📄 এক কাফের ব্যক্তির ঘটনা
হাদীস শরীফে এসেছে- একবার হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ ঘরে অবস্থান করছিলেন। সামনে থেকে এক ব্যক্তিকে আসতে দেখা গেলো। হযরত আয়েশা রাযি. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটেই ছিলেন। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আয়েশা! যে ব্যক্তি সামনে থেকে আসছে, সে তার গোত্রের খারাপ মানুষ। যখন ঐ ব্যক্তি হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে আসলো, তখন তিনি দাঁড়িয়ে তাকে সম্মান করলেন। অত্যন্ত সম্মানজনকভাবে তার সাথে কথা বললেন। যখন ঐ ব্যক্তি কথাবার্তা বলে চলে গেলো, তখন হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি নিজেই তো বললেন, এ ব্যক্তি তার কবিলার খারাপ লোক। কিন্তু যখন সে আসলো, তখন আপনি তার সম্মান করলেন এবং তার সাথে খুব নরম আচরণ করলেন, এর কারণ কি? হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ঐ মানুষ খুবই খারাপ, যার অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্যে সম্মান করা হয়。
টিকাঃ
৩. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৫৭২, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৬৯৩, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১৯১৯, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪১৫৯
📄 এই গীবত জায়েয
এ হাদীসে দুটি প্রশ্ন জাগে। প্রথম প্রশ্ন এই জাগে যে, যখন ঐ ব্যক্তি দূর থেকে আসছিলো, তখন আসার পূর্বেই তার অবর্তমানে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি.-এর নিকট তার নিন্দা করলেন যে, এ ব্যক্তি তার কবিলার মধ্যে খারাপ মানুষ। বাহ্যত এটাকে গীবত মনে হয়। কারণ, এক ব্যক্তির অবর্তমানে তার দোষ বর্ণনা করা হচ্ছে। এর উত্তর এই যে, মূলত এটা গীবত নয়। কারণ, কোনো ব্যক্তিকে অন্য কারো অনিষ্ট থেকে বাঁচানোর নিয়তে যদি তার দোষ বর্ণনা করা হয়, তাহলে তা গীবত নয়। যেমন কোনো ব্যক্তি অন্য কাউকে সতর্ক করার জন্যে বললো যে, তুমি অমুক ব্যক্তির ব্যাপারে সতর্ক থেকো, সে যেনো তোমাকে ধোঁকা দিতে না পারে, বা সে যেনো তোমাকে কষ্ট দিতে না পারে। তাহলে এটা গীবতের অন্তর্ভুক্ত নয়। হারাম ও নাজায়েয নয়। বরং কতক অবস্থায় এটা বলা ওয়াজিব। উদাহরণস্বরূপ আপনার নিশ্চিতভাবে জানা আছে যে, অমুক ব্যক্তি অমুককে ধোঁকা দিবে, আর ধোঁকা দেওয়ার ফলে ঐ দ্বিতীয় ব্যক্তির জানের বা মালের মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে, তখন আপনার উপর ঐ দ্বিতীয় ব্যক্তিকে বলে দেওয়া ওয়াজিব যে, দেখো! অমুক ব্যক্তি তোমাকে ধোঁকা দিতে চায়। যাতে সে এ থেকে নিরাপদে থাকে। এটা গীবতের অন্তর্ভুক্ত নয়।
এ কারণে যখন হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশাকে বললেন যে, এ ব্যক্তি তার কবিলার খারাপ মানুষ, তখন তাঁর উদ্দেশ্য এই ছিলো যে, এ ব্যক্তি যেন হযরত আশেয়া রাযি.-কে ধোঁকা দিতে না পারে, বা এ ব্যক্তির উপর ভরসা করে হযরত আয়েশা রাযি. বা অন্য কোনো মুসলমান এমন কোনো কাজ না করে, যার ফলে পরবর্তীতে তাকে আফসোস করতে হয়। এ কারণে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি.- কে তার ব্যাপারে আগে থেকে বলে দেন।
📄 খারাপ মানুষকে তিনি সম্মান করলেন কেন
দ্বিতীয় প্রশ্ন এই জাগে যে, একদিকে তো তিনি তার দোষ বর্ণনা করলেন, অপরদিকে যখন সে এলো তখন তার খুব সম্মান করলেন, খুব আদর-যত্ন করলেন। এখানে ভিতর-বাইরের মধ্যে পার্থক্য হলো। সম্মুখে একরকম আচরণ, আর পিছনে আরেক রকেম। আসল কথা হলো, তিনি হলেন আল্লাহর রাসূল। প্রত্যেকটি বিষয়ের তিনি সীমা বর্ণনা করেছেন। তাই সতর্ক করার জন্যে তিনি বলে দিয়েছেন যে, এ ব্যক্তি খারাপ মানুষ। কিন্তু যখন সে আমার কাছে মেহমান হয়ে এসেছে, তাই মেহমান হিসেবেও তার কিছু হক রয়েছে। তা এই যে, আমি তার সঙ্গে সম্মানের আচরণ করবো। তার সঙ্গে এমন আচরণ করবো, যা একজন মেহমানের সাথে করা উচিত। তাই হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন আচরণই করেছেন。
📄 ঐ মানুষ অতিনিকৃষ্ট
এ হাদীসে এ কথাও বলা হয়েছে যে, এর মধ্যে একটি হিকমত এও রয়েছে যে, খারাপ মানুষকে সম্মান করা না হলে হতে পারে সে তোমাকে কষ্ট দিবে বা কোনো বিপদে ফেলবে বা এমন কোনো আচরণ সে করবে, যার ফলে তোমাকে ভবিষ্যতে আফসোস করতে হবে। এজন্যে কোনো খারাপ মানুষের সঙ্গে দেখা হলে তাকে সম্মান করাতেও কোনো দোষ নেই। তার অনিষ্ট থেকে নিজের জান-মাল-আব্রু বাঁচানোও মানুষের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।
এ কারনেই হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ হাদীসে পরিষ্কার ভাষায় ইরশাদ করেছেন যে, ঐ মানুষ অতিনিকৃষ্ট, যার অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্যে মানুষ তাকে সম্মান করে। মানুষ তাকে এজন্যে সম্মান করছে না যে, সে ভালো মানুষ, বরং এজন্যে সম্মান করছে যে, তাকে সম্মান করা না হলে সে কষ্ট দিবে। এমতাবস্থায়ও সম্মান করায় কোনো দোষ নেই। তবে শর্ত হলো, জায়েযের সীমারেখার মধ্যে থেকে সম্মান করতে হবে। তার কারণে কোনো গোনাহে লিপ্ত হওয়া যাবে না।
হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুপম আদর্শের একেকটি অংশের মধ্যে না জানি আমার-আপনার জন্যে কতো অসংখ্য শিক্ষা রয়েছে। তিনি গীবতের সীমা বলে দিয়েছেন যে, এতোটুকু বিষয় গীবতের অন্তর্ভুক্ত, আর এতোটুকু বিষয় গীবতের অন্তর্ভুক্ত নয়। মেহমানকে সম্মান করা কপটতা নয়। বরং হুকুম হলো আগমণকারী ব্যক্তি কাফের, ফাসেক, ফাজের যাই হোক না কেন, যখন সে তোমার নিকট মেহমান হয়ে আসবে, তখন তাকে সম্মান করবে, তাকে মর্যাদা দিবে, এটা কপটতার অন্তর্ভুক্ত নয়。