📄 নিজের নামাযকে 'ঠোকর মারা' বলো না
অতিরঞ্জিত এই বিনয় মানুষকে নিরাশ করে। মানুষের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে। যেমন, আপনারা মানুষের মুখে শুনে থাকবেন- 'আরে আমাদের নামায আর কি, কয়েকটা ঠোকর মারি।' নামায পড়াকে 'ঠোকর মারা' বলা অতিরঞ্জিত বিনয়। এমন করা উচিত নয়। আল্লাহর দেওয়া তাওফীকের শোকর আদায় করা উচিত যে, তিনি তাঁর দরবারে হাজির হওয়ার তাওফীক দিয়েছেন। কতো মানুষ এমন আছে, আল্লাহর দরবারে হাজির হওয়ার তাওফীকও যাদের লাভ হয়নি। এ জন্যে কেন এ নামাযের অবমূল্যায়ন ও না-শোকরি করো? এ কথা ঠিক যে, তোমার নামাযের মধ্যে অনেক ত্রুটি রয়েছে, কিন্তু সে ত্রুটি তোমার। আর তাওফীক দিয়েছেন আল্লাহ তা'আলা। এ জন্যে প্রথমে তাওফীকের শোকর আদায় করো। তারপর ত্রুটির জন্যে ইস্তিগফার করো। আল্লাহ তা'আলাকে বলো- হে আল্লাহ! আপনি আমাকে নামায পড়ার তাওফীক দান করেছিলেন, কিন্তু আমি সেই নামাযের হক আদায় করিনি। আসতাগফিরুল্লাহ। প্রথমে ইবাদতের তাওফীকের উপর শোকর আদায় করো, তারপর নিজের ত্রুটির জন্যে ইস্তিগফার করো। এ কথা বলো না যে, আমার নামায তো ঠোকর মারা। এ কথা বলা মোটেই ঠিক নয়।
📄 ত্রুটির জন্য ইস্তিগফার করো
তুমি নিজের ত্রুটির জন্যে ইস্তিগফার করলে যিনি ইবাদত করার তাওফীক দিয়েছেন, তিনি তোমার ইস্তিগফার কবুল করে ঐ ইবাদতের মধ্যে পূর্ণতাও দান করবেন, ইনশাআল্লাহ। আরে এমন কোনো মানুষ আছে কি, যে আল্লাহর ইবাদতের হক আদায় করতে পারে? আমি আর তুমি তো দূরের কথা, রাতের তাহাজ্জুদ নামাযে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যেই নবীর পা ফুলে যেতো, তিনি বলছেন,
مَا عَبَدْنَاكَ حَقَّ عِبَادَتِكَ، مَا عَرَفْنَاكَ حَقٌّ مَعْرِفَتِكَ 'আমরা আপনার ইবাদতের হক আদায় করতে পারিনি।"
তিনি যখন এ কথা বলছেন, তখন আমরা কী করে তাঁর ইবাদতের হক আদায় করতে পারি! আমাদের সব ইবাদতই তো তাঁর তুলনায় ত্রুটিপূর্ণই হবে। কিন্তু তিনি যখন তাঁর দুয়ারে আসার তাওফীক দিয়েছেন, তাঁর চৌকাঠে সেজদা করার তাওফীক দান করেছেন, তখন তাঁর সম্পর্কে এ বদগুমানী কেন করছো যে, তিনি এ সেজদা কবুল করবেন না! কেমনে তোমরা সেজদায় অবমূল্যায়ন করে বলো যে, এটা নাপাক সেজদা! যখন তুমি তাঁর দেওয়া তাওফীকের শোকর আদায় করে ইস্তিগফার করবে এবং বলবে যে, হে আল্লাহ এ ইবাদতে যা কিছু ত্রুটি হয়েছে, আপনি দয়া করে তা মাফ করে দিন, তখন আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই সে ভুল ত্রুটি-মাফ করে দিবেন。
টিকাঃ
