হয় যে, মানুষের চলতে কষ্ট হয়, পদস্খলনের আশঙ্কা হয়, কাপড় নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা হয়, তখন শরীয়ত মসজিদের পরিবর্তে ঘরে নামায পড়ার ছাড় দিয়েছে।'
এখন আমরা শহরে বাস করি। যেখানে গলি ও সড়ক পাকা। এ কারণে বৃষ্টি হলে এতো কাদা হয় না যে, মানুষের চলা-ফেরা কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু যেখানে কাঁচা বাড়ি ও কাঁচা গলি রয়েছে, সেখানে আজও এ হুকুম বিদ্যমান যে, এমতাবস্থায় জামাত মাফ হয়ে যায়। ঘরে নামায পড়া জায়েয হয়ে যায়。
টিকাঃ
৭. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৮১, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৮৯৩, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৫০৫০
📄 হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি.-এর ঘটনা
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচাতো ভাই। একবার তিনি মসজিদে বসা ছিলেন। আযানের সময় হলো। সাথে সাথে মুষলধারে বৃষ্টি আরম্ভ হলো। মুয়াযযিন আযান দিলো। তারপর তিনি মুয়াযযিনকে বললেন, ঘোষণা করে দাও,
الصَّلُوةُ فِي الرِّحَالِ অর্থাৎ, সকলে নিজ নিজ ঘরে নামায পড়ুন।
হযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকেও এ কথাই প্রমাণিত আছে যে, এমন ক্ষেত্রে এ ঘোষণা দেওয়া উচিত। এখন মানুষের জন্যে এটা ছিলো খুবই অপরিচিত ব্যাপার। সারাজীবন তো দেখে এসেছে যে, মসজিদ থেকে ঘোষণা হয়-
حَيَّ عَلَى الصَّلُوةِ، حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ 'নামাযের জন্যে এসো, কামিয়াবির জন্যে এসো।'
কিন্তু এখানে উল্টা ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে যে, নিজেদের ঘরে নামায পড়ো। সুতরাং লোকেরা আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি.-এর নিকট আপত্তি করলো যে, হযরত আপনি এ কি করছেন! আপনি মানুষদেরকে মসজিদে আসতে নিষেধ করছেন। উত্তরে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি, বললেন,
نَعَمْ أَفْعَلُ ذَلِكَ مَنْ هُوَ خَيْرٌ مِنِّي وَمِنْكَ
‘হ্যাঁ, আমি এমন ঘোষণাই করাবো। কারণ, এ ঘোষণাও সেই সত্তাই করিয়েছেন, যিনি আমার থেকে উত্তম এবং তোমাদের থেকেও উত্তম।’
তাই কোনো ব্যক্তি যদি বলে এমন ঘোষণা করা আমার কাছে খারাপ লাগে, এমন ঘোষণা করতে আমার লজ্জা বোধ হয়, তার অর্থ হবে এই যে, তুমি হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছো। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ঘোষণা দিয়েছেন, এ ছাড় দিয়েছেন, আর তুমি বলছো যে, এ ছাড় দেবো না। এরূপ ঘোষণা করা আমার কাছে খারাপ লাগে。
মোটকথা, দ্বীনের যে কোনো বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত ও তাঁর তা'লীম থেকে সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার নিষেধাজ্ঞাও এ আয়াতের অর্থের অন্তর্ভুক্ত。
টিকাঃ
৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬২৮