📄 মানুষের মাঝে আপোস করানো
হযরত সাহল ইবনে সা'দ আসসায়েদী রাযি. বর্ণনা করেন যে, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে পারেন যে, বানী আমর ইবনে আউফ কবীলার মাঝে পরস্পরে ঝগড়া দেখা দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মাঝে আপোস করানোর উদ্দেশ্যে তাশরীফ নিয়ে যান। কতিপয় সাহাবীকেও তিনি সঙ্গে নেন, যাতে তাঁরা আপোস স্থাপনের কাজে সহযোগিতা করেন। আপোস করতে গিয়ে কথা লম্বা হয়ে যায়। এতো দেরি হয় যে, নামাযের সময় ঘনিয়ে আসে। অর্থাৎ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে নববীতে যে সময় নামায পড়িয়ে থাকেন, সে সময় চলে আসে। কিন্তু যেহেতু তিনি তখনও অবসর হতে পারেননি, তাই মসজিদে নববীতে তাশরীফ আনতে পারেননি।'
এখানে এ হাদীস আনার উদ্দেশ্য এই যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের মাঝে ঝগড়া নিরসন ও সন্ধি স্থাপনকে এতো গুরুত্ব দিয়েছেন এবং এ কাজে এতো নিমগ্ন হয়েছেন যে, নামাযের নির্ধারিত সময় চলে এসেছে অথচ তিনি মসজিদে নববীতে তাশরীফ আনতে পারেননি।
বর্ণনাকারী বলেন, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুয়াযযিন হযরত বেলাল রাযি. যখন দেখলেন নামাযের সময় হয়ে গিয়েছে অথচ হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাশরীফ আনেননি, তখন তিনি হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি.-এর নিকট গেলেন এবং নিবেদন করলেন- জনাব আবু বকর সিদ্দীক! হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিলম্ব হচ্ছে, নামাযের সময় হয়ে গিয়েছে। হতে পারে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরে কিছু বিলম্ব হবে। মানুষ নামাযের প্রতীক্ষায় আছে। আপনার জন্যে কি ইমামতি করা সম্ভব? হযরত আবু বরক সিদ্দীক রাযি. বললেন, তুমি চাইলে তা হতে পারে। আমরা নামায পড়ে নেই। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হয়তো বিলম্ব হয়েছে। তারপর হযরত বেলাল রাযি. তাকবীর বললেন এবং হযরত আবু বরক সিদ্দীক রাযি. ইমামতির জন্যে সম্মুখে অগ্রসর হলেন। হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. নামায শুরু করার জন্যে 'আল্লাহু আকবার' বললেন এবং লোকেরাও তাকবীর বললো। যখন নামায শুরু করলেন, তখন নামায চলাকালীন অবস্থায় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাশরীফ আনলেন এবং কাতারের মাঝে মুক্তাদি হিসাবে দাঁড়িয়ে গেলেন। লোকেরা যখন দেখলো যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাশরীফ এনেছেন এবং আবু বকর সিদ্দীক রাযি. সম্মুখে থাকার কারণে তাঁর আগমণ সম্পর্কে জানতে পারেননি, তখন লোকেরা মনে করলো- এখন আবু বকর সিদ্দীককে জানানো উচিত যে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাশরীফ এনেছেন, যাতে তিনি পিছনে সরে আসেন এবং হুযুর সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্মুখে গিয়ে নামায পড়ান। মানুষের মাসআলা জানা না থাকায় হযরত সিদ্দীকে আকবর রাযি.-কে অবগত করার জন্যে তারা নামাযের মধ্যে তালি বাজাতে আরম্ভ করে, এভাবে তাকে সতর্ক করতে থাকে। হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি.-এর অবস্থা এমন ছিলো যে, তিনি যখন নামায আরম্ভ করতেন, তখন দুনিয়ার কোনো কিছুর ব্যাপারে তাঁর খবর থাকতো না। ডানে বামে কি হচ্ছে সেদিকে তিনি মনোযোগ দিতেন না। এ কারণে শুরুর দিকে যখন দু'-একজন তালি বাজিয়েছে, তখন আবু বকর সিদ্দীক রাযি. বুঝতে পারেননি। তিনি তাঁর নামাযের মধ্যে মগ্ন থাকেন।
সাহাবায়ে কেরাম যখন দেখলেন যে, আবু বকর সিদ্দীক রাযি. মনোযোগ দিচ্ছেন না, তখন লোকেরা আরো জোরে তালি বাজাতে আরম্ভ করে। যখন কয়েকজন সাহাবী তালি বাজাতে থাকে এবং আওয়াজ উঁচু হতে থাকে, তখন হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. কিছুটা সজাগ হন এবং চোখের কোণ দিয়ে ডানে বামে দেখতে আরম্ভ করেন। হটাৎ দেখেন যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সারির মধ্যে তাশরীফ এনেছেন। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সারির মধ্যে দেখে হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. পিছু হটতে চাইলেন। তখন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাত দিয়ে ইশারা করে বললেন, তুমি নিজের জায়গায় থাকো। পিছনে সরে আসার প্রয়োজন নেই। নামায পুরা করো।