৫. মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস নং ১৫০২, শোয়াবুল ঈমান, হাদীস নং ১৬৬
📄 হযরত ডাক্তার আব্দুল হাই ছাহেব রহ.-এর একটি ঘটনা
আমাদের হযরত ডাক্তার আব্দুল হাই রহ.-এর সামনে যখন কেউ এসে বলতো যে, 'আমি কি আর নামায পড়ি, কয়েকটা ঠোকর মারি।' তিনি এসব কথায় খুব ভয় পেতেন। সুতরাং এক ব্যক্তি এসে হযরতের কাছে বললো যে হযরত আমার নামায আর কি! সেজদা আর কি! সেজদার মধ্যে প্রবৃত্তির অনেক পঁচা পঁচা কামনা-বাসনা জাগ্রত হয়। আমার এ নামায তো আল্লাহ্র সামনে পেশ করার উপযুক্ত নয়।
হযরত বললেন, আচ্ছা তোমার প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা দিয়ে ভরা এ সেজদা তো অত্যন্ত নাপাক। সে বললো, হ্যাঁ, অত্যন্ত নাপাক সেজদা। হযরত বললেন, আচ্ছা এমন নাপাক সেজদা তুমি আমাকে করো। কারণ, খায়েশাতপূর্ণ এ সেজদা আল্লাহর সামনে পেশ করার উপযুক্ত নয়, এ জন্য এ সেজদা আল্লাহকে না করে আমাকে করো।
সে বললো, হযরত এ আপনি কেমন কথা বলছেন! আমি আপনাকে সেজদা করবো!
হযরত বললেন, এটা যেহেতু নাপাক সেজদা এবং আল্লাহকে করার উপযুক্ত নয়, তাই আমাকে করে দেখাও!
লোকটি বললো, হযরত এটা হতে পারে না। আমি অন্য কাউকে সেজদা করতে পারি না।
হযরত বললেন, এ সেজদা যখন অন্য কোথাও হতে পারে না, তাই বুঝা গেলো, এ সেজদা তাঁর জন্যেই। এ কপাল অন্য কোথাও ঠেকতে পারে না। এ সেজদা অন্য কোথাও হতে পারে না। এ মাথা অন্য কোনো চৌকাঠে নত হতে পারে না। এ সেজদা তো তাঁর জন্যেই এবং তাঁরই তাওফীকে লাভ হয়েছে। হ্যাঁ, আমাদের ভুল-ত্রুটির কারণে এ সেজদা খারাপ হয়ে গিয়েছে। এ জন্যে ইস্তিগফার করো। কিন্তু এ কপাল তো সেখানেই ঠেকবে। কবি কতো চমৎকার বলেছেন,
قبول ہو کہ نہ ہو پھر بھی ایک نعمت ہے وہ سجدہ جس کو تیرے آستاں سے نسبت ہے
'কবুল হোক বা না হোক, তারপরেও তা নেয়ামত, এ সেজদা, তোমার চৌকাঠের সঙ্গে যার সম্পর্ক রয়েছে।' এ সেজদা কোনো মামুলী জিনিস নয়। সেজদা সম্পর্কে উল্টা-সিধা মন্তব্য করো না। আল্লাহর দেওয়া তাওফীকের শোকর আদায় করো।
📄 ইবাদত ছাড়ানোর পদ্ধতি
শয়তান অতিরঞ্জিত এই বিনয় সৃষ্টি করে বিপথগামী করে থাকে। অন্তরে এই চিন্তা জাগ্রত করে যে, আমি তো অহংকারের রোগে আক্রান্ত নই। কারণ, আমি তো আমার নামাযকে কিছুই মনে করি না এবং সাথে সাথে বিনয়ও অবলম্বন করছি। কিন্তু এ চিন্তা যখন বৃদ্ধি পায়, তখন ক্রমান্বয়ে অন্তরে নৈরাশ্য সৃষ্টি করে যে, ইবাদত করা তোমার সাধ্যভুক্ত নয়। তোমার নামায কখনোই কবুল হতে পারে না। যখন কবুলই হবে না, তখন পড়ে লাভ কি? তাই নামায ছেড়ে দাও। ঘরে বসে থাকো। এভাবে শয়তান নামায ছাড়িয়ে থাকে।