কিন্তু হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখে আর জায়নামাযে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। এ জন্যে উল্টা পায়ে পিছন দিকে সরে আসতে আরম্ভ করেন। এমনকি সারির মধ্যে এসে দাঁড়িয়ে যান। হুযূর আকদাস সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্মুখে জায়নামাযের উপর তাশরীফ নিয়ে যান। অবশিষ্ট নামায হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পড়ান।
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১১৫৮, সুনানে নাসাঈ, হাদীস নং ৭৭৬
📄 ইমামকে সতর্ক করার পদ্ধতি
নামায শেষ হলে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের মুখোমুখি হয়ে তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, এটা কোন্ পদ্ধতি যে, নামাযের মধ্যে কোনো ঘটনা দেখা দিলে তোমরা তালি বাজাতে আরম্ভ করো। এটা নামাযের মর্যাদার উপযোগী পদ্ধতি নয়। তালি বাজানো মহিলাদের জন্যে শরীয়তসম্মত। অর্থাৎ, এমনিতে মহিলাদের জামাত পছন্দনীয় নয়, তবে মহিলারা যদি নামাযের মধ্যে শামিল হয় আর তারা ইমামকে কোনো বিষয়ের প্রতি মনোযোগী করতে চায়, তখন তাদের জন্যে হাতের উপর হাত মেরে তালি বাজানোর বিধান রয়েছে। তাদের জন্যে নামাযের মধ্যে মুখে 'সুবহানাল্লাহ' বা 'আলহামদুলিল্লাহ' বলা ভালো নয়। কারণ, এভাবে মহিলার আওয়াজ পুরুষের কানে চলে যাবে। শরীয়তে মহিলার আওয়াজেরও পর্দা রয়েছে। তাই তাদের জন্যে বিধান এই যে, নামাযের মধ্যে কোনো ঘটনা ঘটলে হাতের উপর হাত মেরে ইমামকে মনোযোগী করবে। কিন্তু যদি পুরুষদের জামাতের মধ্যে কোনো ঘটনা দেখা দেয়, আর সে কারণে ইমামকে মনোযোগী করতে হয়, সে ক্ষেত্রে তাদের জন্যে পদ্ধতি হলো তারা 'সুবহানাল্লাহ' বলবে। যেমন ইমামের বসা উচিত ছিলো, মুক্তাদিরা দেখলো যে, ইমাম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, তখন মুক্তাদীদের 'সুবহানাল্লাহ' বা 'আলহামদুলিল্লাহ' বলা উচিত। বা ইমামের দাঁড়ানো উচিত ছিলো, কিন্তু বসে গিয়েছে তখনও 'সুবহানাল্লাহ' বলবে। কিংবা জোরে আওয়াজের নামাযে ইমাম আস্তে কেরাত পড়তে আরম্ভ করলে তখনও 'আলহামদুলিল্লাহ' ইত্যাদি বলে তাকে সতর্ক করবে। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন যে, যদি নামাযের মধ্যে এমন কোনো ঘটনা দেখা দেয়, যার ফলে ইমামকে সতর্ক করতে হয়, তাহলে মুক্তাদী 'সুবহানাল্লাহ' বলবে, তালি বাজানো উচিত নয়।
📄 আবু কোহাফার বেটার এ সাধ্য ছিলো না
তারপর হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি.-এর দিকে মনোযোগী হয়ে বললেন, হে আবু বকর! আমি তো আপনাকে ইশারা করেছিলাম যে, আপনি নামায চালু রাখুন, পিছনে সরে আসবেন না। এর পর কী কারণ ঘটলো যে, আপনি পিছনে সরে আসলেন এবং ইমামতি করতে দ্বিধা করলেন। তখন হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. কী বিস্ময়কর উত্তর দিলেন! তিনি বললেন,
مَا كَانَ لِابْنِ أَبِي قُحَافَةَ أَنْ يُصَلَّى بِالنَّاسِ بَيْنَ يَدَى رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
'হে আল্লাহর রাসূল! আবু কোহাফার বেটার সাধ্য নেই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বর্তমানে মানুষের ইমামতি করে।' আবু কোহাফা তাঁর বাবার নাম। অর্থাৎ, আমার সাধ্য নেই যে, আপনার উপস্থিতিতে জায়নামাযে দাঁড়িয়ে ইমামতি করি। যখন আপনি ছিলেন না, তখন ছিলো ভিন্ন কথা। কিন্তু যখন আপনাকে দেখলাম, তখন আর আমার সাধ্য ছিলো না যে, ইমামতি অব্যাহত রাখি। এ কারণে আমি পিছনে সরে এসেছি। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথার উপর আর কোনো আপত্তি করলেন না, বরং নীরবতা অবলম্বন করলেন।
📄 হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি.-এর মাকাম
এর দ্বারা হযরত আবু বকর সিদ্দকি রাযি.-এর মাকাম জানা যায় যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর অন্তরে হুযূর আকদাস সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মর্যাদা এ পর্যায়ে গেঁথে দিয়েছিলেন যে, তিনি বলেন, এটা আমার সাধ্যের বাইরে যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পিছনে দাঁড়িয়ে থাকবেন, আর আমি সামনে খাড়া থাকবো। যদিও এ ঘটনা হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবর্তমানে ঘটেছে। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপস্থিতিতে তিনি সামনে দাঁড়াননি। কিন্তু যখন জানতে পারলেন যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পিছনে আছেন, তখন সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা সাধ্যের বাইরে ছিলো, এজন্যে তিনি পিছনে সরে এসেছেন।